দেখলাম আংটিটার উপরে ঠিক মাঝখানে একটা প্রায় চার আনির সাইজের ঝলমলে পাথর–নিশ্চয়ই হিরে-~~আর তাকে ঘিরে লাল নীল সবুজ সব আরও অনেকগুলাে ছােট ছােট পাথর।
এত অদ্ভুত সুন্দর আংটি আমি কোনওদিন দেখিনি।
ফেলুদার দিকে আড়চোখে চেয়ে দেখি সে একটা শুকনাে ইউক্যালিপটাসের পাতা নিয়ে কানের মধ্যে ঢুকিয়ে সেটাকে পাকাচ্ছে, যদিও তার চোখটা রয়েছে আংটির দিকে।বাবা বললেন, ‘দেখে তাে মনে হয় জিনিস্টা পুরনাে। এর কোনও ইতিহাস আছে নাকি ?
শ্রীবাস্তব একটু হেসে আংটিটা বাক্সে পরে বাক্সটা পকেটে রেখে চায়ের পেয়ালাটা আবার হাতে তুলে নিয়ে বললেন, ‘তা একটু আছে। এর বয়স তিনশাে বছরের বেশি। এ আংটি ছিল আওরঙ্গজেবের।’
বাবা চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘বলেন কী ! আমাদের আওরঙ্গজেব বাদশা ?
শাজাহানের ছেলে আওরঙ্গজেব ? শ্রীবাস্তব বললেন, “হ—তবে আওরঙ্গজেব তখনও বাদশা বনেননি। গদিতে শাজাহান । সমরকন্দ দখল করবেন বলে ফৌজ পাঠাচ্ছেন বার বার—আর বার বার ডিফিট হচ্ছে। একবার আওরঙ্গজেবের আন্ডারে ফৌজ গেল। আওরঙ্গজেব মার খেলেন খুব। হয়তাে মরেই যেতেন। এক সেনাপতি সেভ করল। আওরঙ্গজেব নিজের হাত থেকে আংটি খুলিয়ে তাকে দিলেন।‘
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১৩)
‘বাবা ! এ যে একেবারে গল্পের মতাে।’ ‘হাঁ। আর পিয়ারিলাল ওই আংটি কিনলেন ওই সেনাপতির এক বংশধরের কাছ থেকে আগ্রাতে। দাম কত ছিল তা পিয়ারিলাল বলেননি। তবে—দ্যাট বিগ স্টোন ইজ ডায়ামন্ড, আমি যাচাই করিয়ে নিয়েছি। বুঝতেই পারছেন কতাে দাম হােবে।’ | ধীরুকাকা বললেন, ‘কমপক্ষে লাখ দুয়েক। আওরঙ্গজেব না হয়ে যদি জাহান্নন খাঁ হত,
তা হলেও লাখ দেড়েক হত নিশ্চয়ই।’
শ্রীবাস্তব বললেন, তাইলে বলছি কালকের ঘটনার পর খুব আপসেট হয়েছি। আমি একেলা মানুষ, রােগী দেখতে হামেশাই বাইরে যাচ্ছি। আজ যদি পুলিশকে বলি, কাল আমি বাইরে গেলে রাস্তায় কেউ যদি ইট পাটকেল ছুঁড়িয়ে মারে ? একবার ভেবেছিলাম কি কোনও ব্যাঙ্কে রেখিয়ে দিই। তারপর ভাবলাম—এত সুন্দর জিনিস বন্ধুবান্ধবকে দেখিয়েও আনন্দ। ওই জন্যেই তাে রেখে দিলাম নিজের কাছে।
ধীরুকাকা বললেন, ‘অনেককে দেখিয়েছেন ও আংটি ?
মাত্র তিনমাস হল তাে পেলাম। আর আমার বাড়িতে খুব বেশি কেউ তাে আসে না। যাঁরা এলেন বন্ধুলােক, ভদ্রলােক, তাঁদেরই দেখিয়েছি ।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। ইউক্যালিপটাসের মাথায় একটু রােদ লেগে আছে, তাও বেশিক্ষণ থাকবে না। শ্রীবাস্তবকে দেখছিলাম কিছুতেই স্থির হয়ে বসে থাকতে পারছিলেন না।
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১৩)
ধীরুকাকা বললেন, চলুন ভিতরে গিয়ে বসা যাক। ব্যাপার নিয়ে একটু ভাবা দরকার।‘ আমরা সবাই বাগান ছেড়ে গিয়ে বৈঠকখানায় বসলাম। ফেলুদাকে দেখে মনেই হচ্ছিল যে ওর এই আংটির ব্যাপারটা একটুও ইন্টারেস্টিং লাগছে । ও সােফাতে বসেই পকেট থেকে তাসের প্যাকেট বার করে হাতসাফাই প্র্যাকটিস করতে লাগল।
বাবা এমনিতে বেশি কথা বলেন না, কিন্তু যখন বলেন তখন বেশ ভেবেচিন্তে ঠাণ্ডা মাথায় বলেন। বাবা বললেন, “আচ্ছা, আপনি কেন ভাবছেন যে আপনার ওই আংটিটা নিতেই ওর এসেছিল ? আপনার অন্য কোনও জিনিস চুরি যায়নি ? এমনও তাে হতে পারে যে ওরা সাধারণ চোর, টাকাকড়ি নিতেই এসেছিল ?
শ্রীবাস্তব বললেন, ‘ব্যাপার কী বলি। বনবিহারীবাবু আছেন বলে এমনিতেই আমাদের পাড়ায় চোর-টোর আসে না। আর আমার পাশের বাড়িতে থাকেন মিস্টার ঝুনঝুনওয়ালা, আর তার পাশের বাড়িতে থাকেন মিস্টার বিলিমােরিয়া-~-বােথ ভেরি রিচ। আর সেটা তাদের বাড়ি দেখলেই বােঝা যায়। তাদের কাছে আমি কী ? তাদের বাড়ি ছেড়ে আমার বাড়ি আসবে কেন চোর ?
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১৩)
ধীরুকাকা বললেন, তারা যেমন ধনী, তেমনি তাদের পাহারার বন্দোবস্তও নিশ্চয়ই খুব জমকালাে । সুতরাং চোর সে বাড়িতে যাবে কেন ? তারা তাে বিরাট ধনদৌলতের আশায় যাবে না। শ’ পাঁচেক টাকা মারতে পারলে তাদের ছ মাসের খােরাক হয়ে যায়। কাজেই আমার-আপনার বাড়িতে চোর আসার ব্যাপারে অবাক হবার কিছু নেই।’
শ্রীবাস্তব তবু যেন ভরসা পাচ্ছিলেন না। উনি বললেন, “আমি জানি না মিস্টার সানিয়াল—আমার কেন জানি মনে হচ্ছে চোর ওই আংটি নিতেই এসেছিল। আমার পাশের ঘরের একটা আলমারি খুলেছিল। দেরাজ খুলেছিল। তাতে অন্য জিনিস ছিল। নিতে পারত। টাইম ছিল আমার ঘুম ভাঙতে চোর পালিয়ে গেলাে, একেবারে কিছু না নিয়ে। আর, কথা কী জানেন ?–
শ্রীবাস্তব হঠাৎ থামলেন । তারপর ভ্রুকুটি করে কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, “পিয়ারিলাল যখন আমাকে আংটি দিয়েছিলেন, তখন মনে হল কী—-উনি আংটি নিজের বাড়িতে রাখতে চাইলেন না। তাই আমাকে দিয়ে দিলেন। আউর-~
শ্রীবাস্তব আবার থেমে কুটি করলেন। ধীরুকাকা বললেন—-‘আউর কেয়া, ডক্টরজি ?
Read More