প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৯)

টগর আবার কীরকম নাম ? ফুলের নাম । 

ফুলের নাম তাে হয় মেয়েদের। বকুল, কদম, পারুল। ফুলের নামে ছেলেদের নাম হওয়া উচিত না। ছেলেদের নাম হওয়া উচিত ফলের নামে, যেমন— আপেল, কলা। হা-হা-হা ।। 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদটগর খুব হাসল । এই ছেলেটিও জুবায়ের সাহেবের মতাে। হাসে না। কথা বলে না। সব সময় মুখ কালাে করে বসে থাকে। আনন্দমেলার পাতা ওল্টায়। 

ছেলেটির মা নেই বােধহয়। তার বড় বােন রােজ আসে এবং ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকে। চমৎকার একটি দৃশ্য। টগর বড় লজ্জা পায়।আড়চোখে বারবার তাকায় আমার দিকে। আমি ভান করি যেন কিছু দেখছি না । 

রাতেরবেলা সে প্রায়ই ফিসফিস করে আমাকে ডাকে। আমি যদি বলি কী ? সে সাড়া দেয় না। বড় লাজুক ছেলে ।। 

আমি তাকে জুবায়ের সাহেবের কথা বলি। তিনি কেমন ভয় পেয়েছিলেন। ভােরবেলা যখন তাঁকে নিতে আসে তখন কেমন কাঁদতে শুরু করেন। কিন্তু কী অদ্ভুত ভাবেই না হাসিমুখে ঘরে ফিরে যান। ছেলেটি এই গল্প বারবার শুনতে চায়। এটি এমন গল্প যা কখনাে পুরনাে হবে না। 

টগর চোখ বড় বড় করে বলে, ওনার অসুখ পুরােপুরি সেরে গেছে ? 

যা, এবং তােমারও সারবে । কেমন করে জানেন? জানি ! জানি। কেমন করে জানেন, সেন বলেন। তা বলব না। এটা গােপন কথা । সে হাসে। সম্ভবত আমার কথা বিশ্বাস করে। শিশুরা সবকিছুই বিশ্বাস করে। 

অপারেশনের দুদিন আগে বড় ভাই দেখা করতে এলেন। তাঁর মুখ অস্বাভাবিক গম্ভীর। হাতে আপেলের একটা প্যাকেট।। 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৯)

কী রে, কেমন আছিস ? ভালাে। এতবড় একটা ব্যাপার, তুই আমাকে মুখের কথাটা বললি না ? বলতে গিয়েছিলাম। আপনাকে পাই নি। চিঠি তাে দিয়েছি। আমার উপর সবার রাগ । এর কারণটা তাে আমার জানা দরকার। রাগ হবে কেন ? 

বড় ভাই গম্ভীর গলায় বললেন, সংসারের জন্য কি আমি কিছু করি নি ? অনুর বিয়ের খরচ কে দিয়েছে ? 

আপনি দিয়েছেন, আর কে দেবে? তাের আইএ পরীক্ষার ফিস ? কলেজের বেতন ? আমি এইসব দিই নি ? হ্যা, দিয়েছেন। 

এখনাে তাে প্রতিমাসের তিন তারিখে বাবা এসে আমার কাছ থেকে একশ টাকা নিয়ে যান হাতখরচনেন না ? 

এটা আমি জানতাম না। বাবার কথাবার্তায় কখনাে প্রকাশ পায় নি। বড় ভাই নিচু স্বরে বললেন, অনেক কিছু আমার করার দরকার ছিল, আমি করতে পারি নি। কিন্তু তােরাও আমার জন্যে কিছু করিস নি । 

পুরনাে কথা বাদ দেন। 

বাদ দেব কেন ? তাের ভাবি হাত ভেঙে এক মাস পড়ে রইল হাসপাতালে। কেউ তােরা গিয়েছিলি তাকে দেখতে? স্বীকার করলাম সে ভালাে মেয়ে নয়। ঝগড়াটে। কিন্তু মানুষ তাে ? ডাক্তার বলল, হাত কেটে বাদ দিতে হবে। কী কষ্ট, কী দৌড়াদৌড়ি! কেউ এসেছিলি দেখতে ? 

হাত কেটে বাদ দিতে হবে এটা শুনি নি। 

বড় ভাই আমাকে লজ্জায় ফেলে দিয়ে ছেলেমানুষের মতাে কাদতে শুরু করলেন। 

টগর অবাক হয়ে দৃশ্যটা দেখল। তারপর বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল । আমি প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্যে বললাম, ভাবি কেমন আছে ? বাচ্চারা? 

ভালােই। ওরা সবাই এসেছে। নিচে আছে । নিচে কেন ? 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৯)

আমি আগে এসেছি তাের সঙ্গে ফয়সালা করতে। কেন এত বড় একটা ব্যাপারে আমি কিছু জানলাম না ? 

বাদ দেন। আমার ভুল হয়ে গেছে । ভুলটা কেন করলি সেটা বল ? তােকে বলতে হবে। 

আমি থেমে থেমে বললাম, কাউকেই কিছু বলতে ইচ্ছে করে না। আপনি আমার চিঠি কি আজই পেয়েছেন ? 

, গত পরশু পেয়েছি। ভাবছিলাম আসব না। এসে ভালাে করেছেন। 

আমি এলে না-এলে কারাের কিছু যায় আসে না। আমি আবার কে? তাের এখানে সিগারেট খাওয়া যায় ? 

যায়। খান। নেন, আমার কাছে ভালাে সিগাব্রেট আছে। বাবা এখন বিরাট বড়লোেক, শুনেছেন ? 

হা। তাের চিঠিতে পড়লাম। বাবা আমাকে কিছু বলেন নি।। 

আপনি দেখে শুনে বাবাকে একটা ছােটখাট বাড়ি বানিয়ে দেন। তাঁর বাড়ির খুব শখ। 

আমি কেন ? তুই দে। 

আমি কিছু বললাম না। তিনি তীক্ষ দৃষ্টিতে দীর্ঘ সময় আমার দিকে তাকিয়ে থেকে আবার চোখ মুছতে শুরু করলেন।

 

Read more

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(শেষ-পর্ব)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *