সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-১৬)

নয়ন রহস্য

ওকে নিয়ে মিটিং করা এক দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। গত বছর একদিন আমি তেওয়ারিকে বলি—“ডাঃ শৰ্মা বলে একজন অত্যন্ত বিচক্ষণ মস্তিষ্ক চিকিৎসক আছেন । তাঁকে আমি খুব ভালাে করে চিনি। আমি চাই তুমি একবার তাঁর কাছে। যাও?”—তাতে তেওয়ারি ভয়ানক অফেন্স নেয় । সেই থেকেই আমাদের সম্পর্কে চিড় ধরে। অথচ আমি হাল না ধরলে সিন্ডিকেট ডুবে যাবে শুধু এই কথা ভেবেই আমি রয়ে গিয়েছিলাম।

না হলে আইনসম্মত ভাবে পার্টনারশিপ চুকিয়ে দিয়ে চলে আসতাম। কিন্তু যে ব্যাপারে আমি সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেলাম সেটা এই যে,তেওয়ারি যেই জানতে পারল যে ওর সিন্দুক খালি, ও সটান আমার কাছে এসে বলল, “গিভ মি ব্যাক মাই মানি-দিস মিনিট।” ‘উনি যে ক্লেম করেন যে এককালে আপনাকে কম্বিনেশনটা বলেছিলেন সেটা কি সত্যি ? | ‘সর্বৈব মিথ্যা। ওটা ছিল ওর পার্সোনাল সিন্দুক। তার কম্বিনেশন ও পাঁচজনকে বলে বেড়াবে ? ননসেন্স ।

তাছাড়া ওর ধারণা যে ও যখন ডেনট্রিস্টের কাছে যায় তখনই আমি ওর সিন্দুক খুলে টাকা চুরি করি । অথচ আমার অকাট্য প্রমাণ রয়েছে যে সেই সময়টা আমি ছিলাম আপিস থেকে অন্তত চার মাইল দূরে। আমার এক খুড়তুতাে ভাইয়ের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে খবর পেয়ে আমি এগারটার সময় বেলভিউ ক্লিনিকে চলে যাই, ফিরি সাড়ে তিনটেয় । 

‘তাও মিঃ তেওয়ারি আপনার পিছনে লেগে আছেন ? ‘শুধু পিছনে লেগেছেন নয় মিস্টার মিটার, তিনি আমাকে শাসিয়েছেন যে অবিলম্বে টাকা ফেরত না দিলে তিনি আমার সর্বনাশ করবেন । তেওয়ারি যে স্বার্থসিদ্ধির জন্য কতদূর যেতে পারে তার বেশ কিছু নমুনা আমি গত সতের বছরে পেয়েছি । গুণ্ডা লাগিয়ে কী করা সম্ভব-অসম্ভব সে আর আমি আপনাকে কী বলব ?  ‘আপনি বলতে চান তেওয়ারি এতই প্রতিহিংসাপরায়ণ যে গুণ্ডা লাগিয়ে আপনাকে খুন করাননাতেও সে পেছপা হবে না ? 

নয়ন রহস্য (পর্ব-১৬)

সিন্দুকে কিছু নেই জানার পরমুহূর্তে সে যেভাবে আমার ঘরে এসে আমার উপর দোষারােপ করে, তাতে আমি পরিষ্কার বুঝি যে তার কাণ্ডজ্ঞান সম্পূর্ণ লােপ পেয়েছে। এ অবস্থায় টাকা ফেরত না পেলে আমার উপর চরম প্রতিশােধ নেওয়াটা কিছুই আশ্চর্য নয়। ‘এই চুরি সম্বন্ধে আপনার নিজের কোনাে থিওরি আছে ? ‘প্রথমত, চুরি যে গেছে সেটাই আমি বিশ্বাস করি না।তেওয়ারি হয় সেটা সরিয়েছে, না হয় কিছুতে খরচ করেছে, না হয় কাউকে দিয়েছে।

তােমরা বাঙলায় যে বল না—ব্যোম ভােলানাথ ?—তেওয়ারি হল সেই ভােলানাথ। না হলে বাইশ বছরের পুরােন ব্যক্তিগত সিন্দুকের কম্বিনেশন কেউ ভােলে ? ‘বুঝলাম, বলল ফেলুদা। এবার তাহলে আসল কথায় আসা যাক। ‘কেন আমি আপনাকে ডেকেছি সেটা জানতে চাইছেন ত ? ‘আজ্ঞে হ্যা। দেখুন মিঃ মিটার—আমি চাই প্রােটেকশন ।

তেওয়ারি নিজে ভােলানাথ হতে পারে, কিন্তু ভাড়াটে গুতাদের কেউই ভােলানাথ নয় । তারা অত্যন্ত সেয়ানা, ধূর্ত, বেপরােয়া। এই জাতীয় প্রােটেকশনের কাজ। ত আপনাদের প্রাইভেট ডিটেকটিভদের মধ্যে পড়ে। তাই না ? ‘তা পড়ে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে কি, আমি সামনে প্রায় পাঁচ সপ্তাহের জন্য থাকছি না। ফলে আমার কাজ শুরু করতে ত অনেক দেরি হয়ে যাবে। তাতে আপনার চলবে কি ? 

নয়ন রহস্য (পর্ব-১৬)

‘আপনি কোথায় যাচ্ছেন? ‘দক্ষিণ ভারত । প্রথমে ম্যাড্রাস। সেখানে দশদিন, তারপর অন্যত্র। হিপোরানির চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। এক্সেলেন্ট । হাঁটুতে চাপড় মেরে বললেন ভদ্রলােক। আপনাকে একটা কথা এখও বলা হয়নি-আমি দুদিন থেকে আর আপিসে যাচ্ছি যা ঘটেছে তার পরে আর কোননামতেই ওখানে থাকা যায় না। আইনত যা করার তা আমি যথাসময়ে করব—যখন মাথা ঠাণ্ডা হবে । অথচ রােজগার ত করতেই হবে ।

ম্যাড্রাসে একটা কাজের সম্ভাবনা আছে সে খবর আমি পেয়েছি। আমি এমনিতেই যেতাম । আপনারা গেলে এক সঙ্গেই বেরিয়ে পড়ব । আপনি প্লেনে যাচ্ছেন ? ‘না, ট্রেনে। এখানেও একজনকে প্রােটেক্ট করার ব্যাপার আছে। তরফদারের ম্যাজিক শােয়ের ওই বালক। তারও জীবন বিপন্ন। অন্তত তিনজন ব্যক্তির লােলুপ দৃষ্টি পড়েছে ওর উপর । বুঝতেই ত পারছেন, এমন আশ্চর্য ক্ষমতাকে অসদুদ্দেশ্যে কাজে লাগানাের অজস্র উপায় আছে। 

বেশ ত, বললেন হিতোয়ানি, আপনি এক ঢিলে দুই পাখি মারুন। আপনি ত এই যাদুকরের জন্য প্রােফেশনালি কাজ করছেন ? ‘হ্যা। ‘সেটা আমার বেলাতেও করুন, আমিও আপনাকে পারিশ্রমিক দেবাে। ফেলুদা অফারটা নিয়ে নিল। তবে বলল, এটা জেনে রাখবেন যে শুধু আমার প্রােটেকশনে হবে না। আপনাকেও খুব সাবধানে চলতে হবে। 

আর সন্দেহজনক কিছু হলেই আমাকে জানাবেন। “নিশ্চয়ই। আপনি কোথায় থাকবেন ? ‘হােটেল করােমন্ডল। আমরা একুশে পৌছচ্ছি। ‘বেশ। ম্যাড্রাসেই দেখা হবে।’ বাড়ি ফেরার পথে আমি বললাম, “আচ্ছা ফেলুদা, ড্রইং রুমের দুদিকের দেয়ালে দুটো বেশ বড় বড় রেক্ট্যাঙ্গুলার ছাপ দেখলাম—-অনেক দিনের টাঙানাে ছবি তুলে ফেললে যেমন হয়? ‘গুড অবজারভেশন’, বলল ফেলুদা।

‘বােঝাই যাচ্ছে ও জায়গায় দুটো বাঁধানাে ছবি ছিল সম্ভবত অয়েল পেন্টিং। সেগুলাে যে আর নেই, বললেন জটায়ু, সেটার কোনাে সিগনিফিক্যান্স আছে কি? ‘বােঝাই যাচ্ছে ভদ্রলােক ছবিগুলাে পাচার করে দিয়েছেন। ‘তার সিগনিফিক্যান্স ? ‘সাতশাে ছেষট্টি রকম সিগনিফিক্যান্স। সব শােনার সময় আছে কি আপনার ?  ‘আবার সজারু ! আমার মনে হয় ব্যাপারটাকে আপনি বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন না।

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-১৭)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *