এই কাজ তারা আদায় করে নেবে। বিজ্ঞানীরা তাদের কাছে রােবট ছাড়া কিছুই নয়। একদল পুতুল যে-পুতুলের সূতা মেন্টালিস্টদের হাতে।
মেন্টালিস্টরা কত সূক্ষ্মভাবে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করে তা ভেবে ফিহা অতীতে অসংখ্যবার বিস্মিত হয়েছেন। ভবিষ্যতেও হয়ত হবেন। কিন্তু এখন আর বিস্মিত হতে ইচ্ছা করে না।
একবার গ্রেওরিয়ান এ্যানালাইসিস নিয়ে তিনি সমস্যায় পড়লেন। বিষয়টির উপর তাঁর তেমন দখল নেই। অথচ সময় সমীকরণে গ্রেগরিয়ান এ্যানালাইসিস অসম্ভব জরুরী। নতুন করে এই জিনিস শিখতে গেলে প্রচুর সময় লাগবে। স্বতস্ফূত চিন্তায় বাধা পড়বে। এই অবস্থায় হঠাৎ খবরের কাগজে দেখলেন। গ্রেগরিয়ান এ্যানালাইসিসের বিখ্যাত পণ্ডিত অধ্যাপক শরমন তুন্দ্রা অঞ্চল থেকে এখানে আসছেন। তাঁর শরীর অসুস্থ। তিনি এখানে এসে শরীর সারাবেন।
এই ব্যবস্থা কি মেন্টালিস্টরা করে দিল না?
সব কিছুই তারা করে দিচ্ছে। সব কিছু এগুচ্ছে তাদের পরিকল্পনায়। তাদের পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দেয়া কি খুব অসম্ভব ? যা তাঁর ইচ্ছা করছে না সেই কাজটি করলে কেমন হয় ?
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
তাঁর শহর ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করছে না, শহর ছেড়ে চলে গেলে কেমন হয় ? নারীসঙ্গ তাঁর প্রিয় নয়, তিনি যদি এখন নুহাশ নামের মেয়েটিকে বিয়ে করে ফেলেন তাহলে কেমন হয় ? অবশ্যি মেয়েটির তাতে মত থাকতে হবে। মত না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। বিজ্ঞানীরা স্বামী হিসেবে মােটেই আকর্ষণীয় নয়।
ফিহা আকাশের দিকে তাকালেন। তাঁর হাসি পাচ্ছে। হো হাে করে খানিকক্ষণ হাসা যেতে পারে। না কি মেন্টালিস্টরা তাকে হাসতেও দেবে না?
এরিন গাড়ি নিয়ে এসেছে। সে বিনীত ভঙ্গিতে বলল, একটু দেরি হল স্যার। অনেকদূর যেতে হবে তাই নতুন সেল লাগিয়ে নিয়ে এসেছি।
‘অনেক দূর যেতে হবে কি? ‘জি স্যার। শহরের অন্যপ্রান্তে। ‘চল, রওনা হওয়া যাক।
নুহাশ দরজা খুলল। ফিহা বললেন, কেমন আছ নুহাশ?
নুহাশ তাকিয়ে আছে। সে কিছুই বুঝতে পারছে না। এটা কি কোন স্বপ্নদৃশ্য? সে কি ঘুমুচ্ছে ? মানুষটিকে সে দেখছে ঘুমের মধ্যে ?
‘আমাকে চিনতে পারছ আশা করি। নুহাশ জবাব দিচ্ছে না। দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
‘তােমার জন্যে এক প্যাকেট কফি নিয়ে আসছিলাম। ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছি বলে আনা হয় নি। এখন মনে হচ্ছে আনলেও হত। তুমি কি আমাকে ঘরে ঢুকতে দেবে, না দরজায় দাঁড় করিয়ে রাখবে ?
নুহাশ তাকিয়ে আছে। কথা বলার চেষ্টা করছে, বলতে পারছে না। ফিহা বললেন, আমার অবশ্যি ভেতরে যাবার তেমন প্রয়োজন নেই। তোমাকে কয়েকটা জরুরী কথা বলা দরকার। বলে চলে যাব। খুব মন দিয়ে শােন। তার আগে জানা দরকার তুমি কি বিবাহিত ?
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
নুহাশ না সূচক মাথা নাড়ল।
ফিহা বললেন, আমি বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সিদ্ধান্ত হঠাৎ করেই নিলাম। কোন তরুণীর সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। একমাত্র তােমার সঙ্গেই সামান্য পরিচয়। কাজেই আমি এসেছি তােমার কাছে। যদি আমাকে তােমার পছন্দ হয়, যদি মনে কর আমাকে বিয়ে করা যেতে পারে তাহলে আমার কাছে চলে আসবে। আচ্ছা, আমি যাচ্ছি। অসময়ে আসার জন্যে লজ্জিত।
নুহাশ কাপা গলায় বলল, একটু বসে যান।
ফিহা বললেন, না বসব না। তুমি আমার কারণে তােমার একটি প্রিয় গ্রন্থ ছিড়েছ। তা ঠিক হয়নি। যে প্রিয় সে সব সময় প্রিয়। আমি খারাপ বললেই কি প্রিয়জন অপ্রিয় হবে? তুমি অবশ্যই অরেকটি বই কিনে নেবে। মনে থাকবে?
নুহাশ হাসছে। লাজুক ভঙ্গিতে হাসছে। ফিহা তা লক্ষ্য করলেন না। তিনি সিড়ি
বেয়ে নেমে যাচ্ছেন। নুহাশ এখনাে দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে এখ রোবটের মত, চোখের পলক ফেলছে না।
ফিহা রাস্তায় নেমে পুরাে ব্যাপারটা মাথা থেকে সরিয়ে দিলেন। এটা নিয়ে এখন তিনি আর ভাবেন না। মেয়েটা যদি সত্যি আসে তখন দেখা যাবে। শুধু শুধু চিন্তা ভাবনা করার কোন মানে হয় না। তাঁর অনেক কাজ।
এরিন গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফিহা বললেন, তুমি আমাকে আমার বাড়িতে পৌছে দাও। তুমি করে বলায় রাগ করনি তাে ?
এরিন হাসল। সুন্দর দেখাল এরিনকে। হাসলে সবাইকেই সুন্দর দেখায়। ‘এরিন তুমি কেমন আছ ?” ‘জি ভাল। ‘এই চাকরি কি তুমি পছন্দ কর?” ‘করি। ‘তুমি কি বিবাহিত ? ‘না। পুলিশদের বিয়ে করার নিয়ম নেই। ‘কাদের তৈরি নিয়ম এরিন ?” ‘মেন্টালিস্টদের নিয়ম। গাড়ি ছুটে চলেছে। ফিহার ঝিমুনি ধরে গেছে। তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন।
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
ফিহার বাড়িটা প্রকাণ্ড। অনেকটা দুর্গের মত। উঁচু পাচিল, পাঁচিলের উপর কাঁটা তার। পাঁচিল থেকে এক হাজার গজ দূরে মূল রাস্তায় সাইনবাের্ড লাগানো।
মেন্টালিস্টদের প্রবেশ কাম্য নয় আমি নীরবতা পছন্দ করি।
ফিহা। এ জাতীয় লেখা ফিহার পক্ষেই লেখা সম্ভব। মেন্টলিস্টরা এই পথে যাওয়া আসা করে। সাইনবোর্ড দেখে। কেউ কেউ এক মুহূর্তের জন্য হলেও থমকে দাঁড়ায়। তবে কখনাে বলে না, এ জাতীয় সাইবাের্ডের মানে কি ? মেন্টালিস্টদের প্রধান গুণ তারা অভিযােগ করে না, বিরক্তি প্রকাশ করে না এবং কখনােই রাগ করে না। তাছাড়া ফিহার উপর রাগ করার প্রশ্ন উঠে না। উনি এসবের উর্ধ্বে। অন্যের রাগ ভালবাসা নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা নেই।
মানুষটি জন্ম থেকেই নিঃসঙ্গ। বিশাল বাড়িটায় থাকেন একা। মাঝখানে কিছুদিন কুকুর পুষেছিলেন। দু’টি শিকারী কুকুর, এদের পছন্দও করতেন। এক গভীর রাতে ঢাইম ডিপেনডেন্ট ইরেটা ফাংশান নিয়ে ভাবছিলেন। কুকুরের ডাকে চিন্তা এলােমেলাে হয়ে গেল। তিনি বিরক্ত মুখে হুকুম দিলেন কুকুর দু’টাকে এই মুহূর্তে বিদেয় কর! কুকুর বিয়ে হয়ে গেল। তারপর পাখি পােষার শখ হল। চার পঁচ ধরনের পাখি যােগাড় হল। এক সময় তাদের চিৎকারও অসহ্য বােধ হল। এখন আর পাখি নেই – খাচা পড়ে আছে।
এ বাড়িতে বর্তমানে কোন মানুষ নেই। তিনটি রােবট আছে। তিনটিই কর্মী রােবট। দু’জনের বুদ্ধিশুদ্ধি নিচের দিকে।
Read More