পল্লী সমাজ পর্ব:৯ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

পল্লী সমাজ পর্ব:৯

রমা আশ্চর্য্য হইয়া কহিল, “আমি?” রমেশ বলিল, “তুমি ছাড়া এ শক্তি আর কারু ছিল না। রমা, আজ তোমাকে একটা সত্যকথা বল্‌ব! ইচ্ছে হয় বিশ্বাস কোরো, না হয় কোরো না। কিন্তু, জিনিসটা যদি না একেবারে ম’রে নিঃশেষ হয়ে যেত, হয় ত কোনদিনই এ কথা তোমাকে শোনাতে পার্‌তাম না!” বলিয়া একটুখানি চুপ করিয়া, পুনরায় কহিল,—“আজ না কি আর কোনপক্ষেরই লেশমাত্র ক্ষতিবৃদ্ধির সম্ভাবনা নাই, তাই আজ জানাচ্চি, তোমাকে অদেয় আমার সেদিন পর্য্যন্ত কিছুই ছিল না। কিন্তু কেন জান?

” রমা মাথা নাড়িয়া জানাইল,—‘না।’ কিন্তু, সমস্ত অন্তঃকরণটা তাহার কেমন একটা লজ্জাকর আশঙ্কায় কণ্টকিত হইয়া উঠিল। রমেশ কহিল,—“কিন্তু, শুনে রাগ কোরো না, কিছুমাত্র লজ্জাও পেয়ো না।মনে কোরো, এ কোন্‌ পুরাকালের একটা গল্প শুন্‌চ মাত্র।” রমা মনে মনে প্রাণপণে বাধা দিবার ইচ্ছা করিল, কিন্তু মাথা তাহার এমনি ঝুঁকিয়া পড়িল যে, কিছুতেই সোজা করিয়া তুলিতে পারিল না।

রমেশ তেমনি শান্ত, মৃদু ও নির্লিপ্তকণ্ঠে বলিয়া উঠিল,—“তোমাকে ভালবাস্‌তাম রমা! আজ আমার মনে হয়, তেমন ভালবাসা বোধ করি, কেউ কখনো বাসেনি; ছেলেবেলায় মা’র মুখে শুন্‌তাম, আমাদের বিয়ে হ’বে। তার পরে, যে দিন সমস্ত আশা ভেঙ্গে গেল, সে দিন আমি কেঁদে ফেলেছিলাম, আজও আমার তা’ মনে পড়ে।” কথাগুলা জ্বলন্ত সীসার মত রমার দুই কানের মধ্যে প্রবেশ করিয়া দগ্ধ করিয়া ফেলিতে লাগিল; এবং একান্ত অপরিচিত অনুভূতির অসহ্য, তীব্র বেদনায় তাহার বুকের একপ্রান্ত হইতে অপরপ্রান্ত পর্য্যন্ত কাটিয়া কুচি-কুচি করিয়া দিতে লাগিল।

কিন্তু, নিষেধ করিবার কোন উপায় খুঁজিয়া না পাইয়া নিতান্ত নিরুপায় পাথরের মূর্ত্তির মত স্তব্ধ হইয়া বসিয়া, রমা রমেশের বিষাক্ত-মধুর কথাগুলো একটির পর একটি ক্রমান্বয়ে শুনিয়া যাইতে লাগিল। রমেশ কহিতে লাগিল,—“তুমি ভাব্‌চ, তোমাকে এ সব কাহিনী শোনানো অন্যায়! আমার মনেও সেই সন্দেহ ছিল ব’লেই সে দিন তারকেশ্বরে যখন একটি দিনের যত্নে আমার সমস্ত জীবনের ধারা বদ্‌লে দিয়ে গেলে, তখনও চুপ ক’রে ছিলাম।

কিন্তু, সে চুপ ক’রে থাকাটা আমার পক্ষে সহজ ছিল না।” রমা কিছুতেই আর সহ্য করিতে পারিল না। কহিল,—“তবে,—আজকেই বা বাড়ীতে পেয়ে আমাকে অপমান কর্‌চেন কেন?” রমেশ কহিল,—“অপমান! কিছু না।এর মধ্যে মান-অপমানের কোন কথাই নেই। এ যাদের কথা হ’চ্চে, সে রমাও কোন দিন তুমি ছিলে না, সে রমেশও আমি আর নেই। যাই হোক, শোন! সেদিন আমার, কেন জানিনে, অসংশয়ে বিশ্বাস হয়েছিল তুমি যা’ ইচ্ছে বল, যা’ খুসি কর, কিন্তু, আমার অমঙ্গল তুমি কিছুতেই সইতে পার্‌বে না।

বোধ করি ভেবেছিলাম, সেই যে ছেলেবেলায় একদিন আমাকে ভালবাস্‌তে আজও তা’ একেবারে ভুল্‌তে পারনি। তাই ভেবেছিলাম, কোন কথা তোমাকে না জানিয়ে, তোমার ছাওয়ায় বসে আমার সমস্ত জীবনের কাজগুলো ধীরে ধীরে ক’রে যাব। তার পরে সে রাত্রে আক্‌বরের নিজের মুখে যখন শুনতে পেলাম, তুমি নিজে—ও কি? বাইরে এত গোলমাল কিসের?” “বাবু—” গোপাল সরকারের ত্রস্ত-ব্যাকুল কন্ঠস্বরে রমেশ ঘরের বাহিরে আসিতেই সে কহিল,—“বাবু, পুলিশের লোক ভজুয়াকে গ্রেপ্তার করেচে।” “কেন?”

গোপালের ভয়ে ঠোঁট কাঁপিতেছিল; সে কোনমতে কহিল,—“পরশু রাত্তিরে রাধানগরের ডাকাতিতে সে নাকি ছিল।” রমেশ ঘরের দিকে চাহিয়া কহিল,—“আর এক মুহূর্ত্ত থেকো না রমা, খিড়কি দিয়ে বেরিয়ে যাও। পুলিশ খানাতল্লাসি কর্‌তে ছাড়্‌বে না।” রমা নীলবর্ণ মুখে উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল,—“তোমার কোন ভয় নেই ত?” রমেশ কহিল,—“বলতে পারিনে। কত দূর কি দাঁড়িয়েচে, সে ত এখনো জানিনে।

” একবার রমার ওষ্ঠাধর কাঁপিয়া উঠিল, একবার তাহার মনে পড়িল, পুলিশে সে দিন তাহার নিজের অভিযোগ করা, তার পরই সে হঠাৎ কাঁদিয়া ফেলিয়া বলিল,—“আমি যাব না।” রমেশ বিস্ময়ে মুহূর্ত্তকাল অবাক্‌ থাকিয়া বলিল,—“ছি—এখানে থাক্‌তেই নেই রমা-শীগ্‌গীর বেরিয়ে যাও।”—বলিয়া আর কোন কথা না শুনিয়া, যতীনের হাত ধরিয়া, জোর করিয়া টানিয়া, এই দুটি ভাইবোন্‌কে খিড়কির পথে বাহির করিয়া দিয়া দ্বার রুদ্ধ করিয়া দিল।

আজ দুই মাস হইতে চলিল, কয়েকজন ডাকাতির আসামীর সঙ্গে ভজুয়া হাজতে। সেদিন খানাতল্লাসিতে রমেশের বাড়ীতে সন্দেহজনক কিছুই পাওয়া যায় নাই, এবং ভৈরব আচার্য্য সাক্ষ্য দিয়াছিল, সে রাত্রে ভজুয়া তাঁহার সঙ্গে তাঁহার মেয়ের পাত্র দেখিতে গিয়াছিল। তথাপি তাহাকে জামিনে খালাস দেওয়া হয় নাই। বেণী আসিয়া কহিল,—“রমা, অনেক চা’ল ভেবে তবে কাজ কর্‌তে হয় দিদি, নইলে কি শত্রুকে সহজে জব্দ করা যায়!

সে দিন মনিবের হুকুমে যে ভজুয়া লাঠি হাতে ক’রে বাড়ী চড়াও হয়ে, মাছ আদায় কর্‌তে এসেছিল, সে কথা যদি না তুমি থানায় লিখিয়ে রাখ্‌তে, আজ কি তা হ’লে ঐ ব্যাটাকে এমন কায়দায় পাওয়া যেত! অমনি ঐ সঙ্গে রমেশের নামটাও যদি আরও দু’কথা বাড়িয়ে গুছিয়ে লিখিয়ে দিতিস্‌ বোন! আমার কথাটায় তখন তোরা ত কেউ কাণ দিলিনে!” রমা এম্‌নি ম্লান হইয়া উঠিল যে, বেণী দেখিতে পাইয়া কহিল,—“না না, তোমাকে সাক্ষী দিতে যেতে হবে না।

আর তাই যদি হয়, তাতেই বা কি! জমিদারী কর্‌তে গেলে কিছুতেই হট‌্‌লে ত চলে না।” রমা কোন কথা কহিল না। বেণী কহিতে লাগিল,—“কিন্তু, তাকে ত অত সহজে ধরা চলে না! তবে সেও এবার কম চা’ল চাল্‌চে না দিদি! এই যে নূতন একটা ইস্কুল করেচে, এ নিয়ে আমাদের অনেক কষ্ট পেতে হবে। এম্‌নিই তো মোচলমান প্রজারা জমিদার ব’লে মান্‌তে চায় না, তার ওপর যদি লেখাপড়া শেখে, তা হ’লে জমিদারী থাকা না থাকা সমান হবে, তা’ এখন থেকে ব’লে রাখ্‌চি।

” জমিদারীর ভাল-মন্দ সম্বন্ধে রমা বরাবর বেণীর পরামর্শ মতই চলে; ইহাতে দুজনের কোন মতভেদ পর্য্যন্ত হয় না। আজ প্রথম রমা তর্ক করিল। কহিল,—“রমেশদা’র নিজের ক্ষতিও ত এতে কম নয়?” বেণীর নিজেরও এ সম্বন্ধে খট্‌কা অল্প ছিল না। সে ভাবিয়া চিন্তিয়া যাহা স্থির করিয়াছিল, তাহাই কহিল,—“কি জান রমা, এতে নিজের ক্ষতি ভাব্‌বার বিষয়ই নয়—আমরা দুজনে জব্দ হলেই ও খুসি।

দেখ্‌চ না, এসে পর্য্যন্ত কি রকম টাকা ছড়াচ্ছে? চারিদিকে ছোটলোকদের মধ্যে ‘ছোটবাবু’ ‘ছোটবাবু’ একটা রব উঠে গেছে। যেন ওই একটা মানুষ, আর আমরা দুঘর কিছু নয়। কিন্তু, বেশিদিন এ চল্‌বে না। এই যে পুলিশের নজরে তাকে খাড়া ক’রে দিয়েচ বোন্‌, এতেই তাকে শেষ পর্য্যন্ত শেষ হ’তে হবে; তা’ বলে দিচ্চি।” বলিয়া বেণী মনে মনে একটু আশ্চর্য্য হইয়াই লক্ষ্য করিল, সংবাদটা শোনাইয়া তাহার কাছে যেরূপ উৎসাহ ও উত্তেজনা আশা করা গিয়াছিল, তাহার কিছুই পাওয়া গেল না।

বরঞ্চ মনে হইল, সে হঠাৎ যেন একেবারে বিবর্ণ হইয়া গিয়া প্রশ্ন করিল,—“আমি লিখিয়ে দিয়েছিলাম, রমেশদা’ জান্‌তে পেরেছেন?” বেণী কহিল,—“ঠিক জানিনে। কিন্তু, জান্‌তে পার্‌বেই। ভজুয়ার মকদ্দমায় সব কথাই উঠবে।” রমা আর কোন কথা কহিল না। চুপ করিয়া ভিতরে-ভিতরে সে যেন একটা বড় আঘাত সামলাইতে লাগিল—তাহার কেবলই মনে উঠিতে লাগিল, রমেশকে বিপদে ফেলিতে সেই যে সকলের অগ্রণী, এই সংবাদটা আর রমেশের অগোচর রহিবে না। খানিক পরে মুখ তুলিয়া জিজ্ঞাসা করিল,—“আজকাল ওঁর নাম বুঝি সকলের মুখেই বড়দা?

” বেণী কহিল,—“শুধু আমাদের গ্রামেই নয়, শুনচি, ওর দেখাদেখি আরও পাঁচছ’টা গ্রামে স্কুল কর্‌বার, রাস্তা তৈরি কর্‌বার আয়োজন হচ্চে। আজকাল ছোটলোকেরা সবাই বলাবলি কর্‌চে, সাহেবদের দেশে গ্রামে গ্রামে একটা দুটো ইস্কুল আছে বলেই ওদের এত উন্নতি। রমেশ প্রচার ক’রে দিয়েচে, যেখানেই নূতন ইস্কুল হবে, সেইখানেই ও দু’শ ক’রে টাকা দেবে।” ওর দাদামশায়ের যত টাকা পেয়েচে, সমস্তই ও এইতে ব্যয় কর্‌বে। মোচলমানেরা ত ওকে একটা পীর পয়গম্বর ব’লে ঠিক ক’রে ব’সে আছে।

” রমার নিজের বুকের ভিতরের এই কথাটা একবার বিদ্যুতের মত আলো করিয়া, খেলিয়া গেল, যদি তাহার নিজের নামটাও এই সঙ্গে যুক্ত হইয়া থাকিতে পারিত! কিন্তু, মুহূর্ত্তের জন্য। পরক্ষণেই দ্বিগুণ আঁধারে তাহার সমস্ত অন্তরটা আচ্ছন্ন হইয়া গেল। বেণী কহিতে লাগিল,“কিন্তু, আমিও অল্পে ছাড়্‌ব না। সে যে আমাদের সমস্ত প্রজা এম্‌নি ক’রে বিগ্‌ড়ে তুল্‌বে, আর জমিদার হয়ে আমরা চোখ মেলে, মুখ বুজে দেখ্‌ব, সে যেন কেউ স্বপ্নেও না ভাবে।

এই ব্যাটা ভৈরব আচার্য্য এবার ভজুয়ার হ’য়ে সাক্ষী দিয়ে কি ক’রে তার মেয়ের বিয়ে দেয়, সে আমি একবার ভাল ক’রে দেখ্‌ব! আরও একটা ফন্দি আছে—দেখি গোবিন্দখুড়ো কি বলে! তার পর দেশে ডাকাতি লেগেই আছে। এবার চাকরকে যদি জেলে পূরতে পারি, ত তার মনিবকে পূরতেও আমাদের বেশি বেগ পেতে হবে না।

সেই যে প্রথম দিনটিতেই তুমি বলেছিলে রমা, শত্রুতা কর্‌তে ইনিও কম কর্‌বেন না, সে যে এমন সত্যি হয়ে দাঁড়াবে তা’ আমিও মনে করিনি।” রমা কোন কথাই কহিল না। নিজের প্রতিজ্ঞা ও ভবিষ্যদ্বাণী এমন বর্ণে-বর্ণে সত্য হওয়ার বার্ত্তা পাইয়াও যে নারীর মুখ অহঙ্কারে উজ্জ্বল হইয়া উঠে না, বরঞ্চ নিবিড় কালিমায় আচ্ছন্ন হইয়া যায়, সে যে তাহার কি অবস্থা, সে কথা বুঝিবার শক্তি বেণীর নাই। তা’ না থাকুক, কিন্তু, জিনিসটা এতই স্পষ্ট যে, কাহারই দৃষ্টি এড়াইবার সম্ভাবনা ছিল না—তাহারও এড়াইল না।

মনে মনে একটু বিস্ময়াপন্ন হইয়াই বেণী রান্নাঘরে যাইয়া মাসীর সহিত দুই একটা কথা কহিয়া বাড়ী ফিরিতেছিল, রমা হাত নাড়িয়া তাহাকে কাছে ডাকিয়া মৃদুস্বরে কহিল,—“আচ্ছা বড়দা’, রমেশদা’ যদি জেলেই যান, সে কি আমাদের নিজেদের ভারি কলঙ্কের কথা নয়? ” বেণী অধিকতর আশ্চর্য্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিল,—“কেন?” রমা কহিল,—“আমাদের আত্মীয়, আমরা যদি না বাঁচাই, সমস্ত লোক আমাদেরই ত ছি ছি ক’র্‌বে!

” বেণী জবাব দিল,—“যে যেমন কাজ কর্‌বে, সে তার ফল ভুগ্‌বে, আমাদের কি?” রমা তেম্‌নি মৃদুকন্ঠে কহিল,—“কিন্তু, রমেশদা’ সত্যিই ত আর চুরি-ডাকাতি ক’রে বেড়ান না। বরং, পরের ভালর জন্যই নিজের সর্ব্বস্ব দিচ্চেন, সে কথা ত কারো কাছে চাপা থাক্‌বে না। তার পর আমাদের নিজেদেরও ত গাঁয়ের মধ্যে মুখ বার করতে হবে!” বেণী হি-হি করিয়া খুব খানিকটা হাসিয়া লইয়া কহিল,—“তোর হ’ল কি, বল্‌ত বোন্‌?

” রমা এই লোকটার মুখের সঙ্গে রমেশের মুখখানা মনে মনে একবার দেখিয়া লইয়া আর যেন সোজা করিয়া মাথা তুলিতেই পারিল না। কহিল,—“গাঁয়ের লোক ভয়ে মুখের সাম্‌নে কিছু না বলুক, আড়ালে বল্‌বেই; তুমি বল্‌বে, আড়ালে রাজার মাকেও ডা’ন বলে, কিন্তু, ভগবান্‌ ত আছেন! নিরপরাধীকে মিছে করে শাস্তি দেওয়ালে তিনি ত রেহাই দেবেন না।

” বেণী কৃত্রিম ক্ষোভ প্রকাশ করিয়া কহিল,—“হা রে আমার কপাল! সে ছোঁড়া বুঝি ঠাকুরদেবতা কিছু মানে! শীতলাঠাকুরের ঘরটা প’ড়ে যাচ্চে—মেরামত কর্‌বার জন্যে তার কাছে লোক পাঠাতে সে হাঁকিয়ে দিয়ে বলেছিল,—‘যারা তোমাদের পাঠিয়েছে, তাদের বল গে বাজে খরচ কর্‌বার টাকা আমার নেই। শোন কথা! এটা তার কাছে বাজে খরচ?

আর কাজের খরচ হচ্চে, মোচলমানদের ইস্কুল ক’রে দেওয়া। তা’ ছাড়া বামুনের ছেলে,—সন্ধ্যে-আহ্নিক কিছুই করে না! শুনি, মোচলমানের হাতে জল পর্য্যন্ত খায়। দু’পাতা ইংরিজী প’ড়ে আর কি তার জাতজন্ম আছে দিদি, কিছুই নেই। শাস্তি তার গেছে কোথা, সমস্তই তোলা আছে; সে একদিন সবাই দেখ্‌তে পাবে।” রমা আর বাদানুবাদ না করিয়া মৌন হইয়া রহিল বটে, কিন্তু, রমেশের অনাচার এবং ঠাকুরদেবতার প্রতি অশ্রদ্ধার কথা স্মরণ করিয়া, মনটা তাহার আবার তাহার প্রতি বিমুখ হইয়া উঠিল।

বেণী নিজের মনে কথা কহিতে কহিতে চলিয়া গেল। রমা অনেকক্ষণ পর্য্যন্ত একভাবে দাঁড়াইয়া থাকিয়া নিজের ঘরে গিয়া, মেঝের উপর ধপ্‌ করিয়া বসিয়া পড়িল। সে দিন তাহার একাদশী। খাবার হাঙ্গামা নাই মনে করিয়া আজ সে যেন স্বস্তিবোধ করিল।বর্ষা শেষ হইয়া আগামী পূজার আনন্দ এবং ম্যালেরিয়াভীতি বাঙ্‌লার পল্লী-জননীর আকাশে, বাতাসে এবং আলোকে উঁকি-ঝুঁকি মারিতে লাগিল। রমেশও জ্বরে পড়িল।

গত বৎসর এই রাক্ষসীর আক্রমণকে সে উপেক্ষা করিয়াছিল; কিন্তু, এ বৎসর আর পারিল না। তিন দিন জ্বরভোগের পর আজ সকালে উঠিয়া, খুব খানিকটা কুইনিন্‌ গিলিয়া লইয়া জানালার বাহিরে পীতাভ-রৌদ্রের পানে চাহিয়া ভাবিতেছিল, গ্রামের এই সমস্ত অনাবশ্যক ডোবা ও জঙ্গলের বিরুদ্ধে গ্রামবাসীকে সচেতন করা সম্ভব কি না। এই তিনদিন মাত্র জ্বরভোগ করিয়াই সে স্পষ্ট বুঝিয়াছিল, যা হৌক, কিছু একটা করিতেই হইবে।

মানুষ হইয়া সে যদি নিশ্চেষ্টভাবে থাকিয়া প্রতি বৎসর, মাসের পর মাস, মানুষকে এই রোগভোগ করিতে দেয়, ভগবান্‌ তাহাকে ক্ষমা করিবেন না। কয়েকদিন পূর্ব্বে এই প্রসঙ্গ আলোচনা করিয়া সে এইটুকু বুঝিয়াছিল, ইহার ভীষণ অপকারিতা সম্বন্ধে গ্রামের লোকেরা যে একেবারেই অজ্ঞ, তাহা নহে; কিন্তু, পরের ডোবা বুজাইয়া এবং পরের জমির জঙ্গল কাটিয়া, কেহই ঘরের খাইয়া বনের মহিষ তাড়াইয়া বেড়াইতে রাজী নহে।

যাহার নিজের ডোবা ও জঙ্গল আছে, সে এই বলিয়া তর্ক করে যে, এ সকল তাহার নিজের কৃত নহে—বাপ পিতামহের দিন হইতেই আছে। সুতরাং যাহাদের গরজ, তাহারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করিয়া লইতে পারে, তাহাতে আপত্তি নাই; কিন্তু, নিজে সে এজন্য পয়সা এবং উদ্যম ব্যয় করিতে অপারগ।

রমেশ সন্ধান লইয়া জানিয়াছিল, এমন অনেক গ্রাম পাশাপাশি আছে, যেখানে একটা গ্রাম ম্যালেরিয়ায় উজাড় হইতেছে, অথচ, আর একটায় ইহার প্রকোপ নাই বলিলেই হয়। ভাবিতেছিল, একটুকু সুস্থ হইলেই, এইরূপ একটা গ্রাম সে নিজের চোখে গিয়া পরীক্ষা করিয়া আসিবে এবং তাহার পরে নিজের কর্ত্তব্য স্থির করিবে। কারণ, তাহার নিশ্চিত ধারণা জন্মিয়াছিল, এই ম্যালেরিয়াহীন গ্রামগুলির জল-নিকাশের স্বাভাবিক সুবিধা কিছু আছেই যাহা এম্‌নি কাহারও দৃষ্টি আকর্ষণ না করিলেও, চেষ্টা করিয়া, চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিলে, লোক দেখিতে পাইবে।

অন্ততঃ, তাহার নিতান্ত অনুরক্ত পীরগ্রামের মুসলমান প্রজারা চক্ষু মেলিবেই। তাহার ইন্‌জিনিয়ারিং শিক্ষা এতদিন পরে এমন একটা মহৎ কাজে লাগাইবার সুযোগ উপস্থিত হইয়াছে মনে করিয়া সে মনে মনে প্রফুল্ল হইয়া উঠিল।“ছোটবাবু?” অকস্মাৎ কান্নার সুরে আহ্বান শুনিয়া রমেশ মহাবিস্ময়ে মুখ ফিরাইয়া দেখিল, ভৈরব আচার্য্য ঘরের মেঝের উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া স্ত্রীলোকের ন্যায় ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিতেছে। তাহার ৭।৮ বৎসরের একটি কন্যা সঙ্গে আসিয়াছিল; বাপের সঙ্গে যোগ দিয়া তাহার চীৎকারে ঘর ভরিয়া উঠিল।

দেখিতে দেখিতে বাড়ীর লোক, যে যেখানে ছিল, দোর-গোড়ায় আসিয়া ভিড় করিয়া দাঁড়াইল। রমেশ কেমন যেন একরকম হতবুদ্ধি হইয়া গেল। এই লোকটার কে মরিল, কি সর্ব্বনাশ হইল, কাহাকে জিজ্ঞাসা করিবে, কেমন করিয়া কান্না থামাইবে, কিছু যেন ঠাহর পাইল না। গোপাল সরকার কাজ ফেলিয়া ছুটিয়া আসিয়াছিল।

সে কাছে আসিয়া ভৈরবের একটা হাত ধরিয়া টানিতেই ভৈরব উঠিয়া বসিয়া দুই বাহু দিয়া গোপালের গলা জড়াইয়া ধরিয়া, ভয়ানক আর্ত্তনাদ করিয়া উঠিল। এই লোকটা অতি-অল্পতেই মেয়েদের মত কাঁদিয়া ফেলে, স্মরণ করিয়া রমেশ ক্রমশঃ যখন অধীর হইয়া উঠিতেছিল, এমন সময় গোপালের বহুবিধ সান্ত্বনা-বাক্যে ভৈরব অবশেষে চোখ মুছিয়া, কতকটা প্রকৃতিস্থ হইয়া বসিল এবং এই মহাশোকের হেতু বিবৃত করিতে প্রস্তুত হইল।

বিবরণ শুনিয়া, রমেশ স্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিল। এত বড় অত্যাচার কোথাও কোনকালে সংঘটিত হইয়াছে বলিয়া সে কল্পনা করিতেও পারিল না। ব্যাপারটা এই। ভৈরবের সাক্ষ্যে ভজুয়া নিষ্কৃতি পাইলে তাহাকে পুলিশের সন্দেহ-দৃষ্টির বহির্ভূত করিতে রমেশ তাহাকে তাহার দেশে পাঠাইয়া দিয়াছিল। আসামী পরিত্রাণ পাইল বটে, কিন্তু সাক্ষী ফাঁদে পড়িল।

কেমন করিয়া যেন বাতাসে নিজের বিপদের বার্ত্তা পাইয়া ভৈরব কা’ল সদরে গিয়া সন্ধান লইয়া অবগত হইয়াছে যে, দিন পাঁচ-ছয় পূর্ব্বে বেণীর খুড়শ্বশুর রাধানগরের সনাৎ মুখুয্যে ভৈরবের নামে সুদে-আসলে এগারশ’ ছাব্বিশ টাকা সাত আনার ডিক্রি করিয়াছে এবং দুই একদিনের মধ্যেই তাহার বাস্তুভিটা ক্রোক করিয়া নিলাম ডাকিয়া লইবে। ইহা একতরফা ডিক্রি নহে।

যথারীতি শমন বাহির হইয়াছে; কে তাহা ভৈরবের নাম দস্তখত করিয়া গ্রহণ করিয়াছে এবং ধার্য্যদিনে আদালতে হাজির হইয়া নিজেকে ভৈরব বলিয়া স্বীকার করিয়া, কবুলজবাব দিয়া আসিয়াছে। ইহার ঋণ মিথ্যা, আসামী মিথ্যা, ফরিয়াদী মিথ্যা। এই সর্ব্বব্যাপী মিথ্যার আশ্রয়ে সবল দুর্ব্বলের যথাসর্ব্বস্ব আত্মসাৎ করিয়া, তাহাকে পথের ভিখারী করিয়া, বাহির করিয়া দিবার উদ্যোগ করিয়াছে; অথচ, সরকারের আদালতে এই অত্যাচারের প্রতিকারের উপায় সহজ নহে।

আইনমত সমস্ত মিথ্যাঋণ বিচারালয়ে গচ্ছিত না করিয়া কথাটি কহিবার জো নাই। মাথা খুঁড়িয়া মরিলেও কেহ তাহাতে কর্ণপাত করিবে না। কিন্তু এত টাকা দরিদ্র ভৈরব কোথায় পাইবে যে, তাহা জমা দিয়া, এই মহা-অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করিয়া আত্মরক্ষা করিবে। সুতরাং রাজার আইন, আদালত, জজ, ম্যাজিষ্ট্রেট্‌ সমস্ত মাথার উপর থাকিতেও দরিদ্র প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিঃশব্দে মরিতে হইবে।

অথচ, সমস্তই যে বেণী ও গোবিন্দ গাঙুলীর কাজ, তাহাতে কাহারও সন্দেহমাত্র নাই; এবং এই অত্যাচারের যত বড় দুর্গতিই ভৈরবের অদৃষ্টে ঘটুক, গ্রামের সকলেই চুপি চুপি জল্পনা করিয়া ফিরিবে, কিন্তু, একটি লোকও মাথা উঁচু করিয়া প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করিবে না, কারণ তাহারা কাহারো সাতেও থাকে না, পাঁচেও থাকে না; এবং পরের কথায় কথা কহা তাহারা ভালই বাসে না।

সে যাই হউক, রমেশ কিন্তু আজ নিঃসংশয়ে বুঝিল, পল্লীবাসী দরিদ্র প্রজার উপর অসঙ্কোচে অত্যাচার করিবার সাহস ইহারা কোথায় পায়। এবং কেমন করিয়া দেশের আইনকেই ইহারা কসাইয়ের ছুরির মত ব্যবহার করিতে পারে। সুতরাং অর্থবল এবং কূটবুদ্ধি একদিকে যেমন তাহাদিগকে রাজার শাসন হইতে অব্যাহতি দেয়, মৃতসমাজও তেম্‌নি অন্যদিকে তাহাদের দুষ্কৃতির কোন দণ্ডবিধান করে না।

তাই, ইহারা সহস্র অন্যায় করিয়াও, সত্যধর্ম্মবিহীন মৃত পল্লী-সমাজের মাথায় পা দিয়া এমন নিরুপদ্রবে এবং যথেচ্ছাচারে বাস করে। আজ, তাহার জ্যাঠাইমার কথাগুলো বারংবার মনে পড়িতে লাগিল।সে দিন সেই যে তিনি মর্ম্মান্তিক হাসি হাসিয়া বলিয়াছিলেন, “রমেশ, চুলোয় যাক্‌ গে তোদের জাত-বিচারের, ভাল-মন্দর ঝগড়াঝাঁটি; বাবা, শুধু আলো জ্বেলে দে রে, শুধু আলো জ্বেলে দে।

গ্রামে গ্রামে লোক অন্ধকারে কাণা হয়ে গেল; একবার কেবল তাদের চোখ মেলে দেখ্‌বার উপায়টা ক’রে দে, বাবা! তখন আপনি দেখ্‌তে পাবে তারা, কোন্‌টা কালো, কোন্‌টা ধলো।” তিনি আরও বলিয়াছিলেন,—“যদি ফিরেই এসেছিস্‌ বাবা, তবে চ’লে আর যাসনে। তোরা মুখ ফিরিয়ে থাকিস্‌ বলেই তোদের পল্লী-জননীর এই দুর্দ্দশা!” সত্যই ত! সে চলিয়া গেলে ত ইহার প্রতিকারের লেশমাত্র উপায় থাকিত না!

রমেশ নিশ্বাস ফেলিয়া মনে মনে কহিল,—“হায় রে! এই আমাদের গর্ব্বের ধন—বাঙালার শুদ্ধ, শান্ত, ন্যায়নিষ্ঠ পল্লী-সমাজ!” একদিন হয় ত, যখন ইহার প্রাণ ছিল, তখন দুষ্টের শাসন করিয়া, আশ্রিত নর-নারীকে সংসারযাত্রার পথে নির্ব্বিঘ্নে বহন করিয়া লইয়া যাইবারও ইহার শক্তি ছিল। কিন্তু আজ ইহা মৃত; তথাপি অন্ধ পল্লীবাসীরা এই গুরুভার বিকৃত শবদেহটাকে পরিত্যাগ না করিয়া, মিথ্যা-মমতায় রাত্রি-দিন মাথায় বহিয়া বহিয়া, এমন দিনের-পর-দিন ক্লান্ত, অবসন্ন ও নির্জ্জীব হইয়া উঠিতেছে,—কিছুতেই চক্ষু চাহিয়া দেখিতেছে না।

যে বস্তু আর্ত্তকে রক্ষা করে না, শুধু বিপন্ন করে, তাহাকেই সমাজ বলিয়া কল্পনা করার মহাপাপ তাহাদিগকে নিয়ত রসাতলের পানেই টানিয়া নামাইতেছে।রমেশ আরও কিছুক্ষণ স্থিরভাবে বসিয়া থাকিয়া, সহসা যেন ধাক্কা-খাইয়া উঠিয়া পড়িল, এবং তৎক্ষণাৎ সমস্ত টাকাটার একখানা চেক লিখিয়া, গোপাল সরকারের হাতে দিয়া কহিল,—“আপনি সমস্ত বিষয় নিজে ভাল ক’রে জেনে, টাকাটা জমা দিয়ে দেবেন, এবং যেমন ক’রে হোক, পুনর্বিচারের সমস্ত বন্দোবস্ত ঠিক ক’রে আস্‌বেন।

এমন ভয়ঙ্কর অত্যাচার কর্‌বার সাহস তাদের আর যেন কোন দিন না হয়।” চেক হাতে করিয়া গোপাল সরকার ও ভৈরব উভয়ে কিছুক্ষণ যেন বিহ্বলের মত চাহিয়া রহিল।রমেশ পুনর্ব্বার যখন নিজের বক্তব্য ভাল করিয়া বুঝাইয়া কহিল এবং সে যে তামাসা করিতেছে না, তা নিঃসন্দেহে যখন বুঝা গেল, তখন অকস্মাৎ ভৈরব ছুটিয়া আসিয়া পাগলের ন্যায় রমেশের দুই পা চাপিয়া ধরিয়া কাঁদিয়া, চেঁচাইয়া, আশীর্ব্বাদ করিয়া, এমন কাণ্ড করিয়া তুলিল যে, রমেশের অপেক্ষা অল্পবলশালী লোকের পক্ষে নিজেকে মুক্ত করিয়া লওয়া সেদিন একটা কঠিন কাজ হইত।

কথাটা গ্রামময় প্রচারিত হইতে বিলম্ব ঘটিল না। সকলেই বুঝিল, বেণী এবং গোবিন্দ এবার সহজে নিষ্কৃতি পাইবে না। ছোটবাবু যে তাঁহার চির-শত্রুকে হাতে পাইবার জন্যই এত টাকা হাতছাড়া করিয়াছে, তাহা সকলেই বলাবলি করিতে লাগিল। কিন্তু, এ কথা কাহারও কল্পনা করাও সম্ভবপর ছিল না যে, দুর্ব্বল ভৈরবের পরিবর্ত্তে ভগবান্‌ তাহারই মাথার উপর এই গভীর দুষ্কৃতির গুরুভার তুলিয়া দিলেন, যে তাহা স্বচ্ছন্দে বহিতে পারিবে।

 

Read more

পল্লী সমাজ পর্ব:১০ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *