শ্রীবাস্তব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “দ্বিতীয়বার যখন হার্ট অ্যাটাক হল, আর আমি ওঁকে দেখতে গেলাম, তখন উনি একটা কিছু আমাকে বলতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলে না। তবে একটা কথা আমি শুনতে পেয়েছিলাম ।
“কী কথা ? ‘দুবার বলেছিলেন—“এ স্পাই… “এ স্পাই…”।
ধী»োকা সােফা ছেড়ে উঠে পড়লেন।
না ডক্টরজি-পিয়ারিলাল যাই বলে থাকুক—আমার দৃঢ় বিশ্বাস ও চোর সাধারণ চোর, ছ্যাঁচড় চোর। আপনি বােধহয় জানেন না, ব্যারিস্টার ভূদেব মিত্তিরের বাড়িতেও রিসেন্টলি চুরি হয়ে গেছে। একটা আস্ত রেডিয়াে আর কিছু রুপাের বাসন-কোসন নিয়ে গেছে। তবে আপনার যদি সত্যিই নাভাস লাগে, তা হলে আপনি ও আংটি স্বচ্ছন্দে আমার জিম্মায় রেখে যেতে পারেন। আমার গােদরেজের আলমারিতে থাকবে ওটা, তারপর আপনার ভয় কেটে গেলে পর আপনি ওটা ফেরত নিয়ে যাবেন।
শ্রীবাস্তব হঠাৎ হাঁফ ছেড়ে একগাল হেসে ফেললেন। ‘আমি ওই প্রস্তাব করতেই এলাম, লেকিন নিজে থেকে বলতে পারছিলাম না । থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ, মিস্টার সানিয়াল } আপনার কাছে আংটি থাকলে আমি নিশ্চিন্ত থাকব।’
শ্রীবাস্তব তাঁর পকেট থেকে আংটি বার করে ধীরুকাকাকে দিলেন, আর ধীরুকাকা সেটা নিয়ে শােবার ঘরে চলে গেলেন।
এইবার ফেলুদা হঠাৎ একটা প্রশ্ন করে বসল। বনবিহারীবাবু কে ? ‘পার্ডন? শ্রীবাস্তব বােধহয় একটু অন্যমনস্ক ছিলেন ।
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১৪)
ফেলুদা বলল, ‘আপনি বললেন না যে, বনবিহারীবাবু পাড়ায় আছেন বলে চোর–টোর আসে না—এই বনবিহারীবাবুটি কে ? পুলিশ–টুলিশ নাকি ? | শ্রীবাস্তব হেসে বললেন, ‘ও নাে নাে । পলিশ না। তবে পলিশের বাড়া। ইন্টারেস্টিং লােক । আগে বাংলাদেশে জমিদারি ছিল। তারপর সেটা গেল—আর উনি একটা ব্যবসা শুরু করলেন। বিদেশে জানােয়ার চালান দেবার ব্যবসা।‘ ‘জানােয়ার ? বাবা আর ফেলুদা একসঙ্গে প্রশ্ন করল।
‘হাঁ। টেলিভিশন, সাকাস, চিড়িয়াখানা—এইসবের জন্য এদেশ থেকে অনেক জানােয়ার চালান যায় ইউরােপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, এইসব জায়গায়। অনেক ইন্ডিয়ান এই ব্যবসা করে। বনবিহারীবাবু ওতে অনেক টাকা করেছিলেন। তারপর রিটায়ার করে এখানে চলে এলেন আজ দু-তিন বছর। আর আসার সময় সঙ্গে কিছু জানােয়ার ভি নিয়ে এসে একটা বাড়ি কিনে সেখানে একটা ছােটখাটো চিড়িয়াখানা বানিয়ে নিলেন।
বাবা বললেন, বলেন কী—ভারী অদ্ভুত তাে । ‘হাঁ । আর ওই চিড়িয়াখানার স্পেশালিটি হল কি, ওর প্রত্যেক জানােয়ার হল ভারী…ভারী…কী বলে—
‘হিংস্র ? ‘হাঁ, হাঁহিংস্র।’
লখনৌতে এমনিতেই যে চিড়িয়াখানাটা আছে সেটা শুনেছি খুব ভাল। ওখানে বাঘ সিংহ নাকি খাঁচায় থাকে না। জাল দিয়ে ঘেরা দ্বীপের মতন তৈরি করা আছে, তার মধ্যে মানুষের তৈরি পাহাড় আর গুহার মধ্যে থাকে ওরা। তার উপর আবার এই প্রাইভেট চিড়িয়াখানা !
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১৪)
শ্রীবাস্তব বললেন, ‘ওয়াইল্ড ক্যাট আছে ওঁর কাছে। হাইনা আছে, কুমির আছে, স্করপিয়ন আছে। আওয়াজ শুনা যায় । চোর আসবে কী করিয়ে ?
এর পরে আমি যেটা জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম, ফেলুদা আমার আগেই সেটা জিজ্ঞেস করে ফেলল।
‘চিড়িয়াখানাটা একবার দেখা যায় না ?
ধীরুকাকা ঠিক এই সময় ঘরে ফিরে এসে বললেন, সে তাে খুব সহজ ব্যাপার । যে কোনও দিন গেলেই হল। উনি মানুষটি মােটেই হিংস্র নন।’ | শ্রীবাস্তব উঠে পড়লেন। বললেন, ‘লাটুশ রােডে আমার এক পেশেন্ট আছে। আমি
চলি।’ | আমরা সবাই শ্রীবাস্তবের সঙ্গে গেটের বাইরে অবধি গেলাম। ভদ্রলােক সকলকে গুড নাইট করে ধীরুকাকাকে আবার ধন্যবাদ জানিয়ে ওঁর ফিয়াট গাড়িতে উঠে চলে গেলেন। বাবা আর ধীরুকাকা বাড়ির দিকে রওনা দিলেন । ফেলুদা সবে একটা সিগারেট ধরাতে যাচ্ছে, এমন সময় হুশ করে একটা কালাে গাড়ি আমাদের সামনে দিয়ে শ্রীবাস্তবের গাড়ির দিকে চলে গেল।
ফেলুদা বলল, স্ট্যান্ডার্ড হেরাল্ড। নম্বরটা মিস্ করে গেলাম। আমি বললাম, নম্বর দিয়ে কী হবে ? মনে হল শ্রীবাস্তবকে ফলাে করছে। রাস্তায় ওদিকটা কেমন অন্ধকার দেখছিস ?
ওইখানে গাড়িটা ওয়েট করছিল। আমাদের গেটের সামনে গিয়ার চেঞ্জ করল দেখলি না ?
এই বলে ফেলুদা রাস্তা থেকে বাড়ির দিকে ঘুরল। বাড়ির গেট থেকে প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে ! আমার আন্দাজ আছে, কেননা আমি স্কুলে অনেকবার হান্ড্রেড ইয়ার্ডস দৌড়েছি। ধীরুকাকার বৈঠকখানায় বাতি জ্বলছে। জানালা দিয়ে ভিতরের দরজাটাও দেখা যাচ্ছে। বাবা আর ধীরুকাকাকে দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকতে দেখলাম। ফেলুদা দেখি হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে সেই জানালার দিকে দেখছে। ওর চোখে শূকুটি আর দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ানাের ভাবটা দেখে বুঝলাম ও চিন্তিত।
‘জানিস তােপসে–
আমার ডাকনাম কিন্তু আসলে ওটা নয়। ফেলুদা তপেশ থেকে তােপসে করে নিয়েছে। আমি বললাম, “কী ? ‘আমি থাকতে এ ভুলটা হবার কোনও মানে হয় না।’
Read More