সে কুলসুম নামের ল টা ফেলে দিয়ে কুসুম ডাকে। তবে বিয়ের কাবিননামায় আমার নাম কুলসুম থাকলেও আমি সিগনেচার করেছি ‘আয়না’ নাম।আয়না তোমার খুব পছন্দের নাম?
জি।তোমার রূপ সম্পর্কে তোমার কী ধারণা? তুমি অতি রূপবতীদের একজন, না সাধারণ বাঙালি তরুণীদের একজন? আয়না এই প্রশ্নের জবাব দিল না। হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছে প্রশ্ন শুনে সে মজা পাচ্ছে।মিসির আলি বললেন, প্রশ্নটার জবাব দাও।দিতেই হবে?
দিতে না চাইলে দেবে না। তোমার রূপ সম্পর্কে তোমার স্বামীর কী ধারণা?আয়না নিচু গলায় বলল, বাসররাতে সে আমাকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিল। ভোরবেলায় হতভম্ব। এখনো সে মাঝে মাঝে মুগ্ধ হয়। মাঝে মাঝে হতভম্ব হয়।তাতে তুমি মজা পাও?পাই।এই মুহুর্তে আমি একটা সংখ্যা ভাবছি। সংখ্যাটা কত? আট।একটা পাখির কথা ভাবছি। পাখিটার নাম কী?
স্যার আপনি দুটা পাখির কথা ভাবছেন। একটা ঘুঘু আর একটা কোকিল। একটা কোকিল। গরমের সময় ডাকত। সে পাখিটা কেন হিমালয়ে যাচ্ছে না সেটা চিন্তা করছেন। এখন আবার অন্য একটা পাখির কথা ভাবছেন। হলুদ পাখি লম্বা লেজ। একা থাকে।তুমি কি সবার চিন্তা বুঝতে পার?
পারি। কিন্তু বুঝার চেষ্টা করি না। মানুষের বেশিরভাগ চিন্তাই কুৎসিত।মিসির আলি বললেন, আমি তোমার ব্যাপারটা বুঝতে চাই তুমি কি আমাকে সাহায্য করবে? আয়না বলল, স্যার সাহায্য করব। আমি নিজেও বুঝতে চাই। আপনার ছাত্রও বুঝতে চেষ্টা করেছিল। সে আমার বিষয়ে অনেক কিছু খাতায় লিখে রেখেছে। খাতাটা আমার কাছে। আপনি পড়তে চাইলে আপনাকে দেব। পড়তে চান?
চাই। তুমি নিজে কি তোমার বিষয়ে কিছু লিখেছি। ডায়েরি জাতীয় লেখা? লিখেছি, তবে আপনাকে পড়তে দেব না।তোমার স্বামীকে পড়তে দিয়েছিলে? না। স্যার, আপনার আরেক কাপ চা খেতে ইচ্ছা করছে। চা নিয়ে আসি? চায়ের সঙ্গে সিগারেট ধরাতে ইচ্ছা করছে। সিগারেট তো তো আপনার সঙ্গে নেই। সিগারেট আনিয়ে দেই?
দাও।কোন ব্র্যান্ডের সিগারেট আনব? মিসির আলি ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, কোন ব্র্যান্ডের সিগারেট আনাবে তা তুমি জান। কেন জিজ্ঞেস করছ? আয়না। হাসিমুখে উঠে গেল। মিসির আলি তাকিয়ে আছেন নদীর দিকে। নদীর নাম রায়না। একসময় নাকি প্ৰমত্তা ছিল। স্টিমার যাওয়া আসা করত। এখন মরতে বসেছে। মৃত্যু সবার জন্যই ভয়ংকর।
নদীর নাম রায়না।
সে কোথাও যায় না।
সমুদ্রকে পায় না।
মিসির আলি নড়েচড়ে বসলেন। তার মাথায় ছড়া পাঠ হচ্ছে। পাঠ করছে আয়না নামের মেয়েটি। এর মানে কী? জীবনে প্রথম মিসির আলি হতাশ এবং পরাজিত বোধ করলেন।The old man and the sea বইটিতে আৰ্নেস্ট হেমিংওয়ে একটা বিখ্যাত লাইন লিখেছিলেন Man can be destroyed but not defeated. লাইনটা ভুল। মানুষকে অসংখ্যাবার পরাজিত হতে হয়।
এটাই মানুষের নিয়তি। পরাজিত হয় না পশুরা। এটাও বোধ হয় ঠিক না। পশুরাও পরাজিত হয়। সিংহ এবং বাঘের যুদ্ধে একজনকে লেজ গুটিয়ে পালাতে হয়।স্যার, আপনার চা। সিগারেট।আয়না চেয়ারে বসতে যাচ্ছিল। মিসির আলি বললেন, আয়না তুমি এখন যাও। আমি কিছুক্ষণ একা থাকব।আপনি কি আমার উপর রাগ করেছেন? না।
আপনার ছাত্র সব সময় বলত আপনার মতো বুদ্ধিমান মানুষ সে জীবনে দেখে নি। আপনাকে আমার দেখার শখ ছিল।স্বায়ন পরে তোমার সঙ্গে কথা বলব। এখন না।স্যার, চা শেষ করে আপনি নদীর পাড় ঘেঁষে হাঁটতে যান, আপনার ভালো লাগবে। একটা পুরোনো বটগাছ আছে। সেখানে বসার জায়গা আছে। আমি ফ্রাস্ক ভর্তি কয়ে চা দিয়ে দেব।থ্যাংক য়্যু। এখন যাও।স্যার, যাচ্ছি। একটা কথা বলে যাই? পরাজিত হবার মধ্যেও কিন্তু আনন্দ আছে স্যার! পরাজয়ের আবার আনন্দ কী?
অবশ্যই পরাজয়ের আলাদা আনন্দ আছে। আনন্দ আছে বলেই প্রকৃতি আমাদের জন্য পরাজয়ের ব্যবস্থা রেখেছে। মৃত্যু একটা পরাজয়। সেখানেও আনন্দ আছে। সমাপ্তির আনন্দ।তুমি পড়াশোনা কতদূর করেছ? বিএ পাস করেছি। আপনার ছাত্রের খুব ইচ্ছা ছিল আমি এমএ পাস করি। আমার ইচ্ছা হয় নি। স্যার যাই? আপনি সিগারেট ঠোঁটে নিন। আমি ধরিয়ে দেব।
মিসির আলি সিগারেট নিলেন। আয়না ধরিয়ে দিল। আয়নার চোখ আনন্দে ঝলমল করছে।হলুদ রঙের লম্বা লেজের পাখিটা বারান্দার রেলিংয়ে বসেছে। রেলিংয়ে পাখিটা বসানোর পেছনে কি আয়না মেয়েটার কোনো হাত আছে? কাক এবং চড়ুই ছাড়া আর কোনো পাখি তো মানুষের এত কাছে আসে না। বনের এই অচেনা পাখি এত কাছে এসেছে কেন?
আয়না।
জি স্যার।
এখন কী ভাবছি বল। আয়না কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, বলতে পারছি না স্যার। খুবই অবাক হচ্ছি।মিসির আলি বললেন, তুমি যাতে আমার মাথার ভেতর ঢুকে পড়তে না পার, তার একটা কৌশল বের করেছি। কৌশলটি কাজ করেছে।আয়না বলল, কৌশলটা কী?
মিসির আলি বললেন, কৌশল তোমাকে জানানো ঠিক না। তারপরেও জানাচ্ছি। আমার হাতের কবিতার বইটার নাম উল্টো করে স্বাক্সবার পড়ছিলাম-বইটার নাম Poems. আমি উল্টো করে পড়ছি Smeop, Smeop. ব্ৰেইনে অর্থহীন শব্দ ধারবার বলে জট পাকিয়েছি। মনে হয় এটাই কাজ করেছে।
মিসির আলি বটগাছের গুড়িতে বসে আছেন। বসার জন্যে জায়গাটা সুন্দর। অর্ধেক বটগাছ রায়না নদীর উপর। নদীর পানি শিকড়ের মাটির অনেকটাই ধুয়ে নিয়ে গেছে। অসহায় বটবৃক্ষ নিজেকে রক্ষার জন্যে অসংখ্য ঝুরি নামিয়েছে। সে এখনো টিকে আছে। কতদিন টিকবে কে জানে।প্ৰথমবারের মতো মিসির আলির মনে হলো তার একটা ক্যামেরা থাকলে ভালো হতো। নদীর উপর দাঁড়িয়ে থাকা বটগাছের ছবি তুলে রাখতেন। ভাতের থালা হাতে নিরন্ন ভিখিরি ছেলের ছবি তুলতে ফটোগ্রাফাররা পছন্দ করেন।
এই বিশাল গাছও এক অর্থে ভিক্ষুক। সে বেঁচে থাকার জন্যে করুণা ভিক্ষা করছে নদীর কাছে। যে নদীর নাম রায়না। মিসির আলি আরাম করে বসেছেন। পায়ের নিচের পানির ছলাৎ শব্দ শুনতে ভাল লাগছে। নদীর পানি যদিও সবসময় একই গতিতে বইছে কিন্তু ছলাৎ ছলাৎ শব্দটা থেমে থেমে হচ্ছে। কিছুক্ষণ ছলাৎ ছলাৎ তারপর আর শব্দ নেই কঠিন নীরবতা। এর কারণ কি? আমাদের চারপাশে অমীমাংসিত সব রহস্য।
নদীর নামটাও তো রহস্যের একটা। কে দিয়েছে রায়না নাম? প্রাচীন পৃথিবীতে মানবগোষ্ঠী খণ্ড খণ্ড ভাগ হয়ে নদীর পাশে বসতি করেছে। হঠাৎ কেউ একজন কি সেই নদীকে ব্ৰহ্মপুত্ৰ নাম দিয়ে দিল। বিশাল এলাকা জুড়ে নদী। সবাই তাকে ডাকছে ব্ৰহ্মপুত্ৰ নামে। কারণ কি? বটগাছের কথাই ধরা যাক। কে তার প্রথম নাম দিল? সেই নাম কিভাবে ছড়িয়ে পড়ল? এমন তো না কিছু জায়গায় নাম বটবৃক্ষ আবার কিছু জায়গায় হুটবৃক্ষ।
মিসির আলির মাথায় এলোমেলো চিন্তা একের পর এক আসছে। তার ভালোই লাগছে। নামকরণ রহস্যের সমাধান তাকে করতে হবে না। এই দায়িত্ব তাকে কেউ দেয় নি। রহস্যের প্রতি সামান্য কৌতূহল প্রদর্শন করলেই হবে।মিসির আলি সিগারেট ধরালেন। তাঁর দৃষ্টি এখন পাখিদের কর্মকাণ্ডে। পাখিদের বড় অংশই বিক। তারা মাছ ধরায় ব্যস্ত। দুটা মাছরাঙা দেখা যাচ্ছে। মাছরাঙার প্রধান খাদ্য মাছ। তবে তারা মাছ ধরায় আগ্রহী না। তারা বাঁশের খুঁটিতে পাশাপাশি বসে আছে।
কিছুক্ষণ পরপর একজন আরেক জলকে দেখছে। মাছরাঙা যে এত সুন্দর পাখি তা আগে তিনি লক্ষ করেন নি। ক্যামেরা থাকলে অবশ্যি মাছরাঙার ছবি তুলতেন।জায়গাটা নিৰ্জন। নদীর পাড় ধরে লোক চলাচল নেই বললেই হয়। নদীতে অনেকক্ষণ পর পর নৌকার দেখা পাওয়া যাচ্ছে। সবই ইনজিনের নৌকা। দ্রুত বিদায় হয়ে যাচ্ছে। গ্রাম-বাংলার শ্লথ জীবনের সমাপ্তি ঘটেছে।
মিসির আলি চায়ের ফ্লাক্স বের করার জন্যে কাপড়ের ঝুলি খুললেন। আয়না মেয়েটা শুধু যে ফ্ল্যাক্স ভর্তি চা দিয়েছে তা-না এক প্যাকেট বিসকিট দিয়েছে। বিসকিটের নাম Energy. সাদা কাগজ এবং বল পয়েন্ট দিয়েছে। সে কি ভেবেছে মিসির আলি লেখক মানুষ? র্যাক্সিনে বাঁধানো একটা ডায়েরিও দেখা যাচ্ছে। মিসির আলি কৌতূহলী হয়ে ডায়েরি খুললেন। যা সন্দেহ করেছিলেন। তাই। তার ছাত্রের লেখা ডায়েরি। সে তার স্ত্রী আয়না সম্পর্কে লিখেছে।
চমৎকার কোনো জায়গায় বসে ডায়েরি পড়া যায় না। ডায়েরি বা গল্পের বই পড়ার অর্থ প্রসারিত দৃষ্টিকে গুটিয়ে নিয়ে আসা। ডায়েরি পড়ার চেয়ে মিসির আলি অনেক বেশি আগ্ৰহবোধ করছেন মাছরাঙা পাখিটার গতিবিধি লক্ষ করায়। এর নাম মাছরাঙা কেন হলো। মাছ খেয়ে সে রাঙা হয়েছে এই জন্যে? তাহলে তো বকের নাম হওয়া উচিত মাছ সাদা। কারণ মাছ খেয়েই সে ধবধবে সাদা হয়েছে।
মিসির আলির চিন্তায় বাধা পড়ল। দুটি মাছরাঙাই হঠাৎ উড়ে গেছে। তাদের উড়ে যাওয়ার পেছনেও ব্যাখ্যা আছে। গ্রামের এক তরুণী মেয়ে নদীতে স্নান করতে এসেছে। সে হয়তো ভেবেছে আশেপাশে তাকে লক্ষ করার মতো কেউ নেই। অর্ধনগ্ন হওয়া যেতে পারে। মিসির আলি খাতা খুলে চোখ সরিয়ে নিলেন। মেয়েটির স্নান শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার ছাত্রের লেখা পড়া একটি শোভন কর্ম।
আমার বিয়ে হয় তেইশে শ্রাবণ। ইংরেজি তারিখটা মনে থাকে না। বাংলাটা মনে থাকে কারণ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরের দিনটাই আমার বিয়ের তারিখ।স্ত্রীর নাম কুলসুম। বিয়ের আগে আমি তাকে দেখিনি। দেখার তেমন কৌতূহলও বোধ করি নি। আমার দূর সম্পর্কের এক মামা বিয়ে ঠিক করে দেন। গ্রামের স্কুলের হেডমাস্টার সাহেবের মেয়ে। বিএ পাস করেছে।
বিএ’তে ফাস্ট ডিভিশন পেয়েছে। মেয়েটির এই যোগ্যতাই আমার কাছে যথেষ্ট মনে হয়েছে। গ্রামের এক কলেজ থেকে ফাস্ট ডিভিশন পেয়ে গ্র্যাজুয়েট হওয়া সহজ কথা না। মামা মেয়েটির ছবি দেখিয়েছেন। মেয়েটি সুশ্ৰী। বেঁচো নাক তবে তাতে খারাপ দেখাচ্ছিল না। মামা বললেন, মেয়েটির গাত্ৰবৰ্ণ উজ্জ্বল শ্যামলা। আমি ধরেই নিলাম মেয়ে কালো। বিয়ের পাত্রীর গায়ের রঙ কালো হলে তাকে উজ্জ্বল শ্যামলা ঘলাটাই শিষ্টাচার।
আমি আমার হবু স্ত্রীর গায়ের রঙ বা চেহারা নিয়ে মাথা ঘামালাম না। তার প্রধান কারণ পাত্র হিসেবে আমি নিচের দিকে। আবার বাবা-মা নেই। বাড়িঘর নেই। চাকরিটাই সম্বল। বাংলাদেশের কোনো বাবা-মা এতিম ছেলের সঙ্গে মেয়ে বিয়ে দিতে আগ্রহী না। তার চান মেয়ে যেন থাকে শ্বশুর-শাশুড়ির আদরে ও প্রশ্ৰয়ে। যদিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সে রকম ঘটে না।তোইশে শ্রাবণ সোমবার সন্ধ্যায় আমার বিয়ে হলো। ঠিক হলো মেয়ে বাবার বাড়িতেই থাকবে। কলেজ থেকে কোয়ার্টার পাওয়ার পর মেয়ে উঠিয়ে নেয়া হবে।
বাসরের আয়োজন হলো মেয়ের বাবার বাড়িতে। বাড়িটা সুন্দর। দোতলা পাকা দালান। যে ঘরে বাসর সাজানো হলো সে ঘরটা বেশ বড়। পাশে রেলিং দেয়া বারান্দা। বারান্দায় দাঁড়ালে নদী দেখা যায়। নদীর নাম রায়না।বিয়ে পড়ানো শেষ হওয়ার পর কিছু মেয়েলি আচার আছে। একই গ্লাসে সরবত খাওয়া। আয়নায় মুখ দেখা ইত্যাদি। সব আচারই পালন করা হলো শুধু আয়নায় মুখ দেখার অংশটা বাদ গেল।
আমাকে জানানো হলো- মেয়ে আয়নায় মুখ দেখবে না। কারণ সে খুব আয়না ভয় পায়। আমার সামান্য খটকা লাগিল। মেয়ে আয়না ভয় পাবে কেন? সে সিজিওফ্রেনিক না তো? কিছু সিজিওফ্রেনিক নিজের মুখোমুখি হতে ভয় পায় বলে আয়নার সামনে দাঁড়াতে পারে না। তাদের মনোবিশ্লেষণের একটা পর্যায়ে বড় বড় আয়নার সামনে দাঁড় করানো হয়। নিজের মুখোমুখি হওয়াতে অভ্যস্ত করার চেষ্টা করা হয়। এই বিষয়ে আমার শিক্ষক মিসির আলি সাহেবের একটি পেপার আছে। নাম Mind Mirror game.
কুলসুমের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হলো বাসর রাতে। আমার এক বৃদ্ধ নানীশাশুড়ি তাকে নিয়ে এলেন। গ্রামের বৃদ্ধারা অশ্লীল কথা বলতে পছন্দ করে। এই বৃদ্ধাও তার ব্যতিক্রম না। তিনি ধাক্কা দিয়ে কুলসুমকে আমার গায়ে ফেলে দিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, জামাই! জিনিস দিয়া গেলাম। শাড়ি, ব্লাউজ খুঁইল্যা দেইখা নেও সব ঠিক ঠিক আছে কি-না। এই বাক্যটির পর তিনি আরো একটি কুৎসিত বাক্য বললেন।
সেই বাক্যটি লেখা সম্ভব না। ঘেন্নায় আমার শরীর প্রায় জমে গেল। আমি আমার স্ত্রীর দিকে লজ্জায় তাকাতেও পারছিলাম না। না জানি মেয়েটা কি মনে করছে। নানীশাশুড়ি ঘর থেকে বের হওয়া মাত্র কুলসুম। মাথার ঘোমটা সরিয়ে স্পষ্ট এবং শুদ্ধ ভাষায় বলল, তুমি নানীজনের কথায় কিছু মনে করো না। গ্রামের এক বৃদ্ধার কাছ থেকে সুরুচি আশা করা যায় না।
আমি হতভম্ব হয়ে কুলসুমের দিকে তাকালাম। হতভম্ব হবার প্রধান কারণ— আমি আমার সমগ্র জীবনে এত রূপবতী মেয়ে দেখিনি। নিখুঁত সৌন্দৰ্য সম্ভবত একেই বলে। হেলেন অব ট্রয়, কুইন আব সেবা, ক্লিওপট্রা এরা কেউ এই মেয়েটির চেয়েও সুন্দর তা হতেই পারে না। আমি নিজের অজান্তেই বললাম, Oh my God. কি দেখছি।কুলসুম বলল, আমাকে দেখছি। আর কি দেখবে?
আমি এখন খানিকটা অস্বস্তি নিয়ে কুলসুমকে দেখছি। কোনো হিসাবই মিলছে না। গ্রামে বড় হওয়া একটা মেয়ে আগ বাড়িয়ে বিয়ের রাতে স্বামীর সঙ্গে তুমি তুমি বলে কথা বলা শুরু করবে না। চোখে চোখ রেখে স্বাভাবিক ভাবে বসে থাকবে না। সারাক্ষণ জড়সড় হয়ে থাকার কথা। আমার চিন্তা-ভাবনা সব কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। কি বলব বুঝতে পারলাম না।কুলসুম বলল, তোমার গরম লাগছে না?
আমি তখন প্ৰবল ঘোরে। গরম-শীতের কোনো অনুভূতি নেই। তারপরেও বললাম, হুঁ।কিছুক্ষণের মধ্যেই বুম বৃষ্টি নামবে। এমন ঠাণ্ডা লাগবে যে রীতিমত শীত করবে।আমি বললাম, হুঁ।কুলসুম বলল, বৃষ্টি নামলে আমরা বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখব।আমি বললাম, আচ্ছা।আমাদের এই বারান্দা থেকে নদী দেখা যায়। নদীর নামটা সুন্দর। তোমাকে কি কেউ নদীটির নাম বলেছে?
আমি বললাম, বলেছিল। এখন ভুলে গেছি।নদীর নাম রায়না।আমি বললাম, ও আচ্ছা রায়না।কুলসুম বলল, রায়না’র সঙ্গে কিসের মিল বলতো।আমি বললাম, জানি না।কুলসুম বলল, আয়না। রায়না আয়না। আমার ডাক নাম কিন্তু অয়না।তাই না-কি?
হুঁ।আমি প্ৰায় অপলকেই তাকিয়ে আছি আয়না নামের মেয়েটির দিকে। সে সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলে যাচ্ছে। কথা শুনছি। বার বার মনে হচ্ছে এই মেয়েটির প্রতিটি কথার অন্য কোনো ব্যাখ্যা আছে। ব্যাখ্যা ধরতে পারছি না। মাথার ভেতর আয়না এবং রায়না ঘুরপাক খাচ্ছে–
নদীর নাম রায়না
সেই নদীতে সিনান করে।
অবাক মেয়ে আয়না।
আমি অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করেছি। ছড়া কবিতা এইসব কখনো আমার মাথায় আসে না। তাহলে ছড়া তৈরি করছি কেন? সমস্যাটা কি।আয়না। হাসিমুখে বলল, দেখ দেখ বৃষ্টি নেমেছে।ঘরের পর্দা কাঁপছে। জানালা দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস আসছে। জানালার লাগোয়া কদমগাছের পাতায় বৃষ্টির শব্দ। আয়না বলল, চল বারান্দায় বসি। সে এসে হাত ধরে আমাকে দাঁড় করাল। আমার ঘোর আরো প্রবল হলো।
বারান্দা অন্ধকার। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎও চমকাচ্ছে। তার নীল আলোয় চারদিক স্পষ্ট হয়ে আবার অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। আমরা দু’জন পাশাপাশি দুটা বেতের চেয়ারে বসে আছি। আমার রীতিমত শীত লাগছে। আয়না একটা চাদর এনে আমার গায়ে দিয়েছে। বাইরে ঠাণ্ডা। চাদরের নিচে আরামদায়ক উষ্ণতা। আয়না বলল, তোমার কি ঘুম পাচ্ছে?
হুঁ।আয়না বলল, ঘুম পেলে ঘুমাও। সারাদিন নানান ধকল গেছে। তুমি ক্লান্ত হয়ে আছ। ঘুম পাবারই কথা। তুমি আরাম করে ঘুমাও তো। রেস্ট নাও। আমি ডেকে দেব।আচ্ছা।আমি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। আমার ঘুম ভাঙলো পরদিন ভোরে। আয়না আমাকে ডেকে তুলল। তার হাতে চায়ের কাপ। আমি প্ৰচণ্ড ধাক্কা খেলাম।
কারণ আমার সামনে যে আয়না দাঁড়িয়ে আছে সে রাতের আয়না না। সাধারণ বাঙালি এক তরুণী। গায়ের রং শ্যামলা। বেঁচো নাক। আমি প্ৰচণ্ড দ্বিধার মধ্যে পড়লাম। গত রাতে যে আয়নাকে দেখেছি, সে সত্যি না এখন যে আয়না আমার সামনে দাড়িয়ে আছে সে সত্যি? আমি কি কোনো মানসিক সমস্যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি? সিজিওফ্রেনিক রোগীর মতো হেলুসিনেশন হচ্ছে? আয়না বলল, তুমি পানি দিয়ে কুলি করে চা খাবে না-কি বাসিমুখে চ্য খাবে?
আমি জবাব দিলাম না। আয়নার হাত থেকে চায়ের কাপ নিলাম। আয়না বলল, ঠিক আছে বাসি মুখেই চা খাও। তারপর হাত মুখ ধুয়ে নিচে যাও। বাবা নাশতা নিয়ে তোমার জন্যে অপেক্ষা করছেন। বেলা। কিন্তু অনেক হয়েছে। সাড়ে ন’টা বাজে।নাসতার টেবিলে আয়নার বাবা চিন্তিত গলায় বললেন, তোমার কি শরীর খারাপ করেছে না-কি? খারাপ করেছে না-কি?
আমি বললাম, না।রাতে ভালো গরম পড়েছিল। গরমে মনে হয়।ঘুমাতে পার নাই।আমি বললাম, বৃষ্টি নামার পর সব ঠাণ্ডা। আরাম করে ঘুমিয়েছি।উনি অবাক হয়ে বললেন, বৃষ্টি মানে? বৃষ্টি হয় নাই তো।আমি অবাক হয়ে বললাম, বৃষ্টি হয় নাই?
তিনি আমার শাশুড়িকে ডেকে বললেন, জামাই কি বলছে শোন। কাল রাতে না-কি বৃষ্টি হয়েছে।আমার শাশুড়ি বললেন, ‘হপন’ দেখেছে।এই পর্যন্ত পড়ে মিসির আলি খাতা বন্ধ করলেন।গ্রামের মেয়েটির স্নান শেষ হয়েছে। সে চলে গেছে। মাছরাঙা পাখি ফিরে এসেছে। সে বসেছে ঠিক আগের জায়গায়। ডাইনিং টেবিলে কে কোন চেয়ারে বসবে সেটা যেমন ঠিক করা থাকে পাখিদের ক্ষেত্রেও হয়ত তাই। আমি বসব এই খুঁটিতে তুমি বসবে ঐটায়।
মিসির আলি সাহেব! আপনি এইখানে। আপনার সন্ধানে সমস্ত অঞ্চল চয়ে ফেলেছি। মাইকে ঘোষণা দিব কি-না চিন্তায় আছি আর আপনি এইখানে বসা। বটগাছ হলো সাপের আড্ডা। চলে আসেন। চলে আসেন।তরিকুল ইসলাম উদ্বিগ্ন গলার স্বর বের করলেন। মিসির আলি বললেন, শীতকালে সাপ থাকে না। সব হাইবারনেশানে চলে যায়। শীত নিদ্ৰা।
তরিকুল ইসলাম বললেন, পুরানা নিয়ম-কানুন। এখন নাই। অনেক সাপ আছে শীতকালেও জেগে থাকে। আসেন তো ভাই। চিতল মাছ চলে এসেছে। আপনাকে না দেখায়ে কাটতেও পারছি না। চিতল মাছ রাঁধতে সময় লাগে না। কিন্তু কাটাকুটি বিরাট হাঙ্গামা। বটগাছের গুড়িতে বসে করছিলেন কি?
দৃশ্য দেখছিলাম।দৃশ্য দেখার কি আছে। এখানে। কিছুই নাই। আধমরা এক নদী। নদীর পাড় ঘেঁষে যে হাঁটবেন। সেই উপায় নাই। সবাই নদীর পাড়ে হাগে। গ্রামের মানুষদের এমনই মেন্টালিটি-বাড়িতে সেনিটারি পায়খানা করে দিলেও হাগতে আসবে নদীর পাড়ে।মিসির আলি বললেন, এই প্রসঙ্গটা থাক। আসুন অন্য কোনো প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ করি।কি প্রসঙ্গ? আপনার জামাইকে নিয়ে কথা বলুন! বাড়িতে যেতে যেতে আপনার জামাইয়ের কথা শুনি। সে কেমন ছেলে?
ভালো। শুধু ভালো বললে কম বলা হবে অত্যাধিক ভালো। আয়নার সঙ্গে তার বনিব্যুনা হয় নাই। তারপরেও সে সব সময় আমার খোঁজ খবর করে। গত ঈদে আমাকে সিল্কের পাঞ্জাবি দিয়েছে। তার শাশুড়ির জন্যে লাল পেড়ে কাতান শাড়ি।ভালো তো।আমের সিজনে দুই ঝুড়ি আমি আনবেই। রাজশাহীর আমি। এক ঝড়ি খিরসাপাতি আরেক ঝুড়ি ল্যাংড়া।আয়নার সঙ্গে বনিবিনা হলো না কেন? ছেলের কোনো দোষ নাই। মেয়েটির সমস্যা। মাথা খারাপ মেয়ে। কোনো কারণ ছাড়া দুই দিন তিন দিন দরজা বন্ধ করে বসে থাকে।ডাক্তার দেখিয়েছিলেন?
তরিকুল ইসলাম বললেন, ডাক্তার কবিরাজ কিছু করতে পারবে না রে ভাই। মূল বিষয় হচ্ছে-খারাপ বাতাস। জানি সায়েন্স এইসব স্বীকার করবে না। তারপরেও খারাপ বাতাস বলে একটা বিষয় আছে। এই বিষয়ে আপনার মতামত কি?মিসির আলি কিছু বললেন না। তরিকুল ইসলাম বললেন, খারাপ বাতাস তৈরি করে খারাপ জ্বীন ভূত। তাবিজ কবচ দিয়ে জীন ভূত তাড়ানো যায়, কিন্তু খারাপ বাতাস তাড়ানো যায় না। এইটাই সমস্যা।
