বিশ্বেশ্বরী ঘরে ঢুকিয়া অশ্রুভরা রোদনের কণ্ঠে প্রশ্ন করিলেন,—“আজ কেমন আছিস্ মা রমা?” রমা তাঁহার মুখের পানে চাহিয়া একটুখানি হাসিয়া বলিল,—“আজ ভাল আছি জ্যাঠাইমা।” বিশ্বেশ্বরী তার শিয়রে আসিয়া বসিলেন এবং মাথায় মুখে হাত বুলাইতে লাগিলেন। আজ তিনমাসকাল রমা শয্যাগত। বুক জুড়িয়া কাসি এবং ম্যালেরিয়া বিষে সর্ব্বাঙ্গ সমাচ্ছন্ন। গ্রামের প্রাচীন কবিরাজ প্রাণপণে ইহার বৃথা চিকিৎসা করিয়া মরিতেছে। সে বুড়া ত জানে না, কিসের অবিশ্রাম আক্রমণে তাহার সমস্ত স্নায়ুশিরা অহর্নিশি পুড়িয়া খাক্ হইয়া যাইতেছে। শুধু বিশ্বেশ্বরীর মনের মধ্যে একটা সংশয়ের ছায়া ধীরে ধীরে গাঢ় হইয়া উঠিতেছিল।
রমাকে তিনি কন্যার মতই স্নেহ করিতেন, সেখানে কোন ফাঁকি ছিল না; তাই সেই অত্যন্ত স্নেহই রমার সম্বন্ধে তাঁহার সত্য-দৃষ্টিকে অসামান্যরূপে তীক্ষ্ণ করিয়া দিতেছিল। অপরে যখন ভুল বুঝিয়া, ভুল আশা করিয়া, ভুল ব্যবস্থা করিতে লাগিল, তাঁহার তখন বুক ফাটিয়া যাইতে লাগিল। তিনি দেখিতেছিলেন, রমার চোখ দুটি গভীর কোটরপ্রবিষ্ট, কিন্তু দৃষ্টি অতিশয় তীব্র। যেন বহু দূরের কিছু একটা অত্যন্ত কাছে করিয়া দেখিবার একাগ্র বাসনায় এরূপ অসাধারণ তীক্ষ্ণ হইয়া উঠিয়াছে। বিশ্বেশ্বরী ধীরে ধীরে ডাকিলেন,—“রমা?”
“কেন জ্যাঠাইমা?” “আমি ত তোর মায়ের মত রমা—” রমা বাধা দিয়া বলিল,—“মত কেন জ্যাঠাইমা, তুমিই ত আমার মা।” বিশ্বেশ্বরী হেঁট হইয়া রমার ললাট চুম্বন করিয়া বলিলেন,—“তবে সত্যি ক’রে বল্ দেখি মা, তোর কি হয়েছে?”
“অসুখ করেচে জ্যাঠাইমা!” বিশ্বেশ্বরী লক্ষ্য করিলেন, তাহার এমন পাণ্ডুর মুখখানি যেন পলকের জন্য রাঙা হইয়া উঠিল। তখন গভীর স্নেহে তাহার রুক্ষ চুলগুলি একবার নাড়িয়া দিয়া কহিলেন,—“সে ত এই দুটো চামড়ার চোখেই দেখ্তে পাই মা! যা’ এতে ধরা যায় না, তেমন যদি কিছু থাকে, এ সময় মায়ের কাছে লুকোস্নে রমা! লুকোলে ত অসুখ সার্বে না মা?” জানালার বাহিরে প্রভাত-রৌদ্র তখনও প্রখর হইয়া উঠে নাই এবং মৃদুমন্দ বাতাসে শীতের আভাস দিতে ছিল।
সেই দিকে চাহিয়া রমা চুপ করিয়া রহিল। খানিকপরে কহিল,—“বড়-দা’ কেমন আছেন, জ্যাঠাইমা?” বিশ্বেশ্বরী বলিলেন,—“ভাল আছে। মাথায় ঘা’ সার্তে এখনও বিলম্ব হবে বটে, কিন্তু ৫।৬ দিনের মধ্যে হাঁসপাতাল থেকে বাড়ী আস্তে পার্বে।” রমার মুখে বেদনার চিহ্ন অনুভব করিয়া বলিলেন,—“দুঃখ কোরো না মা, এই তার প্রয়োজন ছিল। এতে তার ভালই হবে।” বলিয়া তিনি রমার মুখে বিস্ময়ের আভাস অনুভব করিয়া কহিলেন,—“ভাবচ, মা’ হ’য়ে সন্তানের এত বড় দুর্ঘটনায় এমন কথা কি করে বল্চি? কিন্তু, তোমাকে সত্যি বল্চি মা, এতে আমি ব্যথা বেশি পেয়েচি, কি আনন্দ বেশি পেয়েচি, তা’ আমি বলতে পারিনে।
কেন না, আমি জানি, যারা অধর্ম্মকে ভয় করে না, লজ্জার ভয় যাদের নেই, প্রাণের ভয়টা যদি না তাদের তেম্নি বেশি থাকে, তা হ’লে সংসার ছার-খার হয়ে যায়! তাই কেবলই মনে হয় রমা, এই কলুর ছেলে, বেণীর যে মঙ্গল ক’রে দিয়ে গেল, পৃথিবীতে কোন আত্মীয়-বন্ধুই ওর সে ভাল কর্তে পার্ত না। কয়লাকে ধুয়ে তার রঙ্ বদ্লানো যায় না, মা, তাকে আগুনে পোড়াতে হয়।” রমা জিজ্ঞাসা করিল,—“বাড়ীতে তখন কি কেউ ছিল না?
” বিশ্বেশ্বরী কহিলেন,—“থাক্বে না কেন, সবাই ছিল। কিন্তু, সে ত খামকা মেরে বসেনি, নিজে জেলে যাবে ব’লে ঠিক ক’রে, তবে, তেল বেচ্তে এসেছিল। তার নিজের রাগ একটুও ছিল না, মা, তাই তার বাঁকের এক ঘায়েই বেণী যখন অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল, তখন চুপ ক’রে দাঁড়িয়ে রইল,—আর আঘাত কর্লে না। তা’ ছাড়া সে ব’লে গেছে, এর পরেও বেণী সাবধান না হ’লে, সে নিজে আর কখনো ফিরুক, না ফিরুক, এই মারই তার শেষ মার নয়।
” রমা আস্তে আস্তে বলিল,—“তার মানে আরও লোক পিছনে আছে। কিন্তু, আমাদের দেশে ছোটলোকের এত সাহস ত কোন দিন ছিল না জ্যাঠাইমা, কোথা থেকে এ তারা পেলে?” বিশ্বেশ্বরী মৃদু হাসিয়া কহিলেন,—“সে কি তুই নিজে জানিস্ নে, মা, কে দেশের এই ছোটলোকদের বুক এমন ক’রে ভরে দিয়ে গেছে? আগুন জ্বলে উঠে শুধু শুধু নেবে না রমা! তাকে জোর ক’রে নেবালেও সে আশেপাশের জিনিষ তাতিয়ে দিয়ে যায়।
সে আমার ফিরে এসে দীর্ঘজীবী হয়ে যেখানে খুসি সেখানে থাক; বেণীর কথা মনে ক’রে আমি কোন দিন দীর্ঘশ্বাস ফেলব না।” কিন্তু, বলা সত্ত্বেও বিশ্বেশ্বরী যে জোর করিয়াই একটা নিঃশ্বাস চাপিয়া ফেলিলেন, রমা তাহা টের পাইল।তাই তাঁহার হাতখানি বুকের উপর টানিয়া লইয়া স্থির হইয়া রহিল। একটুখানি সামলাইয়া লইয়া বিশ্বেশ্বরী পুনশ্চ কহিলেন,—“রমা, এক সন্তান যে কি, সে শুধু মায়েই জানে।
বেণীকে যখন তারা অচৈতন্য অবস্থায় ধরাধরি ক’রে পাল্কিতে তুলে হাঁসপাতালে নিয়ে গেল, তখন যে আমার কি হয়েছিল, সে তোমাকে আমি বোঝাতে পার্ব না।কিন্তু, তবুও আমি কারুকে একটা অভিসম্পাত বা কোন লোককে আমি দোষ দিতে পর্য্যন্ত পারিনি। এ কথা ত ভুল্তে পারিনি, মা, যে এক সন্তান ব’লে ধর্ম্মের শাসন ত মায়ের মুখ চেয়ে চুপ ক’রে থাকবে না।” রমা একটুখানি ভাবিয়া কহিল,—“তোমার সঙ্গে তর্ক কর্চিনে জ্যাঠাইমা; কিন্তু, এই যদি হয়, তবে, রমেশ-দা’ কোন্ পাপে এ দুঃখভোগ কর্চেন?
আমরা যা’ ক’রে তাঁকে জেলে পূরে দিয়ে এসেচি, সে ত কারো কাছেই চাপা নেই।” জ্যাঠাইমা বলিলেন,—“না মা, তা’ নেই। নেই বলেই বেণী আজ হাঁসপাতালে। আর তোমার—” বলিয়া তিনি সহসা থামিয়া গেলেন। যে কথা তাঁহার জিহ্বাগ্রে আসিয়া পড়িল, তাহা জোর করিয়া ভিতরে ঠেলিয়া দিয়া কহিলেন,—“কি জানিস্ মা, কোন কাজই কোন দিন শুধু শুধু শূন্যে মিলিয়ে যায় না। তার শক্তি কোথাও-না-কোথাও গিয়ে কাজ করেই।
কিন্তু, কি কোরে করে, তা’ সকল সময়ে ধরা পড়ে না বলেই আজ পর্য্যন্ত এ সমস্যার মীমাংসা হ’তে পার্লে না, কেন একজনের পাপে আর একজন প্রায়শ্চিত্ত করে।কিন্তু, কর্তে যে হয় রমা, তাতে ত লেশমাত্র সন্দেহ নাই।” রমা নিজের ব্যবহার স্মরণ করিয়া নীরবে নিঃশ্বাস ফেলিল। বিশ্বেশ্বরী বলিতে লাগিলেন,—“এর থেকে আমারও চোখ ফুটেচে রমা, ভাল কর্ব বল্লেই ভাল করা যায় না।
গোড়ার অনেকগুলো ছোটবড় সিঁড়ি উত্তীর্ণ হবার ধৈর্য্য থাকা চাই। একদিন রমেশ হতাশ হয়ে আমাকে বল্তে এসেছিল, ‘জ্যাঠাইমা, আমার কাজ নেই এদের ভাল ক’রে, আমি যেখান থেকে চলে এসেছি, সেইখানেই চ’লে যাই।’ তখন আমি বাধা দিয়ে বলেছিলাম, ‘না রমেশ, কাজ যদি সুরু করেচিস্ বাবা, তবে ছেড়ে দিয়ে পালাস্নে।’ আমার কথা সে ত কখনো ঠেল্তে পারে না; তাই, যে দিন তার জেলের হুকুম শুন্তে পেলাম, সে দিন মনে হ’ল, ঠিক যেন আমিই তাকে ধরে-বেঁধে এই শাস্তি দিলাম।
কিন্তু, তার পর বেণীকে যেদিন হাঁসপাতালে নিয়ে গেল, সে দিন প্রথম টের পেলাম,—না, না, তারও জেল খাট্বার প্রয়োজন ছিল। তা’ ছাড়া ত জানিনি মা, বাইরে থেকে ছুটে এসে ভাল কর্তে যাওয়ার বিড়ম্বনা এত,—সে কাজ এমন কঠিন! আগে যে মিল্তে হয়, সকলের সঙ্গে ভালতে-মন্দতে এক না হ’তে পার্লে যে কিছুতেই ভাল করা যায় না—সে কথা ত মনেও ভাবিনি।
প্রথম থেকেই সে তার শিক্ষা, সংস্কার, মস্ত জোর, মস্ত প্রাণ নিয়ে এতই উঁচুতে এসে দাঁড়াল যে, শেষ পর্য্যন্ত কেউ তার নাগালই পেলে না। কিন্তু সে ত আমার চোখে পড়ল না মা, আমি তাকে যেতেও দিলাম না, রাখ্তেও পারলাম না।” রমা কি একটা বলিতে গিয়া চাপিয়া গেল। বিশ্বেশ্বরী তাহা অনুমান করিয়া কহিলেন,—“না রমা, অনুতাপ আমি সে জন্যে করিনে।
কিন্তু, তুইও শুনে রাগ করিস্নে মা,—এইবার তাকে তোরা নাবিয়ে এনে সকলের সঙ্গে যে মিলিয়ে দিলি, তাতে তোদের অধর্ম্ম যতই বড় হোক্, সে কিন্তু ফিরে এসে এবার যে ঠিক সত্যটির দেখা পাবে, এ কথা আমি বড় গলা করেই ব’লে যাচ্চি।” রমা কথাটা বুঝিতে না পারিয়া কহিল,—“কিন্তু, এতে তিনি কেন নেবে যাবেন জ্যাঠাইমা?
আমাদের অন্যায় অধর্ম্মের ফলে যত বড় যাতনাই তাঁকে ভোগ ক’র্তে হোক, আমাদের দুষ্কৃতি আমাদেরই নরকের অন্ধকূপে ঠেলে দেবে, তাঁকে স্পর্শ ক’র্বে কেন?” বিশ্বেশ্বরী ম্লানভাবে একটুখানি হাসিয়া বলিলেন,—“কর্বে বই কি মা; নইলে পাপ আর এত ভয়ঙ্কর কেন? উপকারের প্রত্যুপকার কেউ যদি নাই করে, এমন কি, উল্টে অপকারই করে, তাতেই বা কি এসে যায় মা, যদি না তাঁর কৃতজ্ঞতায় দাতাকে নাবিয়ে আনে! তুই ব’ল্চিস মা, কিন্তু, তোদের কুঁয়াপুর রমেশকে কি আর তেম্নিটি পাবে?
সে ফিরে এলে তোরা স্পষ্ট দেখ্তে পাবি, সে, যে হাত দিয়ে দান ক’রে বেড়াতো, ভৈরব তার সেই ডানহাতটাই মুচড়ে ভেঙ্গে দিয়েচে।” তার পরে একটুখানি থামিয়া নিজেই বলিলেন,—“কিন্তু, কে জানে! হয় ত ভালই হয়েচে। তার বলিষ্ঠ সমগ্র হাতের অপর্য্যাপ্ত দান গ্রহণ করবার শক্তি যখন গ্রামের লোকের ছিল না, তখন এই ভাঙা হাতটাই বোধ করি এবার তাদের সত্যকার কাজে লাগবে।” বলিয়া তিনি গভীর একটা নিঃশ্বাস মোচন করিলেন। তাঁহার হাতখানি রমা কিছুক্ষণ নীরবে নাড়াচাড়া করিয়া ধীরে ধীরে বড় করুণকন্ঠে কহিল,—“আচ্ছা জ্যাঠাইমা, মিথ্যে-সাক্ষী দিয়ে নিরপরাধীকে দণ্ডভোগ করানোর শাস্তি কি?
” বিশ্বেশ্বরী জানালার বাহিরে চাহিয়া রমার বিপর্য্যস্ত রুক্ষ চুলের রাশির মধ্যে অঙ্গুলি-চালনা করিতে হঠাত দেখিলেন, তাহার নির্মীলিত দুই চোখের প্রান্ত বাহিয়া অশ্রু গড়াইয়া পড়িতেছে। সস্নেহে মুছাইয়া দিয়া কহিলেন,—“কিন্তু তোমার ত হাত ছিল না মা। মেয়েমানুষের এত বড় কলঙ্কের ভয় দেখিয়ে যে কাপুরষেরা তোমার ওপর এই অত্যাচার ক’রেচে, এর সমস্ত গুরুদণ্ডই তাদের। তোমাকে ত এর একটি কিছুই বইতে হবে না মা।
” বলিয়া তিনি আবার তাহার চক্ষু মুছাইয়া দিলেন। তাঁহার এইটুকুমাত্র আশ্বাসই রমার রুদ্ধ-অশ্রু এইবার প্রস্রবণের ন্যায় ঝরিয়া পড়িতে লাগিল। কিছুক্ষণ পরে সে কহিল,—“কিন্তু, তাঁরা যে তাঁর শত্রু। তাঁরা বলেন, ‘শত্রুকে যেমন করেই হৌক্, নিপাত কর্তে দোষ নেই।’ কিন্তু আমার ত সে কৈফিয়ত নেই জ্যাঠাইমা।” “তোমারই বা কেন নেই মা?” প্রশ্ন করিয়া তিনি দৃষ্টি আনত করিতেই অকস্মাৎ তাঁহার চোখের উপর যেন বিদ্যুৎ খেলিয়া গেল।
যে সংশয় মুখ ঢাকিয়া এতদিন তাঁহার মনের মধ্যে অকারণে আনাগোনা করিয়া বেড়াইত, সে যেন তাহার মুখোস ফেলিয়া দিয়া একেবারে সোজা হইয়া দাঁড়াইল। আজ তাহাকে চিনিতে পারিয়া ক্ষণকালের জন্য বিশ্বেশ্বরী বেদনায়, বিস্ময়ে স্তম্ভিত হইয়া গেলেন। রমার হৃদয়ের ব্যথা আর তাঁহার অগোচর রহিল না। রমা চোখ বুজিয়া ছিল, বিশ্বেশ্বরীর মুখের ভাব দেখিতে পাইল না। ডাকিল,—“জ্যাঠাইমা?” জ্যাঠাইমা চকিত হইয়া তাহার মাথাটা একটুখানি নাড়িয়া দিয়া সাড়া দিলেন। রমা কহিল,—“একটা কথা আজ তোমার কাছে স্বীকার কর্ব জ্যাঠাইমা।
পীরপুরের জাফর আলীর বাড়ীতে সন্ধ্যার পর গ্রামের ছেলেরা জড় হয়ে রমেশদা’র কথা মতো সৎ আলোচনাই কর্ত, বদমাইসের দল ব’লে তাদের পুলিশে ধরিয়ে দেবার একটা মৎলব চল্ছিল—আমি লোক পাঠিয়ে তাদের সাবধান করে দিয়েচি। কারণ, পুলিশ ত এই চায়। একবার তাদের হাতে পেলে ত আর রক্ষা রাখত না!” শুনিয়া বিশ্বেশ্বরী শিহরিয়া উঠিলেন। “বলিস্ কি রে? নিজের গ্রামের মধ্যে পুলিশের এই উৎপাত বেণী মিছে করে ডেকে আন্তে চেয়েছিল?” রমা কহিল,—“আমার মনে হয় বড়দা’র এই শাস্তি তারই ফল। আমাকে মাপ কর্তে পার্বে জ্যাঠাইমা?
” বিশ্বেশ্বরী হেঁট হইয়া নীরবে রমার ললাট চুম্বন করিলেন। বলিলেন—“তার মা হয়ে এ যদি না আমি মাপ কর্তে পারি, কে পার্বে রমা? আমি আশীর্ব্বাদ করি, এর পুরস্কার ভগবান্ তোমাকে যেন দেন।” রমা হাত দিয়া চোখ মুছিয়া ফেলিয়া কহিল,—“আমার এই একটা সান্ত্বনা জ্যাঠাইমা, তিনি ফিরে এসে দেখ্বেন, তাঁর সুখের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে আছে। যা’ তিনি চেয়েছিলেন, তাঁর সেই দেশের চাষাভুষারা এবার ঘুম-ভেঙ্গে উঠে বসেচে। তাঁকে চিনেছে, তাঁকে ভালবেসেছে।
এই ভালবাসার আনন্দে তিনি আমার অপরাধ কি ভুল্তে পার্বেন না জ্যাঠাইমা?” বিশ্বেশ্বরী কথা কহিতে পারিলেন না। শুধু তাঁহার চোখ হইতে এক ফোঁটা অশ্রু গড়াইয়া রমার কপালের উপর পড়িল। তারপর বহুক্ষণ পর্য্যন্ত উভয়েই স্তব্ধ হইয়া রহিলেন। রমা ডাকিল,—“জ্যাঠাইমা? ” বিশ্বেশ্বরী বলিলেন,—“কেন মা?” রমা কহিল,—“শুধু একটা যায়গায় আমরা দূরে যেতে পারিনি। তোমাকে আমরা দুজনেই ভালবেসেছিলাম।” বিশ্বেশ্বরী আবার নত হইয়া তাহার ললাট চুম্বন করিলেন। রমা কহিল,—“সেই জোরে আমি একটা দাবী তোমার কাছে রেখে যাব।
আমি যখন আর থাক্ব না, তখনও আমাকে যদি তিনি ক্ষমা কর্তে না পারেন, শুধু এই কথাটি আমার হ’য়ে তাঁকে বোলো জ্যাঠাইমা, যত মন্দ ব’লে আমাকে তিনি জান্তেন, তত মন্দ আমি ছিলাম না। আর যত দুঃখ তাঁকে দিয়েচি, তার অনেক বেশী দুঃখ যে আমিও পেয়েচি,—তোমার মুখের এই কথাটি হয় ত তিনি অবিশ্বাস কর্বেন না।” বিশ্বেশ্বরী উপুড় হইয়া পড়িয়া, বুক দিয়া রমাকে চাপিয়া ধরিয়া কাঁদিয়া ফেলিলেন। বলিলেন, “চল্ মা, আমরা কোন তীর্থে গিয়ে থাকি।
যেখানে বেণী নেই, রমেশ নেই—যেখানে চোখ তুল্লেই ভগবানের মন্দিরের চূড়া খেয়ে নিজে এসে মিথ্যে-সাক্ষী দিয়ে এত দুঃখ দেবে, সে কথা জেনেও যে আমি তখন জান্তে চাইনি, ভগবান্ তার শাস্তি আমাকে ভালমতেই দিয়েছেন। জেলের মধ্যে তুই বরং ছিলি ভাল রমেশ, বাইরে এই ছ’টা মাস আমি যে তুষের আগুনে জ্বলে-পুড়ে গেছি!” রমেশ কি করিবে, কি বলিবে, ভাবিয়া না পাইয়া হতবুদ্ধি হইয়া চাহিয়া রহিল।
হেডমাষ্টার পাড়ুইমশাই একেবারে ভূলুণ্ঠিত হইয়া রমেশের পায়ের ধূলা মাথায় লইলেন। তাহার পিছনের দলটি তখন অগ্রসর হইয়া কেহ আশীর্ব্বাদ, কেহ সেলাম, কেহ প্রণাম করিবার ঘটায় সমস্ত পথটা যেন চষিয়া ফেলিতে লাগিল। বেণীর কান্না আর মানা মানিল না। অশ্রুগদ্গদকণ্ঠে কহিল,—“দাদার ওপর অভিমান রাখিস্নে, ভাই বাড়ী চল্। মা কেঁদে কেঁদে দু’চক্ষু অন্ধ কর্বার যোগাড় করেচেন!” ঘোড়ার গাড়ী দাঁড়াইয়াছিল; রমেশ বিনাবাক্যব্যয়ে তাহাতে চড়িয়া বসিল।
বেণী সম্মুখের আসনে স্থানগ্রহণ করিয়া মাথার চাদর খুলিয়া ফেলিল। ঘা শুকাইয়া গেলেও আঘাতের চিহ্ন জাজ্বল্যমান। রমেশ আশ্চর্য্য হইয়া কহিল,—“ও কি বড়দা’?” বেণী একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিয়া ডান হাত উলটাইয়া কহিল,—“কাকে আর দোষ দেব ভাই, এ আমার নিজেরই কর্ম্মফল—আমারই পাপের শাস্তি! কিন্তু, সে আর শুনে কি হবে?” বলিয়া মুখের উপর গভীর বেদনার আভাস ফুটাইয়া চুপ করিয়া রহিল। তাহার নিজের মুখের এই সরল স্বীকারোক্তিতে রমেশের চিত্ত আর্দ্র হইয়া গেল। সে মনে করিল, কিছু একটা হইয়াছেই। তাই, সে কথা শুনিবার জন্য আর পীড়াপীড়ি করিল না।
কিন্তু, বেণী যে জন্য এই ভূমিকাটি করিল, তাহা ফাঁসিয়া যাইতেছে দেখিয়া সে নিজেই মনে মনে ছট্ফট্ করিতে লাগিল।মিনিট দুই নিঃশব্দে কাটার পরে, সে আবার একটা নিঃশ্বাসের দ্বারা রমেশের মনোযোগ আকর্ষণ করিয়া ধীরে ধীরে কহিল,—“আমার এই একটা জন্মগত দোষ যে, কিছুতেই মনে এক, মুখে আর কর্তে পারিনে। মনের ভাব আর পাঁচজনের মত ঢেকে রাখ্তে পারিনি বলে কত শাস্তিই যে, ভোগ কর্তে হয়, কিন্তু, তবু ত আমার চৈতন্য হল না!”
রমেশ চুপ করিয়া শুনিতেছে দেখিয়া, বেণী কণ্ঠস্বর আরও মৃদু ও গম্ভীর করিয়া কহিতে লাগিল,—“আমার দোষের মধ্যে সে দিন মনের কষ্ট আর চাপ্তে না পেরে কাঁদ্তে কাঁদ্তে বলে ফেলেছিলাম, রমা, আমরা তোর এমন কি অপরাধ করেছিলাম যে, এই সর্ব্বনাশ আমাদের কর্লি! জেল হয়েছে শুন্লে যে মা একেবারে প্রাণ-বিসর্জ্জন কর্বেন! আমরা ভায়ে ভায়ে বিষয় নিয়ে ঝগড়া করি—যা’ করি, কিন্তু, তবু ত সে আমার ভাই! তুই একটি আঘাতে আমার ভাইকে মার্লি, মাকে মার্লি! কিন্তু, নির্দ্দোষীর ভগবান্ আছেন।
” বলিয়া সে গাড়ীর বাহিরে আকাশের পানে চাহিয়া আর একবার যেন নালিশ জানাইল। রমেশ যদিও এ অভিযোগে যোগ দিল না, কিন্তু মন দিয়া শুনিতে লাগিল। বেণী একটু থামিয়া কহিল, —“রমেশ, রমার সে উগ্রমূর্ত্তি মনে হ’লে এখনো হৃৎকম্প হয়, দাঁতে দাঁত ঘ’ষে বল্লে, ‘রমেশের বাপ আমার বাবাকে জেলে দিতে যায় নি? পার্লে ছেড়ে দিত বুঝি?” মেয়েমানুষের এত দর্প আর সহ্য হল না রমেশ। আমিও রেগে ব’লে ফেললাম,
“আচ্ছা ফিরে আসুক সে, তার পরে এর বিচার হবে!” এতক্ষণ পর্য্যন্ত রমেশ বেণীর কথাগুলা মনের মধ্যে ঠিকমত গ্রহণ করিতে পারিতেছিল না। কবে তাহার পিতা রমার পিতাকে জেলে দিবার আয়োজন করিয়াছিলেন, তাহা সে জানে না, কিন্ত ঠিক এই কথাটিই সে দেশে পা-দিয়াই রমার মাসীর মুখে শুনিয়াছিল, তাহা তাহার মনে পড়িল।তখন পরের ঘটনা শুনিবার জন্য সে উৎকর্ণ হইয়া উঠিল। বেণী তাহা লক্ষ্য করিয়া কহিল,—“খুন করা তার অভ্যাস আছে ত! আকবর লেঠেলকে পাঠিয়েছিল, মনে নেই?
কিন্তু, তোমার কাছে ত চালাকি খাটেনি,—বরঞ্চ তুমিই উলটে শিখিয়ে দিয়েছিলে। কিন্তু, আমাকে দেখ্চ ত? এই ক্ষীণজীবী—” বলিয়া বেণী একটুখানি চিন্তা করিয়া লইয়া, তুষ্টু কলুর ছেলের কল্পিত বিবরণ নিজের অন্ধকার অন্তরের ভিতর হইতে বাহির করিয়া, আপনার ভাষা দিয়া একটু একটু গ্রথিত করিয়া বিবৃত করিল। রমেশ রুদ্ধনিশ্বাসে কহিল,—“তার পর?” বেণী মলিনমুখে একটুখানি হাসিয়া কহিল,—“তার পরে কি আর মনে আছে ভাই! কে, কিসে ক’রে যে আমাকে হাঁসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল, সেখানে কি হ’ল, কে দেখ্লে কিছুই জানিনে। দশদিন পরে জ্ঞান হ’য়ে দেখ্লাম, হাঁসপাতালে প’ড়ে আছি।
এ যাত্রা যে রক্ষে পেয়েচি সে কেবল মায়ের পুণ্যে—এমন মা কি আর আছে রমেশ! রমেশ একটি কথাও কহিতে পারিল না, কাঠের মূর্ত্তির মত শক্ত হইয়া বসিয়া রহিল। শুধু কেবল তাহার দুই হাতের দশ অঙ্গুলি জড় হইয়া বজ্রকঠিন মুঠায় পরিণত হইল। তাহার মাথায় ক্রোধ ও ঘৃণার যে ভীষণ বহ্নি জ্বলিতে লাগিল, তাহার পরিমাণ করিবারও তাহার সাধ্য রহিল না। বেণী যে কত মন্দ, তাহা সে জানিত। তাহার অসাধ্য যে কিছুই নাই, ইহাও তাহার অপরিজ্ঞাত ছিল না।
কিন্তু, সংসারে কোনো মানুষই যে এত অসত্য এমন অসঙ্কোচে, এরূপ অনর্গল উচ্চারণ করিয়া যাইতে পারে, তাহা কল্পনা করিবার মত অভিজ্ঞতা তাহার ছিল না। তাই, সে রমার সমস্ত অপরাধই সত্য বলিয়া বিশ্বাস করিল।সে দেশে ফিরিয়া আসায় গ্রামময় যেন একটা উৎসব বাধিয়া গেল। প্রতিদিন সকালে, দুপুরে এবং রাত্রি পর্য্যন্ত এত জনসমাগম, এত কথা, এত আত্মীয়তার ছড়াছড়ি পড়িয়া গেল যে, কারাবাসের যেটুকু গ্লানি তাহার মনের মধ্যে অবশিষ্ট ছিল দেখিতে দেখিতে তাহা উড়িয়া গেল।
তাহার অবর্ত্তমানে গ্রামের মধ্যে যে খুব বড় একটা সামাজিক স্রোত ফিরিয়া গিয়াছে, তাহাতে কোন সংশয় নাই; কিন্তু এই কয়টা মাসের মধ্যেই এত বড় পরিবর্ত্তন কেমন করিয়া সম্ভব হইল, ভাবিতে গিয়া তাহার চোখে পড়িল, বেণীর প্রতিকূলতায় যে শক্তি পদে পদে প্রতিহত হইয়া কাজ করিতে পারিতেছিল না, অথচ সঞ্চিত হইতেছিল, তাহাই এখন তাহারি অনুকূলতায় দ্বিগুণ বেগে প্রবাহিত হইয়াছে।
বেণীকে সে আজ আরও একটু ভাল করিয়া চিনিল। এই লোকটাকে এরূপ অনিষ্টকারী জানিয়াও সমস্ত গ্রামের লোক যে, তাহার কতদূর বাধ্য, তাহা আজ যেমন সে দেখিতে পাইল, এমন কোন দিন নয়। ইহারই বিরোধ হইতে পরিত্রাণ পাইয়া রমেশ মনে মনে হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল। শুধু তাই নয়। রমেশের উপর অন্যায় অত্যাচারের জন্য গ্রামের সকলেই মর্ম্মাহত, সেকথা একে-একে সবাই তাহাকে জানাইয়া গিয়াছে।
ইহাদের সমবেত-সহানুভূতি লাভ করিয়া, এবং বেণীকে স্বপক্ষে পাইয়া, আনন্দ, উৎসাহে হৃদয় তাহার বিস্ফারিত হইয়া উঠিল। ছয়মাস পূর্ব্বে যে সকল কাজ আরম্ভ করিয়াই তাহাকে ত্যাগ করিয়া যাইতে হইয়াছিল, আবার পূরাদ্যমে তাহাতে লাগিয়া পড়িবে সঙ্কল্প করিয়া রমেশ কিছু দিনের জন্য নিজেও এই সকল আমোদ-আহ্লাদে গা ঢালিয়া দিয়া, সর্ব্বত্র, ছোট-বড় সকল বাড়ীতে, সকলের কাছে, সকল বিষয়ের খোঁজখবর লইয়া সময় কাটাইতে লাগিল।
শুধু একটা বিষয় হইতে সে সর্ব্বপ্রযত্নে নিজেকে পৃথক্ করিয়া রাখিতেছিল—তাহা রমার প্রসঙ্গ। সে পীড়িতা, তাহা পথেই শুনিয়াছিল; কিন্তু, সে পীড়া যে এখন কোথায় উপস্থিত হইয়াছিল,—তাহার কোন সংবাদ গ্রহণ করিতে চাহে নাই। তাহার সমস্ত সম্বন্ধ হইতে আপনাকে সে চিরদিনের মত বিচ্ছিন্ন করিয়া লইয়াছে, ইহাই তাহার ধারণা।
গ্রামে আসিয়াই মুখে মুখে শুনিয়াছিল, শুধু একা রমাই যে তাহার সমস্ত দুঃখের মূল, তাহা সবাই জানে। সুতরাং এইখানে বেণী যে মিথ্যা কথা কহে নাই, তাহাতে আর তাহার সন্দেহ রহিল না। দিন পাঁচছয় পরে বেণী আসিয়া রমেশকে চাপিয়া ধরিল। পীরপুরের একটা বড় বিষয়ের অংশ-বিভাগ লইয়া বহুদিন হইতে রমার সহিত তাহার প্রচ্ছন্ন মনোবিবাদ ছিল। এই সুযোগে সেটা হস্তগত করিয়া লওয়া তাহার উদ্দেশ্য। বেণী বাহিরে যাহাই বলুক, সে মনে মনে রমাকে ভয় করিত।
এখন সে শয্যাগত, মামলা-মোকদ্দমা করিতে পারিবে না; উপরন্তু তাহাদের মুসলমান প্রজারাও রমেশের কথা ঠেলিতে পারিবে না। পরে যাই হোক্, আপাততঃ বেদখল করিবার এমন অবসর আর মিলিবে না, বলিয়া সে একেবারে জিদ্ ধরিয়া বসিল।রমেশ আশ্চর্য্য হইয়া অস্বীকার করিতেই বেণী বহু প্রকারের যুক্তিপ্রয়োগ করিয়া শেষে কহিল,—“হবে না কেন? বাগে পেয়ে সে কবে তোমাকে রেয়াৎ করেচে যে, তার অসুখের কথা তুমি ভাব্তে যাচ্চ?
তোমাকে যখন সে জেলে দিয়েছিল, তখন তোমার অসুখই বা কোন্ কম ছিল ভাই!” কথাটা সত্য। রমেশ অস্বীকার করিতে পারিল না। তবু, কেন যে তাহার মন কিছুতেই তাহার বিপক্ষতা করিতে চাহিল না, বেণীর সহস্র কটু উত্তেজনা সত্ত্বেও রমার অসহায়, পীড়িত অবস্থা মনে করিতেই তাহার সমস্ত বিরুদ্ধশক্তি সঙ্কুচিত হইয়া বিন্দুবৎ হইয়া গেল, তাহার সুস্পষ্ট হেতু সে নিজেও খুঁজিয়া পাইল না! রমেশ চুপ করিয়া রহিল। বেণী, কাজ হইতেছে জানিলে, ধৈর্য্য ধরিতে জানে। সে তখনকার মত আর পীড়াপীড়ি না করিয়া, চলিয়া গেল।
Read more
