প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৬)

 টাকা তিনি দেবেন। বড় ভাই অতিরিক্ত রকমের উৎসাহের সঙ্গে বললেন, এই সংসারের খরচ আমি আগে যেমন দিতাম, এখনাে দেব। চিন্তা কিছু নাই। মা বিশেষ ভরসা পেলেন না। মায়েরা অনেক জিনিস আগে আগে বুঝতে পারে।প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

আসলে আমাদের কারােরই মা-বাবার প্রতি টান ছিল না। মেজো ভাই। জার্মানি গিয়ে চুপচাপ হয়ে গেল। দুমাস-তিনমাস পরপর চিঠি আসে। একটি চিঠিতে জানলাম, ল্যাঙ্গুয়েজ পরীক্ষায় পাস করতে পারে নি। সম্ভবত তাকে দেশে ফিরে আসতে হবে। বাবা প্রায় পাগলের মতাে হয়ে পড়লেন। সে অবশ্যি দেশে ফিরল না। মাস ছয়েক পর চিঠি এলাে, সুইডেনে চলে এসেছে। সে চিঠিতে কোনাে ঠিকানা নেই, লেখা আছে- এখনাে কোনাে স্থায়ী ঠিকানা হয় নাই। হওয়ামাত্র জানাই। 

এক বৎসরেও তার কোনাে স্থায়ী ঠিকানা হলাে না। আমরা তাকে কিছু লিখতে পারি না। কোনাে খবর দিতে পারি না কী অবস্থা! এর মধ্যে খবর পাওয়া গেল, কাগজপত্র না থাকায় তাকে নাকি সুইডেনের এক জেলখানায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। খবর কতটুকু সত্যি জানার উপায় নেই। 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

সে-সময় আমাদের এখামেও অনেকগুলি খবর তৈরি হলাে, যেগুলি তাকে জানানাে গেল না। যেমন-অনুর বিয়ে হয়ে গেল নারায়ণগঞ্জের এক উকিলের সঙ্গে। খুবই ভালাে বিয়ে। শহরের উপর তাদের বাড়ি-টাড়ি আছে। ছেলের চেহারাও সুন্দর । অনুর (যে খানিকটা তােতলিয়ে কথা বলে) এতটী ভালাে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল না। আমরা খুবই খুশি। পরে অবশ্যি জানা গেল, উকিল সাহেব আগে একবার বিয়ে করেছিলেন এবং সেই বিয়ের একটি ছেলেও আছে। দ্বিতীয়বার বিয়ের সময় প্রথম স্ত্রীর খবর চেপে গিয়েছেন। ভদ্রলােক কেন এটা করলেন কে জানে! 

বিয়ের এই খবর মেজো ভাইকে জানানাে গেল না। মা মারা যাবার খবরও জানানাে গেল না। তিনি মারা গেলেন হঠাৎ করে। রাতেরবেলা জেগে উঠে বললেন, তাঁর বুক জ্বালা করছে। বাবা গম্ভীর হয়ে বললেন, ও কিছু না, খেসারির ডাল বেশি খেয়েছ, তাই অম্বল হয়েছে। এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি খেয়ে শুয়ে থাক। 

মা তাই করলেন। ঘণ্টাখানিক পর উঠে বললেন, বুক জ্বলে যাচ্ছে। বাবা বললেন, এক গ্লাস লেবুর সরবত করে খাও। খেয়ে শুয়ে থাক। 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

বাবার কথা মা’র কাছে নবীর ওহীর মতাে। ঘরে লেবু ছিল না। চিনির সরবত বানিয়ে খেলেন এবং ছটফট করতে লাগলেন। বাবা বললেন, চেঁচামেচি করলে কি আর ব্যথা কমবে ? শুয়ে থাক। ভােরবেলা ডাক্তারকে খবর দেব।শেষরাতে আমরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। ডাক্তাররা বললেন, ফুড পয়জনিং। আলু-পটলের তরকারি এবং খেসারির ডাল খেয়ে আমাদের কারাে কিছু হলাে না, মা’র ফুড পয়জনিং হয়ে গেল! কোনাে মানে হয় ? 

বৃষ্টি থেমে গেছে। মনসুরের কথাবার্তা শােনা যাচ্ছে না। ওরা কি ঘুমিয়ে পড়েছে ? আমি সাবধানে উঠে বসলাম। তলপেটের ব্যথাটা টের পাচ্ছি। লক্ষণ ভালাে নয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই এই ব্যথা আমাকে কাবু করে ফেলবে। মনসুরকে হয়তাে ডাকতে হবে। আমি প্রাণপণে ব্যথাটা সামাল দিতে চেষ্টা করলাম। কিছু-কিছু জিনিসকে কিছুতেই সামাল দেয়া যায় না। একেও যাবে না। এর নিজস্ব একটি জীবন আছে। মাথা ঝিমঝিম করছে। মনে হচ্ছে, নাড়িভুড়ি ফেটে বেরিয়ে আসবে। ডাকব না ওদের, কিছুতেই ডাকব না। বমি করতে ইচ্ছা হচ্ছে ।

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

হারিকেনের আলাে ক্রমেই বাড়ছে। আমি মৃদু স্বরে মাকে ডাকলাম, মা, তুমি কোথায় আছ ? এসাে, ব্যথা কমিয়ে দাও। পাশের ঘর থেকে শব্দ হচ্ছে। মনসুর উঠে আসছে। রীনার গলা পাওয়া যাচ্ছে। কী যেন বলছে সে। আমি ক্ষীণস্বরে ডাকলাম, মনসুর। কেন ডাকলাম? সে কিছুই করতে পারবে না। পাশে দাড়িয়ে থাকা ছাড়া এখন কেউ কিছু করতে পারবে না। তবু মনে হয়, কেউ আসুক। পাশে এসে দাঁড়িয়ে থাকুক। মনসুরের গলা পাওয়া যাচ্ছে, এই ফরিদ, কী হয়েছে ? আমি হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম, মরে যাচ্ছি। আমি মরে যাচ্ছি। 

মনসুর আমার হাত ধরে রেখেছে। রীনা বসে আছে আমার ডান পাশে। সে বড় ভয় পেয়েছে। রীনা ফিসফিস করে বলল, কোথায়, কোন জায়গায় ব্যথা ? ঘরের আলাে কমে আসছে। রীনার মুখ অসম্ভব বড় মনে হচ্ছে। রীনা আবারও বলল, কোথায় ব্যথা ? কোথায় ? 

ঠিক অন্য সব দিনের মতােই আমার ঘুম ভাঙল। চোখ মেলে দেখলাম, মনসুর এবং রীনা বসে আছে চেয়ারে। মশারি তােলা। মাথার কাছে একটা ছােট টেবিল ফ্যান। পাখা ঘুরছে। 

কী রে, কেমন লাগছে এখন ? ভালাে। 

কিছুক্ষণ পরই তুই ঘুমিয়ে পড়লি। রীনা বলেছিল, তুই অজ্ঞান হয়ে গেছিস। মাথায় পানি ঢাললাম। 

আমি ফ্যাকাসেভাবে হাসতে চেষ্টা করলাম। রীনা বলল, ব্যথাটা আপনার কতক্ষণ থাকে ? বেশিক্ষণ না । কমে গেলেই ঘুম এসে যায়। লম্বা ঘুম দিয়ে ফ্রেশ হয়ে যাই। 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

আপনি কিছু খাবেন ? চা আর টোস্ট এনে দিই ? নাকি এক পিস কেক খাবেন ? 

চা খাব। শুধু চা। 

রীনা উঠে চলে গেল। মনসুর বলল, ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলি! হাত-মুখ ধুবি ? পানি এনে দিই ? 

এনে দিতে হবে না। নিজেই বাথরুমে যাব। চুপচাপ শুয়ে থাক, নড়াচড়া করিস না। এখন আর কিছু হবে না। মনসুর বলল, আজ আমি অফিসে যাব না, ঠিক করেছি, ঘরেই থাকব। সে হাই তুলল। তার চোখ লাল। বেচারা সারারাত কষ্ট করেছে। মনসুর! বল। চা খেয়ে আমি বেরুব । কোথায় ? ৩ মিরপুর পাঁচ নম্বর সেকশন। বাবাকে দেখে আসি । আজ শুয়ে থাক, নড়াচড়া করিস না। আজ না গেলে আর সময় পাব না। চল, আমিও যাই সঙ্গে। আমি তাের সঙ্গে গেলে অসুবিধা কী ? 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

ভেবেছিলাম, আমাকে যেতে দিতে রীনা আপত্তি করবে। সে করল না। মেয়েটি ভয় পেয়েছে। কাল রাতের মতাে কোনাে দৃশ্য সে সম্ভবত দ্বিতীয়বার দেখতে চায় না। না চাওয়াই ভালাে। 

সারা রাত বৃষ্টি হবার জন্যই বােধহয় রাস্তা-ঘাট ঝকঝক করছে। গাছের পাতা অন্যদিনের চেয়েও বেশি সবুজ। চারদিক চকলেটের রাংতার মতাে ঝিলমিল করছে। মন ভালাে হয়ে যাবার মতাে একটা সকাল। অপূর্ব! এরকম একটি সকালে পুরনাে কথা মনে পড়ে না, শুধু বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে। 

ভেবেছিলাম, বাসে করে যাব। এই সময় মিরপুরের দিকের বাস ফাকা যায়। কিন্তু মনসুরের জন্যে পারা গেল না। সে আমাকে কিছুতেই বাসে উঠতে দেবে 

বাসে উঠলেই নাকি আমার তলপেটের নাড়িভুঁড়ি ঝাঁকুনিতে ফেটে চৌচির হবে। সে বাইশ টাকায় এক বুড়াে রিকশাওয়ালাকে রাজি করিয়ে ফেলল। গলার স্বর নামিয়ে অন্তরঙ্গ স্বরে বলল, বুড়াে মিয়া, খুব আস্তে আস্তে চালাবেন।

 

Read more

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৭)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *