‘ভাল বলেছ পাঠক। ভাল বলেছ। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার হচ্ছে ভালবাসা। আশ্চর্যের ব্যাপার কি জান – এই উপহার আমি একমাত্র আমার পালক পিতামাতার কাছ থেকেই পেয়েছি। যারা দুজনই মেন্টালিস্ট। | ‘স্যার, আপনি আমাদের ভালবাসাও পেয়েছেন। তবে আমরা যন্ত্র। আমাদের ভালবাসা মূল্যহীন।

পাঠক, ভালবাসা মূল্যহীন নয়। আজ সম্ভব না, কিন্তু একদিন নিশ্চয়ই ভালবাসাকে অংকে নিয়ে আসা যাবে। অংকের মডেল তৈরী করা হবে। হয়ত
আমিই তা করব
‘আমি কি আপনাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দেব স্যার?”
‘দাও এগিয়ে দাও। গাধা লীম দেখি এখনাে গান গাইছে। ব্যাটার গলা এত সুন্দর তাতাে জানতাম না। তাকে বার বার গাধা বলা বােধ হয় ঠিক হচ্ছে না।
মারলা লি বললেন, এই সামান্য বিষয় নিয়ে আপনার আসার প্রয়ােজন ছিল না। বিয়ের লাইসেন্স এমন জরুরী কিছু নয়।
ফিহা বললেন, আরেকটা জরুরী বিষয় আমার আলােচ্যসূচিতে আছে। আপনার কি সময় হবে?
‘আমার সময়ের একটু টানাটানি যাচ্ছে। কিন্তু আপনার জন্যে সময় বের করা হবে।
‘মেন্টালিস্টদের উপর লেখা আরাে কিছু বই পড়তে চাচ্ছি। “কেন?” ‘যে বইটি দিয়েছেন সেটি অস্পষ্ট। ‘সব বইই অস্পষ্ট। বিজ্ঞানের বই এগুলি নয়।
‘মেন্টালিস্টদের জীবনযাপন পদ্ধতি, এদের আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে যদি কোন বই থাকে।
‘শুনুন মহামতি ফিহা, আপনি যেভাবে কথা বলছেন তার থেকে মনে হতে পারে আমরা মানুষ নই। আমরা জন্তু বিশেষ।
‘শুধু শুধুই আপনি রাগ করছেন।
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
‘আমি মােটেই রাগ করছি না। আপনাকে মেন্টালিস্ট সম্পর্কে আর কোন বই দেয়া যাবে না। আপনি সমাজবিজ্ঞানী নন। আপনি তাত্ত্বিক পদার্থবিদ। বাজে কাজে সময় নষ্ট করবেন কেন? সবার কাজ নির্দিষ্ট করা আছে। আপনি আপনার কাজ করবেন।
ফিহা তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, সবার সব কাজ তাে আপনারা করিয়ে নিচ্ছেন। আমি জানতে চাচ্ছি আপনাদের কাজটা কি। আপনারা কি করেন? মাটির নিচে শহর বানিয়ে বাস করেন জানি। কিন্তু বেঁচে থাকা ছাড়া আর কি করেন ?
‘আমরা ভাবি। “কি ভাবেন ? ‘পৃথিবীর মঙ্গল নিয়ে ভাবি। মানুষকে পরিচালনা করার সর্বোত্তম পন্থা নিয়ে
ভাবি। ভবিষ্যৎ পৃথিবী কি করে সাজানাে হবে তা নিয়ে ভাবি।
‘ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে আমাদের স্থান কোথায় ?
‘আমার জানা নেই। শুনুন মহামতি ফিহা, আজ আপনি বিয়ে করেছেন। একটি তরুণী মেয়ে ঘরে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে — আজ কেন বাজে তর্ক করে সময় নষ্ট করছেন? তার কাছে যান। যাবার পথে ফুল কিনে নিয়ে যান। ফুলের দোকান এত রাতে নিশ্চয়ই বন্ধ হয়ে গেছে। আমি খুলাবার ব্যবস্থা করছি।
‘কোন প্রয়ােজন দেখছি না।’
‘আপনার প্রয়ােজন নেই। কিন্তু মেয়েটির প্রয়ােজন আছে। আপনারা মেন্টালিস্ট নন। আপনাদের একেকজনের চিন্তা-ভাবনা একেক রকম। ফুল একজনের কাছে অর্থহীন, অন্যজনের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।
ফিহা উঠে দাঁড়ালেন। মারলা লি বললেন, আমি দুঃখিত যে আপনি খানিকটা হলেও মন খারাপ করে যাচ্ছেন। আপনার মন ভাল করার জন্যে কিছু কি করতে পারি ?
‘আমি আমার পালক বাবা-মা’র সঙ্গে দেখা করতে চাই। তা-কি সম্ভব হবে?”
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
‘না। তা সম্ভব হবে না। তাঁরা যদি ভূগর্ভস্থ শহরে না থাকতেন তাহলে সম্ভব হত। ভূগর্ভস্থ শহর শুধুমাত্র মেন্টালিস্টদের জন্যে।
‘সাধারণ মানুষ সেখানে গেলে শহর কি অশুচি হয়ে যাবে? ‘শুচি-অশুচির প্রশ্ন নয়। এটা হচ্ছে আইন। ‘আইনের পেছনে যুক্তি থাকে। এই আইনের পেছনের যুক্তিটি কি?
‘আমরা মানুষ হিসেবে আপনাদের থেকে অনেকখানিই আলাদা। সহাবস্থান আমাদের পক্ষে সম্ভব নয় বলেই এই ব্যবস্থা। আপনারা আমাদের সম্পর্কে যত কম জানবেন ততই মঙ্গল।
‘আপনারা আমাদের সম্পর্কে সবকিছুই জানবেন, আর আমরা কিছু জানব ?’
‘আপনাদের সম্পর্কে জানা আমাদের প্রয়ােজন। কিন্তু আমাদের সম্পর্কে আপনাদের জানা প্রয়ােজন নয়। আলােচনা যথেষ্ট হয়েছে ফিহা। এখন বাড়ি যান। ফুলের দোকান কি খুলাবার ব্যবস্থা করব?’
ফিহা জবাব না দিয়ে বের হয়ে এলেন। রাস্তায় তেমন আলাে নেই। ঝড়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় যে সমস্যা হয়েছিল সে সমস্যা এখনাে কাটিয়ে ওঠা যায় নি। ফিহা হাঁটছেন
অন্ধকারে। তীব্র হতাশাবােধ তাঁকে গ্রাস করতে শুরু করেছে। ফিরে এসেছে। পুরােনাে অস্থিরতা।
‘স্যার। তিনি চমকে তাকালেন। অন্ধকারে রাস্তার পাশে বিশালদেহী একজন যুবক। ‘আপনি কে ?
‘স্যার আমি টহল পুলিশ। আপনি কোথায় যেতে চান বলুন, আমি আপনাকে পৌঁছে দেব।’
‘তার কোন প্রয়ােজন নেই, আপনাকে ধন্যবাদ। ‘আমি যদি আপনার পেছনে পেছনে আসি আপনার কি অসুবিধা হবে?”
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
‘া হবে। আমি একা হাঁটতেই পছন্দ করি। ভাল কথা, এরিন নামের একজন টহল পুলিশের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। তাকে কি একটা খবর দিতে পারবেন? তাকে কি বলবেন যে আমি বিয়ে করেছি ?”
‘এরিনকে খবর দেয়া যাবে না স্যার। “কেন?”
‘ঝড়ের রাতে সে মারা গেছে। রাস্তায় ডিউটি ছিল। রাস্তা ছেড়ে কোথাও আশ্রয় নেবার অনুমতি ছিল না। কাজেই সে ঝড়ের সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল।
‘প্রাণ বাঁচানাের জন্যেও সে কোথাও যেতে পারে নি ? ‘না। আমরা মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রিত। ‘ও আচ্ছা। ফিহা এগিয়ে চললেন। টহল পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। এক দৃষ্টিতে দেখছে তাঁকে।
ফিহা রাতের খাবার শেষ করলেন নিঃশব্দে।
নুহাশ তার মুখােমুখি বসেছে। কিন্তু তার সঙ্গে তেমন কোন কথাবার্তা হচ্ছে না। অন্যদিন খাবার টেবিলের আশেপাশে লীম এবং পাঠক দুজনই থাকে। আজ তারা নেই।
নুহাশ বলল, আপনার খাবারে লবণের সমস্যা হয় বলে শুনেছি। লবণ কি ঠিব আছে ?
‘ঠিক আছে। ‘আপনাকে অসম্ভব চিন্তিত মনে হচ্ছে। ‘চিন্তিত না। আমার মন খারাপ হয়ে আছে। মেন্টালিস্টদের সঙ্গে দেখা হলেই
Read More