বাসর শেষ – পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

বাসর শেষ – পর্ব

মেয়েটি গভীর মমতায় স্যান্ডেলটি তুলল। আহসান অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল, তুমি কি এখানে ফুলের গন্ধ পাচ্ছ? এই জায়গাটার একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। মাঝে-মাঝে ফুলের গন্ধ পাওয়া যায় অথচ আশেপাশে কোনো ফুলের গাছ নেই।ফুলের গন্ধ না। আগরবাতির গন্ধ।আগরবাতির গন্ধ?

হুঁ পীর সাবের একটা মাজার আছে দোকানের পিছনে। এরা আগরবাত্তি জ্বালায়।ও আচ্ছা। হ্যাঁ তাই। এখন মনে হচ্ছে আগরবাতিরই গন্ধ। এই জিনিসটি নিয়ে। আমি অনেকদিন ভেবেছি বুঝলে? কারণটা বের করতে পারি নি।মেয়েটি হাসছে। সরল সহজ হাসি। পৃথিবীর কোনো মালিন্য সেই হাসিকে স্পর্শ করে নি।

পারুল।জ্বি।এস আমার সঙ্গে।মেয়েটি ছোট-ছোট পা ফেলতে লাগল। আহসান বলল, তোমার যখন টাকা-পয়সার দরকার হবে আসবে আমার কাছে, কিন্তু রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবে না। আমার স্ত্রীর চেহারার সঙ্গে তোমার খুব মিল আছে এই জন্যেই একথা বলছি।কতদিন আপনে আর আমারে টেকা দিবেন? আমার দুইটা মাইয়া আছে। না খাইয়া সারা দিন বইসা থাকে। দুনিয়াডা খুব খারাপ জায়গা ভাইজান।

হ্যাঁ খুবই খারাপ। দি উইন্টার অব ডিসকনটেন্ট।পারুল দাঁড়িয়ে পড়ল। শান্তস্বরে বলল, আপনের কাছ থাইক্যা টেকা নিতাম না।কেন? ঝড় বৃষ্টি আইতাছে ঘরে যামু।হেঁটে হেঁটে যাবে? জ্বি।চল তোমাকে খানিকটা এগিয়ে দিই।না। আপনে ঘরে যান।মেয়েটি ঘুরে দাঁড়াল। পরক্ষণেই দ্রুত পা ফেলতে লাগল।বাতাস বইতে শুরু করেছে। শিগগিরই বৃষ্টি নামবে। মেয়েটি কি পারবে বৃষ্টির আগে আগে ফিরে যেতে হয়ত পারবে হয়ত পারবে না।

করিম সাহেবের বাড়ির সবগুলো আলো জ্বলছে, কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে দূর থেকে। আজ এদের খুব দুঃখের রাত।আহসান নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। বারান্দায় জলিল মিয়া এবং তার হেপ্পার উবু হয়ে বসেছিল। তারা তাকাল কিন্তু কিছু বলল না।ঝড় বৃষ্টি শুরু হল রাত বারটার দিকে। ইলেকট্রিসিটি চলে গিয়ে চারদিকে নিকষ অন্ধকার। আহসান মোমবাতি জ্বালিয়েছে। বাতাসের ঝাপটায় মোমবাতি নিবু-নিবু হয়েও আবার জ্বলে উঠছে। বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে কান্নার শব্দ মিলে গিয়ে কি যে অদ্ভুত শোনাচ্ছে।

এই রাতটির সঙ্গে তার বিয়ের রাতের বড় অদ্ভুত মিল তো। বিয়ের রাতেও ঠিক এই ব্যাপার। তাদের বাসর দোতলায়। হঠাৎ করে ঠিক করা। ফুলটুল কিছুই জোগাড় হয় নি। পুরনো আমলের বিশাল পালঙ্কে বড়-বড় ফুল আঁকা একটা চাদর শুধু বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। জানালার একটা কাঁচ ভাঙা। কাঁচের ভেতর দিয়ে বারবার পানির ঝাপটা আসছে। ইলেকট্রিসিটি নেই। দুটি মোমবাতি জ্বালানো হয়েছে। অনেক রাতে হাতে একটা হারিকেন নিয়ে তারিন ঢুকল। আহসান বলল, বাসর রাতে হারিকেন। ভারি কুৎসিত ব্যাপারটা বাইরে রেখে আস।

হুঁ, তারপর অন্ধকারে ভূতের ভয়ে কাঁপি। হারিকেন থাকবে। ইস পালঙ্ক তো ভিজে জবজবে। এসোনা ধরাধরি করে পালঙ্কটা সরাই।দুজনে বহু ঠেলাঠেলি করেও সেই গন্ধমাদন পর্বত একচুল সরাতে পারল না। তারিন বলল, নিচ থকে দু একজনকে ডেকে আনব? আহসান বলল, থাক ডাকতে হবে না।

তারিন খুব খুশি। হাসিমুখে বলল, গল্প করেই রাতটা কাটিয়ে দিই কি বল? বল তুমি একটি গল্প, তারপর আমি বলব। এইভাবে চলবে সারা রাত। নাকি আমি শুরু করব—এক ছিল টোনা আর এক ছিল টুনি। টোনা কহিল, টুনি পিঠা তৈরি কর–তারিন গল্প বলছে আর হাসতে হাসতে তার চোখে পানি এসে যাচ্ছে। আহসান বলল, বাসর রাতে এত হাসতে নেই।কেন? হাসতে নেই কেন?

বাসর রাতে হাসা খুব অলক্ষণ।বলেছে তোমাকে।সত্যি অলক্ষণ। বেহুলা বাসর রাতে খুব হাসাহাসি করছিল, তার ফলে লখিন্দর বেচারার কি অবস্থা হল দেখলে না? সত্যি বেহুলা হাসাহাসি করছিল? নাকি তুমি বানিয়ে বানিয়ে বলছ? সত্যি হাসছিল।বেশ তাহলে আর হাসব না।তারিন চুপ করে গেল। আর ঠিক তখনি নিচ থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসল। মেয়েলি গলায় কান্না। আহসান চমকে উঠে বলল, কে কাঁদছে?

আমার দাদি। ওঁনার মাথার ঠিক নেই। রাত-বিরেতে উনি এরকম কাঁদেন।বল কি? সবসময় না মাঝে-মাঝে।সারা রাতই কি কাঁদবেন? হা কাঁদবেন। বুড়ো মানুষদের কত রকম কষ্ট।বলতে বলতে পারিনের চোখে পানি এসে গেল। আহসান বলল, বাসর রাতে কাঁদতেও নেই। কাঁদাও অলক্ষণ। তারিন আঁচলে চোখ মুছে সঙ্গে সঙ্গে হাসল।ঐ রাতের সঙ্গে আজকের রাতের কি অদ্ভুত মিল। আজো ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে। নিচ থেকে কান্নার শব্দ আসছে। মোমবাতি জ্বলছে ঘরে।

এবং আশ্চর্যের ব্যাপার এ-ঘরেও জানালার একটি কাঁচ ভাঙা। প্রচুর বৃষ্টির পানি ঢুকছে। আহসান চোখ বন্ধ করে তারিনের মুখ মনে করতে চেষ্টা করল–পারল না।সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। ছোট ছোট পা ফেলে কে যেন আসছে। কে হতে পারে? থমকে দাঁড়াল দরজার পাশে। আহসান বলল, কে? কেউ জবাব দিল না। সে উঠে এসে দরজা খুলে দিল। মহল হারিকেন হাতে দাঁড়িয়ে আছে। তার এক হাতে একটা থালায় কয়েকটা মিষ্টি।

সে মিষ্টির থালাটা নিঃশব্দে আহসানের সামনে নামিয়ে রাখল। মৃদু স্বরে প্রায় ফিসফিস করে বলল, আৰ্বাজানের অপারেশন খুব ভালো হয়েছে। ডাক্তাররা বলেছে ভয়ের আর কিছু নেই। মিলাদের মিষ্টি। একটু খান।আহসান অবাক হয়ে বলল, এত বিরাট আনন্দের খবর। সবাই কাঁদছে কেন?খুশিতে কাঁদতেছে। খুশির কাঁদা।মহল তুমি বস–একটু বস। আমি নিজেও অসম্ভব খুশি হয়েছি। বস তুমি—একটু বস।

মহল অবাক হয়ে তাকাচ্ছে। যেন আহসানের কথা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। সে ভয়ে ভয়ে চেয়ারে বসল। আহসান সহজ স্বরে বলল, তোমাকে আমি খুব একটা জরুরি কথা বলতে চাই মহল। আজ না বললেও চলত তবু আজই বলতে চাই। কথাটা বলার জন্যে আজ রাতের মতো চমৎকার একটা রাত আর আসবে না। কথাটা হচ্ছে–

আহসান একটু থামল। মহল চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। তার চোখে শঙ্কার ছায়া। তার হাতের হারিকেন কাঁপছে। বিচিত্র সব নকশা তৈরি হচ্ছে দেয়ালে, আহসান শান্ত স্বরে বলল, তোমার বাবা যখন সুস্থ হয়ে বাসায় আসবেন তখন তাঁকে। আমি একটা অনুরোধ করতে চাই। তাঁকে বলতে চাই যে আপনার তিন নম্বর মেয়েটিকে আমি বিয়ে করতে চাই। যদি আপনি রাজি হন তাহলে আমার আনন্দের সীমা থাকবে না।

মহল এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, চোখে পলক পর্যন্ত পড়ছে না। আহসান হাসি-হাসি মুখে বলল, তোমারও রাজি হওয়া না হওয়ার একটা প্রশ্ন আছে, তাই না? তুমি যদি রাজি থাক তাহলে আমার জন্যে খুব চমৎকার এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এস। খুব চায়ের তৃষ্ণা হচ্ছে।

অনেকক্ষণ কেটে গেছে মহল আসছে না। বাইরে তুমুল বর্ষণ হচ্ছে। আহসান যখন প্রায় নিশ্চিত যে মহল আসবে না তখনই চুড়ির শব্দ পাওয়া গেল। চায়ের কাপ হাতে মহল ঢুকল মাথা নিচু করে। সে এর মধ্যে কাপড় বদলে সুন্দর একটা শাড়ি পরেছে। চুল বেঁধে চোখে কাজল দিয়েছে। হাত-ভর্তি লাল কাঁচের চুড়ি। আহসান হাসি মুখে বলল, মহল তোমাকে ভারি সুন্দর লাগছে।

মহলের মাথা আরো নিচু হয়ে গেল। দরজার ওপাশে চাপা হাসি। চুড়ির শব্দ। আহসান বাইরে উঁকি দিল। দরজার ওপাশে বড় দু বোনও দাঁড়িয়ে আছে। ওরাও অবিকল মহলের মতো শাড়ি পরেছে। চোখে কাজল দিয়েছে—চুল বেঁধেছে। সবার হাত ভর্তি লাল চুড়ি। আহসান উকি দিতেই ওরা শব্দ করে ছুটে পালাল। মহল মাথা নিচু করে আছে। কি ভাবছে মনে-মনে কে জানে।

মহল।জ্বি।একটা গল্প বল।মহল বিস্মিত হয়ে তাকাচ্ছে।গল্প জান না? মহল তার উত্তর দিল না। মুখ ঘুরিয়ে দেয়ালের দিকে তাকাল। সেখানে তারিনের ছবি। সে যেন হাসি-হাসি মুখে দেখছে এদের দুজনকে।মহল।জ্বি।এই লাইনটির মানে জান? …. Since there is no help come let us kiss and part.

মহল উত্তর দিল না। আহসান কোমল গলায় বলল, ঐ লাইনটির মানে তোমার জানার প্রয়োজন নেই।

 

Read more

মিসির আলি UNSOLVED পর্ব – ১ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *