তিনি কাউকে অগ্রাহ্য করেন না। সবার সমস্যাই শুনেন। শুধু নিজের মেয়েদের কোন কথা শােনার সময় পান না। ছুটির সাতদিন পুরােপুরি মেয়েদের সঙ্গে কাটাবেন ভেবেছিলেন—তাও হচ্ছে না।
নবনী মা, বােস তাে আমার পাশে।
নবনী বসল। জামিল সাহেব বললেন, মা’র মুখটা এমন মলিন কেন? কি হয়েছে আমার মার?
‘আমার কিছু হয়নি, বাবা। সম্ভবত মার কিছু হয়েছে। রাতে ঘুমুচ্ছে না।’
‘এটা তাে নরমাল। সে রাতে কখনাে ঘুমায় না। আমার ধারণা, ঘুম এলেও জেগে থাকে।’
এরকম করতে করতে দেখবে একদিন খুব অসুস্থ হয়ে পড়বে।’ ‘তা তাে পড়বেই। কিন্তু তাের মা’কে কে বােঝাবে? আমার সাধ্যের বাইরে। আমি চেষ্টা কম করিনি। অনেক চেষ্টা করেছি। এখন হাত ধুয়ে ফেলেছি । তােরা চেষ্টা করে দেখ কিছু করতে পারিস কি-না। মনে হয় না পারবি। তাের মা’র কথা বাদ দে। তােদের কথা বল । ছুটি কেমন লাগছে?
একবারতাে বলেছি বাবা ভাল লাগছে।’ এখানে যা দেখার দেখেছিস?’
মনু মিয়ার দীঘি দেখেছিস?’ ‘না। সেটা আবার কোথায়?’
‘সুরুজ মিয়াকে বললেই নিয়ে যাবে। নৌকায় যেতে হবে। এখান থেকে তিন–চার মাইল হবে।’
বিরাট দীঘি?’
তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-২৩
মােটামুটি বিরাটই আছে। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল পানি লাল। গাঢ় লাল। ভয় কে দীঘিতে নামে না । অদ্ভুত মিথ আছে দীঘি নিয়ে। সুরুজ মিয়া জানে নিশ্চয়ই।
‘পানি লাল কেন, বাবা?’
‘ঠিক জানি না। কে যেন বলেছিল লাল শৈবালের কারণে পানি হয়েছে লাল। এসব তােদের সায়েন্সের ব্যাপার। তােরাই তাে ভাল জানবি।’
‘আমি আমার পাঠ্যবইয়ের বাইরে কিছু জানি না, বাবা। শ্রাবণী হয়ত জানে। তার কাজই বই পড়া।’
কুয়াশা কেটেছে।
স্পিড বােট চলে এসেছে। রওনা হতে দেরি হবে। সুরুজ মিয়া হাতা আনতে গেছেন। রােদ চড়লে ছাতা না থাকলে কষ্ট হবে। প্রাবণী বাইরে যাবার জন্য তৈরি হয়েছে। আজ এই প্রথম সে শাড়ি পরল। নবমীকে বলল, তােমার মুক্তার কানের দুলজোড়া আমাকে দাও তাে আপা। নবনী দুল পরিয়ে দিল। শাহেদ বলল, প্রাবণীকে তাে আজ অদ্ভুত লাগছে! নবনী দেখেছ, কি অপূর্ব লাগছে শ্রাবণীকে নবনী বলল, যা অপূর্ব লাগছে।
শাহেদ বলল, শাড়ি হচ্ছে অসম্ভব সুন্দর একটা পােশাক। শােন শ্রাবণী, এখন থেকে তুমি সব সময় শাড়ি পরবে।
শ্ৰবণী বলল, আচ্ছা শাহেদ ভাই, আপনাকে একটা ধাধা জিজ্ঞেস করছি। বলুন তাে দেখি আমি, আপনি এবং একটি শাড়ি। এই তিন জিনিসের মধ্যে একটা সুন্দর মিল আছে। মিলটা কোথায়?
তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-২৩
শাহেদ অবাক হয়ে বলল, আমি তাে মিল পাচ্ছি না।
ভাবলে পাবেন কি করে? ভেবে তারপর বলুন। আপা, তুমি বলতে পারবে? না, আমি বলতে পারব না।’
শ্রাবণী হাসতে হাসতে বলল, মিলটা হল তিনটিরই গুরু অক্ষর হচ্ছে ‘শ। শ্ৰবণী, শাহেদ এবং শাড়ি।
নবনী হােটবােনের দিকে তাকিয়ে আছে। সে কিছু একটা বলতে গিয়েও বলল না। নিজেকে সামলে নিল।
শ্রাবণী বলল, আপা, তােমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে। এসাে আমার সঙ্গে। ‘কোথায় যাব? ‘খানিকটা দূরে যেতে হবে। মিনিট দশেক হাঁটতে হবে।’ ‘ডাকবাংলাের ভেতরে বলা যাবে না?
না।’ শাহেদ বলল, আমি কি তােমাদের সঙ্গে আসতে পারি?
না। বােনে বােনে কথা হবে, এখানে আপনার কোন স্থান নেই।’ আমি সঙ্গে আসি। তােমাদের কথা বলার সময় না হয় দূরে সরে যাব। ‘অসম্ভব। আপনাকে নেয়াই যাবে না।’
নবনী এবং শ্রাবণী হাঁটছে। কেউ কোন কথা বলছে না। জংলামত একটা জায়গায় এসে শ্রাবণী থমকে দাঁড়াল। আপার দিকে তাকিয়ে বলল, এখন এই বনের ভেতর ঢুক? হবে।
নবনী বলল, কথাগুলি কি বনের ভেতর ঢুকে বলবি? কথা না। তােমাকে একটা জিনিস দেখাব। কি জিনিস?’
মারিয়া স্টোনের কবর। তুমি আমাকে অবিশ্বাস করেছিলে। তুমি ভেবেছিলে আর্মি মিথ্যা কথা বলছি। আমি সত্যি কথাই বলি, আপা। কিছু কিছু মানুষ আছে যাদের সত্যি কথা মিথ্যার মত মনে হয়। আমি সে রকম একজন । এসাে বনে ঢুকি, বেশি দূর যেতে হবে না। অল্প কিছু দূর গেলেই দেখবে।’
তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-২৩
নবনী ক্লান্ত গলায় বলল, আমি তাের কথা বিশ্বাস করছি। আমি দেখতে চাচ্ছি না। ‘তােমাকে দেখতে হবে। এতদূরে এসে তুমি না দেখে যেতে পারবে না।’
তুই কেন আমার সঙ্গে এরকম করছিস?’ ‘তুমি আমাকে মিথ্যাবাদী ভাববে, তা হবে না।’
আমি তােকে মিথ্যাবান ভাবছি না।’ এক সময় ভেবেছিলে।। হাঁ, এক সময় ভেবেছিলাম। I am sorry for that.’ ‘এসাে আপা, দু’মিনিটের মাত্র পথ। চোরকাঁটা আছে। শাড়ি খানিকটা উপরে তুলতে হবে। ভয় নেই, কেউ দেখবে না।
তারা কবরের কাছে এসে দাড়াল। একটা কালাে পাথরের ক্রসচিহ্ন। পেছনে কালাে পাথরে খােদাই করে লেখা, মারিয়া স্টোন। দীর্ঘ ইংরেজি কবিতা। এপিটাপ । প্রথম দুই লাইন
The bells will ring,
The birds will sing শ্ৰবণী বলল, আপা দেখলে?
যা দেখলাম।
শাহেদ ভাই সম্পর্কে যে কথাগুলি বলেছি সেগুলিও যে সত্যি তা-কি তুমি বিশ্বাস করছ?
নবনী জবাব দিল না। শ্রাবণী বলল, পাখি দেখতে যাবার জন্যে আমরা সব তৈরি হয়ে আছি। এখন আমি যদি বলি—শাহেদ ভাই, আপনি আপাকে নিয়ে যান। আমার মচকানাে পা আবার ব্যথা করছে। আমি যেতে পারব না। তাহলে শাহেদ তাই যাবে না। সে থেকে যাবে। আমি প্রমাণ করব?
Read More