খাওয়া শেষ করার পর ভদ্রলোক যে কাজটা করলেন তার জন্যে আমি প্ৰস্তুত ছিলাম না। তিনি আমার কাজের ছেলে হামিদকে ডেকে বললেন, বাবা, তোমার রান্না খেয়ে অত্যধিক তৃপ্তি পেয়েছি। এই পাঁচটা টাকা রাখো বখশিশ। আমি দরিদ্র মানুষ, এর চেয়ে বেশি দেবার সামর্থ্য নাই। তবে তোমার জন্যে খাস দিলে এখুনি আল্লাহপাকের দরবারে দোয়া করব। হাত তোলো দোয়ায় সামিল হও।
রউফ হাত তুলে দােয়া শুরু করলেন, হে আল্লাহপাক আজ অতি তৃপ্তি সহকারে যার রন্ধন খেয়েছি। তুমি তাকে বেহেশতে নাসিব করো। যেন সে বেহেশতি খানা খেতে পারে। যে পিতা-মাতা এমন এক বাবুর্চির জন্ম দিয়েছে। তাদেরকেও তুমি বেহেশতে নাসিব করো। আমিন।
দোয়া শেষ হবার পর দেখি হামিদের চোখে পানি। সে চোখ মুছে ফুঁপাতে লাগল।আমি বললাম, আজ রাতটা আপনি ঢাকায় থেকে যান। হামিদ মাংস রাধুক। সে ভালো মাংস রান্না করে।রউফ বললেন, আচ্ছা থাকলাম! ভোলার রোগী একদিন পরে দেখলেও ক্ষতি কিছু নাই। এতদিন রোগ ভোগ করেছে, আর একদিন বেশি ভোগ করবে। উপায় কি? সবই আল্লাহপাকের ইশারা। আপনার রোগী সন্ধ্যার পর দেখব। এখন শুয়ে কিছুক্ষণ। ঘুমাব। অতিরিক্ত ভোজন করে ফেলেছি।
রউফ মিয়া সন্ধ্যা পর্যন্ত নাক ডাকিয়ে ঘুমালেন। আমি হামিদকে বললাম রাতে ভালো খাবারের আয়োজন করতে। পোলাও, খাসির রেজালা, মুরগির কোরমা। বেচারা আরাম করে থাক। দুপুরে অতি সামান্য খাবার খেয়ে যে তৃপ্তির প্রকাশ দেখেছি তা আবার দেখতে ইচ্ছা করছে।
রউফ মিয়া যখন শুনলেন আমার কোনো রোগী নেই, আমি গল্প করার জন্যে তাকে টাকা পাঠিয়ে আনিয়েছি, তখন তিনি খুবই অবাক হলেন। আমি বললাম, ভাই রোগ আপনি কীভাবে সারান? রউফ মিয়া বললেন, রোগ ভক্ষণ করে ফেলি।কী করে ফেলেন? ভাই সাহেব, খেয়ে ফেলি। ভক্ষণ।আমি বললাম, কীভাবে খেয়ে ফেলেন?
চেটে খেয়ে ফেলি।আমি বললাম, কীভাবে চেটে খান? ভালোমতো ব্যাখ্যা করুন।রউফ বললেন, রোগীর কপাল চেটে রোগ খেয়ে ফেলতে পারি। হাতের তালু, পায়ের তালু চেটেও খাওয়া যায়। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে ঘাড় চেটে রোগ খাওয়া আমার জন্য সহজ।ও আচ্ছা।
রউফ দুঃখিত গলায় বললেন, আপনি মনে হয় আমার কথা বিশ্বাস করেন নাই। অনেকেই করে না। বাংলাদেশে বিশ্বাসী লোক পাওয়া কঠিন। সবাই অবিশ্বাসী। আমার কাছে দুটা সার্টিফিকেট আছে, দেখতে পারেন। আমি ইচ্ছা! করলে ব্যাগভর্তি সাটিফিকেট রাখতে পারতাম। রাখি নাই। কারণ আমি সাটিফিকেটের কাঙালি না।আপনি কিসের কাঙালি? ভালোবাসার কাঙালী। যে যার কাঙালা হয়। সে সেই জিনিস পায় না।আপনি পান নাই?
জি না। তবে আপনি ভালোবাসা দেখায়েছেন। আদর করে পাশে নিয়ে ভাত খেয়েছেন। নিজের হাতে প্লেটে তিন বার ভাত তুলে দিয়েছেন। ছোট মাছের সালুন দিয়েছেন দুই বার। সালুনের বাটিতে একটা বড় চাপিলা মাছ ছিল, সেটা আপনি নিজে না নিয়ে আমার পাতে তুলে দিয়েছেন। এমন ভালোবাসা আমারে কেউ দেখায় নাই। ভাই সাহেব, সার্টিফিকেট দুটা পড়লে খুশি হব।আমি সার্টিফিকেট দুটা পড়লাম। একটি দিয়েছেন নান্দিনা হাইস্কুলের অ্যাসিসটেন্ট হেডমাস্টার। তিনি লিখেছেন–
যার জন্য প্রযোজ্য
এই মৰ্মে প্রত্যয়ন করা যাইতেছে যে, ব্যতিক্রমী চিকিৎসক মোঃ রউফ মিয়ার চিকিৎসায় নান্দিনা হাইস্কুলের দপ্তরি শ্রীরামের কন্যা সুধা সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করিয়াছে। সে দীর্ঘদিন জটিল জণ্ডিস রোগে আক্রান্ত ছিল। আমি মোঃ রউফ মিয়ার উন্নতি কামনা করি। সে রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নয়। তাহার নৈতিক চরিত্র উত্তম।
মোঃ আজিজুর রহমান খান
সহকারী প্রধান শিক্ষক
নান্দিনা হাইস্কুল
দ্বিতীয় প্রশংসাপত্ৰটি উকিল আশরাফ আলি খাঁ দিয়েছেন। এই প্ৰশংসাপত্ৰটি ইংরেজিতে লেখা।
I hereby confirm the fact that Mr. Rouf Mia is a genuine diseases eater. He has performed the feat in presence of me.
রউফ মিয়া বললেন, ইংরেজি লেখাটার জোর বেশি। কী বলেন ভাই সাহেব? আমি বললাম, হ্যাঁ।রউফ মিয়া বললেন, উকিল মানুষ তো! অনেক চিন্তাভাবনা করে লিখেছেন।আমি বললাম, আপনার খবর স্থানীয় কোনো কাগজে আসে নি। এই জাতীয় খবর তো লোকাল কাগজগুলি আগ্রহ করে ছাপায়।
রউফ দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বললেন, নেত্রকোনা বার্তায় একবার খবর উঠেছিল। পেপার কাটিং হারায়ে ফেলেছি। তবে হারায়ে লাভ হয়েছে। ওরা আমার নাম ভুল করে ছেপেছে। লিখেছে রুব মিয়া। রব আর রউফ কি এক? ফাজিল পুলাপান সাংবাদিক হয়ে বসেছে। আর লিখেছেও ভুল। লিখেছে রব মিয়া অন্যের রোগ খেয়ে জীবনধারণ করেন। তিনি কোনো খাদ্য গ্ৰহণ করেন না। খাদ্য গ্ৰহণ না করলে মানুষ বাঁচে?
আমি বললাম, আপনি বিয়ে করেছেন?
যৌবনকালে বিবাহ করেছিলাম। স্ত্রী মারা গোল কলেরায়। ছেলে একটা ছিল, নাম রেখেছিলাম রাজা মিয়া। সুন্দর চেহারা ছবি ছিল- এই জন্যে রাজা মিয়া নাম। ছেলেটা মারা গেল টাইফয়েডে। রোগ খাওয়া তখন জানতাম না। এইজন্যে চোখের সামনে মারা গেল। রোগ খাওয়া জানলে টাইফয়েড কোনো বিষয় না। চোটে ভক্ষণ করে ফেলতাম।রোগ খাওয়ার কৌশল কীভাবে শিখলেন?
রউফ মিয়া দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বললেন, আমার ছেলে রাজা মিয়া আমারে শিখায়েছে। একদিন ভোর রাতে রাজা মিয়াকে স্বপ্নে দেখলাম। আমি বললাম, বাবা কেমন আছ? সে বলল, ভালো আছি। আমি বললাম, তোমার কি বেহেশতে নাসিব হয়েছে? সে বলল, জানি না। আমি বললাম, তোমার মা কই? তার সঙ্গে তোমার সাক্ষাৎ হয় না? সে বলল, না। তারপরেই সে আমারে রোগ খাওয়ার কৌশল শিখায়ে দিল। আমি স্বপ্নের মধ্যেই ছেলেকে কোলে নিয়া কিছুক্ষণ কাদলাম। ঘুম ভাঙার পর দেখি চউখের পানিতে বালিশ ভিজে গেছে।
রউফ মিয়া চোখ মুছতে লাগলেন। একসময় বললেন, আপনার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়েছি। আপনি যদি চান রোগ খাওয়ার কৌশল শিখায়ে দিব। তবে আপনারা ভদ্রসমাজ। আপনারা পারবেন না। চট্টাচাটির বিষয় আছে।
রউফ মিয়া দুদিন থেকে ভোলায় রোগী দেখতে গেলেন। ছয় মাস পর তার কাছ থেকে একটা চিঠি পেলাম। এইবারের চিঠি ছাপানো না, হাতে লেখা। তিনি লিখেছেন–
বিরাট আর্থিক সমস্যায় পতিত হইয়াছি। যদি সম্ভব হয় আমাকে দুইশত টাকা কৰ্জ দিবেন। আমি যত দ্রুত সম্ভব কর্জ পরিশোধ করিব।
ইতি
আপনার অনুগত
রউফ মিয়া (র, ভ)।
পুনশ্চতে লেখা- আমি নামের শেষে র, ভ টাইটেল নিজেই চিন্তা করিয়া বাহির করিয়াছি। র, ভ-র অর্থ রোগ ভক্ষক।আমি দুশ টাকা মানিঅৰ্ডার করে পাঠিয়ে দিলাম। এই ধরনের কর্জের টাকা কখনো ফেরত আসে না। তাতে কি। মানুষটার প্রতি আমার এক ধরনের মমতা তৈরি হয়েছে। অবোধ শিশুদের প্রতি যে মমতা তৈরি হয় আমার মমতার ধরনটা সে রকম।রউফ মিয়া তিন মাসের মাথায় টাকা নিয়ে ঢাকায় চলে এলেন। দু’দিন থাকলেন। দেখলাম তার স্বাস্থ্য আরো ভেঙেছে। জীবন্ত কঙ্কাল ভাব চলে এসেছে। আমি বললাম, শরীরের এই অবস্থা কেন ভাই?
রউফ মিয়া বললেন, অন্যের রোগ খেয়ে খেয়ে এই অবস্থা হয়েছে। রোগ খাওয়ার পর বেশি করে দুধ খেতে হয়। দুধ কই পাব বলেন? পনেরো টাকা কেজি দুধ।আমি বললাম, আসুন আপনাকে ডাক্তার দেখাই।রউফ মিয়া আঁতকে উঠে বললেন, অসম্ভব কথা বললেন। আমি বিখ্যাত রোগভক্ষক। এখন আমি যদি ডাক্তারের কাছে। যাই, লোকে কী বলবে?
কেউ তো জানছে না।কেউ না জানুক আপনি তো জানলেন। একজন জানা আর এক লক্ষ জন জানা একই কথা।রউফ মিয়া শীতের সময় এসেছিলেন। বাজারে নতুন সবজি উঠেছে। তার জন্যে বাজার করলাম। হামিদ অনেক পদ রান্না করল। তিনি কিছুই খেতে পারলেন না। দুঃখিত গলায় বললেন, ক্ষুধা নষ্ট হয়ে গেছে ভাই সাহেব। মানুষের রোগ ভক্ষণ করে করে এই অবস্থা হয়েছে। যদি সম্ভব হয় এক কাপ দুধ দেন।
আমি বললাম, রোগ খাওয়াটা ছেড়ে দিন।রউফ বললেন, নিজের ছেলে একটা বিদ্যা শিখায়ে দিয়েছে। মানুষ বিপদে পড়ে আমার কাছে আসে। ভাই সাহেব, কয়েকদিন আগে ছেলেটাকে স্বপ্নে দেখেছি। সে এখনো তার মা’ক্সে খুঁজে পায় নাই। পরকালে বাপ-মা ছাড়া ঘুরতেছে, দেখেন তো অবস্থা!
রউফ মিয়া হঠাৎ বড় বড় করে নিশ্বাস নিতে নিতে শুয়ে পড়লেন। তাঁর মুখ থেকে ঘর্ঘর শব্দ হতে লাগল।আপনার এ্যাজমা আছে না-কি? রউফ মিয়া বললেন, আপে ছিল না। সম্প্রতি হয়েছে। একজনের হাঁপানি ভক্ষণ করে এই অবস্থা। আমাকে ধরে ফেলেছে। আপনার ছেলেটাকে একটু বলুন বুকে সরিষার তেল মালিশ করে দিতে। রসুন দিয়ে তোলটা পরম করতে হবে।
হামিদ দীর্ঘ সময় ধরে তেল ঘসিল। এক সময় রউফ মিয়া ঘুমিয়ে পড়লেন।মিসির আলি থামলেন। আমি বললাম, আপনার রোগ মুক্তির পেছনে কি রোগভক্ষক রউফ মিয়ার কোনো ভূমিকা আছে।মিসির আলি বললেন, জানি না। এই চিঠিটা পড়ে দেখুন। হামিদ ভোরবেলা চিঠিটা দিয়ে গেছে। রউফ আমাকে দেখতে এসেছিলেন। চিঠি লিখে বান্দরবান চলে গেছেন। মুরং রাজার এক আত্মীয়ের চিকিৎসার জন্যে ডাক এসেছে।
আমি চিঠি হাতে নিলাম। চিঠিতে লেখা—
প্ৰাপক জনাব মিসির আলি।
প্রেরক বিশিষ্ট রোগভক্ষক বাংলার গৌরব রউফ মিয়া।
জনাব,
বান্দরবানের মুরং, রাজার এক জ্ঞাতি ভ্ৰাতা উল্লাং প্রশ্ন সাহেবের চিকিৎসার জন্যে অদ্য সকল এগারোটায় রওনা হইব। ঢাকায় আসিয়া আপনার অসুখের খবর শুনিলাম! হামিদকে নিয়ে হাসপাতালে আসিয়া আপনার অচেতন মুখ দেখিয়া মৰ্মে আঘাত লাগিয়াছে। বিশিষ্ট রোগভক্ষক, বাংলার গৌরব যাহার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং ভ্রাতাতুল্য তাহার এই অবস্থা কেন হইবে?
(বাংলার গৌরব টাইটেল বর্তমানে ব্যবহার করিতেছি। যে দেশের যে নিয়ম। নিজের ঢোল নিজেকেই বাজাতে হয়।) যাই হোক, আমি আপনার ডান হাত চাটিয়া রোগ সম্পূর্ণই ভক্ষণ করিয়াছি। অবশিষ্ট কিছুই নাই। কিছুদিন শরীর দুর্বল থাকিবে। দধি এবং ফল খাইবেন। কচি ডাবের পানি শরীরের জন্যে রোগমুক্তি সময়ে অত্যন্ত উপকারী।
ইতি
আপনার
অনুগত
মোঃ রউফ মিয়া
বিশিষ্ট রোগভক্ষক
বাংলার গৌরব।
পুনশ্চ : জনাব, ভালো কাগজে একটা প্যান্ড ছাপাইতে কত খরচ পড়িবে সেই অনুসন্ধান নিবেন। প্যাডে। আমার নাম, ঠিকানা এবং টাইটেল লেখা থাকিবে। বাংলার গৌরব লেখা থাকিবে সোনালি কালিতে। প্যাডের ডান পার্শ্বে আমার ছবি। তিনটি ছবি সঙ্গে দিয়া দিলাম। যেটি পছন্দ হয় সেটি ব্যবহার করিবেন।
তিনটি ছবিরই ক্যাপশন আছে। একটিতে রউফ মিয়ার কানে মোবাইল টেলিফোন। ক্যাপশনে লেখা- রুগীর সঙ্গে বাক্যালপো রত।দ্বিতীয় ছবিতে তিনি ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে চোখে কালো চশমা। ক্যাপশনে লেখা- কলে যাবার জন্য প্রস্তুত।তৃতীয় ছবিতে তিনি একটি শিশুর কপাল চাটছেন। ক্যাপশনে লেখা–চিকিৎসা চলাকালীন ছবি।চিঠি মিসির আলির হাতে ফেরত দিতে দিতে বললাম, আপনার কি ধারণা? সে সত্যি রোগ খেয়ে ফেলেছে?
মিসির আলি বললেন, রউফ আমার কাছে এসেছিলেন রাত ন’টায়। তিনি পনেরো মিনিটের মতো ছিলেন। এর মধ্যে হাসপাতালে হৈচৈ পড়ে যায়। নার্সডাক্তার মিলে বিরাট জটলা। বুড়ো এক পাগল মেঝেতে বসে কুকুরের মতো আমার হাত চাটছে। তাকে দারোয়ান দিয়ে তাড়িয়ে দেয়া হয়। আমার জ্ঞান ফিরে রাত দশটার দিকে। জ্বর তখনি নেমে যায়। রাত বারোটার সময় বুঝতে পারি আমি পুরোপুরি সুস্থ।আমি বললাম, আপনি আমার প্রশ্নের জবাব দেন নি। আপনার কি ধারণা রোগভক্ষক আপনার রোগ ভক্ষণ করেছে?
মিসির আলি বললেন, জানি না। হিসাব মিলাতে পারছি না। রেইন ফরেস্টের আদিবাসী শমন চিকিৎসকদের মধ্যে রোগীর বুড়ো আঙুল চুষে রোগ আরোগ্যের পন্থা আছে। রেড ইন্ডিয়ানরা গায়ে হাত বুলিয়ে রোগ সারায়। অধ্যাপক মেসমার বডি ম্যাগনেটিজম চিকিৎসার কথা বলতেন। এর কোনোটাই বিজ্ঞান স্বীকার করে। না। যুক্তি স্বীকার করে না। আমি নিজে কঠিন যুক্তিবাদী মানুষ। তারপরেও…।
মিসির আলি রেডিও বন্ড কাগজে প্যাড ছাপিয়েছিলেন। রোগভক্ষক রউফ মিয়ার কাছে সেই প্যাড পৌঁছানো যায় নি। বান্দরবান থেকে ঢাকা ফেরার পথে বাসে বমি করতে করতে তাঁর মৃত্যু হয়। মিসির আলি বন্ধুর মৃত্যুর খবর পান এক মাস পরে।
লিফট রহস্য
মিসির আলি বললেন, লিফটে উঠে কখনো ভয় পেয়েছেন? আমি কিছুক্ষণ চিন্তা করলাম। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় মহসিন হলের লিফটে এক ঘণ্টার জন্যে আটকা পড়েছিলাম। আমার সঙ্গে জীবনে প্রথম লিফটে উঠেছেন এমন এক বৃদ্ধ ভয়ে জ্ঞান হারিয়েছিলেন। আমি নিজে ভয় পাই নি। দিনের বেলা বলেই লিফটে কিছু আলো ছিল। পুরোপুরি অন্ধকার ছিল না। আমি মিসির আলির দিকে তাকিয়ে বললাম, না।কেউ প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে এমন শুনেছেন? এক বুড়ো মানুষকে নিজে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যেতে দেখেছি।লিফটে ভয় পাওয়া নিয়ে কোনো গল্প শুনেছেন?
আমি বললাম, একটা গল্প শুনেছি। গল্পের সত্য-মিথ্যা জানি না। এক লোক সাত তলা থেকে গ্রাউন্ড ফ্লোরে যাবে। লিফটের বোতাম টিপল। লিফটের দরজা খুলল। তিনি ভেতরে ঢুকে হুড়মুড় করে নিচে পড়ে গেলেন। কারণ লিফটের দরজা খুলেছে ঠিকই কিন্তু লিফট আসে নি। মেকানিক্যাল কোনো গণ্ডগোল হয়েছে।লিফট নিয়ে কোনো ভূতের গল্প পড়েছেন?
স্টিফেন কিং-এর একটা গল্প পড়েছি। বেশ জমাট গল্প। সায়েন্স ফিকশন টাইপ।মিসির আলি বললেন, আমি লিফট নিয়ে একটা গল্প বলব। এক তরুণী লিফটে উঠে এমনই ভয় পেল যে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল। সে এখন এক ক্লিনিকে আছে। তার চিকিৎসা চলছে।কি দেখে ভয় পেয়েছে? এখনো পুরোপুরি জানি না। চলুন যাই চেষ্টা করে দেখি মেয়েটার মুখ থেকে কিছু শোনা যায় কি-না। সম্ভাবনা ক্ষীণ। ভয় পেয়ে যে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সে ভয় কেন পেয়েছে সেই বিষয়ে মুখ খুলবে না। এটাই স্বাভাবিক।আমি বললাম, মেয়েটার খোজ পেলেন কীভাবে?
মিসির আলি বললেন, ক্লিনিকের ডাক্তার আমাকে জানিয়েছেন। মেয়েটির ব্যাপারে সাহায্য চেয়েছেন। মেয়েটা তার আত্মীয়া। বোনের মেয়ে বা এই জাতীয় কিছু।মেয়েটার নাম লিলি। বয়স ২৪/২৫ বা তারচে’ কিছু বেশি। গায়ে হাসপাতালের সবুজ পোশাক। সাধারণ বাঙালি মেয়ে যেমন হয় তেমন। রোগা, শ্যামলা। মেয়েটার চোখ সুন্দর। বিদেশে এই চোখকেই বলে Liquid eyes.
চাদর গায়ে সে জড়সড় হয়ে ক্লিনিকের খাটে বসে আছে। সে দুহাতে একজন বয়স্ক মহিলার হাত চেপে ধরে আছে। শব্দ করে নিশ্বাস ফেলছে। কিছুক্ষণ পর পর টোক গিলছে।মিসির আলি বললেন, মা কেমন আছ? লিলি তাকাল কিন্তু কোনো জবাব দিল না। বয়স্ক মহিলা বললেন, লিলি কারো প্রশ্নের জবাব দেয় না। শুধু বলে লিফটের ভিতর ভয় পেয়েছি। এর বেশি কিছু বলে না।মিসির আলি বললেন, আপনি কি লিলির মা? জি।আপনাকেও বলে নি কি দেখে ভয় পেয়েছে?
না। বেশি কিছু জিজ্ঞেসও করি না। এই বিষয়ে জানতে বেশি জোরাজুরি করলে মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে যায়।মিসির আলি লিলির সামনের চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, মা শোনো! তুমি প্রচণ্ড ভয় পেয়েছ বুঝতে পারছি। এখন তুমি লিফটের ভেতরে নেই। লিফটের বাইরে। বাকি জীবন আর লিফটে না উঠলেও চলবে। চলবে না?
এই প্রথম লিলি কথা বলল। বিড়বিড় করে বলল, আমি আর কোনোদিন না।মিসির আলি বললেন, যে লিফটে উঠে তুমি ভয় পেয়েছ। সেখানে তুমি না। উঠলেও অন্যরা উঠবে। তারাও ভয় পেতে পারে। তাদের অবস্থাও তোমার মতো হতে পারে। পারে না? পারে।
Read more
