‘তৃপ্তিবে ? ভুরু কুঁচকে বলল ফেলুদা । ‘হােয়াই নট ? মল্লিকের উপর মাইকেলের দস্তুরমতাে প্রভাব ছিল। তৃপ্তিবে হল নামধাতু। আপনি গােয়েন্দা তাই হয়ত জানেন না ; আমরা সাহিত্যিকরা জানি । বলছি না-হাইলি ট্যালেন্টেড ! পােড়া দেশ বলে ককে পেলেন না। | আমি দেখেছি বৈকুণ্ঠ মল্লিকের কথা বলতে গেলেই জটায়ু ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়েন, আর এতটুকু সমালােচনা করলেই তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন। আমি আর ফেলুদা তাই চুপ মেরে গেলাম।
এই ফাঁকে বলে রাখি যে ট্রেনে কোনাে গণ্ডগােল হয়নি। তরফদার, শঙ্করবাবু আর নয়ন এ. সি ফার্স্ট ক্লাসে আমাদের এক বােগীতেই ছিলেন। দলের বাদবাকি সব ছিল সেকেন্ড ক্লাসে। যে তিনজনকে নিয়ে চিন্তা-হজসন, তারকনাথ আর বসাক—তারা কেউ এ ট্রেনে এসে থাকলেও আমাদের সঙ্গে দেখা হয়নি।
ম্যাড্রাস সেন্ট্রালে নেমেও এদের কাউকে দেখিনি হিপ্পোরানি আজ বাত্রেই প্লেনে আসছেন, আর আমাদের হােটেলেই থাকবেন। করােমণ্ডলের ঝলমলে লবিতে ঢুকে লালমােহনবাবুর মুখে প্রথম হাসি দেখা দিল। এদিকে ওদিকে দেখে বললেন, নাঃ,অনবদ্য মশাই,অনবদ্য! ইডলি-দোসার দেশে এ জিনিস ভাবাই যায় না।
নয়ন রহস্য (পর্ব-১৯)
ট্রেনেই আলােচনা করে ঠিক হয়েছে যে আমরা প্রথম তিনটে দিন একটু ঘুরে দেখব । সঙ্গে অবশ্য নয়ন আর তরফদারও থাকবে। ফেলুদা বলেছে—‘আমরা এলিফ্যান্ট দেখেছি, এলােরা দেখেছি, উড়িষ্যার মন্দির দেখেছি—মাদ্রাজে এসে মহাবলীপুরম দেখলে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাস্কর্যের নমূনাটা দেখা হয়ে যাবে।
তােপশে, তুই গাইডবুকটায় একটু চোখ বুলিয়ে নিস। কতগুলাে তথ্য জানা থাকলে দেখতে আরাে ভালাে লাগবে। | রাত্রে নটার মধ্যে ডাইনিং রুমে গিয়ে মােগলাই খানা খেয়ে ঠাণ্ডা ঘরে দিব্যি আরামে ঘুম দিলাম। পরদিন সকালে উঠে ফেলুদা বলল, ‘একবার তরফদারের খোঁজটা নেওয়া দরকার। আমরা দুজন আমাদের চার তলার ৪৩৩ নম্বর ঘর থেকে তিন তলার ৩৮২ নম্বর ঘরের সামনে গিয়ে দরজার বেল টিপলাম।
দরজা খুলে দিলেন তরফদার নিজেই। ঘরে ঢুকে দেখি শঙ্করবাবুও রয়েছেন, আর আরেকটি ভদ্রলােক, যাকে দেখলেই মাদ্ৰাজী বলে বােঝ যায়। কিন্তু নয়নকে দেখতে পাচ্ছি না কেন? গুড মর্নিং মিঃ মিত্তির একগাল হেসে বললেন তরফদার। ইনি মিঃ রেড্ডি। এর রােহিণী থিয়েটারেই আমার শশা। বলছেন প্রচুর এনকোয়ারি আসছে। এর ধারণা, দুর্দান্ত সেল হবে।
নয়ন কই ? তরফদারের কথাগুলাে যেন অগ্রাহ্য করেই জিজ্ঞেস করল ফেলুন। ‘এখানকার সবচেয়ে নামী কাগজ “হিন্দু”র একজন রিপাের্টার নয়নকে ইন্টারভিউ করছে,’ বললেন তরফদার। এর ফলে আমাদের দারুণ পাবলিসিটি হবে।
নয়ন রহস্য (পর্ব-১৯)
কিন্তু কোথায় হচ্ছে সে ইন্টারভিউ ? ‘হােটেলের ম্যানেজার নিজে একতলার কনফারেন্স রুমে ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এও বলা আছে বাইরের কাউকে যেন ঢুকতে না দেওয়া হয়। তাছাড়া তরফদায়ের কথা শেষ হবার আগেই ফেলুদা এক লাফে ঘর থেকে বেরিয়ে দৌড় দিল হােটেলের করিডর দিয়ে—আমি পিছনে।
লিফট না নিয়ে সিড়ি দিয়ে উধশ্বাসে নামলাম আমরা—ফেলুদা সমানে দাঁতে দাঁত চেপে হিন্দি, ইংরিজি ও বাংলায় তরফদারের উদ্দেশে গালি দিয়ে চলেছে। নীচে পেীছে একজন বেয়ারাকে সামনে পেয়ে যেদা জিজ্ঞেস করল, ‘হায়্যার ইজ দ্য কনফারেন্স কম ? বেয়ারা দেখিয়ে দিল, আমরা হুড়মুড়িয়ে গিয়ে ঘরে ঢুকলাম।
বেশ বড় ঘর । তার মাঝখানে লম্বা টেবিলের দুপাশে আর দু’মাথায় সারি সারি চেয়ার। একটা চেয়ারে নয়ন বসে আছে, তার পাশের চেয়ারে একজন দাড়িওয়ালা লােক নােটবই খুলে ডট পেন হাতে নিয়ে নয়নের সঙ্গে কথা বলছে। ফেলুদা তিন সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখল। তারপর ঝড়ের বেগে এগিয়ে গিয়ে এক টানে রিপােটারের গাল থেকে দাড়ি, আর আরেক টানে ঠোটের উপর থেকে গোঁফ খুলে ফেলল। অবাক হয়ে দেখলাম ছদ্মবেশের তলা থেকে বেরিয়ে পড়েছেন হেনরি হন।
‘গুড মর্নিং ? উঠে দাঁড়িয়ে নির্লজ্জ হাসি হেসে বললেন হজসন। ফেলুদা নয়নের দিকে ফিরল। “উনি কী জিজ্ঞেস করছিলেন তােমাকে ? ‘ঘােড়ার কথা। ‘আমার কাজ এখানে শেষ হলেও আমার আপসােস নেই,’ বললেন হজসন। আগামী তিন দিনের সব কটা রেসের উইনিং হর্সের নম্বর আমি জেনে নিয়েছি । আমি এখন বেশ কয়েক বছরের জন্য নিশ্চিন্ত ।
গুড ডে স্যার? হজসন গটগটিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন । ফেলুদা কপালে হাত দিয়ে ধপ করে হজসনের চেয়ারে বসে পড়ল। তারপর মাথা নেড়ে গভীর বিরক্তির সুরে বলল, নয়ন, এবার থেকে কোনাে বাইরের লােক তােমার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তুমি বলবে—ফেলুকাকা সঙ্গে থাকলে বলব, না হলে নয়। বুঝেছ ?
নয়ন রহস্য (পর্ব-১৯)
নয়ন মাথা নেড়ে জানিয়ে দিল সে বুঝেছে। আমি বললাম, তবে একটা কথা ফেলুদা—হজসন আর জ্বালাবে না ; সে এখন কলকাতায় ফিরে গিয়ে রেস খেলবে। ‘সেটা ঠিক, কিন্তু আমি ভাবছি আমাদের যাদুকরটি কত দায়িত্বজ্ঞানহীন। ম্যাজিশিয়ানদের এর চেয়ে বেশি কমনসেন্স থাকা উচিত। আমরা নয়নকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে গেলাম তরফদারের ঘরে।
‘চমৎকার পাবলিসিটি হবে তােমার ?’ শ্লেষমাখানাে সুরে তরফদারকে বলল ফেলুদা। নয়ন কাকে ইন্টারভিউ দিচ্ছিল জানাে ? কাকে ? মিস্টার হেনরি হজসন। ‘ওই দাড়িওয়ালা ? ‘হা, ওই দাড়িওয়ালা। তার কার্যসিদ্ধি হয়ে গেছে । এই যদি তােমার আক্কেলের নমুনা হয় তাহলে কিন্তু আমি তােমাকে কোনােরকম সাহায্য করতে পারব না।
তােমার অনুমান যে ভুল সে তাে দেখতেই পাচ্ছ; হজসন যদি ম্যাড্রাস অবধি ধাওয়া করতে পারে তাহলে অন্য দুজনই বা করবে না কেন? আমি জানি যে বিপদের আশঙ্কা এখনাে পুরােমাত্রায় রয়েছে। এ অবস্থায় আমি যা বলছি, তা তােমাকে মানতেই হবে। বলুন স্যার, হেট মাথা চুলকে বললেন তরফদার।
Read More
