রাজেনবাবু বললেন, “আমার চাকরটার পাহারা দেবার কথা ছিল, কিন্তু আমি নিজেই কাল দশটার সময় তাকে ছুটি দিয়ে দিয়েছি। ওর বাড়িতে খুব অসুখ। বুড়াে বাপ আছে, তার এখন-তখন অবস্থা !’

ফেলুদা বলল, ‘মাস্কটা কেমন ছিল মনে আছে ? রাজেনবাবু বললেন, ‘খুবই সাধারণ নেপালি মুখােশ, দার্জিলিং শহরেই অন্তত আরও তিন-চার শ খোঁজ করলে পাওয়া যাবে। আমার এই ঘবেই তাে আরও পাঁচখানা রয়েছে—ওই যে, দ্যাখাে-না!’
রাজেনবাবু যে মুখােশটার দিকে আঙুল দেখালেন, ঠিক সেই জিনিসটা কাল ফেলুদা আমার জন্য কিনে দিয়েছে। তিনকড়িবাবু এতক্ষণ বেশি কথা বলেননি, এবার বললেন, “আমার মতে এবার বােধহয় পুলিশে একটা খবর দেওয়া উচিত। একটা প্রােটেকশনেরও তাে দরকার । কাল যা ঘটেছে, তার পরে তাে আর ব্যাপারটাকে ঠাট্টা বলে নেওয়া চলে না।
ফেলুবাবু, তুমি তােমার নিজের ইচ্ছে মতাে তদন্ত চালিয়ে যেতে পারাে, তাতে তােমায় কেউ বাধা দেবে না। কিন্তু আমি সব দিক বিবেচনা করে বলছি, এবার পুলিশের সাহায্য নেওয়া দরকার। আমি বরং যাই, গিয়ে একটা ডায়েরি করে আসি। প্রাণের ভয় আছে বলে মনে হয় না, তবে রাজেনবাবু, আপনার ঘটাটা একটু সাবধানে রাখবেন।’
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-৯)
আমরা যখন উঠছি, তখন ফেলুদা রাজেনবাবুকে বলল, “ তিকড়িবাবু তাে চলে যাচ্ছেন। তার মানে আপনার একটি ঘর খালি হয়ে যাচ্ছে। আমরা যদি আজ রাতটা ও ঘরে এসে থাকি, তা হলে আপনার কোনও আপত্তি আছে কি ?
রাজেনবাবু বললেন, ‘মােটেই না! আপত্তি কী ? তুমি তাে হলে আমার প্রায় আত্মীয়ের মতাে। আর সত্যি বলতে কী, যত বুড়াে হচ্ছি তত যেন সাহসটা কমে আসছে। ছেলেবয়সে দুরস্ত হলে নাকি বুড়াে বয়সে মানুষ মাদা মেরে যায়।’
তিনকড়িবাবুকে ফেলুদা বলল সেশনে ওঁকে সি-অফ করতে যাবে। ফেরার পথে যখন নেপাল কিউরিও শপের পাশ দিয়ে যাচ্ছি, তখন আমাদের দুজনেরই চোখ গেল দোকানের ভিতর।
দেখলাম দুজন ভদ্রলােক দোকানের ভিতর জিনিসপত্র দেখছে আর পরস্পরের সঙ্গে কথা বলছে। দেখে মনে হয় দুজনের অনেক দিনের আলাপ।
একজন অবনী ঘােষাল, আর একজন প্রবীর মজুমদার। আমি ফেলুদার দিকে চাইলাম। তার মুখের ভাব দেখে মনে হল না সে কোনও আশ্চর্য জিনিস দেখেছে। সাড়ে দশটার সময় স্টেশনে গেলাম তিনকড়িবাবুকে গুড বাই করতে। উনি এলেন আমাদেরও পাঁচ মিনিট পরে ।
চড়াই উঠে উঠে পায়ে ব্যথা হয়ে গেছে তাই আস্তে হাঁটতে হল। ‘ সত্যিই ভদ্রলােক একটু খোঁড়াচ্ছিলেন।
নীল রঙের ফার্স্ট ক্লাস কামরায় উঠে তিড়িবাবু তাঁর অ্যাটাচিকেস খুলে একটা ব্রাউন কাগজের প্যাকেট ফেলুদাকে দিলেন।
‘এটা কিনতেও একটু সময় লাগল । রাজেনবাবু তাে আর কিউরিওর দোকানে যেতে পারলেন না, অথচ কাল সত্যিই অনেক ভাল জিনিস এসেছে। তার থেকে একটি সামান্য জিনিস বাছাই করে ওঁর জন্যে এনেছি। তােমরা আমার নাম করে শুভেচ্ছা জানিয়ে ওঁকে দিয়ে দিও।’
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-৯)
ফেলুদা প্যাকেটটা নিয়ে বলল, আপনার ঠিকানা দিয়ে গেলেন না ? মিস্ট্রিটা সলভ করে আপনাকে জানিয়ে দেব ভাবছিলাম যে।’ | তিনকড়িবাবু বললেন, “আমার প্রকাশকের ঠিকানাটা আমার বইতেই পাবে—তার কেয়ারে
লিখলেই চিঠি আমার কাছে পৌছে যাবে। গুড লাক!
ট্রেন ছেড়ে দিল। ফেলুদা আমাকে বলল, লােকটা বিদেশে জন্মালে দারুণ নাম আর পয়সা করত। পর পর এতগুলাে ভাল রহস্য উপন্যাস খুব কম লােকেই লিখেছে।’ | সারা দিন ধরে ফেলুদা রাজেনবাবুর ব্যাপারটা নিয়ে নানান জায়গায় ঘােরাফেরা করল। আমি অনেক করে বলতেও আমাকে সঙ্গে নিল না। সন্ধেবেলা যখন রাজেশবাবুর বাড়ি যাচ্ছি, তখন ফেলুদাকে বললাম, কোথায় কোথায় গেলে সেইটে অন্তত বলবে তাে ?
ফেলুদা বলল, ‘দুবার মাউন্ট এভারেস্ট হােটেল, একবার ফণী মিত্তিরের বাড়ি, একবার নেপাল কিউরিও শপ, একবার লাইব্রেরি, আর এ ছাড়াও আরও কয়েকটা জায়গা।
‘আর কিছু জানতে চাস ? ‘অপরাধী কে বুঝতে পেরেছ ? ‘এখনও বলার সময় আসেনি। ‘কাউকে সন্দেহ করেছ ? ‘ভাল ডিটেটিভ হলে প্রত্যেককেই সন্দেহ করতে হয়।’
প্রত্যেককে মানে ? ‘এই ধর—তুই।’
‘যার কাছে এই মুখােশ আছে, সে-ই সন্দেহের পাত্র, সে যে-লােকই হােক ।
তা হলে তুমিই বা বাদ যাবে কেন ? ‘বেশি বাজে বকিসনি।’ ‘বা রে—তুমি যে রাজেনবাবুকে আগে চিনতে, সে কথা তাে গােড়ায় বলােনি। তার
মানে সত্য গােপন করেছ । আর আমার মুখােশ তো ইচ্ছে করলে তুমিও ব্যবহার করতে পারাে-হাতের কাছেই থাকে।’
শাটা, শাটা ।
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-৯)
রাজেনবাবুকে এ বেলা দেখে তবু অনেকটা ভাল লাগল । কেমন আছেন জিজ্ঞেস করতে বললেন, ‘দুপুরের দিকটা বেশ ভাল বােধ করছিলাম। যত সন্ধে হয়ে আসছে ততই যেন কেমন অসােয়াস্তি লাগছে।’
ফেলুদা তিনকড়িবাবুর দেওয়া প্যাকেটটা রাজেনবাবুকে দিল । সেটা খুলে তার থেকে একটা চমৎকার বুদ্ধের মাথা বের হল। সেটা দেখে রাজেনবাবুর চোখ ছলছল করে এল । ধরা গলায় বললেন, ‘খাশা জিনিস, খাশা জিনিস!
ফেলুদা বলল, “পুলিশ থেকে লােক এসেছিল ? ‘আর বলাে না। এসে বত্রিশ রকম জেরা করলে। কর কী হদিস পাবে জানি না, তবে আজ থেকে বাড়িটা ওয়াচ করার জন্য লােক থাকবে, সেই যা নিশ্চিন্তি। সত্যি বলতে কী, তােমরা হয়তো না এলেও চলত।’
ফেলুদা বলল, ‘স্যানাটোরিয়ামে বড় গােলমাল। এখানে হয়তাে চুপচাপ আপনার কেসটা নিয়ে একটু ভাবতে পারব।’
Read More