মাস তিনেক পরে একদিন সকালবেলা তারকেশ্বরের যে পুষ্করিণীটিকে দুধপুকুর বলে, তাহারই সিঁড়ির উপর একটি রমণীর সহিত রমেশের একেবারে মুখোমুখি দেখা হইয়া গেল। ক্ষণকালের জন্য সে এম্নি অভিভূত, অভদ্রভাবে তাহার অনাবৃত মুখের পানে চাহিয়া দাঁড়াইয়া রহিল যে, তাহার তৎক্ষণাৎ পথ ছাড়িয়া সরিয়া যাইবার কথা মনেই হইল না। মেয়েটির বয়স, বোধ করি, কুড়ির অধিক নয়।
স্নান করিয়া উপরে উঠিতেছিল। তাড়াতাড়ি হাতের জলপূর্ণ ঘটিটি নামাইয়া রাখিয়া সিক্ত বসনতলে দুই বাহু বুকের উপর জড় করিয়া, মাথা হেঁট করিয়া মৃদুকন্ঠে কহিল,—“আপনি এখানে যে?” রমেশের বিস্ময়ের অবধি ছিল না; কিন্তু তাহার বিহ্বলতা ঘুঁচিয়া গেল। একপাশে সরিয়া দাঁড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “আপনি কি আমাকে চেনেন?” মেয়েটি কহিল,—“চিনি।
আপনি কখন্ তারকেশ্বরে এলেন?” রমেশ কহিল, “আজই ভোরবেলা। আমার মামার বাড়ী থেকে মেয়েদের আস্বার কথা ছিল, কিন্তু তাঁরা আসেন নি।” “এখানে কোথায় আছেন?” রমেশ কহিল,—“কোথাও না। আমি আর কখনো এখানে আসিনি। কিন্তু আজকের দিনটা কোনমতে কোথাও অপেক্ষা ক’রে থাকতেই হবে। যেখানে হোক, একটা আশ্রয় খুঁজে নেব।” “সঙ্গে চাকর আছে ত?” “না, আমি একাই এসেছি।” “বেশ যা হোক্” বলিয়া মেয়েটি হাসিয়া হঠাৎ মুখ তুলিতেই, আবার দুজনের চোখোচোখি হইল।
সে চোখ নামাইয়া লইয়া মনে মনে, বোধ করি একটু ইতস্ততঃ করিয়া শেষে কহিল, “তবে আমার সঙ্গেই আসুন” বলিয়া ঘটিটি তুলিয়া লইয়া অগ্রসর হইতে উদ্যত হইল।রমেশ বিপদে পড়িল। কহিল,—“আমি যেতে পারি, কেন না, এতে দোষ থাক্লে আপনি কখনই ডাক্তেন না। আপনাকে আমি যে চিনি না, তাও নয়; কিন্তু কিছুতেই স্মরণ কর্তে পাচ্ছিনে। আপনার পরিচয় দিন।” “তবে মন্দিরের বাইরে একটু অপেক্ষা করুন, আমি পূজোটা সেরে নিই।
পথে যেতে যেতে আমার পরিচয় দেব” বলিয়া মেয়েটি মন্দিরের দিকে চলিয়া গেল। রমেশ মুগ্ধের মতো চাহিয়া রহিল। এ কি ভীষণ, উদ্দাম যৌবনশ্রী ইহার আর্দ্র বসন বিদীর্ণ করিয়া বাহিরে আসিতে চাহিতেছিল। তাহার মুখ, গঠন, প্রতি পদক্ষেপ পর্য্যন্ত রমেশের পরিচিত; অথচ, বহুদিনরুদ্ধ স্মৃতির কবাট কোনমতেই তাহাকে পথ ছাড়িয়া দিল না।
আধঘণ্টা পরে পূজা সারিয়া মেয়েটি আবার যখন বাহিরে আসিল, রমেশ আর একবার তাহার মুখ দেখিতে পাইল; কিন্তু তেমনই অপরিচয়ের দুর্ভেদ্য প্রাকারের বাহিরে দাঁড়াইয়া রহিল। পথে চলিতে চলিতে রমেশ জিজ্ঞাসা করিল,—“সঙ্গে আপনার আত্মীয় কেউ নেই?” মেয়েটি উত্তর দিল,—“না। দাসী আছে, সে বাসায় কাজ কর্চে। আমি প্রায়ই এখানে আসি, সমস্তই চিনি।” “কিন্তু, আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্চেন কেন?” মেয়েটি খানিকক্ষণ চুপ করিয়া পথ চলিবার পরে বলিল,—“নইলে আপনার খাওয়া-দাওয়ার ভারি কষ্ট হ’ত। আমি রমা।”
সম্মুখে বসিয়া আহার করাইয়া, পান দিয়া বিশ্রামের জন্য নিজের হাতে সতরঞ্চি পাতিয়া দিয়া, রমা কক্ষান্তরে চলিয়া গেল। সেই শয্যায় শুইয়া পড়িয়া চক্ষু মুদিয়া, রমেশের মনে হইল, তাহার এই তেইশবর্ষব্যাপী জীবনটা এই একটা বেলার মধ্যে যেন আগাগোড়া বদলাইয়া গেল। ছেলেবেলা হইতেই তাহার বিদেশে পরাশ্রয়ে কাটিয়াছে। খাওয়াটার মধ্যে ক্ষুন্নিবৃত্তির অধিক আর কিছু যে কোনো অবস্থাতেই থাকিতে পারে, ইহা সে জানিতই না। তাই, আজিকার এই অচিন্তনীয় পরিতৃপ্তির মধ্যে তাহার সমস্ত মন বিস্ময়ে, মাধুর্য্যে, একেবারে ডুবিয়া গেল।
রমা বিশেষ কিছুই এখানে তাঁহার আহারের জন্য সংগ্রহ করিতে পারে নাই।নিতান্তই সাধারণ ভোজ্য ও পেয় দিয়া তাঁহাকে খাওয়াইতে হইয়াছে। এই জন্য তাহার বড় ভাবনা ছিল, পাছে তাঁহার খাওয়া না হয় এবং পরের কাছে নিন্দা হয়।হায় রে পর! হায় রে তা’দের নিন্দা! খাওয়া না হইবার দুর্ভাবনা যে তাহার নিজেরই কত আপনার এবং সে যে তাহার অন্তরের অন্তরতম গহ্বর হইতে অকস্মাৎ জাগিয়া উঠিয়া, তাহার সর্ব্ববিধ দ্বিধা-সঙ্কোচ সজোরে ছিনিয়া লইয়া, এই খাওয়ার জায়গায় তাহাকে ঠেলিয়া পাঠাইয়া দিয়াছিল, এ কথা কেমন করিয়া আজ সে তাহার নিজের কাছে লুকাইয়া রাখিবে।
আজ ত কোন লজ্জার বাধাই তাহাকে দূরে রাখিতে পারিল না। এই আহার্য্যের স্বল্পতার ত্রুটি শুধু যত্ন দিয়া পূর্ণ করিয়া লইবার জন্যই সে সুমুখে আসিয়া বসিল। আহার নির্ব্বিঘ্নে সমাধা হইয়া গেলে, গভীর পরিতৃপ্তির যে নিশ্বাসটুকু রমার নিজের বুকের ভিতর হইতে বাহির হইয়া আসিল, তাহা রমেশের নিজের চেয়ে যে কত বেশি, তাহা আর কেহ যদি না জানিল, যিনি সব জানেন, তাঁহার কাছে ত গোপন রহিল না।
দিবানিদ্রা রমেশের অভ্যাস ছিল না। তাহার সুমুখের ছোট জানালার বাহিরে নববর্ষার ধূসর-শ্যামল-মেঘে মধ্যাহ্ন-আকাশ ভরিয়া উঠিয়াছিল; অর্দ্ধ-নিমীলিত চক্ষে সে তাহাই দেখিতেছিল। তাহার আত্মীয়গণের আসা না আসার কথা আর তাহার মনেই ছিল না। হঠাৎ রমার মৃদুকণ্ঠ তাহার কানে গেল। সে দরজার বাহিরে দাঁড়াইয়া বলিতেছিল,—“আজ যখন বাড়ী যাওয়া হবে না, তখন এইখানেই থাকুন!” রমেশ তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিয়া বলিল,—“কিন্তু যাঁর বাড়ী, তাঁকে এখনো ত দেখ্তে পেলাম না।
তিনি না বল্লে থাকি কি ক’রে?” রমা সেইখানে দাঁড়াইয়াই প্রত্যুত্তর করিল,—“তিনিই বল্চেন থাক্তে।এ বাড়ী আমার।” রমেশ বিস্মিত হইয়া প্রশ্ন করিল,—“এ স্থানে বাড়ী কেন?” রমা বলিল, —“এ স্থানটা আমার খুব ভাল লাগে। প্রায়ই এসে থাকি। এখন লোক নেই বটে, কিন্তু, এমন সময় হয় যে, পা-বাড়াবার জায়গা থাকে না।” রমেশ কহিল, “বেশ ত, তেমন সময় নাই এলে?” রমা নীরবে একটু হাসিল। রমেশ পুনরায় জিজ্ঞাসা করিল, “তারকনাথ ঠাকুরের উপর, বোধ করি, তোমাদের খুব ভক্তি, না?
” রমা বলিল,—“তেমন ভক্তি আর কই? কিন্তু যতদিন বেঁচে আছি, চেষ্টা কর্তে হবে ত।” রমেশ আর কোন প্রশ্ন করিল না।রমা সেইখানেই চৌকাঠ ঘেঁসিয়া বসিয়া পড়িয়া, অন্য কথা পাড়িল, জিজ্ঞাসা করিল,—“রাত্রে আপনি কি খান?” রমেশ হাসিয়া কহিল, “যা’ জোটে তাই খাই। আমার খেতে বস্বার আগের মুহুর্ত্ত পর্য্যন্ত কখনো খাবার কথা মনে হয় না। তাই, বামুনঠাকুরের বিবেচনার উপরেই আমাকে সন্তুষ্ট থাক্তে হয়।” রমা কহিল,—“এত বৈরাগ্য কেন?” ইহা প্রচ্ছন্ন বিদ্রূপ কিংবা সরল পরিহাস মাত্র, তাহা রমেশ ঠিক বুঝিতে পারিল না।
সংক্ষেপে জবাব দিল,—“না। এ শুধু আলস্য।” “কিন্তু, পরের কাজে ত আপনার আলস্য দেখিনে?” রমেশ কহিল,—“তার কারণ আছে। পরের কাজে আলস্য কর্লে ভগবানের কাছে জবাবদিহিতে পড়্তে হয়।নিজের কাজেও হয় ত হয়, কিন্তু নিশ্চয়ই অত নয়।” রমা একটুখানি মৌন থাকিয়া কহিল,—“আপনার টাকা আছে, তাই আপনি পরের কাজে মন দিতে পারেন; কিন্তু যাদের নেই?” রমেশ বলিল,—“তাদের কথা জানিনে রমা! কেন না, টাকা থাকারও কোন পরিমাণ নেই, মন দেবারও কোন ধরাবাঁধা ওজন নেই।
টাকা থাকা না থাকার হিসেব তিনিই জানেন, যিনি ইহ-পরকালের ভার নিয়েচেন।” রমা ক্ষণকাল চুপ করিয়া থাকিয়া কহিল,—কিন্তু, পরকালের চিন্তা কর্বার বয়স ত আপনার হয় নি। আপনি আমার চেয়ে শুধু তিন বছরের বড়।” রমেশ হাসিয়া বলিল,—তার মানে, তোমার আরও হয় নি। ভগবান্ তাই করুন, তুমি দীর্ঘজীবী হ’য়ে থাক; কিন্তু, আমি নিজের সম্বন্ধে আজই যে আমার শেষ দিন নয়, এ কথা কখনও মনে করিনে।” তাহার কথার মধ্যে যেটুকু প্রচ্ছন্ন আঘাত ছিল, তাহা বোধ করি, বৃথা হয় নাই।
একটুখানি স্থির থাকিয়া রমা হঠাৎ জিজ্ঞাসা করিয়া উঠিল,—“আপনাকে সন্ধ্যে-আহ্নিক কর্তে ত দেখলুম না। মন্দিরের মধ্যে কি আছে না আছে, তা’ না হয় নাই দেখ্লেন, কিন্তু খেতে ব’সে গণ্ডূষ করাটাও কি ভুলে গেছেন?” রমেশ মনে মনে হাসিয়া বলিল,—“ভুলিনি বটে, কিন্তু ভুল্লেও কোন ক্ষতি বিবেচনা করিনে। কিন্তু, এ কথা কেন?” রমা বলিল,—“পরকালের ভাবনাটা আপনার খুব বেশী কি না, তাই জিজ্ঞেসা কর্চি।” রমেশ ইহার জবাব দিল না; তার পর কিছুক্ষণ পর্য্যন্ত দুই জনে চুপ করিয়া রহিল।
রমা আস্তে আস্তে বলিল,—“দেখুন, আমাকে দীর্ঘজীবী হ’তে বলা শুধু অভিশাপ দেওয়া। আমাদের হিন্দুর ঘরে বিধবার দীর্ঘজীবন কোন আত্মীয় কোন দিন কামনা করে না।” বলিয়া আবার একটুখানি চুপ করিয়া থাকিয়া কহিল,—“আমি মর্বার জন্যে যে পা বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছি, তা সত্যি নয় বটে, কিন্তু বেশীদিন বেঁচে থাক্বার কথা মনে হ’লেও আমাদের ভয় হয়।
কিন্তু আপনার সম্বন্ধেও ত সে কথা খাটে না! আপনাকে জোর ক’রে কোনও কথা বলা আমার পক্ষে প্রগল্ভতা; কিন্তু, সংসারে ঢুকে যখন পরের জন্যে মাথাব্যথা হওয়াটা নিজেরই নিতান্তই ছেলেমানুষি ব’লে মনে হবে, তখন আমারই এই কথাটি স্মরণ কর্বেন।” প্রত্যুত্তরে রমেশ শুধু একটা নিঃশ্বাস ফেলিল। খানিক পরে রমার মতই ধীরে ধীরে বলিল,—“কিন্তু তোমাকে স্মরণ ক’রে বল্চি, আজ আমার এ কথা কোন মতেই মনে হচ্চে না। আমি তোমার ত কেউ নই রমা, বরং তোমাদের পথের কাঁটা।
তবু প্রতিবেশী ব’লে আজ তোমার কাছে যে যত্ন পেলুম, সংসারে ঢুকে এ যত্ন যারা আপনার লোকের কাছে নিত্য পায়, আমার ত মনে হয়, পরের দুঃখ-কষ্ট দেখ্লে তারা পাগল হয়ে ছোটে। এইমাত্র আমি একা ব’সে চুপ ক’রে ভাব্ছিলুম, আমার সমস্ত জীবনটি যেন তুমি এই একটা বেলার মধ্যে আগাগোড়া বদ্লে দিয়েচ। এমন ক’রে আমাকে কেউ কখনো খেতে বলেনি, এত যত্ন কোরে আমাকে কেউ কোন দিন খাওয়ায়নি।
খাওয়ার মধ্যে যে এত আনন্দ আছে, আজ তোমার কাছ থেকে এই প্রথম জান্লাম রমা।” কথা শুনিয়া রমার সর্ব্বাঙ্গ কাঁটা দিয়া বারংবার শিহরিয়া উঠিল; কিন্তু সে তৎক্ষণাৎ স্থির হইয়া বলিল,—“এ ভুল্তে আপনার বেশী দিন লাগ্বে না। যদি বা একদিন মনেও পড়ে, অতি তুচ্ছ ব’লেই মনে পড়্বে।”
রমেশ কোন উত্তর করিল না। রমা কহিল,—“দেশে গিয়ে যে, নিন্দে করবেন না, এই আমার ভাগ্য।” রমেশ আবার একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া ধীরে ধীরে বলিল,—“না রমা, নিন্দেও কর্ব না, সুখ্যাতি করেও বেড়াব না। আজকের দিনটা আমার নিন্দা-সুখ্যাতির বাহিরে।” রমা কোন প্রত্যুত্তর না করিয়া, খানিকক্ষণ স্থির হইয়া বসিয়া থাকিয়া, নিজের ঘরে উঠিয়া চলিয়া গেল। সেখানে নির্জ্জন ঘরের মধ্যে তাহার দুই চক্ষু বাহিয়া বড় বড় অশ্রুর ফোঁটা টপ্-টপ্ করিয়া ঝরিয়া পড়িতে লাগিল।
দুইদিন অবিশ্রান্ত বৃষ্টিপাত হইয়া অপরাহ্ন-বেলায় একটু ধরণ হইয়াছে। চণ্ডীমণ্ডপে গোপাল সরকারের কাছে বসিয়া রমেশ জমীদারীর হিসাবপত্র দেখিতেছিল; অকস্মাৎ প্রায় কুড়িজন কৃষক আসিয়া কাঁদিয়া পড়িল—“ছোটবাবু, এ যাত্রা রক্ষে করুন, আপনি না বাঁচালে ছেলেপুলের হাত ধ’রে আমাদের পথে ভিক্ষে কর্তে হবে।” রমেশ অবাক্ হইয়া কহিল, “ব্যাপার কি?” চাষীরা কহিল,—“একশ-বিঘের মাঠ ডুবে গেল, জল বা’র ক’রে না দিলে সমস্ত ধান নষ্ট হয়ে যাবে বাবু, গাঁয়ে একটা ঘরও খেতে পাবে না!” কথাটা রমেশ বুঝিতে পারিল না।
গোপাল সরকার তাহাদের দুই একটা প্রশ্ন করিয়া, ব্যাপারটা রমেশকে বুঝাইয়া দিল। একশ-বিঘার মাঠটাই এ গ্রামের একমাত্র ভরসা। সমস্ত চাষীদেরই কিছু কিছু জমি তাহাতে আছে। ইহার পূর্ব্বধারে সরকারী প্রকাণ্ড বাঁধ, পশ্চিম ও উত্তর ধারে উচ্চ গ্রাম, শুধু দক্ষিণধারের বাঁধটা ঘোষাল ও মুখুয্যেদের। এই দিক্ দিয়া জল-নিকাশ করা যায় বটে, কিন্তু বাঁধের গায়ে একটা জলার মত আছে। বৎসরে দু’শ টাকার মাছ বিক্রী হয় বলিয়া জমিদার বেণীবাবু তাহা কড়া-পাহারায় আট্কাইয়া রাখিয়াছেন।
চাষীরা আজ সকাল হইতে তাঁহাদের কাছে হত্যা দিয়া পড়িয়া থাকিয়া, এইমাত্র কাঁদিতে কাঁদিতে উঠিয়া এখানে আসিয়াছে। রমেশ আর শুনিবার জন্য অপেক্ষা করিল না, দ্রুতপদে প্রস্থান করিল। এ বাড়ীতে আসিয়া যখন প্রবেশ করিল, তখন সন্ধ্যা হয় হয়। বেণী তাকিয়া ঠেস দিয়া তামাক খাইতেছেন এবং কাছে হালদার-মহাশয় বসিয়া আছেন; বোধ করি, এই কথাই হইতেছিল। রমেশ কিছুমাত্র ভূমিকা না করিয়াই কহিল,—“জলার বাঁধ আট্কে রাখ্লে ত আর চল্বে না, এখনি সেটা কাটিয়ে দিতে হবে।
” বেণী হুঁকাটা হালদারের হাতে দিয়া মুখ তুলিয়া বলিলেন, “কোন্ বাঁধটা?” রমেশ উত্তেজিত হইয়াই আসিয়াছিল, ক্রুদ্ধভাবে কহিল,—“জলার বাঁধ আর একটা আছে বড়দা? না কাটালে সমস্ত গাঁয়ের ধান হেজে যাবে। জল বা’র ক’রে দেবার হুকুম দিন।” বেণী কহিলেন,—“সেই সঙ্গে দু’তিনশ টাকার মাছ বেরিয়ে যাবে, সে খবরটা রেখেচ কি? এ টাকাটা দেবে কে?
চাষারা, না তুমি?” রমেশ রাগ সামলাইয়া বলিল—“চাষারা গরীব; তারা দিতে ত পার্বেই না, আর আমিই বা কেন দেব, সে ত বুঝ্তে পারিনে।” বেণী জবাব দিলেন,—“তা হ’লে আমরাই বা কেন এত লোকসান কর্তে যাব, সে ত আমিও বুঝ্তে পারিনে।” হালদারের দিকে চাহিয়া বলিলেন,—“খুড়ো, এম্নি ক’রে ভায়া আমার জমীদারী রাখবেন। ওহে রমেশ, হারামজাদারা সকাল থেকে এতক্ষণ এইখানে পড়েই মড়াকান্না কাঁদ্ছিল। আমি সব জানি। তোমার সদরে কি দরওয়ান নেই?
তার পায়ের নাগরা-জুতো নেই? যাও, ঘরে গিয়ে সেই ব্যবস্থা কর গে; জল আপনি নিকেশ হ’য়ে যাবে।” বলিয়া বেণী, হালদারের সহিত একযোগে হিঃ—হিঃ— করিয়া নিজের রসিকতায় নিজে হাসিতে লাগিলেন। রমেশের আর সহ্য হইতেছিল না, তথাপি সে প্রাণপণে নিজেকে সংবরণ করিয়া বিনীতভাবে বলিল,—“ভেবে দেখুন বড়দা, আমাদের তিন ঘরের দু’শ টাকার লোকসান বাঁচাতে গিয়ে গরীবদের সারা বছরের অন্ন মারা যাবে। যেমন ক’রে হোক্, পাঁচসাত হাজার টাকা তাদের ক্ষতি হবেই।
” বেণী হাতটা উল্টাইয়া বলিলেন,—“হ’ল হ’লই। তাদের পাঁচহাজারই যাক্, আর পঞ্চাশ হাজারই যাক্, আমার গোটা সদরটা কোপালেও ত দুটো পয়সা বা’র হবে না, ভায়া, যে ও শালাদের জন্যে দু’দশ’ টাকা উড়িয়ে দিতে হবে?” রমেশ শেষ চেষ্টা করিয়া বলিল, “এরা সারা বছর খাবে কি?” যেন ভারি হাসির কথা। বেণী একবার এপাশ, একবার ওপাশ হেলিয়া-দুলিয়া মাথা নাড়িয়া, হাসিয়া, থুথু ফেলিয়া, শেষে স্থির হইয়া কহিলেন—“খাবে কি?
দেখ্বে, ব্যাটারা যে যার জমি বন্ধক রেখে আমাদের কাছেই টাকা ধার কর্তে ছুটে আস্বে। ভায়া, মাথাটা একটু ঠাণ্ডা ক’রে চল, কর্ত্তারা এম্নি করেই বাড়িয়ে গুছিয়ে এই যে এক-আধ টুক্রা উচ্ছিষ্ট ফেলে’ রেখে গেছেন, এই আমাদের নেড়েচেড়ে গুছিয়ে গাছিয়ে খেয়েদেয়ে, আবার ছেলেদের জন্যে রেখে যেতে হবে। ওরা খাবে কি? ধারকর্জ্জ ক’রে খাবে। নইলে আর ব্যাটাদের ছোটলোক বলেছে কেন?” ঘৃণায়, লজ্জায়, ক্রোধে, ক্ষোভে রমেশের চোখ-মুখ উত্তপ্ত হইয়া উঠিল, কিন্তু, কন্ঠস্বর শান্ত রাখিয়াই বলিল,—“আপনি যখন কিছুই কর্বেন না ব’লে স্থির করেছেন, তখন এখানে দাঁড়িয়ে তর্ক ক’রে লাভ নেই।
আমি রমার কাছে চল্লুম, তার মত হ’লে আপনার একার অমতে কিছুই হবে না।” বেণীর মুখ গম্ভীর হইল; বলিলেন,—“বেশ, গিয়ে দেখ গে, তার আমার মত ভিন্ন নয়। সে সোজা মেয়ে নয় ভায়া,—তাকে ভোলানো সহজ নয়। আর তুমি, ত ছেলেমানুষ, তোমার বাপকেও সে চোখের জলে নাকের জলে ক’রে তবে ছেড়েছিল! কি বল খুড়ো?” খুড়ার মতামতের জন্য রমেশের কৌতূহল ছিল না; বেণীর এই অত্যন্ত অপমানকর প্রশ্নের উত্তর দিবারও তাহার প্রবৃত্তি হইল না; সে নিরুত্তরে বাহির হইয়া গেল।
প্রাঙ্গণে তুলসীমূলে সন্ধ্যার প্রদীপ দিয়া প্রণাম সাঙ্গ করিয়া রমা মুখ তুলিয়াই বিস্ময়ে অবাক্ হইয়া গেল। ঠিক সম্মুখে রমেশ দাঁড়াইয়া। তাহার মাথার আঁচল গলায় জড়ানো। ঠিক যেন সে এইমাত্র রমেশকেই নমস্কার করিয়া মুখ তুলিল। ক্রোধের উত্তেজনায় ও উৎকণ্ঠায় মাসীর সেই প্রথম দিনের নিষেধবাক্য রমেশের স্মরণ ছিল না; তাই সে সোজা ভিতরে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিল এবং রমাকে তদবস্থায় দেখিয়া নিঃশব্দে অপেক্ষা করিতেছিল; দুজনের মাসখানেক পরে দেখা।
রমেশ কহিল,—“তুমি নিশ্চয়ই সমস্ত শুনেচ। জল বা’র ক’রে দেবার জন্যে তোমার মত নিতে এসেচি।” রমার বিস্ময়ের ভাব কাটিয়া গেলে, সে মাথায় আঁচল তুলিয়া দিয়া কহিল,—“সে কেমন ক’রে হবে? তা’ ছাড়া বড়দার মত নেই।” “নেই জানি। তাঁর একলার অমতে কিছুই আসে যায় না।” রমা একটুখানি ভাবিয়া কহিল,—“জল বা’র ক’রে দেওয়া উচিত বটে; কিন্তু, মাছ আট্কে রাখার কি বন্দোবস্ত কর্বেন?” রমেশ কহিল,—“অত জলে কোন বন্দোবস্ত হওয়া সম্ভব নয়। এ বছর সে টাকাটা আমাদের ক্ষতি স্বীকার কর্তেই হবে। না হ’লে গ্রাম মারা যায়।” রমা চুপ করিয়া রহিল।
রমেশ কহিল,—“তা হ’লে অনুমতি দিলে?” রমা মৃদুকন্ঠে কহিল,—“না। অত টাকা আমি লোকসান কর্তে পার্ব না।” রমেশ বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হইয়া গেল। সে কিছুতেই এরূপ উত্তর আশা করে নাই। বরং, কেমন করিয়া তাহার যেন নিশ্চিত ধারণা জন্মাইয়াছিল, তাহার একান্ত অনুরোধ রমা কিছুতেই প্রত্যাখ্যান করিতে পারিবে না। রমা মুখ না তুলিয়াই, বোধ করি, রমেশের অবস্থাটা অনুভব করিল। কহিল,—“তা’ ছাড়া, বিষয় আমার ভাইয়ের, আমি অভিভাভক মাত্র।” রমেশ কহিল, “না, অর্দ্ধেক তোমার।”
রমা বলিল,—“শুধু নামে। বাবা নিশ্চয় জান্তেন, সমস্ত বিষয় যতীনই পাবে; তাই অর্দ্ধেক আমার নামে দিয়ে গেছেন।” তথাপি রমেশ মিনতির কন্ঠে কহিল,—“রমা, এ ক’টা টাকা? তোমাদের অবস্থা এদিকের সকলের চেয়ে ভাল। তোমার কাছে এ ক্ষতি ক্ষতিই নয়, আমি মিনতি জানাচ্চি, রমা, এর জন্যে এত লোকের অন্নকষ্ট ক’রে দিয়ো না। যথার্থ বল্চি, তুমি যে এত নিষ্ঠুর হ’তে পার, আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।”
রমা তেমনি মৃদুভাবেই জবাব দিল,—“নিজের ক্ষতি কর্তে পারিনে ব’লে যদি নিষ্ঠুর হই, না হয় তাই। ভাল, আপনার যদি এতই দয়া, নিজেরই না হয় ক্ষতিপূরণ ক’রে দিন না।” তাহার মৃদু কন্ঠস্বরে বিদ্রূপ কল্পনা করিয়া রমেশ জ্বলিয়া উঠিল। কহিল,—“রমা, মানুষ খাঁটি কি না, চেনা যায় শুধু টাকার সম্পর্কে। এই জায়গাটায় না কি ফাঁকি চলে না, তাই, এইখানেই মানুষের যথার্থ রূপ প্রকাশ পেয়ে উঠে। তোমারও আজ তাই পেলে, কিন্তু, তোমাকে আমি কখনো এমন ক’রে ভাবিনি।
চিরকাল ভেবেচি, তুমি এর চেয়ে অনেক—অনেক উঁচুতে; কিন্তু, তুমি তা’ নও। তোমাকে নিষ্ঠুর বলাও ভুল। তুমি অতি নীচ—অতি ছোটো।” অসহ্য বিস্ময়ে রমা দুই চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া কহিল,—“কি আমি?” রমেশ কহিল,—“তুমি অত্যন্ত হীন এবং নীচ। আমি যে কত ব্যাকুল হ’য়ে উঠেছি, সে তুমি টের পেয়েচ ব’লেই আমার কাছে ক্ষতিপূরণের দাবী কর্লে! কিন্তু, বড়দাও মুখ ফুটে এ কথা বল্তে পারেন নি; পুরুষমানুষ হ’য়ে তাঁর মুখে যা’ বেধেচে, স্ত্রীলোক হ’য়ে তোমার মুখে তা’ বাধেনি!
আমি এর চেয়েও অনেক বেশি ক্ষতিপূরণ কর্তে পারি, কিন্তু, একটা কথা আজ তোমাকে ব’লে যাই, রমা, সংসারে যত পাপ আছে, মানুষের দয়ার উপরে জুলুম করাটা, সব চেয়ে বেশি। আজ তুমি তাই ক’রে আমার কাছে টাকা আদায়ের চেষ্টা করেচ।” রমা বিহ্বল, হতবুদ্ধির ন্যায় ফ্যাল্-ফ্যাল্ করিয়া চাহিয়া রহিল-—একটা কথাও তাহার মুখ দিয়া বাহির হইল না।
রমেশ তেমনি শান্ত, তেমনি দৃঢ়কন্ঠে কহিল,—“আমার দুর্ব্বলতা কোথায়, সে তোমার অগোচর নেই বটে, কিন্তু, সেখানে পাক দিয়ে আর এক বিন্দু রস পাবে না, তা’ ব’লে দিয়ে যাচ্চি। আমি কি কর্ব, তাও এইসঙ্গে জানিয়ে দিয়ে যাই। এখনি জোর ক’রে বাঁধ কাটিয়ে দেব—তোমরা পার আট্কাবার চেষ্টা কর গে।” বলিয়া রমেশ চলিয়া যায় দেখিয়া রমা ফিরিয়া ডাকিল। আহ্বান শুনিয়া রমেশ নিকটে আসিয়া দাঁড়াইতে রমা কহিল,—“আমার বাড়ীতে দাঁড়িয়ে আমাকে এত অপমান কর্লেন, আমি তাঁর একটারও জবাব দিতে চাইনে, কিন্তু, এ কাজ আপনি কিছুতেই কর্বার চেষ্টা কর্বেন না।” রমেশ প্রশ্ন করিল,—“কেন?
” রমা কহিল,—“কারণ, এত অপমানের পরেও আমার আপনার সঙ্গে বিবাদ কর্তে ইচ্ছা করে না।” তাহার মুখ যে কিরূপ অস্বাভাবিক পাণ্ডুর হইয়া গিয়াছিল এবং কথা কহিতে ঠোঁট কাঁপিয়া গেল, তাহা সন্ধ্যার অন্ধকারেও রমেশ লক্ষ্য করিতে পারিল। কিন্তু, মনস্তত্ত্ব আলোচনার অবকাশ এবং প্রবৃত্তি তাহার ছিল না;—তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল,—“কলহ-বিবাদের অভিরুচি আমারও নেই বটে, কিন্তু, তোমার সম্ভাবের মূল্যও আর আমার কাছে কিছুমাত্র নেই।
যাই হোক্, বাগ্বিতণ্ডার আবশ্যক নেই, আমি চল্লুম।” মাসী উপরে ঠাকুরঘরে আবদ্ধ থাকায় এ সকলের কিছুই জানতে পারেন নাই। নীচে আসিয়া দেখিলেন, রমা দাসীকে সঙ্গে লইয়া বাহির হইতেছে। আশ্চর্য্য হইয়া প্রশ্ন করিলেন,—“এই জল-কাদায় সন্ধ্যার পর কোথায় যাস্ রমা?” “একবার বড়দা’র ওখানে যাব মাসি!” দাসী কহিল,—“পথে আর এতটুকু কাদা পাবার যো নেই দিদিমা! ছোটবাবু এম্নি রাস্তা বাঁধিয়ে দিয়েচেন যে, সিঁদূর পড়্লে কুড়িয়ে নেওয়া যায়। ভগবান্ তাঁকে বাঁচিয়ে রাখুন, গরীব দুঃখী সাপের হাত থেকে রেহাই পেয়ে বেঁচেচে।”
Read more
