পল্লী সমাজ পর্ব:৩ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

পল্লী সমাজ পর্ব:৩

ছেলেমেয়ে সঙ্গে করিয়া বৃদ্ধ ধীরে ধীরে চলিয়া গেল। রমেশ ফিরিয়া আসিয়া মুহূর্ত্তের জন্য নিজের রূঢ় কথা স্মরণ করিয়া গাঙুলী মশায়কে কিছু বলিবার চেষ্টা করিতেই, তিনি থামাইয়া দিয়া উদ্দীপ্ত হইয়া বলিয়া উঠিলেন, “এ যে আমার নিজের কাজ, রমেশ, তুমি না ডাক্‌লেও যে আমাকে নিজে এসেই সমস্ত কর্‌তে হ’ত। তাই ত এসেছি; ধর্ম্মদাস-দা’ আর আমি দুই ভায়ে ত তোমার ডাক্‌বার অপেক্ষা রাখিনি, বাবা।” ধর্ম্মদাস এইমাত্র তামাক খাইয়া কাসিতেছিল।

লাঠিতে ভর দিয়া দাঁড়াইয়া কাসির ধমকে চোখ-মুখ রাঙা করিয়া, হাত ঘুরাইয়া বলিল, “বলি শোন রমেশ, আমরা বেণী ঘোষাল নই। আমাদের জন্মের ঠিক আছে।” তাহার কুৎসিত কথায় রমেশ চম্‌কাইয়া উঠিল। কিন্তু আর রাগ করিল না। এই অত্যল্প সময়ের মধ্যেই সে বুঝিয়াছিল, ইহারা শিক্ষা ও অভ্যাসের দোষে অসঙ্কোচে কত বড় গর্হিত কথা যে উচ্চারণ করে, তাহা জানেও না।

জ্যাঠাইমার সস্নেহ অনুরোধে এবং তাঁহার ব্যথিত মুখ মনে করিয়া রমেশ ভিতরে ভিতরে পীড়া অনুভব করিতেছিল। সকলে প্রস্থান করিলে সে বড়দা’র কাছে যাইবার জন্য প্রস্তুত হইল। বেণীর চণ্ডীমণ্ডপের বাহিরে আসিয়া যখন উপস্থিত হইল, তখন রাত্রি আটটা। ভিতরে যেন একটা লড়াই চলিতেছে। গোবিন্দ গাঙ্গুলীর হাঁকা-হাঁকিটাই সবচেয়ে বেশী। বাহির হইতেই তাহার কানে গেল, গোবিন্দ বাজি রাখিয়া বলিতেছে, “এ যদি না দু’দিনে উচ্ছন্ন যায়, ত আমার গোবিন্দ গাঙ্গুলী নাম তোমরা বদ্‌লে রেখো, বেণী বাবু! নবাবি কাণ্ডকারখানা শুন্‌লে ত?

তারিণী ঘোষাল সিকি পয়সা রেখে মরেনি, তা’ জানি, তবে এত কেন? হাতে থাকে কর, না থাকে, বিষয় বন্ধক দিয়ে কে কবে ঘটা ক’রে বাপের ছাদ্দ করে, তা ত কখন শুনিনি, বাবা! আমি তোমাকে নিশ্চয় বল্‌চি, বেণীমাধব বাবু, এ ছোঁড়া নন্দীদের গদি থেকে অন্ততঃ তিনঢি হাজার টাকা দেনা ক’রেচে।” বেণী উৎসাহিত হইয়া কহিল, “তা হ’লে কথাটা ত বার ক’রে নিতে হচ্চে, গোবিন্দ খুড়ো?” গোবিন্দ স্বর মৃদু করিয়া বলিল, “সবুর কর না, বাবাজী! একবার ভাল করে ঢু্‌ক্‌তেই দাও না—তার পরে—বাইরে দাঁড়িয়ে কে ও?

এ কি, রমেশ বাবাজী? আমরা থাক্‌তে এত রাত্তিরে তুমি কেন, বাবা?” রমেশ সে কথার জবাব না দিয়া অগ্রসর হইয়া আসিয়া বলিল, “বড়দা’, আপনার কাছেই এলুম।” বেণী থতমত খাইয়া জবাব দিতে পারিল না। গোবিন্দ তৎক্ষণাৎ কহিল, “আস্‌বে বৈ কি, বাবা, একশবার আস্‌বে! এ ত তোমারই বাড়ী। আর বড়ভাই পিতৃতুল্য। তাই ত আমরা বেণীবাবুকে বল্‌তে এসেছি, বেণীবাবু, তারিণীদার ওপর মনোমালিন্য তাঁর সঙ্গেই যাক্‌—আর কেন?

তোমরা দু’ভাই এক হও, আমরা দেখে চোখ জুড়োই—কি বল, হালদারমামা? ও কি, দাঁড়িয়ে রইলে যে, বাবা—কে আছিস্‌ রে, একখানা কম্বলের আসন-টাসন পেতে দে না রে! না, বেণী বাবু, তুমি বড় ভাই—তুমিই সব। তুমি আলাদা হয়ে থাক্‌লে চলবে না। তা’ ছাড়া বড়গিন্নী ঠাক্‌রুন যখন স্বয়ং গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন, তখন—” বেণী চম্‌কাইয়া উঠিল—“মা গিয়ে ছিলেন?”

এই চমক্‌টা লক্ষ্য করিয়া গোবিন্দ মনে মনে খুসি হইল। কিন্তু, বাহিরে সে ভাব গোপন করিয়া নিতান্ত ভাল মানুষের মত খবরটা ফলাও করিয়া বলিতে লাগিল, “শুধু যাওয়া কেন, ভাঁড়ার-টাঁড়ার—করাকর্ম্ম যা’ কিছু তিনিই ত কর্‌চেন। আর তিনি না কর্‌লে কর্‌বেই বা কে?” সকলেই চুপ করিয়া রহিল। গোবিন্দ একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, “নাঃ—গাঁয়ের মধ্যে বড়গিন্নী ঠাক্‌রুনের মত মানুষ কি আর আছে?—না হবে? না বেণীবাবু, সাম্‌নে বল্‌লে খোসামোদ করা হবে, কিন্তু, যে যাই বলুক, গাঁয়ে যদি লক্ষ্মী থাকেন, ত সে তোমার মা। এমন মা কি কারু হয়?

” বলিয়া পুনশ্চ একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করিয়া গম্ভীর হইয়া রহিলেন। বেণী অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া অস্ফুটে কহিল,—“আচ্ছা—” গোবিন্দ চাপিয়া ধরিল, “শুধু আচ্ছা নয়, বেণীবাবু! যেতে হবে, কর্‌তে হবে, সমস্ত ভার তোমার উপরে। ভাল কথা, সবাই আপনারা ত উপস্থিত আছেন, নেমন্তন্নটা কি রকম করা হবে, একটা ফর্দ্দ ক’রে ফেলা হোক্‌ না কেন? কি বল, রমেশ বাবাজী? ঠিক্‌ কথা কি না, হালদার মামা! ধর্ম্মদাস-দা’ চুপ ক’রে রইলে কেন? কাকে বল্‌তে হবে, কাকে বাদ দিতে হবে, জান ত সব।”

রমেশ উঠিয়া দাঁড়াইয়া সহজ-বিনীত-কন্ঠে বলিল, “বড়দা,’ একবার পায়ের ধুলো যদি দিতে পারেন—” বেণী গম্ভীর হইয়া কহিল, “মা যখন গেছেন, তখন আমার যাওয়া না যাওয়া—কি বল, গোবিন্দ খুড়ো?” গোবিন্দ কথা কহিবার পূর্ব্বেই রমেশ বলিল, “আপনাকে আমি পীড়াপীড়ি কর্‌তে চাইনে, বড়দা’, যদি অসুবিধে না হয়, একবার দেখে শুনে আস্‌বেন।”বেণী চুপ করিয়া রহিল। গোবিন্দ কি একটা বলিবার চেষ্টা করিতেই রমেশ উঠিয়া চলিয়া গেল। তখন গোবিন্দ বাহিরের দিকে গলা বাড়াইয়া দেখিয়া ফিস্‌-ফিস্ করিয়া বলিল, “দেখ্‌লে, বেণীবাবু, কথার ভাবখানা!” বেণী অন্যমনস্ক হইয়া কি ভাবিতেছিল, কথা কহিল না।

পথে চলিতে চলিতে গোবিন্দের কথাগুলা মনে করিয়া রমেশের সমস্ত মন ঘৃণায় পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল। সে অর্দ্ধেক পথ হইতে ফিরিয়া আসিয়া সেই রাত্রেই আবার বেণী ঘোষালের বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিল। চণ্ডীমণ্ডপের মধ্যে তখন তর্ক-কোলাহল উদ্দাম হইয়া উঠিয়াছিল; কিন্তু সে শুনিতেও তাহার প্রবৃত্তি হইল না। সোজা ভিতরে প্রবেশ করিয়া রমেশ ডাকিল, “জ্যাঠাইমা!

জ্যাঠাইমা তাঁহার ঘরের সুমুখের বারান্দায় অন্ধকারে চুপ করিয়া বসিয়াছিলেন; এত রাত্রে রমেশের গলা শুনিয়া বিস্ময়াপন্ন হইলেন। “রমেশ? কেন রে?” রমেশ উঠিয়া আসিল। জ্যাঠাইমা ব্যস্ত হইয়া বলিলেন, “একটু দাঁড়া, বাবা, একটা আলো আন্‌তে ব’লে দি।” “আলোয় কাজ নেই জ্যাঠাইমা, তুমি উঠো না।” বলিয়া রমেশ অন্ধকারেই একপাশে বসিয়া পড়িল। তখন জ্যাঠাইমা প্রশ্ন করিলেন, “এত রাত্তিরে যে?”

রমেশ মৃদু কন্ঠে কহিল, “এখনো ত নিমন্ত্রণ করা হয়নি, জ্যাঠাইমা, তাই তোমাকে জিজ্ঞেস কর্‌তে এলুম।” “তবেই মুস্কিলে ফেল্‌লি বাবা! এঁরা কি বলেন? গোবিন্দ গাঙ্গুলী, চাটুয্যে মশাই—” রমেশ বাধা দিয়া বলিয়া উঠিল, “জানিনে, জ্যাঠাইমা, কি এঁরা বলেন। জান্‌তেও চাইনে—তুমি যা’ বল্‌বে তাই হবে।” অকস্মাৎ রমেশের কথার উত্তাপে বিশ্বেশ্বরী মনে মনে বিস্মিত হইয়া ক্ষণকাল মৌন থাকিয়া বলিলেন, “কিন্তু তখন যে বল্‌লি রমেশ, এরাই তোর সব চেয়ে আপনার! তা’ যাই হোক, আমার মেয়েমানুষের কথায় কি হবে বাবা? —এ গাঁয়ে যে আবার,—আর এ গাঁয়েই কেন বলি, সব গাঁয়েই—এ ওর সঙ্গে খায় না, ও তার সঙ্গে কথা কয় না—একটা কাজকর্ম্ম পড়ে গেলে আর মানুষের দুর্ভাবনার অন্ত থাকে না।

কাকে বাদ দিয়ে কাকে রাখা যায়, এর চেয়ে শক্ত কাজ আর গ্রামের মধ্যে নেই।” রমেশ বিশেষ আশ্চর্য্য হইল না। কারণ, এই কয়দিনের মধ্যেই সে অনেক জ্ঞানলাভ করিয়াছিল। তথাপি জিজ্ঞাসা করিল, “কেন, এ রকম হয়, জ্যাঠাইমা?” “সে অনেক কথা, বাবা। যদি থাকিস্‌ এখানে, আপনিই সব জান্‌তে পারবি। কারুর সত্যিকার দোষ-অপরাধ আছে, কারুর মিথ্যে অপবাদ আছে—তা’ ছাড়া মামলা—মকদ্দমা, মিথ্যে সাক্ষী দেওয়া নিয়েও মস্ত দলাদলি। আমি যদি তোর ওখানে দুদিন আগে যেতুম, রমেশ, তা হ’লে এত উদ্যোগ আয়োজন কিছুতে ক’রতে দিতুম না। কি যে সেদিন হবে, তাই কেবল আমি ভাবচি।

” বলিয়া জ্যাঠাইমা একটা নিশ্বাস ফেলিলেন। সে নিশ্বাসে যে কি ছিল, তাহার ঠিক মর্ম্মটি রমেশ ধরিতে পারিল না, এবং কাহারো সত্যকার অপরাধই বা কি এবং কাহারও মিথ্যা অপবাদই বা কি হইতে পারে, তাহাও ঠাহর করিতে পারিল না। বরঞ্চ উত্তেজিত হইয়া কহিল,—“কিন্তু আমার সঙ্গে ত তার কোন যোগ নেই। আমি একরকম বিদেশী বল্‌লেই হয়—কারো সঙ্গে কোন শত্রুতা নেই।

তাই আমি বলি জ্যাঠাইমা, আমি দলাদলির কোন বিচারই কর্‌ব না, সমস্ত ব্রাহ্মণ-শূদ্রই নিমন্ত্রণ করে আস্‌ব। কিন্তু, তোমার হুকুম ছাড়া ত পারিনে; তুমি হুকুম দাও জ্যাঠাইমা!” জ্যাঠাইমা কিছুক্ষণ চুপ করিয়া ভাবিয়া বলিলেন—“এ রকম হুকুম ত দিতে পারিনে রমেশ! তাতে ভারি গোলযোগ ঘটবে। তবে তোর কথাও যে সত্যি নয়, তাও আমি বলিনে। কিন্তু এ ঠিক সত্যি-মিথ্যের কথা নয়, বাবা।

সমাজ যাকে শাস্তি দিয়ে আলাদা ক’রে রেখেচে, তাকে জবরদস্তি ক’রে ডেকে আনা যায় না। সমাজ যাই হোক্‌, তাকে মান্য করতেই হবে। নইলে তার ভাল কর্‌বার মন্দ কর্‌বার কোন শক্তিই থাকে না—এ রকম হ’লে ত কোনমতে চল্‌তে পারে না রমেশ!” ভাবিয়া দেখিলে রমেশ এ কথা যে অস্বীকার করিতে পারিত, তাহা নহে; কিন্তু এইমাত্র নাকি বাহিরে এই সমাজের শীর্ষস্থানীয়দের ষড়্‌যন্ত্র এবং নীচাশয়তা তাহার বুকের মধ্যে আগুনের শিখার মত জ্বলিতেছিল, তাই, সে তৎক্ষণাৎ ঘৃণাভরে বলিয়া উঠিল, “এ গাঁয়ের সমাজ বল্‌তে ধর্ম্মদাস, গোবিন্দ—এঁরা ত? এমন সমাজের একবিন্দু ক্ষমতাও না থাকে, সেই ত ঢের ভাল, জ্যাঠাইমা!” জ্যাঠাইমা রমেশের উষ্ণতা লক্ষ্য করিলেন; কিন্তু শান্তকণ্ঠে বলিলেন, “শুধু এঁরা নয়, রমেশ, তোমার বড়দা’ বেণীও সমাজের একজন কর্ত্তা।

” রমেশ চুপ করিয়া রহিল। তিনি পুনরপি বলিলেন, “তাই আমি বলি, এঁদের মত নিয়ে কাজ করো গে, রমেশ! সবেমাত্র বাড়ীতে পা দিয়েই এঁদের বিরুদ্ধতা করা ভাল নয়।” বিশ্বেশ্বরী কতটা দূর চিন্তা করিয়া যে এইরূপ উপদেশ দিলেন, তীব্র উত্তেজনার মুখে রমেশ তাহা ভাবিয়া দেখিল না; কহিল, “তুমি নিজে এইমাত্র বল্‌লে জ্যাঠাইমা, নানান্‌ কারণে এখানে দলাদলির সৃষ্টি হয়। বোধ করি, ব্যক্তিগত আক্রোশটাই সবচেয়ে বেশী। তা’ ছাড়া, আমি যখন সত্যিমিথ্যে কারো কোন দোষ অপরাধের কথাই জানিনে, তখন, কোন লোককেই বাদ দিয়ে অপমান করা আমার পক্ষে অন্যায়।” জ্যাঠাইমা একটুখানি হাসিয়া বলিলেন, “ওরে পাগ্‌লা, আমি যে তোর গুরুজন—মায়ের মত।

আমার কথাটা না শোনাও ত তোর পক্ষে অন্যায়!” “কি কর্‌ব জ্যাঠাইমা, আমি স্থির করিচি, আমি সকলকেই নিমন্ত্রণ কর্‌ব।” তাহার দৃঢ়সঙ্কল্প দেখিয়া বিশ্বেশ্বরীর মুখ অপ্রসন্ন হইল; বোধ করি বা মনে মনে বিরক্ত হইলেন; বলিলেন, “তা হ’লে আমার হুকুম নিতে আসাটা তোমার শুধু একটা ছল মাত্র।” জ্যাঠাইমার বিরক্তি রমেশ লক্ষ্য করিল, কিন্তু বিচলিত হইল না। খানিক পরে আস্তে আস্তে বলিল, “আমি জান্‌তুম জ্যাঠাইমা, যা অন্যায় নয়, আমার সে কাজে তুমি প্রসন্নমনে আমাকে আশীর্ব্বাদ করবে। আমার—” তাহার কথাটা শেষ হইবার পূর্ব্বেই বিশ্বেশ্বরী বাধা দিয়া বলিয়া উঠিলেন, কিন্তু এটাও ত তোমার জানা উচিত ছিল, রমেশ, যে, আমার সন্তানের বিরুদ্ধে আমি যেতে পার্‌ব না?”

কথাটা রমেশকে আঘাত করিল। কারণ, মুখে সে যাই বলুক, কেমন করিয়া তাহার সমস্ত অন্তঃকরণ কা’ল হইতে এই জ্যাঠাইমার কাছে সন্তানের দাবী করিতেছিল, এখন দেখিল, এ দাবীর অনেক ঊর্দ্ধে তাঁর আপন সন্তানের দাবী জায়গা জুড়িয়া বসিয়া আছে। সে ক্ষণকালমাত্র চুপ করিয়া থাকিয়াই উঠিয়া দাঁড়াইয়া চাপা অভিমানের সুরে বলিল,—“কা’ল পর্য্যন্ত তাই জান্‌তুম, জ্যাঠাইমা! তাই তোমাকে তখন বলেছিলুম, যা’ পারি, আমি একলা করি, তুমি এসো না, তোমাকে ডাকবার সাহসও আমার হয়নি।” এই ক্ষুণ্ণ অভিমান জ্যাঠাইমার অগোচর রহিল না। কিন্তু আর জবাব দিলেন না, অন্ধকারে চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন।

খানিকপরে রমেশ চলিয়া যাইবার উপক্রম করিতেই বলিলেন, “তবে একটু দাঁড়াও বাছা, তোমার ভাঁড়ার ঘরের চাবিটা এনে দিই” বলিয়া ঘরের ভিতর হইতে চাবি আনিয়া রমেশের পায়ের কাছে ফেলিয়া দিলেন। রমেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধভাবে দাঁড়াইয়া থাকিয়া অবশেষে গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া চাবিটা তুলিয়া লইয়া আস্তে আস্তে চলিয়া গেল। ঘণ্টাকয়েকমাত্র পূর্ব্বে সে মনে মনে বলিয়াছিল, ‘আর আমার ভয় কি, আমার জ্যাঠাইমা আছেন।’ কিন্তু একটা রাত্রিও কাটিল না, তাহাকে আবার নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিতে হইল, “না, আমার কেউ নেই—জ্যাঠাইমাও আমাকে ত্যাগ করিয়াছেন।”

বাহিরে এইমাত্র শ্রাদ্ধ শেষ হইয়া গেছে। আসন হইতে উঠিয়া রমেশ অভ্যাগতদিগের সহিত পরিচিত হইবার চেষ্টা করিতেছে—বাড়ীর ভিতরে আহারের জন্য পাতা পাড়িবার আয়োজন হইতেছে, এমন সময় একটা গোলমাল হাঁকাহাঁকি শুনিয়া রমেশ ব্যস্ত হইয়া, ভিতরে আসিয়া উপস্থিত হইল। সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই আসিল। ভিতরে রন্ধনশালার কপাটের একপাশে একটি ২৫।২৬ বছরের বিধবা মেয়ে জড়সড় হইয়া, পিছন ফিরিয়া দাঁড়াইয়া আছে এবং আর একটি প্রৌঢ়া রমণী তাহাকে আগলাইয়া দাঁড়াইয়া ক্রোধে চোখমুখ রক্তবর্ণ করিয়া চীৎকারে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বাহির করিতেছে।

বিবাদ বাধিয়াছে পরাণ হালদারের সহিত। রমেশকে দেখিবামাত্র প্রৌঢ়া চেঁচাইয়া প্রশ্ন করিল, “হাঁ বাবা, তুমিও ত গাঁয়ের একজন জমিদার, বলি, যত দোষ কি এই ক্ষেন্তি বাম্‌নির মেয়ের? মাথার ওপর আমাদের কেউ নেই ব’লে কি যতবার খুসি শাস্তি দেবে?” গোবিন্দকে দেখাইয়া কহিল, “ঐ উনি মুখুয্যে বাড়ীর গাছ-পিতিষ্ঠের সময় জরিমানা ব’লে ইস্কুলের নামে দশটাকা আমার কাছে আদায় করেননি কি?

গাঁয়ের ষোলো–আনা শেতলা-পুজোর জন্যে দুজোড়া পাঁঠার দাম ধ’রে নেননি কি? তবে, কতবার ঐ এক কথা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি কর্‌তে চান, শুনি?” রমেশ ব্যাপারটা কি, কিছুই বুঝিতে পারিল না। গোবিন্দ গাঙুলী বসিয়াছিল, মীমাংসা করিতে উঠিয়া দাঁড়াইল। একবার রমেশের দিকে, একবার প্রৌঢ়ার দিকে চাহিয়া গম্ভীর গলায় কহিল, “যদি আমার নাম্‌টাই কর্‌লে, ক্ষান্তমাসী, তবে সত্যি কথা বলি, বাছা! খাতিরে কথা কইবার লোক এই গোবিন্দ গাঙুলী নয়। সে দেশ শুদ্ধ লোক জানে।

তোমার মেয়ের প্রাশ্চিত্যও হয়েচে, সামাজিক জরিমানাও আমরা করেছি—সব মানি। কিন্তু তাকে যজ্ঞিতে কাঠি দিতে ত আমরা হুকুম দিইনি! মর্‌লে ওকে পোড়াতে আমরা কাঁধ দেব, কিন্তু—” ক্ষান্তমাসী চীৎকার করিয়া উঠিল, “ম’লে তোমার নিজের মেয়েকে কাঁধে ক’রে পুড়িয়ে এসো বাছা—আমার মেয়ের ভাবনা তোমাকে ভাব্‌তে হবে না। বলি, হাঁ গোবিন্দ, নিজের গায়ে হাত দিয়ে কি কথা কও না?

তোমার ছোট–ভাজ যে ঐ ভাঁড়ার ঘরে বসে পান সাজ্‌চে, সে আর বছর মাসদেড়েক ধ’রে কোন্‌ কাশীবাস ক’রে অমন হল্‌দে রোগা শল্‌তেটির মত হয়ে ফিরে এসেছিল, শুনি? সে বড়লোকের বড় কথা বুঝি? বেশী ঘেঁটিয়ো না, বাপু, আমি সব জারিজুরি ভেঙে দিতে পারি। আমরাও ছেলেমেয়ে পেটে ধরেচি, আমরা চিন্‌তে পারি। আমাদের চোখে ধূলো দেওয়া যায় না।” গোবিন্দ ক্ষ্যাপার মত ঝাঁপাইয়া পড়িল—“তবে রে, হারামজাদা মাগী—” কিন্তু হারামজাদা মাগী একটুও ভয় পাইল না, বরং এক পা আগাইয়া আসিয়া হাতমুখ ঘুরাইয়া কহিল, “মারবি না কি রে?

ক্ষেন্তিবাম্‌নিকে ঘাঁটালে ঠগ্‌ বাছতে গাঁ উজোড় হয়ে যাবে, তা’ বলে দিচ্চি। আমার মেয়ে ত রান্নাঘরে ঢুকতে যায়নি; দোর-গোড়ায় আস্‌তে না আস্‌তে হালদার ঠাকুরপো যে খামকা অপমান ক’রে বস্‌ল, বলি তার বেয়ানের তাঁতি-অপবাদ ছিল নাকি? আমি ত আর আজকের নই গো, বলি, আরও বল্‌ব, না এতেই হবে?

” রমেশ কাঠ হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। ভৈরব আচার্য্য ব্যস্ত হইয়া ক্ষান্তর হাতটা প্রায় ধরিয়া ফেলিয়া সানুনয়ে কহিল, “এতেই হবে, মাসি, আর কাজ নেই। নে, সুকুমারী, ওঠ মা, চল্‌ বাছা, আমার সঙ্গে ওঘরে গিয়ে বস্‌বি চল্‌।” পরাণ হালদার চাদর কাঁধে লইয়া সোজা খাড়া হইয়া উঠিয়া বলিল, “এই বেশ্যে মাগীদের বাড়ী থেকে একেবারে তাড়িয়ে না দিলে এখানে আমি জলগ্রহণ কর্‌ব না, তা’ বলে দিচ্চি। গোবিন্দ! কালীচরণ! তোমাদের মামাকে চাও, ত উঠে এসো বল্‌চি।

বেণী ঘোষাল যে তখন বলেছিল, “মামা, যেয়ো না ওখানে!’ এমন সব খান্‌কী-নটীর কাণ্ডকারখানা জান্‌লে কি জাত-জন্ম খোয়াতে এ বাড়ীর চৌকাঠ মাড়াই? কালী! উঠে এসো।” মাতুলের পুনঃ পুনঃ আহ্বানেও কিন্তু কালীচরণ ঘাড় হেঁট করিয়া বসিয়া রহিল। সে পাটের ব্যবসা করে। বছরচারেক পূর্ব্বে কলিকাতাবাসী তাহার এক গণ্যমান্য খরিদ্দার বন্ধু তাহার বিধবা ছোটভগিনীটিকে লইয়া প্রস্থান করিয়াছিল। ঘটনাটি গোপন ছিল না।

হঠাৎ শ্বশুরবাটী যাওয়া এবং তথা হইতে তীর্থযাত্রা ইত্যাদি প্রসঙ্গে কিছুদিন চাপা ছিল মাত্র। পাছে সেই দুর্ঘটনার ইতিহাস এত লোকের সমক্ষে আবার উঠিয়া পড়ে, এই ভয়ে কালী মুখ তুলিতে পারিল না। কিন্তু গোবিন্দের গায়ের জ্বালা আদৌ কমে নাই। সে আবার উঠিয়া দাঁড়াইয়া জোর গলায় কহিল, “যে যাই বলুক না কেন, এ অঞ্চলে সমাজপতি হলেন বেণী ঘোষাল, পরাণ হালদার আর যদু মুখুজ্যে মহাশয়ের কন্যা।

তাঁদের আমরা ত কেউ ফেলতে পার্‌ব না! রমেশ বাবাজী সমাজের অমতে এই দুটো মাগীকে কেন বাড়ী ঢুক্‌তে দিয়েচেন, তার জবাব না দিলে, আমরা এখানে জলটুকু পর্য্যন্ত মুখে দিতে পারব না।” দেখিতে দেখিতে পাঁচসাত-দশজন চাদর কাঁধে ফেলিয়া একে একে উঠিয়া দাঁড়াইল। ইহারা পাড়াগাঁয়েরই লোক, সামাজিক ব্যাপারে কোথায় কোন চাল্‌ সর্ব্বাপেক্ষা লাভজনক, ইহা তাহাদের অবিদিত নহে।

নিমন্ত্রিত ব্রাহ্মণ-সজ্জনেরা যাহারা যা খুসি বলিতে লাগিল। ভৈরব এবং দীনু ভট্‌চায কাঁদ কাঁদ হইয়া বার বার ক্ষান্তমাসী ও তাহার মেয়ের, একবার গাঙুলী ও হালদার মহাশয়ের হাতে-পায়ে ধরিবার উপক্রম করিতে লাগিল—চারিদিক্‌ হইতে সমস্ত অনুষ্ঠান ও ক্রিয়াকর্ম্ম যেন লণ্ডভণ্ড হইবার সূচনা প্রকাশ করিল। কিন্তু রমেশ একটি কথা কহিতে পারিল না; একে ক্ষুধায় তৃষ্ণায় নিতান্ত কাতর, তাহাতে অকস্মাৎ এই অভাবনীয় কাণ্ড। সে পাংশুমুখে কেমন যেন একরকম হতবুদ্ধির মত স্তব্ধ হইয়া চাহিয়া রহিল।

“রমেশ!” অকস্মাৎ এক মুহূর্ত্তে সমস্ত লোকের সচকিত দৃষ্টি এক হইয়া বিশ্বেশ্বরীর মুখের উপর গিয়া পড়িল। তিনি ভাঁড়ার হইতে বাহির হইয়া কপাটের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন। তাঁহার মাথার উপর আঁচল ছিল কিন্তু মুখখানি অনাবৃত। রমেশ দেখিল, জ্যাঠাইমা আপনিই কখন্‌ আসিয়াছেন—তাহাকে ত্যাগ করেন নাই। বাহিরের লোক দেখিল, ইনিই বিশ্বেশ্বরী, ইনিই ঘোষাল বাড়ীর গিন্নী-মা!

 

Read more

পল্লী সমাজ পর্ব:৪ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *