সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-৩)

নয়ন রহস্য

যাকে নিয়ে এই আইটেম, সে হল আটবছরের একটি ফুটফুটে ছেলে–যাকে সঙ্গে নিয়ে তরফদার মঞ্চে হাজির হলেনএকটা বেশ বাহারের চেয়ার স্টেজের মাঝখানে রাখা ছিল, ছেলেটিকে তাতে বসিয়ে তরফদার দর্শকদের দিকে ঘুরে বললেন, ‘এই বালকের নাম জ্যোতিষ্ক ; এর আশ্চর্য ক্ষমতার পরিচয় আপনারা এখনই পাবেনআমি স্বীকার করছি এতে আমার কোনাে বাহাদুরি নেই

একে মঞ্চে উপস্থিত করতে পেরে আমি গর্বিতএ ছাড়া আমার আর কোননা ক্রেডিট নেই| এবার তরফদার ছেলেটির দিকে ফিরে বললেন, জ্যোতিষ্ক, দর্শকদের দিকে দেখ ত ।ছেলেটির দৃষ্টি সামনের দিকে ঘুরলতরফদার বললেন, ‘সামনের সারিতে প্যাসেজের ডান দিকে লাল সােয়েটার আর কালাে প্যান্ট পরা যে ভদ্রলােকটি বসে আছেন, তাঁর কাছে। কি কোনাে টাকা আছে ? যাঁর কথা বলা হচ্ছে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। ‘আছে’, মিহি, সুরেলা গলায় বলল জ্যোতিষ্ক। ‘কত টাকা বলতে পার ? ‘পারি।’ ‘কত ? ‘কুড়ি টাকা তিরিশ পয়সা। 

ভদ্রলােক ইতিমধ্যে পকেট থেকে পার্স বার করে তার থেকে দুটো দশ টাকার নোেট বার করেছেন। প্যাসেজের ওদিকে বসলেও দিব্যি বুঝতে পারছি যে, ভদ্রলােকের চোখ ছানাবড়া, মুখ হাঁ ।‘ওনার হাতে যে দুটো দশ টাকার নােট, তার নম্বর বলতে পার ? ‘এগারাে ই—এক এক এক তিন শূন্য দুই। আর চোদ্দ সি– দুই আট ছয় শূন্য দুই পাঁচ। 

নয়ন রহস্য (পর্ব-৩)

ভদ্রলােকের ভুরু আৱাে ইঞ্চিখানেক উপরে উঠে গেল। ‘মাই গড়–হি ইজ অ্যাবসােলিউটলি রাইট ! চারিদিক থেকে তুমুল হাততালি আর উচ্ছাসের কোরাস । এবার তরফদার দর্শকদের দিকে ফিরে বললেন, ‘এখন অবিশ্যি আমি জ্যোতিষ্ককে প্রশ্ন করছি, কিন্তু ইচ্ছে করলে আপনাদের যে কেউ করতে পারেন। শুধু এটা মনে রাখতে হবে যে, প্রশ্ন এমন হতে হবে যার উত্তর সংখ্যায় হয় ।

এই ভাবে উত্তর দিতে জ্যোতিষ্কর যথেষ্ট মানসিক পরিশ্রম হয়, যদিও সেটা বাইরে থেকে বােঝা নাও যেতে পারে। তাই জ্যোতিষ্ক আর মাত্র দুটো প্রশ্নের জবাব দেবে, তারপর তার ছুটি। | দুটোর একটায় একজন তরুণ দর্শক প্রশ্ন করল, “আমি এখানে এসেছি মােটর গাড়িতে। সে গাড়ির নম্বর তুমি বলতে পার ?’ 

জ্যোতিষ্ক নম্বর বলে দিয়ে বলল, তােমাদের কিন্তু এ ছাড়াও আরেকটা গাড়ি আছে। সেটার নম্বর ডব্লিউ এম এফ ছয় দুই তিন দুই। তারপর তরফদার একটি ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি এ বছর কোনাে পরীক্ষা দিয়েছ ? ‘মাধ্যমিক, বলল ছেলেটা। তরফদার জ্যোতিষ্কর দিকে ফিরে বললেন, ‘এই ছেলেটি মাধ্যমিক পরীক্ষায় বাংলায় কত নম্বর পেয়েছে বলতে পায় ? 

নয়ন রহস্য (পর্ব-৩)

জ্যোতিষ্ক বলল, একাশি। ওর চেয়ে বেশি কেউ পায়নি। উত্তর শুনে ছেলেটি নিজেই হাততালি দিয়ে উঠল।শােয়ের পর ফেলুদা বলল, ‘একবার ব্যাকস্টেজে যাওয়া দরকার । তরফদারকে একটা ধন্যবাদ ত দিতেই হয়।আমরা গেলাম । তরফদার আয়নার সামনে বসে মেকআপ তুলছেন–আমাদের দেখেই এক গাল হেসে উঠে দাঁড়ালেন। কেমন লাগল ফ্র্যাঙ্কলি বলুন, স্যার। 

‘দুটো আইটেমের তারিফ করতেই হয়’, বলল ফেলুদাএক, আপনার হিনটিজম, আর দুই—জ্যোতিষ্ক কোত্থেকে পেলেন এই আশ্চর্য  ছেলেকে ? | কালীঘাটের ছেলে। ওর আসল নাম নয়নজ্যোতিষ্ক নামটা আমিই দিয়েছি ; বিজ্ঞাপনেও জ্যোতিষ্কই ব্যবহার করছি কথাটা আপনাদের বললুম, আপনারা কাইন্ডলি আর কাউকে বলবেন না| না না, বলল ফেলুদা

কিন্তু শুধু কালীঘাট বললে ত কিছুই বলা হল। বাপ অসীম সরকার থাকেন নিকুঞ্জবিহারী লেনেছেলের আশ্চর্য ক্ষমতা দেখে আমার কাছে নিয়ে আসেন যদি আমি ওকে কাজে লাগাতে পারিআসলে ভদ্রলােক অভাবী, তাই ভাবলেন ছেলেকে দিয়ে যদি কিছু একস্ট্রা ইনকাম হয়। সেটা যে হবে সে বিষয় আমার কোনাে সন্দেহ নেই, ছেলেটি কি বাপের কাছেই থাকে ? 

নয়ন রহস্য (পর্ব-৩)

‘আজ্ঞে না । আমি ওকে নিজের বাড়িতে এনে রেখেছি। ওর পড়াশুনাের জন্য টিউটর ঠিক করেছি ; কাল এক ডাক্তারকে ডেকেছিলাম, উনি নয়নের ডায়েট বাতলে দিয়েছেন। ‘এসব ত রীতিমতাে খরচের ব্যাপার! ‘জানি স্যার । তবে এও জানি যে নয়ন ইজ এ গােন্ডমাইন । ওর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যদি ধারদেনাও করতে হয়, সে টাকা কদিনের মধ্যেই উঠে আসবে। ‘… তবে আইডিয়াল হত যদি আপনি একটি পৃষ্ঠপােষক জোগাড় করতে পারতেন। 

‘সেটা আমিও বুঝি, স্যার । দেখি আর দুটো দিন.. ‘আপনার অনেকটা সময় নিয়েছি। আর মাত্র দুটো কথা বলে আপনাকে রেহাই দেব। এক–এই স্বর্ণখনিটি যাতে বেহাত না হয় সেদিকে আপনার কড়া নজর রাখতে হবে। সেকেন্ড রােতে মনে হল কয়েকজন সাংবাদিককে দেখলাম, তাই না? | ‘ঠিক দেখেছেন, স্যার। এগারজন সাংবাদিক আজকে আমার শাে দেখেছেন।

অরা সকলেই আগামী শুক্রবারের সিনেমার পাতায় আমার শশায়ের বিষয় লিখবেন। ইতিমধ্যে কোনাে চিন্তার কারণ আছে বলে মনে হয় না।’ ‘যাই হােক, এটা বলে গেলাম যে, যদি নয়ন সম্বন্ধে কোনাে এনকোয়ারি বা টেলিফোন আসে যা আপনার মনে খটকা জাগায়, তাহলে আমাকে জানাতে দ্বিধা করবেন না।’ ‘মেনি থ্যাঙ্কস, স্যার। এবার আমার একটা রিকোয়েস্ট আছে। ‘কী ? ‘এবার থেকে আমায় আপনি না বলে তুমি বলবেন কাইলি।

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-৪)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *