সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-২১)

নয়ন রহস্য

আর আপনি মাদ্রাজে যে একটা চাকরির সম্ভাবনার কথা বলছিলেন ? মেটা সত্যি নয়।‘আই স? বলল ফেলুদা। তাহলে ব্যাপারটা যা দাঁড়াচ্ছে আপনার জীবন বিপন্ন, যার কারণ হল তেওয়ারি সংক্রান্ত ঘটনা ; আর জ্যোতিষ্কও ঘাের বিপদে পড়তে পারে দুজন অত্যন্ত লােভী আর বেপরােয়া ব্যক্তির চক্রান্তে। এই দুই বিপদই সামলানাের জন্য আমাকে নিযুক্ত করা হয়েছে।

নয়নের সঙ্গে সব সময় আমাদের কেউ-না-কেউ থাকবে। এখন আপনি বলন আপনি কী ভাবে আমাদের কাজটা সহজ করতে পারেন।হিঙ্গোরানি বললেন, “আমি কথা দিচ্ছি আপনার আদেশ আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। মাদ্রাজে আমি এর আগে অনেকবার এসেছি। কাজেই এখানে আমার দেখবার কিছু বাকি নেই ।

তরফদারের শশা একবার শুরু হলে তার রিপাের্ট আমি ওর মানেজারের কাছ থেকে পাবাে এবং শাে-এর দরুন পেমেন্ট যা করার তা ম্যানেজারকেই করব।অথাৎ আমি ঘরেই থাক এবং চেনা লােক কি না যাচাই না করে দরজা খুলব না। ফেলুদা উঠে পড়ল, আর সেই সঙ্গে আমরা দুজনও। ‘এসাে, নয়নবাবু। জটায়ু নয়নের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন, নয়ন বেশ আগ্রহের সঙ্গে হাতটা ধরে নিল। বুঝলাম জটায়ুকে তার বেশ পছন্দ হয়ে গেছে। 

নয়ন রহস্য (পর্ব-২১)

সদর স্নেক পার্কে বেশিক্ষণ ছিলাম না, কিন্তু এটা বুঝেছি যে জায়গাটা একেবারে নতুন ধরনের । মাত্র একজন লােকের মাথা থেকে যে এ জিনিস বেরিয়েছে সেটা বিশ্বাস করা যায় না। যতরকম সাপের নাম আমি শুনেছি তার সব, আর তার বাইরেও বেশ কিছু এই পার্কে রয়েছে। তাছাড়া, সাপ দেখা ছাড়াও, পার্কে ঘুরে বেড়ানাের আনন্দও এখানে পাওয়া যায় । 

প্রথম দিনের এই আউটিং-এ কোনাে উল্লেখযােগ্য বা চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেনি। যদিও হজসনের ছদ্মবেশের কথা জানার জননাই বােধহয় দাড়িওয়ালা লােক দেখলেই জটায়ু বসাক বলে সন্দেহ করে নয়নকে একটু কাছে টেনে নিচ্ছিলেন। 

সাপ দেখে এদিক ওদিক ঘুরতে হঠাৎ দেখলাম রেলিং দিয়ে ঘেরা একটা বেশ বড় জলা জায়গায় গােটা পাঁচেক কুমীর রােদ পােয়াচ্ছে। দেখে মনে হল তারা সব কটাই ঘুমােচ্ছে। রেলিং-এর ফাঁক দিয়ে এ-দৃশ্য দেখছি, লালমােহনবাবু নয়নকে ফিসফিস করে বলছেন—তুমি আরেকটু বড় হলে তােমাকে আমার করাল কুম্ভীর’ বইটা দেব—এমন সময় দেখি দুহাতে দুটো বালতি নিয়ে গেঞ্জি আর হাফপ্যান্ট পড়া একটা লােক কুমীরগুলাে থেকে হাত পঞ্চাশেক দূরে গিয়ে দাঁড়াল।

কুমীরগুলাে এবার একটু নড়েচড়ে উঠল। লােকটা এবার বালতিতে হাত ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে এক-একটা কোলা ব্যাঙ বার করে কুমীরগুলাের দিকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিতে লাগল। আশ্চর্য এই যে, প্রত্যেকটা ব্যাঙই কোনাে-না-কোনাে কুমীরের হাঁ করা মুখের ভিতর গিয়ে পড়ল। কুমীরকে ব্যাঙ চিবিয়ে খেতে আর কোনােদিন দেখিওনি আর দেখব বলে ভাবিওনি।

নয়ন রহস্য (পর্ব-২১)

গােলমেলে ঘটনা যা ঘটে সেটা দ্বিতীয় দিনে, আর সেটার কথা ভাবলেই মনে বিস্ময়, আতঙ্ক, অবিশ্বাস-সব একসঙ্গে জেগে ওঠে । গাইডবুক পড়ে জেনেছিলাম মহাবলীপুরম ম্যাড্রাস থেকে প্রায় আশি ৬০ কিলােমিটার দূরে। রাস্তা নাকি ভালাে, যেতে দুঘণ্টার বেশি সময় লাগা উচিত নয়। কালকের মতােই দুটো ট্যাক্সির ব্যবস্থা করেছিলেন শঙ্করবাবু । এবার নয়ন তরফদারের সঙ্গে না গিয়ে আমাদের সঙ্গে আসতে চাইল।

কারণ আর কিছুই নয়, জটায়ুর সঙ্গে ওর বেশ জমে গেছে। ভদ্রলােক নয়নকে তাঁর লেটেস্ট বই ‘অতলান্তিক আতঙ্ক’র গল্প সহজ করে বলে শােনাচ্ছেন। একবারে ত শেষ হবার নয়, তাই খেপে খেপে শােনাচ্ছেন। গাড়িতে তাই ফেলুদা আর জটায়ুর মাঝখানে বসল নয়ন। আর আমি সামনে। 

 যেতে যেতে বেশ বুঝতে পারছি আমরা ক্রমে সমুদ্রের দিকে এগােচ্ছি। মাদ্রাজ শহর সমুদ্রের ধারে হলেও আমরা এখন অবধি সমুদ্র দেখিনি, তবে সন্ধেবেলা সমুদ্রের দিক থেকে আসা হাওয়া উপভােগ করেছি। সােয়া দুঘণ্টার মাথায় সামনের দৃশ্যটা হঠাৎ যেন ফাঁক হয়ে গেল ।ওই যে দূরে গাঢ় নীল জল, আর সামনে বালির উপর ছড়িয়ে উঁচিয়ে আছে সব কী যেন। আরাে খানিকটা এগিয়ে গিয়ে বুঝলাম যে সেগুলাে মন্দির। মূর্তি আর বিশাল বিশাল পাথরের গায়ে খােদাই করা নানারকম দৃশ্য।

নয়ন রহস্য (পর্ব-২১)

 আমাদের গাড়ি যেখানে এসে থামল, তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে একটা ভ্যান। আর তার পরেই একটা প্রকাও লাক্সারি কোচ । কোচে একে একে উঠছে এক বিরাট টুরিস্ট দল। তাদের দেখেই কেন জানি বােঝা যায় তারা আমেরিকান। কত রকম পােশাক, কত রকম টুপি, চোখে কতরকম। ধোঁয়াটে চশমা, কাঁধে কতরকম ঝােলা ।‘বিগ বিজনেস, টুরিজম, বলে জটায়ু নয়নকে নিয়ে গাড়ি থেকে নামলেন। 

ফেলুদা আগে এখানে না এলেও, কোথায় কী আছে সব জানে। ও আগেই বলে রেখেছিল—“অনেক দূর ছড়িয়ে অনেক কিছু দেখার জিনিস আছে ; তবে নয়নকে নিয়ে ত আর অত ঘােরা যাবে না ; তুই অন্তত চারটে জিনিস অবশ্যই দেখিস—শাের টেম্পল, গঙ্গাবতরণ, মহিষ মণ্ডপ গুহা আর পঞ্চ পাণ্ডব গুহা। জটায়ু যদি দেখতে চান ত দেখবেন ; না হলে নয়নকে সামলাবেন । তরফদার আর শঙ্কর কী করবে জানি না ; কথাবার্তা শুনে ত মনে হয় না ওদের মধ্যে শিপ্রীতি বলে কোনাে বস্তু আছে।’ 

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-২২)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *