চার জল অলস ভঙ্গিতে ঘুরে বেড়াতে লাগল। সবাই কিছু পরিমাণে গম্ভীর। লায়লা ঘনঘন কাশছে। কাল রাতে তার ঠাণ্ডা লেগেছে। কনকের দেখাদেখি সবাই গোলাপ ছিড়ে খোঁপায় খুঁজেছে। আতা হঠাৎ করে বলল, ‘তােদর এখানে বকুলগাছ

নেই, না?’
“উহু।
‘আমার হঠাৎ বকুলফুলের কথা মনে পড়ছে। আমাদের স্কুলের বকুলগাছটার কথা মনে আছে তোদের?
সবাই একসঙ্গে হেসে উঠল। স্কুলের বকুলগাছটা নিয়ে অনেক মজার মজার ব্যাপার আছে।
জরীর মা দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে মেয়েদের দেখছিলেন। তিনি সেখান থেকে চেচিয়ে ডাকলেন, ‘ও জরী, জরী।
কী মা? কী করছিস তােরা? কনক বলল, ‘বেড়াচ্ছি—আপনিও আসুন না খালাম্মা।
জরীর মা হাসিমুখে নেমে এলেন। মনে হল মেয়েদের দলে এসে তাঁর বয়স যেন হঠাৎ করে কমে গিয়েছে। তিনি খানিকক্ষণ ইতস্তত করে বললেন, ‘গত রাতে একটা মজার স্বপ্ন দেখেছি। দেখলাম, জরী যেন খুব ছােট হয়ে গিয়েছে। ফ্রক পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে বাগানে। আর জেগে দেখি সত্যি তাই।
‘বললেই হল। আমি বুঝি ফুক পরে ঘুরে বেড়াচ্ছি।
মীর মা হাসতে লাগলেন। হালকা গলায় বললেন, “আমার যখন বিয়ে হয়, তখন এ বাগানটা আরাে বড়াে ছিল। আমি রােজ সকালে এখানে এসে একটা করে ফুল খোঁপায় খুঁজতাম।’
নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ
বলেই তিনি হঠাৎ লজ্জা পেয়ে গেলেন। লায়লা বলল, ‘আসুন খালা, আজ আপনার খোঁপায় ফুল দিয়ে দি।
কী যে বল মা, ছিঃ ছিঃ। কিন্তু ততক্ষণে কনক একটি ফুল ছিড়ে এনেছে। জরীর মা আপত্তি করবার আগেই তারা সেটি খোঁপায় পরিয়ে দিল। তিনি বিব্রত ভঙ্গিতে বললেন, ‘আমি তােমাদের চায়ের যােগাড় করি। আর দেখ, হাহেনা–ঝাড়ের দিকে যেয়াে না। খুব সাপের আড়া ঐদিকে।’
শীতকালে সাপ কোথায় খালা? না থাক, তবুও যাবে না।’
জরীর মা চলে যেতেই আভা বলল, খালা এখনাে যা সুন্দর, দেখলে হিংসা লাগে।’
‘পরী আপাও ভীষণ সুন্দর। তাই না জরী? ‘হ্যাঁ। আর আমি কেমন?
পরী আপা ফার্স্ট ক্লাস হলে তুই ইস্টার ক্লাস, আর আমাদের কনক হচ্ছে এয়ারকণ্ডিশশু ফাস্ট ক্লাস।’
কনক একটু গম্ভীর হয়ে পড়ল। জরীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘৫৩ গুণ মায়াবী চেহারা রী। রূপবতী হওয়া খুব বাজে ব্যাপার।
‘বাজে হলেও আমি রূপবতী হতে রাজি।’
সবাই হেসে উঠলেও কনক হাসল না। অসাধারণ সুন্দরী হয়ে জন্মায় সে অনেক বার বাথরুমে দরজা বন্ধ করে কেঁদেছে। অনেক বার তার মনে হয়েছে, সাধারণ একটি বাঙালী মেয়ে হয়ে সে যদি জন্মাত! শ্যামলা রঙ, একটু বােকা বােকা ধনের মায়াবী চেহারা। কিন্তু তা হয় নি। পুরুষের লুব্ধ দৃষ্টির নিচে অনেক যন্ত্রণার মধ্যে তাকে বড়াে হতে হয়েছে। অথচ ছােটবেলায় কেউ যখন বলত, কনকের মতাে সুন্দর একটি মেয়ে দেখেছি আজ। তখন কী ভালােই না লাগত।
নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ
কুয়াশা কেটে রােদ উঠেছে। ধানী রঙের নরম বােদ। শিশিরভেজা মাটি থেকে আর্দ্র এক ধরনের গন্ধ আসছে। মেয়েদের দলটি গােল হয়ে বসে আছে শিউলিগাছের নিচে। এই গাছটি এক সময়ে প্রচুর ফুল ফোটাত। আজ তার আর সে–ক্ষমতা নেই। কয়েকটি সাদা সাদা ফুল পড়ে আছে। শীতের বাগানে যখন ধানী রঙের রােদ ওঠে এবং সেখানে যদি কয়েকটি মেয়ে চুপচাপ গােল হয়ে বসে থাকে, তাহলে বাগানের চেহারাই পাল্টে যায়। বড়চাচা অবাক হয়ে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
বিয়েবাড়ির লােকজন ক্রমে ক্রমে জেগে উঠছে। বাচ্চা ছেলেমেয়েদের হুটোপুটি আর কান্নার শব্দ শােনা যাচ্ছে। টিউবওয়েলে ঘটাং ঘটাং করে ক্রমাগত পানি তােলা হচ্ছে। ডেকোরেটরের দোকান থেকে লােকজন এসে গেটের জন্য মাপজোক শুরু করেছে। জরীর বাবা অকারণে একতলা থেকে দোতলায় ওঠানামা করছেন। মাঝে মাঝে তাঁর উঁচু গলা শােনা যাচ্ছে, এক ঘন্টা ধরে বলছি এক কাপ চা দিতে। শুধু
এক কাপ চা, এতেই এত দেরি? মেয়ের বিয়ে কি আর কালো হয় না?’
আভা হঠাৎ বলল, ‘জরী, তাের ছােটচাচার ছেলে কি আমেরিকা চলে গেছে? ‘না, সতের তারিখে যাবে। ‘একাই যাচ্ছে? “না। বড়ােচাচা সঙ্গে যাবেন। কনক বলল , কী জন্যে যাচ্ছেন? কই, আমি তাে কিছু জানি না?
Read More