প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১২)

গনি সাহেব বললেন, এক কাজ করেন, আমার রিকশা নিয়ে যান। নানান জায়গায় যাবেন, সুবিধা হবে। এখন রিকশা পাওয়া ঝামেলা। অফিস টাইম।

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

গনি সাহেবের রিকশাটির পেছনে বড় বড় করে লেখা প্রাইভেট’। এটা যে সাধারণ ভাড়া-খাটা রিকশা নয় সেটা বােঝানাের জন্য এটা বানানােও হয়েছে অন্যরকমভাবে। দেখতে অনেকটা যাত্রাদলের সিংহাসনের মতাে। চড়তে বড়ই অস্বস্তি লাগে। সবাই দেখে তাকিয়ে তাকিয়ে। 

রিকশায় উঠেই ঠিক করে ফেললাম কোথায় কোথায় যাব। প্রথমে যাব আমার অফিসে। যাওয়ার দরকার নেই, আগেই ছুটি নিয়ে এসেছি। তবু একবার যাব। বড় ভাইয়ের বাসায় যাব। আমার এক ছােট মামা থাকেন ইন্দিরা রােডে, তাঁর কাছে যাব। তিনি বলে রেখেছেন আমাকে কিছু টাকা দেবেন। অনুর ওখানে গেলে ভালাে হতাে কিন্তু এখন আর নারায়ণগঞ্জ যাবার সময় নেই । অনুর বরকে টেলিফোনে বলা হয়েছে। সে জানিয়েছে আসবে। পাঁচটার সময় সরাসরি হাসপাতালে আসবে। 

প্রথমে যাওয়া যায় কোথায় ? বড় ভাইয়ের বাসায়। তাঁর ছােট মেয়েটির জন্যে কিছু-একটা নেয়া দরকার। এই মেয়েটি আমার খুব ভক্ত। আমাকে চাচা ডাকে না, ডাকে ফরিদ মামা। মামাদের সঙ্গেই ওর যােগাযােগ বেশি, কাজেই সবাইকেই ভাবে মামামেয়েটির বয়স মাত্র চার বৎসর। কিন্তু অসম্ভব স্মৃতিশক্তি। তাকে যত উপদেশ দেওয়া হয় সব সে গম্ভীর হয়ে আমাকে শােনায়।

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে এমনভারে কথা বলে যে, বড় মায়া লাগে। যেমন— সে গম্ভীর হয়ে বলবে, ফরিদ মামা, টিভি বেশি দেখলে মাথা ধরে, চোখ খারাপ হয়। বেশি দেখা ভালাে না। শুধু কার্টুন দেখতে হয়। কার্টুন দেখলে চোখ খারাপ হয় আর শােনাে মামা, বাইরের মানুষের সামনে নেংটো হয়ে আসা খুব খারাপ। সবাই তখন মন্দ বলবে। আর বিছানায় পেশাব করাও খারাপ। আর পেশাব বলাও খারাপ। বলতে হয় বাথরুম। তােমার যদি পেশাব পায় তা হলে তুমি বলবে, বাথরুম পেয়েছে । তাই না মামা? 

বড় ভাইকে বাসায় পাওয়া গেল না। তার এক শালির গায়ে-হলুদ। দল বেঁধে সবাই গেছে নারিন্দা। আজ আর ফিরবে না। বিয়ের ঝামেলা চুকিয়ে ফিরবে। দু-তিন দিনের মামলা। মজিদের মা বলল, নারিন্দা যাইবেন ভাইজান ? 

তয় বসেন। চা দেই, চা খান। 

মজিদের মা কোনাে-এক বিচিত্র কারণে আমাকে খুব পছন্দ করে। যখনই আসি আমার সেবা-যত্নের জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে। হয়তাে আমার মতাে দেখতে তার কোনাে ছেলে ছিল। কোনােদিন জিজ্ঞেস করা হয় নি। 

কোন শালির বিয়ে জানাে মজিদের মা ? মধ্যমটার, বেনু আফার। 

বেনুকে ঠিক চিনতে পারলাম না। বড় ভাইয়ের অনেকগুলি শালি এবং সবাই বেশ রূপসী। প্রতিবছরই এদের কারাে-না-কারাে বিয়ে হচ্ছে। তবু সংখ্যায় কমছে না। এদের মধ্যে একজন ছিল দেবী প্রতিমার মতাে। মুখের দিকে তাকালেই মন খারাপ হয়ে যেত। ভুরু, চোখ, সব যেন তুলি দিয়ে আঁকা। আমি একদিন ভাবিকে ঠাট্টা করে বলেছিলাম, এই মেয়েটির সঙ্গে আমার বিয়ের ব্যবস্থা করে দেন না ভাবি। 

ভাবি রসিকতা বুঝতে পারলেন না। রেগেমেগে অস্থির হয়ে গেলেন। কী দেখে তােমার কাছে বােন বিয়ে দেব? কী আছে তােমার ? টাকা-পয়সা থাকলে লােকজনের বিদ্যা-বুদ্ধি থাকে। চেহারা থাকে। তােমার কোনটা আছে ? ঠাট্টা করছিলাম ভাবি। 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

না, ঠাট্টা তুমি করছ না। ঠাট্টা বােঝার বুদ্ধি আমার আছে। তুমি ওর কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাক, সেটা আমি জানি না ভাবছ ? ঠিকই জানি। 

দারুণ অস্বস্তিকর অবস্থা! কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার কথাটা ঠিক না। 

একদিন নিউমার্কেটের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন ভাবির এ বােনটির সঙ্গে দেখা। দু’-একটা কথাবার্তা বললাম এবং পৃথিবীর সমস্ত সুন্দরী মহিলার মতাে তার ধারণা হলাে, আমি তার জন্যে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এই গল্প সে করেছে ভাবির সঙ্গে। 

ঘটনার এখানেই শেষ নয়। বড় ভাই একদিন হােস্টেলে এসে নানারকম ভণিতা করে বললেন, এখন পড়াশােনার সময়, বিয়ে টিয়ের কথা চিন্তা করা ঠিক 

 পড়াশােনা আগে শেষ হােক। তা ছাড়া দুই ভাইয়ের এক বাড়িতে বিয়ে করা ঠিক না। নতুন আত্মীয় করা দরকার। মহা ঝামেলা! 

একবার গিয়ে দেখলে হয় না, কোন মেয়েটির বিয়ে হচ্ছে ? নারিন্দা খুব একটা দূর কি ? রিকশা তাে আছেই। 

দে কোনাে তেজ নেই। আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। আজও লাধহয় শাড়-বৃষ্টি হবে। এ বত্সর খুব ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। রিকশাওয়ালা বলল, এlal । দিকে যাইবেন? 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

মাজার চল। ওয়ারলেস অফিস। | এই রিকশাওয়ালা প্রফেশন্যাল নয়। চালাতে পারছে না। ঘামে নেয়ে ঊঠছে। উৎসাহেরও বেশ অভাব। চলছে ঢিমে তেতালা ছাদে। তাকে দেখে মনে হা! • সে কোনােদিন মগবাজারে পৌছবে। 

{ঞ্জসমিন তাে বাসায় নেই। আপনি কে ? 

 |ত্যিই তাে আমি কে? বুড়াে ভদ্রলােক তাকিয়ে আছেন আমার দিকে । উনি 

  • *চয়ই জেসমিনের বাবা। এই দুপুরবেলা ঘামতে ঘামতে আমি উপস্থিত হয়েছি। সঙ্গত কারণেই ভদ্রলোেক শঙ্কিত বােধ করছেন। 

আপনি কে ? জেসমিনকে কী জন্য দরকার ? 

সত্যি তাে, ওকে আমার কী জন্য দরকার ? আমি থেমে থেমে বললাম, আমি খুব অসুস্থ। আজ আমি হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছি। আমার তলপেটে একটা সপশন হবে। 

অপলোক অবাক হয়ে আমাকে দেখছেন। সেমিনকে খবরটা দেবেন দয়া করে। এ তা দেব, কিন্তু আপনার নাম কী ? পরিচয় কী? জেসমিনকে কীভাবে চেনেন ? দেবার মতাে কোনাে পরিচয় অস্কার নেই। আমার নাম ফরিদ। এই •াম বললে জেসমিন আপনাকে চিনবে ? জানি না। চিনতেও পারে। অপার অসুখটা কী ? ক||সর। ডুওডেন্যাল ক্যানসার। দলোক তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। আমি হাসতে চেষ্টা করলাম। 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

বাসায় ফিরলাম একটার দিকে। বন্ধুরা কেউ আসে নি তখনাে। গনি সাহেব এসে একটি রেজিস্ট্রি চিঠি দিয়ে গেলেন। বাবুল ভাইয়ের চিঠি। ইংরেজিতে লেখা। যার অর্থ অনেকটা এরকম– বাবার অনেকগুলি চিঠি পেয়েছি। বুঝতে পারছি তােমাদের অবস্থা শােচনীয়। কিছু করতে পারছিলাম না। আমার নিজের অবস্থাও তাই। এখন অবস্থার সামান্য পরিবর্তন হয়েছে। ড্রাফট একটা পাঠালাম।

বেশ কিছু টাকা এতে হবার কথা। পরবর্তী সময়ে আরাে পাঠাব। ধীরে ধীরে দোতলা একটি বাড়ি বানিও, যার একতলাটি ভাড়া দিয়ে বাবা যেন নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। আমার নিজের আর দেশে ফেরা হবে না। তবে বাচ্চাদের একবার বাংলাদেশ দেখাতে নিয়ে আসব। ড্রাফটটি তাড়াতাড়ি ভাঙাবার চেষ্টা করবে। ডলারের দাম পড়ে যাবে এরকম একটি গুজব এখানে আছে। 

তিন হাজার পাঁচশ’ ইউএস ডলারের একটি ড্রাফট।

 

Read more

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৩)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *