হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-৯

বালিশ হাতে নবনী ছােট বােনের ঘরে ঘুমুতে গেল। দরজায় টোকা দিল । শ্রাবণী জেগে আছে। ঘরে বাতি জ্বলছে। তার নড়াচড়ার শব্দ শােনা যাচে। কিন্তু সে না খুলছে না। নবনী দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলল, এই শ্রাবণী, দরজা খােল । কি হল তাের।

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে 

শ্রণী দরজা খুলল। তার চোখে-মুখে শ বিরক্তি। সে হতাশ গলায় বলল, আপা, তুমি আমার সঙ্গে ঘুমুবে।’অসুবিধা আছে। 

আছে। আমি কারাে সঙ্গে ঘুমুতে চাই না। একা ঘুমুতে চাই।’ যথেষ্ট পাগলামি করেছিস । দরজা থেকে সরে দাঁড়া। 

প্রাবণী দরজা ছেড়ে সরে আঁড়াল। করুণ গলায় বলল, তুমি কি দেয়ালের দিকে শােবে। আমি ঘুমূব বাইরের দিকে। এবং কাল থেকে তুমি অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করবে। 

‘তাের সমস্যাটা কি? ‘সমস্যা আছে। তুমি বুঝবে না।’ 

বুঝিয়ে বললেও বুঝবাে না? না।’ বলে দেখ। বুঝতেও তাে পারি।’ 

প্রাবণী হালকা গলায় বলল, আমি তাে রাতে এক নাগাড়ে ঘুমাই না আপা। কিছুক্ষণ ঘুমাই। আবার জেগে উঠি। আবার খানিকক্ষণ বই পড়ি । গান শুনি। তুমি বিরক্ত হবে। 

‘অবশ্যই বিরক্ত হব । আমার তাে শুনেই বিরক্তি লাগছে।’ 

এই জন্যেই আমি চাই না তুমি আমার সঙ্গে ঘুমাও। আমি একা থাকতে চাই।’ ননী বিছানায় উঠতে উঠতে বলল, গল্পের বই পড়ে তাের মাথা এলােমেলাে হয়ে যাচ্ছে। গল্পের বই পড়া তাের বন্ধ করতে হবে। একা একা থাকার অভ্যাসটাও তাের বদলাতে হবে। দুদিন হল আমরা এখানে আছি- দুদিন তুই কি একবারের জননও ডাকবাংলাে কম্পাউন্ডের বাইরে গিয়েছিস? শ্রাবণী জবাব দিল না। হাসল। 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-৯

নবনী বলল, আয়, বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ি। শুয়ে শুয়ে গল্প করি। শ্রাবণী বলল, আমার ওতে ইচ্ছে করছে না। এত সকালে আমি কখনাে ঘুমুতে যাই না। একরাতে একটু ব্যতিক্রম হােক। 

শ্রাবণী বাতি নিভিয়ে ঘুমুতে এল। দু’জনের জন্য একটাই লেপ। নবনী হাসতে হাসতে বলল, তাের গায়ের সঙ্গে গা গেলে সমস্যা নেই তাে আবার। না, কোন সমস্যা নেই। 

শ্রাবণী বােনকে জড়িয়ে ধরল । এখন মনে হচ্ছে বােনের সঙ্গে ঘুমুতে পেরে সে আনন্দিত। নবনী আদুরে গলায় বলল, তুই দিন দিন এত অদ্ভুত হচ্ছিস কেন রে? 

সে জবাব দিল না। লেপের ভেতর মাথা ঢুকিয়ে নিয়ে খিল খিল করে হাসল । নবনী বলল, এত হাসছিস কেন? 

তুমি আমার সঙ্গে ঘুমুচ্ছ । আমার ভাল লাগছে, তাই হাসছি।’ একটু আগে তাে উল্টো কথা বলি—আমাকে তাের ঘরে আসতেই দিতে চাসনি।’ 

শ্রাবণী আরাে ভালভাবে বােনকে জড়িয়ে ধরল । নবনী বলল, হাত ছাড়, দম বন্ধ হয়ে আসছে। 

‘হােক দম বন্ধ, হাত ছাড়ব না। তুমি গল্প বল। গল্প শুনব।’ 

কনি পরেই পড়ি তুই, আর প বলব আমি—এটা কেমন কথা? বরং তুই ভাের পক্ষ থেকে এটা কি ফল, আমি ওনি।’ 

তুমি কৰে আমি কনব। যাৰ ফল। এখানে এসে তােমার কেমন লাগছে সেইটা না হয় বল। তুমি যে এ ক খুরে বেড়াও কোথায় কোথায় গেলে, কি দেখলে?’ 

ননী হাই তুলতে তুলতে বলল, গাছপালা ছাড়া এখানে আর কি আছে? গাছপালা মেয়ে। একটা বিশাল বটগাছ দেখলাম। বুড়ি নেমে একাকার। নিচটা বাঁধানাে। তােকে বি একদিন না হয় বাৰ। ঐ বটগারে বাধানাে জায়গাটায় বসে জোছনা দেখব। খুব না কি সুন্দর। 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-৯

কে বলেছে খুব সুন্দর? এখানকার কলেজের এক অধ্যাপক মবিন উদ্দিন না কি যেন নাম।’ তার সঙ্গে দেখা হল কোথায়?’ 

ননী গল্পটা বলল, বেশ গুছিয়েই বলল। বলতে গিয়ে লক্ষ্য করল গল্পটা বলতে তার ভাল লাগছে। শ্রাবণী শুনছেও খুব আগ্রহ করে। গল্প শেষ হবার পর শ্রাবণী বলল, তুমি কি অধ্যাপক লােককে খুব কঠিন করে ধমক দিলে? 

‘মােটামুটি কঠিনভাবেই দিলাম। 

জ্বলােক কি বললেন?’ লি বলেনি। দাঁড়িয়েছিল চুপচাপ।’ ধমক দেবার পর তােমার কি মনে হয়নি আহা, কেন ধমক দিলাম! 

না, মনে হয়নি। ধমক তার প্রাপ্য ছিল । কি করে সে তার সঙ্গে জোছনা দেখার জন্যে এমন একটা নির্জন জায়গায় যেতে বলে। 

‘আমি কিন্তু লােকের কোন দোষ দেখছি না।’ ‘দোষ দেখছিস না কেন?’ 

শ্রাবণী উঠে বসে হাত বাড়িয়ে টেবিল ল্যাম্প জ্বালাল ? মুখ না দেখে কথা বলতে তার অল লাগছে না। নবনী বিরক্ত গলায় বলল, বাতি জ্বালিয়েছিস কেন? বাতি নেভা।। 

উহু। অন্ধকারে কথা বলতে ভাল লাগছে না। আপা, তুমি আমার যুক্তি শােন । যুক্তি শােনার পর তােমার মনে হবে ঐ অধ্যাপক দ্রলােক কোন ভুল করেন নি। বরং তাকে ধমক দিয়ে তুমি ভুল করেছ। 

যুক্তি সকালে শুনব। এখন শুনতে ইচ্ছা করছে না।’ 

না, তােমাকে এখনই শুনতে হবে। এই যুক্তি আমার সকালে মনে থাকবে না। রাতের যুক্তি দিনে কাজ করে না। আপা শােন—ঐ অধ্যাপক ভদ্রলােকের কথা থেকেই মনে হচ্ছে তিনি বটগাছের কাছে প্রায়ই আসেন । এখানে বসে জোছনা দেখেন। নিশ্চয় জায়গাটা তার অত্যন্ত প্রিয় এবং জোছনাও খুব প্রিয়। তুমি কি accept করছ? 

করছি।’ 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-৯

ভদ্রলােক বসেছিলেন একা একা । তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি—তুমি সেখানে উপস্থিত হবে। তিনি হঠাৎ তােমাকে দেখলেন। নির্জন জায়গা। অদ্ভুত পরিবেশ। সেখানে ঠিক 

দৃশ্যের মত অসাব রূপবতী এক তরুণী উপস্থিত হল। সাধারণ পরিবেশেই তােমাকে দেখলে লােকজন চমকে যায়। অস্বাভাবিক পরিবেশে তােমাকে দেখে দ্রলােক হতভম্ব হয়ে গেলেন। তার মধ্যে এক ধরনের ঘাের সৃষ্টি হল। তার কাছে এটা বাস্তব দৃশ্য না । 

এটা হয়ে গেল স্বপ্নদৃশ্য । তুমি হয়ে গেলে স্বপ্নের একটি মেয়ে। স্বপ্নে যা ই করে তাই বলা যা { লােক তাই করলেন— তােমাকে নিমন্ত্রণ করলেন জোছনা দেখার জন্যে। ব্যাপারটা তােমার কাছে অস্বাভাবিক লাগলেও তার কাছে মােটেই অস্বাভাবিক লাগল না। কারণ তুমি তাে বাস্তবের মেয়ে না, তুমি ছিলে কল্পনার একটি মেয়ে। 

চুপ কর গাধা। আমি হলাম কল্পনার মেয়ে। সে খুব ভাল করেই জানে আমি কে। আমি ডাকবাংলােয় আছি। আমার নাম পর্যন্ত জানে। | জানম্নেও তুমি তার কাছে বাস্তবের কোন চরিত্র না। বাস্তবের চরিত্র তােমার মত সুন্দর হয় না। বাস্তবের চরিত্ররা এত সুন্দর করে সেজে একা একা লাহের কাছে যায় । বটগাছের সঙ্গে গল্প করে না।’ 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-৯

যথেষ্ট হয়েছে। বাতি নিভিয়ে ঘুমুতে আয়।’ | শ্রাবণী বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। হালকা গলায় বলল, তােমার জায়গায় আমি হলে কি করতাম জান আপা? 

‘জানি।’ 

বলতে কি করতাম।’ 

‘তুই বলতি—চলুন যাই । আপনার জোছনা দেখে আসি। তারপবসে থাকতি লােকটার সঙ্গে। আমরা পুলিশ নিয়ে তােকে খুঁজে বের করে আনতাম। 

শ্রাবণী হাসতে হাসতে বলল, কিছুটা হয়েছে, পুরােপুরি হয়নি। আমি ঠিকই বলতাম, চলুন যাই। বটগাছটার কাছে গিয়ে বলতাম—আপনি গিয়ে বসুন, আমি আসছি।ভদ্রলােক বসতেন আর আমি নিঃশব্দে পালিয়ে চলে আসতাম। ভদ্রলােক আর আমাকে খুঁজে পেতেন না । 

‘তাতে লাভ কি হত? 

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-১০

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *