ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১২)

ফিহা থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, তুমি কেন পেছনে পেছনে আসছ? ‘জানি না স্যার। ‘তােমাকে আসতে হবে না।ফিহা সমীকরণ

গেটের বাইরে নুহাশ দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর সঙ্গে দুটা ব্যাগ। একটা বেশ বড়, একটা ছােট। প্যাকেট করা এক গাদা বই। একটা ফোল্ডিং ইজিচেয়ার, একটা টেবিল ল্যাম্প। নুহাশ লাজুক গলায় বলল, আপনি আসতে বলেছিলেন, আমি এসেছি ।। 

ঠিক কোন কথাটা বললে ভাল হবে ফিহা বুঝতে পারছেন না। সব কেমন জট পাকিয়ে গেছে। মেয়েটিকে ঐ দিন তেমন আকর্ষণীয় মনে হয় নি। আজ অসম্ভব রূপবতী বলে মনে হচ্ছে। কোন সাজসজ্জা করেছে বলেতাে মনে হয় না। তাহলে সুন্দর লাগার কারণ কি ? সৌন্দর্য ব্যাপারটা কি? একটা জিনিসকে কেন সুন্দর লাগে, কেন অসুন্দর লাগে ? 

‘আমি কি চলে এসে আপনাকে খুব বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছি। 

না। ‘আমি আমার সব জিনিসপত্র নিয়ে এসেছি।’ ‘ভাল করেছ। ‘আমি কি বাড়িতে ভেতর আসব ?” ‘অবশ্যই আসবে। অবশ্যই। 

সুন্দর কিছু বলা উচিত। বলতে ইচ্ছাও করছে। কিন্তু সুন্দর কোন কথা মনে আসছে না। তাঁর কি উচিত না মেয়েটির রূপের প্রশংসা করে কিছু বলা ? কি বলা যায় ?

নুহাশ বলল, আপনি গেট ছেড়ে সরে না দাঁড়ালে তাে আমি ভেতরে আসতে পারছি না। 

ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ

ফিহা সরে দাঁড়ালেন। তাঁর ইচ্ছা করছে মেয়েটিকে হাত ধরে ভেতরে নিয়ে যেতে, কিন্তু লজ্জা লাগছে। অসম্ভব লজ্জা লাগছে। লজ্জা লাগার কারণ কি? 

নুহাশ বলল, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি খুব বিব্রত হচ্ছেন। 

না না না। বিব্রত হচ্ছি না। মােটেই বিব্রত হচ্ছি না। অংকের একটা মডেল তৈরী করছিলাম, মাঝখানে তুমি এলে মানে সব এলােমেলাে হয়ে গেল। একটা কাজ করা যাক। তুমি ঘরে যাও। লীম তােমাকে সব দেখিয়ে দেবে। কোন ঘরে থাকবে, এইসব আর কি।। 

‘লীম কে ? 

‘লীম হচ্ছে কমী রােবট। বােকা ধরণের তবে ঘরের কাজে খুব পটু। তুমি সব দেখে শুনে নাও। আমি এই ফাঁকে আমার কাজটা শেষ করি। অবশ্যি বিয়ের লাইসেন্সের জন্যে দরখাস্ত করতে হবে। এটা যদিও তেমন জরুরী নয়। কফি ? কফি খাবে?” 

‘আমাকে নিয়ে আপনি ব্যস্ত হবেন না। ‘ব্যস্ত হচ্ছিনা তাে। মােটেই ব্যস্ত হচ্ছি না। নুহাশ। 

‘মেয়েদের সঙ্গে কিভাবে কথা বলতে হয় আমি জানি না। কি বললে তারা খুশি হয় তাও জানি না। পদে পদে আমার ভুল হবে, তুমি কিছু মনে কর না। কি করলে 

তুমি খুশি হবে তা যদি তুমি বল তাহলে আমি তা করব। অবশ্যই করব। 

নুহাশ হাসিমুখে বলল, আপনি যদি হাত ধরে আমাকে বাড়িতে নিয়ে যান তাহলে আমি খুশি হব। 

ফিহা নুহাশের হাত ধরে বাড়ির দিকে এগুচ্ছেন। পাঠক এবং লীম দু’জনই বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। পাঠক এমন ভাব করছে যেন সে কিছু দেখছে না। কিন্তু গাধা লীম চোখ বড় বড় করে তাকাচ্ছে এবং খুব মাথা দুলাচ্ছে যেন সে সব বুঝে ফেলেছে। এই গাধাটাকে বাড়িতে রাখাই ভুল হয়েছে। বিরাট বােকামি হয়েছে। 

ফিহা লাইব্রেরী ঘরে ফিরে গেলেন। অংকের মডেলটা শেষ করতে হবে। নতুন পরিস্থিতির কারণে সব কাজ কর্ম বন্ধ রাখার কোন মানে হয় না। তাছাড়া এটা খুব জরুরী, খুবই জরুরী। 

ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ

লীম গভীর আগ্রহে নুহাশকে সব ঘরে ঘুরে দেখাচ্ছে। নুহাশ যা দেখছে তাতেই বিস্মিত হচ্ছে। একজন মানুষের জন্যে এত প্রকাণ্ড বাড়ি? বাড়ির পেছনের ফুলের বাগান দেখে নুহাশ হকচকিয়ে গেল। এত সুন্দর! 

নুহাশ বলল, ফুলের বাগান বাড়ির পেছনে কেন? 

লীম দুঃখিত গলায় বলল, স্যার পছন্দ করেন না, এই জন্যেই ফুলের বাগান বাড়ির পেছনে। 

‘উনি ফুল পছন্দ করেন না?” ‘না।‘আর কি কি উনি পছন্দ করেন না ? ‘গান পছন্দ করেন না। ‘কি বল তুমি?” 

লীম দুঃখিত গলায় বলল, “আমি খুব ভাল গাইতে পারি। কিন্তু এই বাড়িতে গান গাওয়ার উপায় নেই। স্যার বিরক্ত হন। 

‘কখনাে গেয়ে দেখেছিলে ? 

একবার রান্নাঘরে বসে গুন গুন করছিলাম। স্যার বললেন, গলায় কি হয়েছে। এরকম করছ কেন? 

‘দেখি আমাকে একটা গান শুনাও তাে। ‘কোন ধরণের গান শুনতে চান ? “তােমার যা ইচ্ছা তুমি গাও। সব ধরণের গানই আমার ভাল লাগে। ‘একটি প্রেমের গান গাইব?” ‘গাও।” 

ফিহা চোখ বন্ধ করে একের পর এক সংখ্যা বলেছেন, পাঠক তা মেমােরী সেলে সাজিয়ে নিচ্ছে। এই প্রক্রিয়া আবার ব্যাহত হল। লীমের গানের শব্দে আবার সব এলােমেলাে হয়ে গেল। 

ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ

ফিহা বললেন, এসব কি হচ্ছে ? পাঠক বলল, গান হচ্ছে স্যার। 

ফিহা বললেন, কে গান করছে? 

‘লীম। পিআর ধরনের রােবটদের ভয়েস সিনথেসাইজার খুব উন্নত মানের। তারা চমত্ত্বার গাইতে পারেফিহার অসম্ভব বিরক্ত হওয়া উচিত, কারণ কাজটা আবার গোড়া থেকে শুরু করতে হবেকিন্তু তিনি বিরক্ত হচ্ছেন নাতাঁর ভাল লাগছেঅসম্ভব ভাল লাগছেতিনি কান পেতে গানের কথাগুলি শােনার চেষ্টা করছেন। 

দিনের প্রথম আলােয় তােমাকে দেখতে চেয়েছিলাম তুমি এলে না। মধ্যাহ্নের তীব্র আলোয় তােমাকে কেমন দেখায় জানা হল না, কারণ তুমি মধ্যাহ্নে এলে নাসূর্যের শেষ রশ্মি কি তােমার রঙ বদলে দেয়? আমি জানি না, কারণ তুমি এলে রাতের অন্ধকারে

প্রিয়তম, আমি শুধু তােমাকে দেখতে চেয়েছিলাম। অন্ধকারে কি করে দেখব? ফিহা মুগ্ধ গলায় বললেন, গাধাটাতাে ভাল গাইছে। বেশ ভাল গাইছেপাঠক বলল, ডাটা এন্ট্রির কাজটা আজ বন্ধ থাকলে খুব কি ক্ষতি হবে? ‘থাকুক বন্ধ থাকুকআপনাকে এবং আপনার স্ত্রীকে আমি কি অভিনন্দন জানাতে পরি ? ‘পার।”

 

Read More

ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৩)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *