আহসান সিগারেট ধরাল। খালি পেটে সিগারেট টানতে ভালো লাগছে না। মুখ বন্ধ করে বারান্দায় বসে থাকাও বিরক্তিকর। বড় মেয়েটি এখন আবার কাঁদতে শুরু করেছে। কাঁদছে নিঃশব্দে। এবং খুব চেষ্টা করছে নিজেকে আড়াল করে রাখতে। ছোট মেয়ে দুটি বোনের গা ঘেঁষে বসে আছে এবং এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে বোনের দিকে। এদের ভাব-ভঙ্গি থেকে মনে হচ্ছে এরাও কাঁদতে শুরু করবে। আহসানের কারণে সংকোচ বোধ করছে বলে কাঁদছে না।
রাস্তায় ট্রাকের আলো দেখা যাচ্ছে। সম্ভবত জালাল মিয়া ট্রাক নিয়ে আসছে। মেয়ে তিনটি উঠে দাঁড়িয়েছে। গভীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে রাস্তার দিকে। বড় মেয়েটি বলল, আপনি এখন যেতে পারেন, জালাল এসেছে।আহসান নিজের ঘরে চলে এল। সিঁড়ি দিয়ে উঠবার সময় মনে হল—জালাল কী খবর আনল জানা দরকার ছিল। অতি সাধারণ ভদ্রতা। কেন জানি ভদ্রতাটা করা হল না।
মেয়েদের সঙ্গে আলাপে সে করিম সাহেবের প্রসঙ্গ আনে নি। এটাও অন্যায় হয়েছে। খুবই অন্যায়। এ্যাক্সিডেন্ট কীভাবে হল এইসব জিজ্ঞেস করা দরকার ছিল।দরজায় খুট-খুট শব্দে টোকা পড়ছে। আহসান দরজা খুলল, জালাল মিয়া দাঁড়িয়ে আছে।বিরক্ত করলাম প্রবেসার সাব।না-বিরক্তের কিছু না। উনার খবর কি?
খবর খারাপ। মেয়েগুলিরে নিতে আসছি। রাতে আর ফিরব না। আপনারে বলে গেলাম। একটু লক্ষ রাখবেন।রাখব, লক্ষ রাখব।যা মুশকিলে পড়লাম ভাইজান—মেয়েগুলি খুব কানতেছে। আচ্ছা যাই। আপনার কাছে সিগারেট আছে? থাকলে একটা দেন।প্যাকেটে দুটি সিগারেট ছিল। আহসান প্যাকেটটাই হাতে তুলে দিল।বিপদের উপরে বিপদ বুঝলেন বেসার সাব। আমার হেল্লার ব্যাটারে কুত্তায় কামড় দিছে। পনরখান ইনজিকশন লাগে। কি সমস্যা চিন্তা করেন দেহি।
সিগারেটের প্যাকেটটা দিয়ে দেওয়া ভুল হয়েছে। আহসানের ধারণা ছিল ড্রয়ারে একটা নতুন প্যাকেট আছে, এখন দেখা যাচ্ছে নতুন প্যাকেট নেই। পুরনো চিঠি-পত্ৰ, একটা মোমবাতি, এক প্যাকেট নতুন দেয়াশলাই ছাড়া ড্রয়ার পুরোপুরি শূন্য। রাত বাজছে এগারটা পঁচিশ। সিগারেটের জন্যে হেঁটে-হেঁটে রাস্তার মোড় পর্যন্ত যেতে হবে। প্রায় বিশ মিনিটের পথ। যে পাগলা কুকুর ড্রাইভারের হেপ্পারকে কামড়েছে সে নিশ্চয়ই এই অঞ্চলেরই বাসিন্দা।
সুযোগ পেলে তাকেও কামড়াবে। পাগলা কুকুরের নিয়ম হচ্ছে সাত জনকে কামড়ানো। তারিন তাই বলত। অদ্ভুত-অদ্ভুত সব তথ্য তারিনের মাথায়। বিড়াল নাকি চোখ ফোটার আগে তার বাচ্চাকে সাত বাড়ি ঘুরিয়ে আনে। জোড় বাচ্চা রাখে না। যে বিড়ালের চারটা বাচ্চা সে একটাকে মেরে সংখ্যা বিজোড় করে ফেলে। কোত্থেকে সে এইসব যোগাড় করত কে জানে?
খিদে লেগেছে। ভাত খাবার পর একটা সিগারেট খাওয়া যাবে না—এই চিন্তাটি তাকে অস্থির করে তুলল। আকাশের অবস্থাও ভালো না। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঝড়-বৃষ্টির সময়। অথচ যেতে হবে ছাতা ছাড়া। প্রতি বর্ষাতেই তাকে একটি করে ছাতা কিনতে হয়। এবারের ছাতাটি সে গত সপ্তাহে কিনেছে। একদিন মাত্র ব্যবহার করেছে। তারপরই ছাতা নিখোঁজ। আরেকটি কিনতে ইচ্ছে হচ্ছে না। এই বৰ্ষা ভিজেই কাটুক। আহসান খুলে ফেলা জুতো আবার পরতে বসল, সিগারেট না আনলেই নয়। নেশার জিনিস ফুরিয়ে গেলে খুব অস্থির লাগে।
জায়গাটার আসলেই একটা রহস্য আছে। গন্ধটা এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না। সে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করল। যদি পাওয়া যায়। অপেক্ষাটা বিপজ্জনক-আকাশের অবস্থা বেশ খারাপ। বাতাস বন্ধ হয়ে গেছে। লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে তুমুল বৰ্ষণ হবে। কিন্তু জায়গাটা ছেড়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। কেন মাঝেমাঝে চমৎকার একটা গন্ধ এজায়গাটায় পাওয়া যায়? কারো সঙ্গে ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করলে হয়। আলাপের জন্যে বিষয়টি অবশ্যি খুবই তুচ্ছ।
তবু মাঝে-মাঝে তুচ্ছ জিনিস নিয়ে আলাপ করতে ইচ্ছে করে। চার বছর আগে তারিন ছিল। যেকোনো তুচ্ছ জিনিস নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আলাপ করা যেত তার সঙ্গে। চমৎকার সময় কাটত। একবার তারিন নিউমার্কেটে যাবার পথে দেখল একটা মহিষকে ঠেলাগাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছে। সে বাসায় ফিরল দারুণ উত্তেজিত হয়ে।আজ একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম-মহিষকে ঠেলাগাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছে।আহসান হাই তুলে বলল, এটা অদ্ভুত কিছু না।
গরু-মহিষকে প্রায়ই ঠেলাগাড়িতে করে নিয়ে যায়। এরা হাঁটতে পারে না বলে এই ব্যবস্থা। তুমি যদি দেখতে একটা বাঘকে ঠেলাগাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছে তাহলেও একটা কথা ছিল।মহিষটা অসুস্থ না, খুবই সুস্থ।সুস্থ হলে একে ঠেলাগাড়িতে করে নিয়ে যাবে কেন?
তারিন হাসতে-হাসতে বলল, আমি জানি কেন নিয়ে যাচ্ছে। তুমি যদি বলতে পার তাহলে তোমার জন্যে পুরস্কার আছে।কী পুরস্কার আগে বল।না—আগে-ভাগে বলা যাবে না।তুমি যদি একটি বিশেষ পুরস্কার আমাকে দাও তাহলে চেষ্টা করে দেখতে রাজি আছি।কি অসভ্যতা করছ?
ছি।অসভ্যতা কি করলাম? আমি একটি বিশেষ পুরস্কারের কথা বলছি। এর বেশি। তো কিছু বলি নি।থাক তোমাকে কিছু বলতে হবে না।রাগ করে উঠে চলে যায় তারিন।সেই রাগ ভাঙাতে আহসানকে যথেষ্ট কষ্ট করতে হয়। শেষ পর্যন্ত রাগ ভাঙে এবং আহসান অনুমান করতে চেষ্টা করে কেন মহিষটিকে ঠেলাগাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছে।মহিষটার একটা পা ছিল খোঁড়া?
হল না।গাড়ির নিচে পড়ে জখম হয়েছে, হাঁটতে পারছে না তাই— হল না।মহিষটা সম্ভবত বিয়ে করতে যাচ্ছে— ফাজলামি করবে না ঠিকমতো বল।পারছি না। তুমি বলে দাও।মহিষটার একটা ছোট্ট বাচ্চা আছে। বাচ্চাটা হাঁটতে পারে না বলে বাচ্চা এবং মা ঠেলাগাড়িতে করে যাচ্ছে। এই সহজ জিনিসটা বলতে পারলে না? তুমি বলছ মহিষ। মহিষ হচ্ছে পুংলিঙ্গ। ম্যাসকুলিন জেন্ডার। আমি বুঝব কী করে এর একটা বাচ্চা আছে? মহিষ-এর স্ত্রীলিঙ্গ কী?
মহিষী কিংবা মহিষিনী কিংবা মহিলা মহিষ।ওমা তুমি জান না নাকি? না, জানি না।প্রফেসর মানুষ আর এই সাধারণ জিনিসটা তুমি জান না? আমি কি বাংলার প্রফেসর নাকি যে জানব? আমি হচ্ছি যুক্তিবিদ্যার অধ্যাপক।যুক্তিবিদ্যা তো তুমি আরো কম জান।কী করে বুঝলে?
আমার সঙ্গে তো কোনো যুক্তিতেই তুমি পার না।অর্থহীন কথা। বলার জন্যেই কথা বলা। এর বেশি কিছু না। কিন্তু কি অপূর্ব ছিল সেই অর্থহীন কথাবার্তা। তারিন যদি আজ থাকত তাহলে নিশ্চয়ই এই হঠাৎ আসা গন্ধের রহস্য বের করে ফেলত। কোনো এক রাতে ঘুমুতে যাবার আগে কৃত্রিম একটা হাই তুলে বলত, গন্ধ-রহস্যের সমাধান হয়েছে।কী সমাধান?
আজ বলা যাবে না ঘুম পাচ্ছে।আহ, বল না।বললাম তো ঘুম পাচ্ছে।আরেকবার হাই তুলে এমন ভাব করত যাতে মনে হতে পারে সত্যি-সত্যি ঘুম পেয়েছে।আহসান অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। ছোট ছোট কয়েকটি বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে পড়েছে। এখানে দাঁড়িয়ে থাকার মানে হয় না। রাত অনেক হয়েছে। বৃষ্টিবাদলা দেখলে দোকানপাট বন্ধ করে দোকানীরা বাড়ি চলে যাবে। মস্তান ধরনের ছেলেপুলে বোতল হাতে নিরিবিলি জায়গার খোঁজে আসবে এদিক দিয়েই। এটি মোটামুটি নির্জন অঞ্চল। ঘরবাড়ি তৈরি হচ্ছে এরকম একটি ঘরে তাদের আসর বসবে।
এ-জাতীয় একটি দলের সামনে একবার আহসান পড়ে গিয়েছিল। রাত বেশি হয়। নি, দশটা-সাড়ে দশটা। পাঁচ-ছটি ছেলের একটা দল একটি মেয়ের হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটি যেতে চাচ্ছে না। ল্যাম্প-পোস্টের আলোয় মেয়েটিকে চমৎকার লাগছে। রোগা, লম্বা একটি মেয়ে, কচি মুখ। এসব ক্ষেত্রে কোনোরকম কথা না-বলাই বিচক্ষণতার লক্ষণ। কিন্তু আহসান, অসম্ভব সাহস দেখাল। কড়া গলায় বলল এ্যাই, কী ব্যাপার? কী হচ্ছে?
দলটি থেমে গেল। মেয়েটি হাত ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করছে। যে তার হাত ধরে আছে সে চিকন গলায় বলল, আপনি যা ভাবছেন তা না ব্রাদার। ভদ্রঘরের মেয়ে না। ট্রিপ দেওয়া মেয়ে। জায়গায়-জায়গায় ট্রিপ দেয়। একসঙ্গে বেশি কাস্টমার দেখে ঘাবড়ে গেছে।বলার ভঙ্গিটি এতই কুৎসিত যে গা জ্বালা করে। কিন্তু জ্বালা করা পর্যন্তই। কিছুই করবার নেই। তবে ঐ মেয়েটি আজেবাজে ধরনের মেয়েই ছিল।
কারণ আহসান দেখল মেয়েটি বেশ সহজভাবেই যাচ্ছে। তাকে আর আগের মতো টেনে-হিচড়ে নিতে হচ্ছে না। অল্প বয়সের এ-রকম সুশ্রী একটি মেয়ের একি দুর্দশা! মেয়েটি যেতে যেতে একবার বলল, এমুন করেন ক্যান? যাইতেছি তো। সকাল সকাল ছাড়বেন কিন্তুক।এর উত্তরে ছেলেদের একজন কি বলল ঠিক বোঝা গেল না, তবে নিশ্চয়ই হাসির কিছু মেয়েটি খিল-খিল করে হাসছে। অর্থহীন হাসি।
আহসান দু প্যাকেট সিগারেট কিনল। সবকিছু বেশি-বেশি থাকাই ভালো। সিগারেটওয়ালার মুখে অসম্ভব বিরক্তি। শেষ সময়ে দু প্যাকেট সিগারেট বিক্রি করেও তার বিরক্তি দূর হল না। টাকার ভাংতি হিসাব করছে এই জন্যেই কি বিরক্তি? নাকি তারও খিদে পেয়েছে, বাড়ি যেতে ইচ্ছা করছে; কিন্তু যেতে পারছে না, কারণ বিক্রি ভালো হয় নি। আহসান লোকটির বিরক্তি কমাবার জন্যে হালকা গলায় বলল, একটা পাগলা কুকুর নাকি বেরিয়েছে, জান নাকি?
জানি না।লোকটি মুখ আরো বিরস করে ফেলল। পাগলা কুকুর কেন, বাঘ বেরুলেও তার কিছু যায়-আসে না।আহসানের ঘরে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না। একবার ঘরে ঢুকলে বেরুতে ইচ্ছে করে না, আবার বেরুলে ঘরে ঢুকতে ইচ্ছে করে না। অদ্ভুত অবস্থা। সকালে নাশতার কিছু নেই। নূর বেকারি খোলা। সে কলা এবং রুটি কিনল।
আজ সকালে ঘরে নাশতার কিছু ছিল না বলে, না খেয়ে কলেজে ছুটতে হয়েছে। দুটি দেয়াশলাই কিনে টাকা দেবার সময় মনে পড়ল ড্রয়ারে পুরো এক প্যাকেট দেয়াশলাই দেখে এসেছে। কোন জিনিস আছে কোন জিনিস নেই তার কোনো হিসাব থাকছে না। যা নেই তা কেনা হচ্ছে না। যেটা আছে সেটাই কেনা হচ্ছে। হয়ত ঘরে গিয়ে দেখবে পাউরুটিও একটি পড়ে আছে।নূর বেকারির ছেলেটিকে দেখে মনে হচ্ছে আলাপী। আহসান অন্তরঙ্গ সুর বের করল, একটা নাকি পাগলা কুকুর বের হয়েছে, জান কিছু?
ছেলেটি জবাব দিল না। রাগী চোখে তাকাল। তুমি করে বলায় হয়ত রক্ত গরম হয়ে গেছে। মাস্টারি করে এই সমস্যা হয়েছে—সবাইকে ছাত্র মনে হয়।খিদে জানান দিচ্ছে। আহসান খিদে-পেটেই সিগারেট ধরাল, ঠিক তখন। হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নামল। ধুম বৃষ্টি। এ-বৃষ্টি থামবে না। ধরন দেখেই বলে দেওয়া যায় সারা রাত চলবে। দৌড়ে কোথাও দাঁড়ানোর কোনো মানে হয় না। শেষ পর্যন্ত কাকভেজা হয়েই বাসায় ফিরতে হবে। তবুবৃষ্টি নামলেই কোথাও দাঁড়াতে ইচ্ছে করে। আহসান ছুটে গিয়ে দাঁড়াল মেসার্স রহমানিয়ার বারান্দায়। মাথার ওপর খানিকটা ছাদের মতো আছে। তাতে বৃষ্টি আটকাচ্ছে না।
আশ্রয়ের খোঁজে আরো কিছু লোকজন এসেছে। একজন ভিখিরি, সঙ্গে ইদুরের বাচ্চার মতো কৃশ একটি বাচ্চা। বাচ্চাটি গভীর রাতেও জেগে আছে। চোখ বড়-বড় করে তাকাচ্ছে। একজন বুড়ো লোক যাকে প্রথম দৃষ্টিতে ভিখিরি মনে হলেও সে ভিখিরি নয়। কারণ তার হাতে একটি বাজারের থলে আছে। সেই থলের ভেতর থেকে লাউয়ের মাথা বের হয়ে আছে। ভিখিরির কাছে বাজারের থলে থাকে না। এই বুড়ো গভীর রাতে বাজার করে কোথায় ফিরছে কে জানে। একেকবার বৃষ্টির ঝাপটা আসছে আর এই বুড়ো করে থুথু ফেলছে।
কোণের দিকে প্রায় দেয়াল ঘেঁষে লম্বা রোগা একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত ঐদিনকার সেই মেয়েটি। মেয়েটি যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে আলো নেই, মুখ দেখা যাচ্ছে না। মুখ দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে আবার হচ্ছেও না। থলে হাতে বুড়োটি মেয়েটির দিকে কয়েকবার তাকিয়ে ঝাঁজালোভাবে কিসব বলল। আহসান শুনতে পেল না। ভিখিরি মেয়েটি শুনল এবং হাসতে-হাসতে ভেঙে পড়ার মতো হল। ভিখিরির শিশুটি হয়ত তার মা হাসি শুনে অভ্যস্ত নয়।
একবার ক্লাসে এরকম হল। সেকেন্ড ইয়ার অনার্স ক্লাস। এসথেটিকস পড়ানো হবে। রোল কল করা হচ্ছে। রোল ফিফটি এইট বলা মাত্র একটি মেয়ে বলল, প্রেজেন্ট স্যার। আহসান হতভম্ব! আরে এর গলা তো অবিকল তারিনের গলার মতো।আহসান সেই স্বর দ্বিতীয় বার শোনার জন্যে আবার বলল, রোল ফিফটি এইট।প্রেজেন্ট স্যার।আবার শুনতে ইচ্ছে করছে। একটা রোল তিনবার ডাকা যায় না। আহসান বলল, রোল ফিফটি এইট তুমি এত এ্যাসেন্ট থাক কেন?
স্যার, আমি তো এ্যাবসেন্ট থাকি না।ও আচ্ছা। আমার ভুল হয়েছে—বস।মেয়েটি বসে পড়ল। সে বেশ বিব্রত বোধ করছে। তার দু পাশের বান্ধবীরা মুখ টিপে হাসছে। একজন সম্ভবত পেনসিল দিয়ে খোঁচাও দিল। এ-কালের মেয়েগুলি ফাজিলের চূড়ান্ত। সহজ কথারও তিন রকম অর্থ করে মজা পায়।
বৃষ্টি যতটা জোরাল মনে হচ্ছিল ততটা জোরাল নয়। কুয়াশার মতো পড়ছে। বাসা পর্যন্ত যেতে মাথা সামান্য ভিজবে, এর বেশি কিছু হবে না। ঝম-ঝম বৃষ্টি হলে মন্দ হত না। অনেকদিন ধুম বৃষ্টিতে ভেজা হয় না।মেয়েটি আসছে তার পিছনে-পিছনে। স্যাভেল খলে হাতে নিয়েছে, পা ফেলছে খুব সাবধানে। এর বাড়ি বোধ হয় আশেপাশে কোথাও হবে। একা-একা যেতে ভয় পাচ্ছে। বলে সঙ্গে আসছে। আসুক ক্ষতি তো কিছু নেই। এত সাবধানতায়ও কাজ দিল না।
মেয়েটি পা পিছলে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। অন্ধকারে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। তবে সে যে কাদায় মাখামাখি হয়েছে এটা বোঝা যাচ্ছে। এগিয়ে এসে হাত ধরে তোলার কোনো অর্থ হয় না। আবার পাশ-কেটে চলে যেতেও খারাপ লাগে।এই জাতীয় মেয়ের সংখ্যা শহরে দ্রুত বাড়ছে। কলেজের ইসমাইল সাহেবের ধারণা শহরটা প্ৰসটিটিউটের শহর হয়ে যাচ্ছে। ইসমাইল সাহেব লোকটি বেশ রসিক। যাই বলেন শুনতে ভালো লাগে।
বুঝলেন সাহেব, ঐরকম একজনের পাল্লায় পড়েছিলাম। রাত দশটার মতো। বাজে। আমার ভায়রার বাসায় বেড়াতে যাচ্ছি ঝিকাতলা। একটু ভেতরের দিকে। রিকশা ছেড়ে দিয়ে হাঁটছি, তখন এই মেয়েটা এসে উপস্থিত। নরম গলায় বলল, আজ রাতটা কি আপনি আমাকে থাকতে দিতে পারেন? আমি তো বুঝতেই পারি নাই রে ভাই। কচি চেহারা, ভদ্ৰ সাজ-পোশাক।আপনি কী বললেন? আমি বললাম, কী অসুবিধা তোমার?
জিওগ্রাফির মনসুর সাহেব চাপা হাসি হেসে বললেন, মা বলে ডাকলেন না? আপনার তো আবার মেয়েদের মা ডাকার একটা প্রবণতা আছে।নামা ডাকি নি। কলেজের মেয়েগুলিকে মা বলি। বাইরে বলি না। তারপর কি হল শোনেন—আমি বললাম, কী অসুবিধা তোমার? … সে বলল, অনেক অসুবিধা। বলেই হাসল, তখনই ব্যাপারটা বুঝলাম।কি করলেন?
পাঁচটা টাকা দিলাম। টাকাটা নিল না। তখনই বুঝলাম ভালো ফ্যামিলির মেয়ে, ছ্যাচড়া ধরনের হলে নিত।মনসুর সাহেব বাঁকা হাসি হেসে বললেন, আপনার মনের অবস্থাটা তখন কী হল বলুন।কী আবার হবে। কিছু হয় নি-একটু স্যাড ফিল করেছি।শুধুই স্যাড আর কিছু না? একবারের জন্যেও কি মনে হয় নি এই মেয়েটির সঙ্গে কিছু সময় কাটালে কি আর এমন ক্ষতি হবে? ঘরে ফিরলে সেই তো বাসি স্ত্রী। অর্থের বিনিময়ে টাটকা একজন তরুণীর সঙ্গ মন্দ কি? কী-সব বাজে কথা বলছেন মনসুর সাহেব?
বাজে কথা একেবারেই বলছি না। নিতান্ত সত্যি-সত্যি কথাটা বলছি। হার্ড টুথ।নিজেকে দিয়ে সবাইকে বিচার করবেন না।নিজেকে দিয়ে বিচার করছি না আপনাকে দিয়েই আমি আপনাকে বিচার করছি। এই যে মেয়েগুলিকে আপনি মা মা ডাকেন, তার পিছনে কি অন্য কিছু কাজ করে না? মা বলে সহজেই একজনের পিঠে হাত রাখতে পারছেন। স্পর্শের আনন্দটুকুর জন্যে আপনি মা ডাকছেন। আমি খুব ভুল বলছি?
ইসমাইল সাহেব স্যান্ডেল খুলে মনসুর সাহেবকে মারতে গেলেন। কেলেঙ্কারি ব্যাপার। কলেজের প্রিন্সিপ্যাল পর্যন্ত জিনিসটা গড়াল। প্রিন্সিপ্যাল দার্শনিকের মতো বললেন, মেয়েমানুষ কী জিনিস দেখলেন। সামান্য মেয়েমানুষের কথা থেকে স্যান্ডেল নিয়ে ছোটাছুটি। এই খবর বাইরে লিক হলে টিচার্স ক্যুনিটি হিসাবে আমাদের স্থান কোথায় হবে বলেন দেখি? আপনাদের মতো হাইলি এড়ুকেটেড লোক যদি ……
Read more
