সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১১)

বাদশাহী আংটি 

বাবা যখন বললেন, তাের ধীরুকাকা অনেকদিন থেকে বলছেন—তাই ভাবছি এবার পুজোর ছুটিটা লখনৌতেই কাটিয়ে আসি’—-তখন আমার মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। আমার বিশ্বাস ছিল লখনৌটা বেশ বাজে জায়গা। অবিশ্যি বাবা বলেছিলেন ওখান থেকে আমরা হরিদ্বার লছমনবুলাও ঘুরে আসব, আর লছমনঝুলাতে পাহাড়ও আছে—কিন্তু সে আর কদিনের জন্য ?

 ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড

এর আগে প্রত্যেক ছুটিতে দাজিলিং না হয় পুরী গিয়েছি। আমার পাহাড় ভাল লাগে, আবার সমুদ্রও ভাল লাগে! লখনৌতে দুটোর একটাও নেই। তাই বাবাকে ২৫ 

বললাম, ‘ফেলুদা যেতে পারে না আমাদের সঙ্গে ? 

ফেলুদা বলে ও কলকাতা ছেড়ে যেখানেই যাক না কেন, ওকে ঘিরে নাকি রহস্যজনক ঘটনা সব গজিয়ে ওঠে। আর সত্যিই, দার্জিলিং-এ যেবার ও আমাদের সঙ্গে ছিল, ঠিক সেবারই রাজেনবাবুকে জড়িয়ে সেই অদ্ভুত ঘটনাগুলাে ঘটল। তেমন যদি হয় তা হলে জায়গা ভাল না হলেও খুব ক্ষতি নেই। | বাবা বললেন, ‘ফেলু তাে আসতেই পারে, কিন্তু ও যে নতুন চাকরি নিয়েছে, ছুটি পাবে কি ? 

ফেলুদাকে লখনৌয়ের কথা বলতেই ও বলল, “ফিফটিএইটে গেলাম—ক্রিকেট খেলতে। জায়গাটা নেহাত ফেলনা নয়। বড়ইমামবড়ার ভুলভুলাইয়ার ভেতরে যদি কিস তাে তাের চোখ আর মন একসঙ্গে ধাঁধিয়ে যাবে। নবাব-বাদশাহের কী ইম্যাজিনেশন ছিল–বাপরে বাপ। 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১১)

‘তুমি ছুটি পাবে তাে ? (ফেলুদা আমার কথায় কান না দিয়ে বলল, আর শুধু ভুলভুলাইয়া কেন—গুমতী নদীর ওপর মাঙ্কি ব্রিজ দেখবি, সেপাইদের কামানের গােলায় বিধ্বস্ত রেসিডেন্সি দেখবি । 

‘রেসিডেন্সি আবার কী ? ‘সেপাই বিদ্রোহের সময় গােৱা সৈনিকদের ঘাঁটি ছিল ওটা। কি করতে পারেনি। ঘেরাও করে গােলা দেগে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল সেপাইরা। | দুবছর হল চাকরি নিয়েছে ফেলুদা, কিন্তু প্রথম বছর কোনও ছুটি নেয়নি বলে পনেরাে দিনের ছুটি পেতে ওর কোনও অসুবিধে হল না । 

এখানে বলে রাখি—ফেলুদা আমার মাসতুতো দাদা। আমার বয়স চোদ্দো, আর ওর সাতাশ। ওকে কেউ কেউ বলে আধপাগলা, কেউ কেউ বলে খামখেয়ালি, আবার কেউ কেউ বলে কুঁড়ে । আমি কিন্তু জানি এই বয়সে ফেলুদার মতো বুদ্ধি খুব কম লােকের হয়। আর ওর মনের মতাে কাজ পেলে ওর মতাে খাইতে খুব কম লােকে পারে।

তা ছাড়া ও ভাল ক্রিকেট জানে, প্রায় একশাে রকম ইনডাের গেম বা ঘরে বসে খেলা জানে, তাসের ম্যাজিক জানে, একটু একটু হিপনটিজম জানে, ডান হাত আর বাঁ হাত দুহাতেই লিখতে জানে। আর ও যখন স্কুলে পড়ত তখনই ওর মেমারি এত ভাল ছিল যে ও দুবার রিডিং পড়েই পুরাে দেবতার গ্রাস মুখস্থ করেছিল। 

কিন্তু ফেলুদার যেটা সবচেয়ে আশ্চর্য ক্ষমতা, সেটি হল-~~~-ও বিলিতি বই পড়ে আর নিজের বুদ্ধিতে দারুণ ভিটেটিভের কাজ শিখে নিয়েছে। তার মানে অবশ্যি এই নয় যে চোর ডাকাত খুনি এইসব ধরার জন্য পৃলিশ ফেলুদাকে ডাকে। ও হল যাকে বলে শখের ডিটেকটিভ। 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১১)

সেটা বােঝা যায় যখন একজন অচেনা লােককে একবার দেখেই ফেলুদা তার সম্বন্ধে অনেক কিছু বলে দিতে পারে । 

যেমন লখনৌ স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে ধীরুকাকাকে দেখেই ও আমায় ফিসফিস করে বলল, তাের কাকার বুঝি বাগানের শখ ? | আমি যদি জানতাম ধীরুকাকার বাগানের কথা, ফেলুদার কিন্তু মােটেই জানার কথা নয়, কারণ, যদিও ফেলুদা আমার মাসতুতাে ভাই, ধীরুকাকা কিন্তু আমার আসল কাকা নন, বাবার ছেলেবেলার বন্ধু। 

তাই আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কী করে জানলে ? ফেলুদা আবার ফিসফিস করে বলল, “উনি পিছন ফিরলে দেখবি ওঁর ডান পায়ের জুতাের 

গােড়ালির পাশ দিয়ে একটা গােলাপ পাতার ডগা বেরিয়ে আছে। আর ডান হাতের তর্জনীটায় দেখ টিচার আয়ােডিন লাগানাে । সকালে বাগানে গিয়ে গােলাপ ফুল ঘাঁটার ফল। 

স্টেশন থেকে বাড়ি আসার পথে বুঝলাম লখনৌ শহরটা আসলে খুব সুন্দর। গম্বুজ আর মিনারওয়ালা বাড়ি দেখা যাচ্ছে চারদিকে, রাস্তাগুলো চওড়া আর পরিষ্কার, আর তাতে মােটরগাড়ি ছাড়াও দুটো নতুন রকমের ঘােড়ার গাড়ি চলতে দেখলাম। তার একটার নাম টাঙ্গা আর অন্যটা এক্কা! ‘এক্কা গাড়ি খুব দুটেছে’—এই জিনিসটা নিজের চোখে এই প্রথম দেখলাম ! ধরুকাকার পুরনাে সেভ্রোলে গাড়ি না থাকলে আমাদের হয়তাে ওরই একটাতে চড়তে হত। 

যেতে যেতে ধীরুকাকা বললেন, এখানে না এলে কি বুঝতে পারতে শহরটা এত সুন্দর ? আর কলকাতার মতাে আবর্জনা কি দেখতে পাচ্ছ রাস্তাঘাটে ? আর কত গাছ দেখাে, আর কত ফুলের বাগান।’ | বাবা আর ধীরুকাকা পিছনে বসেছিলেন, ফেলুদা আর আমি সামনে। আমার পাশেই বসে গাড়ি চালাচ্ছে ধীরুকাকার ড্রাইভার দীনদয়াল সিং। ফেলুদা আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, ‘ভুলভুলাইয়ার কথাটা জিজ্ঞেস কর।’ 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১১)

ফেলুদা কিছু করতে বললে সেটা না করে পারি না। তাই বললাম, “আচ্ছা ধীরুকাকা, ভুলভুলাইয়া কী জিনিস ? | ধীরুকাকা বললেন, “দেখবে দেখবে—সব দেখবে। ভুলভুলাইয়া হল ইমামবড়ার ভেতরে একটা গােলকধাঁধা! আমরা বাঙালির অবিশ্যি বলি ঘুলঘুলিয়া; কিন্তু আসল নাম এই ভুলভুলাইয়া । নবাবরা তাঁদের বেগমদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতেন ওই গােলকধাঁধায়।। 

এবার ফেলুদা নিজেই বলল, ওর ভেতরে গাইড ছাড়া ঢুকলে নাকি আর বেরােনাে যায় 

 ‘তাই তাে শুনিচি। একবার এক গােৱাপন—অনেকদিন আগে মদ খেয়ে বাজি ধরে নাকি ঢুকেছিল ওর ভেতরে। বলেছিল কেউ যেন ধাওয়া না করে~~-ও নিজেই বেরিয়ে আসবে { দুদিন পরে ওর মৃতদেহ পাওয়া যায়, ওই গােলকধাঁধার এক গলিতে। 

আমার বুকের ভেতরটা এর মধ্যেই ঢিপঢিপ করতে শুরু করেছে। ফেলুদাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি একা গিয়েছিলে, না গাইড নিয়ে ? ‘গাইড নিয়ে। তবে একাও যাওয়া যায় । ‘সত্যি ? 

আমি তাে অবাক। তবে ফেলুদার পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয়। ‘কী করে একা যাওয়া যায় ফেলুদা ?” 

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১২)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *