রাজেনবাবু বললেন, ‘ইচ্ছে তো আছে।’ অনীবাণু বেরিয়ে যাওয়ার পর ফেলুদা রাজেনবাবুকে বলল, কটা দিন একটু না বেরিয়ে-টেরিয়ে সাবধানে থাকা উচিত নয় কি ?
‘সেটাই বােধ হয় ঠিক। কিন্তু মুশকিল কী জান ? সেই চিঠির ব্যাপারটা এতই অবিশ্বাস্য যে, এটাকে ঠিক যেন সিরিয়াসলি নিতেই পারছি না। মনে হচ্ছে এটা যেন একটা ঠাট্টা—যাকে বলে প্র্যাকটিক্যাল জোক।
‘যদ্দিন না সেটা সম্বন্ধে ডেফিনিট হওয়া যাচ্ছে, তুদ্দিন বাড়িতেই থাকুন না। আপনার নেপালি চাকরটা কদ্দিনের ?
‘একেবারে গােড়া থেকেই আছে । কমপ্লিটলি রিলায়েবল।’
ফেলুদা এবার তিনকড়িবাবুর দিকে ফিরে বলল, আপনি কি বেশির ভাগ সময় বাড়িতেই থাকেন ?
‘সকাল বিকেল ঘণ্টাখানেক একটু এদিক-ওদিক ঘুরে আসি আর কী। কিন্তু বিপদ যদি ঘটেই, আমি বুড়াে মানুষ খুব বেশি কিছু করতে পারি কি ? আমার বয়স হল চৌষট্টি, রাজেনবাবুর চেয়ে এক বছর কম।’
রাজেনবাবু বললেন, “উনি চেঞ্জে এসেছেন, ওঁকে আর বাড়িতে বন্দি করে রাখার ফন্দি করছ কেন তােমরা ? আমি থাকব, আমার চাকর থাকবে, এই যথেষ্ট। তােমরা চাও তাে দু
বেলা খোঁজ-খবর নিয়ে যেয়ো এখন।
‘বেশ তাই হবে। ‘ ফেলুদার দেখাদেখি আমিও উঠে পড়লাম।
আমরা যেখানে বসেছিলাম তার উলটোদিকেই একটা ফায়ারপ্লেস। ফায়ারপ্লেসের উপরেই একটা তাক, আর সেই তাকের উপর তিনটে ফ্রেমে-বাঁধানাে ছবি। ফেলুদা ছবিগুলাের দিকে এগিয়ে গেল।
প্রথম ছবিটা দেখিয়ে রাজেনবাবু বললেন, “ইনি আমার স্ত্রী। বিয়ের চার বছর পরেই মারা গিয়েছিলেন।’
দ্বিতীয় ছবি, একজন আমার বয়সী ছেলের, গায়ে ভেলভেটের কোট।
ফেলুদা জিজ্ঞেস করল, এটি কে ? রাজেনবাবু হাে হাে করে হেসে বললেন, ‘সময়ের প্রভাবে মানুষের চেহারার কী বিচিত্র। পর্বিবর্তন ঘটতে পারে, সেইটে বােঝানাের জন্য এই ছৰি । উনি হচ্ছেন আমারই বাল্য সংস্করণ। বাঁকুড়া মিশনারি স্কুলে পড়তাম তখন। আমার বাবা ছিলেন বাঁকুড়ার ম্যাজিস্ট্রেট।’
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-৪)
সত্যি, ভারী ফুটফুটে চেহারা ছিল রাজেনবাবুর ছেলেবয়সে। ‘অবিশ্যি, ছবি দেখে ভালাে না। দূরন্ত বলে ভারী বদনাম ছিল আমার। শুধু যে মাস্টারদের জ্বালিয়েছি তা নয়, ছাত্রদেরও। একবার স্পাের্টসের দিন হান্ড্রেড ইয়ার্ডস-এ
আমাদের বেস্ট রানারকে কাত করে দিয়েছিলাম, ল্যাং মেরে।
তৃতীয় ছবিটা ফেলুদার বয়সী একজন ছেলের। রাজেনবাবু বললেন, সেটা তাঁর একমাত্র ছেলে প্রবীরের।
‘উনি এখন কোথায় ?
রাজেনবাবু গলা খাঁকরিয়ে বললেন, “জানি না ঠিক। বহুকাল দেশ ছাড়া। প্রায় সিক্সটিন ইয়ার্স।
“আল্পনার সঙ্গে চিঠি লেখালেখি নেই ? ‘নাঃ। ফেলুদা দরজার দিকে এগােতে এগােতে বলল, “ভারী ইন্টারেস্টিং কেস। আমি মনে মনে বললাম, ফেলুদা একেবারে বইয়ের ডিটেকটিভের মতাে কথা বলছে। বাইরেটা ছমছমে অন্ধকার হয়ে এসেছে। জলাপাহাড়ের গায়ের বাড়িগুলােতে বাতি জ্বলে উঠেছে। পাহাড়ের নীচের দিকে চেয়ে দেখলাম রক্ষিত উপত্যকা থেকে কুয়াশা ওপর দিকে উঠছে।
রাজেনবাবু আর তিনকড়িবাবু আমাদের সঙ্গে গেট অবধি এলেন। রাজেনবাবু গলা নামিয়ে ফেলুদাকে বললেন, তুমি ছেলেমানুষ, তাও তােমাকে বলছি—একটু যে নারভাস বােধ করছি না তা নয়। এমন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এ-চিঠি যেন বিনামেঘে বজ্রপাত।’
ফেলুদা বেশ জোরের সঙ্গেই বলল, “আপনি কিছু ভাববেন না। আমি এর সমাধান করবই। আপনি নিশ্চিন্তে বিশ্রাম করুন গিয়ে।
রাজেনবাবু ‘গুডনাইট অ্যান্ড থ্যাঙ্ক ইউ’ বলে চলে গেলেন।
এবার তিনকড়িবাবু ফেলুদাকে বললেন, তােমার–তােমাকে “তুমি” করেই বলছি—তোমার অবজারভেশনের ক্ষমতা দেখে আমি সত্যিই ইমপ্রেসড় হইচি। ডিটেকটিভ গল্প আমিও অনেক পড়িচি। এই চিঠিটার ব্যাপারে আমি হয়তাে তোমাকে কিছুটা সাহায্যও করতে পারি।’
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-৪)
তাই নাকি ? ‘এই যে টুকরাে টুকরাে ছাপা কথা কেটে চিঠিটা লেখা হয়েছে, এর থেকে কী বুঝলে বলে তাে ? | ফেলুদা কয়েক সেকেন্ড ভেবে বলল, এক নম্বর-~~কথাগুলাে কাটা হয়েছে খুব সম্ভব ব্রেড দিয়ে কাঁচি দিয়ে নয়।
‘ভেরি গুড।’ ‘দুই নম্বর-~-কথাগুলো নানারকম বই থেকে নেওয়া হয়েছে–কারণ হরফ ও কাগজে তফাত রয়েছে।’
‘ভেরি গুড়। সেই সব বই সম্বন্ধে কোনও আইডিয়া করে? ‘চিঠির দুটো শব্দ ‘শাস্তি” আর “প্রস্তুত’—মনে হচ্ছে খবরের কাগজ থেকে কাটা। ‘আনন্দবাজার। ‘তাই বুঝি ?
ইয়েস। ওই টাইপটা আনন্দবাজারেই ব্যবহার হয়–অন্য বাংলা কাগজে নয়। আর অন্য কথাগুলােও কোনওটাই পুরনাে বই থেকে নেওয়া হয়নি, কারণ যে হরফে ওগুলাে ছাপা, সেটা হয়েছে, মাত্র পনেরাে-বিশ বছর । …আর যে আঠা দিয়ে আটকানাে হয়েছে সেটা সম্বন্ধে কোনও ধারণা করেছ ?
Read More