ম্যাজিক মুনশি পর্ব:৩ হুমায়ূন আহমেদ

ম্যাজিক মুনশি পর্ব:৩

আমি বললাম, আপনার পর্যবেক্ষণশক্তি ভালো। আমি বেশ অবাক হয়েছি। আপনার আতর খানিকটা কি আমাকে দিতে পারবেন? আমি আমার স্ত্রীকে দিতাম। অদ্ভুত আতরের গন্ধে সে খুশি হবে। সুগন্ধির প্রতি তার বিশেষ দুর্বলতা আছে।মুনশি কিছু বললেন না। হাসলেন। ভদ্রলোকের হাসি সুন্দর।আমি বললাম, শুনেছি আপনি খুব ভালো ম্যাজিক দেখান। আপনার কাছে নাকি জুয়েল আইচ শিশু। জুয়েল আইচকে চিনেছেন তো? জি জনাব। বাংলাদেশে বাস করব উনাকে চিনব না, তা হয় না।তাঁর কোনো জাদু কি দেখেছেন? জি-মা। হাওর অঞ্চলে থাকি, কীভাবে দেখব?

আমি বললাম, মসজিদের একজন ইমাম জাদু দেখান এই প্রথম শুনলাম।মুনশি জবাব দিলেন না। মনে হচ্ছে তিনি কম কথা বলেন। ভদ্রলোকের ভাষা শুদ্ধ, কিছুটা পোশাকি। বাড়ি মনে হয় সিলেট অঞ্চলে না। তবে কিছুদিন সিলেটে থাকলে ভাষায় সিলেটি ঢুকে যাওয়ার কথা। সিলেটি ভাষার আগ্রাসী রূপ আছে। এই প্রসঙ্গে একটা ব্যক্তিগত কাহিনী বলি— নিউইয়র্ক বইমেলায় গিয়েছি। আমি এবং শাওন গানের একটা অনুষ্ঠান দেখব। বইমেলার আয়োজক বিশ্বজিৎ সাহার জনৈক কর্মচারীর হাতে দুঘণ্টার জন্যে পুত্র নিষাদকে ছেড়ে দিয়েছি। নিষাদের বয়স তিন। বিশ্বজিতের কর্মচারীর নাম শাহীন, বাড়ি সিলেট।

দুঘণ্টা পর ফিরে আসতেই নিষাদ বলল, বাবা, আইসক্রিম খাইমু।এই দুঘণ্টাতেই তার ভাষায় সিলেটি ঢুকে পড়েছে।আমি ম্যাজিক মুনশির দিকে তাকিয়ে বললাম, আপনি কি চা খাবেন? মুনশি বললেন, চা খাব না। চা খেলে অজু ভেঙে যাবে। এশার নামাজ শেষ করে চা খাব।আপনার পড়াশোনা কতদূর? খুবই সামান্য। উলা পাশ করেছি। মৌলানায়ে মুহাদ্দেস হওয়ার ইচ্ছা ছিল। দরিদ্র ঘরের সন্তান। অর্থের অভাবে পড়তে পারি নাই। কোরানে হাফেজ হওয়ার শখ ছিল। মেধার অভাবে পারি নাই।মাঝখান থেকে ম্যাজিক শিখে ফেলেছেন?

ম্যাজিক মুনশি ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেললেন। কিছু বললেন না।আমি বললাম, এখন কি আমি আপনার ম্যাজিক দেখব? আপনি চাইলে অবশ্যই দেখবেন।আমি ম্যাজিক দেখার প্রস্তুতি নিলাম।অদ্ভুত কিছু দেখবু তা ভাবলাম না। গ্রামের মুনশি মানুষ শুত ম্যাজিক জানবেন কীভাবে? দড়ি কেটে জোড়া লাগানো, কিংবা পয়সার কোনো খেলা।তবে ম্যাজিশিয়ান না এমন অনেকের কাছ থেকে আমি বিস্ময়কর কিছু ম্যাজিক দেখেছি। অভিনেতা রহমত (বিভাগীয় প্রধান, নাট্যকলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) এমন একজন।নাটকের শুটিং শেষে রহমতকে নিয়ে আড্ডা দিচ্ছি, হঠাৎ সে বলল, স্যার একটা কয়েন দিন।

আমি কয়েন দিলাম। রহমত বলল, স্যার দেখুন কয়েনটা ঘসতে ঘসতে কীভাবে ভ্যানিশ করি। বলেই সে কয়েনটা বাঁ হাতের কনুইতে ঘসতে শুরু করল। চোখের সামনে কয়েন অদৃশ্য হয়ে গেল। কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া গেল না।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের আমার এক শিক্ষক ড. তৌফিকুর রহমান অপূর্ব সব তাশের ম্যাজিক জানেন।

একবার নুহাশপল্লীতে রাত্রি যাপন করতে এসে আমাদের এক ঘণ্টা তাশের ম্যাজিক দেখিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখলেন।পামিং-এর অদ্ভুত এক কৌশল আমি দেখেছিলাম একজন মাঝির কাছে। সে নিজের মনে সিগারেট টানছিল। আমাকে দেখে জ্বলন্ত সিগারেট হাতে লুকিয়ে ফেলল। তার দুটা হাতই আমার সামনে মেলে ধরা। হাতে সিগারেট নেই। অথচ আঙুলের ফাঁক দিয়ে ধােয়া আসছে।

সিগারেট পামিং-এর কৌশল আমি তার কাছ থেকে শিখেছি। তবে তার মতো ভালো পারি না।ম্যাজিক মুনশি কী করবে কে জানে!ম্যাজিকের জন্যে কেবিনঘর খুব উপযুক্ত। আলো কম। দুটি মোমবাতি, একটি হারিকেন। বাতাস আটকানোর জন্যে কেবিনের জানালা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দর্শক আমি একা। সর্পরাজ ভেতরে আসতে চাচ্ছিল। আমি দেই নি। ম্যাজিক মুনশির গায়ের অদ্ভুত চা-পাতা গন্ধওয়ালা আতরের স্নিগ্ধ গন্ধ নষ্ট হোক তা চাই নি। সর্পরাজ ঢুকবে জর্দার কড়া গন্ধ নিয়ে। তার এই স্পেশাল জর্দা নাকি ইন্ডিয়া থেকে আসে। জর্দার নাম গোপাল জর্দা।আমি প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করতে করতে বললাম, ভাই দেখন একটা ম্যাজিক।

স্যার, আপনার সিগারেটটা টেবিলে শুইয়ে রাখুন।আমি তাই করলাম। সিগারেট গড়াতে গড়াতে আমার দিকে আসতে শুরু করল। যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি সিগারেট ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে আসছে। ম্যাজিক মুনশি শীতল চোখে তাকিয়ে আছে সিগারেটের দিকে।চমকে ওঠার মতো কোনো ম্যাজিক না। এর কৌশল অত্যন্ত সহজ। সিগারেটে মুখ দিয়ে ফুঁ দিতে হয়। ফুটা এমনভাবে দিতে হয় যেন দর্শক দেখতে না পারে।

নিচের ঠোঁট খানিকটা ভেতরের দিকে ঢুকিয়ে ফুঁ দেওয়া নিয়ম। এইসময় মাথা খানিকটা ঝুঁকে থাকবে যেন দর্শক স্পষ্টভাবে ঠোঁট দেখতে পারেন। একই পদ্ধতিতে বই হাতে নিয়ে ফুঁ দিলে আপনাআপনি বইয়ের পাতা উল্টাতে থাকে। যারা ম্যাজিকের ভেতরের কৌশল জানেন না তারা ঘটনা দেখে চমৎকৃত হন। সমস্যা হচ্ছে আমি কৌশলটা জানি।

কৌশল জানার পরেও ম্যাজিকের শেষ পর্যায়ে এসে চমকাতে হলো। সিগারেটটা আমার খুব কাছাকাছি এসে শোয়া অবস্থা থেকে দাড়িয়ে পড়ল। ফিল্টারটা নিচে, সাদা অংশ উপরে।ফুঁ দেওয়ার কোনো বিশেষ টেকনিকে এটা কি করা সম্ভব? আমি জানি না। সিগারেটের মাথায় অদৃশ্য সুতা লাগিয়ে এটা করা যাবে। অদৃশ্য সুতা বিদেশের ম্যাজিক স্টোরে পাওয়া যাবে। ম্যাজিক মুনশি এই অদৃশ্য সুতা কোথায় পাবে! বিদেশ থেকে তার কোনো আত্মীয়স্বজন কি পাঠিয়েছে?

ধরে নিলাম পাঠিয়েছে। সুতার একটা মাথা সিগারেটের মাথায় লাগাতে হবে। ম্যাজিক মুনশি সেই সুযোগ তো পায় নি। সিগারেট সবসময় আমার হাতে ছিল।আমি বললাম, আপনার ম্যাজিক দেখে ধাক্কার মতো খেয়েছি। এত সুন্দর ম্যাজিক কোথায় শিখেছেন? মুনশি বলল, স্যার! কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর আমি দেব না। আপনার কাছে। তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করি।আপনি কি এই সিগারেটট শূন্যে ভাসিয়ে রাখতে পারবেন?না। তবে আমি নিজে কিছুক্ষণ শূন্যে ভেসে থাকতে পারি।

কতক্ষণ?

এক মিনিট।

মাটি থেকে কতদূর উপরে ভাসতে পারেন?

ছয় সাত ইঞ্চি, এর বেশি না।

শূন্যে ভাসার ম্যাজিককে বলে Levitation। এক দেড় মিনিট অনেক ম্যাজিশিয়ানই শূন্যে ভাসতে প ন। কৌশলটা আমার জানা আছে, তবে নিজে কখনো করি নি। শূন্যে ভাসার একটা Optical illuston করা হয়। চক্ষুবিভ্রমের জন্যে দরকার একজোড়া সাধারণ কাপড়ের জুতা।ডেভিড ব্রেইন নামের আর রিকান স্ট্রিট ম্যাজিশিয়ান এই খেলা পথেঘাটে দেখান।আমি বললাম, শূন্যে ভাসার ম্যাজিকটা দেখানোর সময় কি আপনার পায়ে জুতা থাকে? ম্যাজিক মুনশি বললেন, জি-না স্যার।পায়ে খড়ম থাকে?

না। তবে খড়ম থাকলেও কোনো সমস্যা নাই।তাহলে তো পায়ে জুতা থাকলেও কোনো সমস্যা নেই।জি-না স্যার।আমি পকেট থেকে একটা পাঁচ টাকার কয়েন বের করে বললাম, আমি আপনাকে একটা ম্যাজিক দেখাব। দেখি আপনি কৌশলটা ধরতে পারেন কি না।ম্যাজিক মুনশি শিশুসুলভ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে রইল। আমি মুদ্রাটা ডান হাত থেকে বাঁ হাতে নিলাম। বাঁ হাতের মুঠি বন্ধ করলাম। সিগারেটের প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে মুঠিবদ্ধ হাতের কাছে নিয়ে বললাম, খ সিগারেট খা। পাঁচ টাকার কয়েন খা।

হাতের মুঠি খুললাম। কয়েন নেই। সিগারেটে কয়েকবার ঝাকি দিতেই কয়েন বের হলো! যেন কয়েনটা সিগারেটের ভেতর ছিল। কঁকি দেওয়ায় বের হয়েছে।ম্যাজিক মুনশি মুগ্ধ গলায় বলল, অদ্ভুত! সোবাহানাল্লাহ!আমি চিন্তায় পড়লাম। এই খেলাকে অদ্ভুত বলার কিছু নেই। পামিং-এর অতি সাধারণ কৌশল। পামিং ম্যাজিকের ভাষা। এর অর্থ হাতের তালুতে কোনো বস্তু লুকিয়ে রাখা। সব ম্যাজিশিয়ানকেই অল্পবিস্তর পামিং জানতে হয়। এই পামিং শিখতে বৎসরের পর বৎসর লাগে। তবে বর্তমানের আধুনিক ম্যাজিকে পামিং লাগে না। নতুন প্রযুক্তি জাদুকরকে পামিং শেখার দীর্ঘ ক্লান্তিকর শিক্ষানবিশীর কষ্ট থেকে মুক্তি দিয়েছে।

আমি ম্যাজিক মুনশির চোখমুখ দেখে পরিষ্কার বুঝতে পারছি তিনি পামিং বিষয়টা জানেন না। আমি বললাম, আপনি কি সিগারেটের পয়সা গিলে ফেলার কৌশলটা শিখতে চান? আপনি শিখতে চাইলে আমি শিখাতে পারি।জনাব আপনার মেহেরবানি।এই দেখুন মুদ্রাটা আমি ডান হাতের তালুতে নিলাম। ডান হাত থেকে বাম হাতের তালুতে দেখেছেন? জি।আমি কিন্তু বাম হাতের তালুতে মুদ্রাটা নেই নি। ডান হাতের তালুতে লুকিয়ে রেখেছিলাম। একে বলে পামিং। বাংলায় বলে হাতসাফাই। হাতসাফাই শব্দটি শুনেছেন না? শুনেছি।আপনি হাতসাফাই জানেন না?

জি-না। স্যার আরেকটা ম্যাজিক দেখান।আমি একটা কাগজ নিয়ে তাকে না দেখিয়ে লিখলাম—গোলাপ। কাগজটা বলের মতো বানিয়ে ম্যাজিক মুনশির হাতে দিয়ে বললাম, একটা ফুলের নাম বলুন।তিনি বললেন, গোলাপ।আমি কাগজের বল খুলে গোলাপ লেখাটি তাকে দেখিয়ে বললাম, আপনি যে গোলাপ বলবেন আমি আগেই সেটা জানতাম।ম্যাজিক মুনশি বলল, স্যার অবাক মানলাম।আমি বললাম, অবাক মানার কিছু নেই। শতকরা ৮০ ভাগ মানুষকে কোনো একটা ফুলের নাম বলতে বলা হলে সে বলবে গোলাপ। কাজেই আমি কাগজে গোলাপ লিখে আপনার হাতে দিয়েছি। আমি ধরেই নিয়েছি আপনি শতকরা ৮০ ভাগের মধ্যে পড়বেন।

যদি গোলাপ না বলে অন্য কোনো ফুলের নাম বলতাম? তাহলে ম্যাজিকটা করতে পারতাম না। আমি যে গোলাপ লিখে তার হাতে দিয়েছি তা জানতাম না। কাগজের গোল্লাটা দিয়ে অন্য কিছু করার চেষ্টা করতাম। আচ্ছা মুনশি সাহেব, আপনি ম্যাজিক দেখান কেন? পুলাপানরা আনন্দ পায় এইজনো দেখাই। বড়দের দেখাই না।বড়রা আনন্দ পায় না? জি-না। আনন্দ পাওয়ার জন্যে অবাক হতে হয়। বড়রা অবাক হয় না। তারা বলে, এইগুলান কিছু না, যন্ত্র।আমি বললাম, মন্ত্র কি আছে?

ম্যাজিক মুনশি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, স্যার আপনার এই প্রশ্নের জবাব দিব না। বেয়াদবির জন্য ক্ষমা চাই। স্যার, যদি আপনি আমাকে আধঘণ্টা সময় দেন তাহলে এশার নামাজটা পড়ায়ে আবার আসব।নামাজ পড়িয়ে আসুন। আমরা রাতের খাবার একসঙ্গে খাব। আপনার অনেক মেহেরবানি।ম্যাজিক মুনশি চলে যাওয়ার পর লক্ষ করলাম আমার সিগারেটের প্যাকেটের উপর একটা গোলাপ ফুল। এই ফুল আগে ছিল না। আমি গোলাপ ফুলের নাম নিয়েছি বলেই কি সিগারেটের প্যাকেটের উপর গোলাপ? বিস্ময়ে অভিভূত হওয়া ছাড়া আমার পথ রইল না।।এই লোকটির ম্যাজিক কোন পর্যায়ের? প্রাচীন ম্যাজিক দুটি শাখায় বিভক্ত হয়েছিল। একটিকে বলা হতো আসল ম্যাজিক। অন্যটিকে বলা হতো ভোজবাজি বা নকল ম্যাজিক।

ভোজবাজি শব্দটা এসেছে মালব দেশের রাজা ভোজরাজার কাছ থেকে। তিনি হাতসাফাই-এর খেলায় একজন গ্র্যান্ডমাস্টার ছিলেন। ভোজরাজ মাসে একবার প্রজাদের আনন্দ দেওয়ার জন্যে জাদুর খেলা দেখাতেন। রাজার একমাত্র মেয়ে ভানুমতি খেলা দেখানোয় বাবাকে সাহায্য করতেন। এই কারণেই জাদুবিদ্যার আরেক নাম ভানুমতির খেলা। আমাদের দেশের বেদিনীরা ভানুমতির খেলা নাম দিয়েই ম্যাজিক দেখায়।ভারতের রোপ ট্রিককে আসল ম্যাজিকের পর্যায়ে ফেলা হয়। এই ম্যাজিকে জাদুকর তার সন্তান এবং এক গাছ দড়ি হাতে নিয়ে উপস্থিত হন।

ম্যাজিক শুরু হওয়ার পর দড়ি আপনাআপনি শূন্যে উঠে স্থির হয়ে যায়। তখন জাদুকরপুত্র দড়ি বেয়ে উঠতে থাকে। অনেকদূর উঠে সে অদৃশ্য হয়ে যায়। তারপর ম্যাজিশিয়ান ধারালো তলোয়ার কামড়ে ধরে দড়ি বেয়ে উঠে অদৃশ্য হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর জাদুকরপুত্রের আর্তনাদ শোনা যায়। তার শরীরের কাটা অংশ একে একে শূন্য থেকে নিচে পড়তে থাকে। দর্শকরা আতংকে অস্থির হয়ে পড়েন।

তখন জাদুকর দড়ি বেয়ে নেমে আসেন। পুত্রের শরীরের খণ্ড খণ্ড অংশগুলি ঝুড়িতে ভরে, ঝুড়ি চাদর দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। জাদুকরপুত্র চাদর সরিয়ে বের হয়ে আসে। এই দড়ির ম্যাজিকের অনেক ভেরিয়েশন আছে, তবে মূলটা এক।মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর এই খেলা দেখেছিলেন। তিনি জাহাঙ্গীরনামায় তার চমৎকার বর্ণনা লিখে গেছেন। সম্রাট বানিয়ে বানিয়ে জাদুকরের খেলা নিয়ে লিখবেন তা মনে হয় না।

সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজসভায় (সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ) ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত Sir Tomas Roe নিজেও ছিলেন। তিনিও তার আত্মজীবনীতে বোপ ট্রিকের কথা লিখে গেছেন। তাঁর লেখায় একটি মজার তথ্য আছে। যে সাতজন জাদুকর সেদিন রাজসভায় অদ্ভুত সব জাদু দেখিয়েছিলেন তারা সবাই ছিলেন বাঙালি। Sir Jomas Roe-র ভাষায় Seven Bengali jugglers।সম্প্রতি আমার হাতে একটি বই এসেছে (জাদুবিদ্যার মাধ্যমে আপনাআপনি আসে নি, আমি নিউইয়র্ক থেকে কিনেছি), নাম The Rise of the Indian Rope Trick. লেখকের নাম Peter Lamort।

লেখক ২৫০ পৃষ্ঠার বই লিখে প্রমাণ করতে চেষ্টা করেছেন রোপ ট্রিক নামের কোনো কৌশল ভারতবর্ষে ছিল না। পুরো বিষয়টি কল্পনাবিলাসী ব্রিটিশদের বানানো।আমি বইটির যুক্তির সঙ্গে একমত হব কি না বুঝতে পারছি না। অকারণে অদ্ভুত এক জাদু নিয়ে মিথ তৈরি হয় না।জুয়েল আইচের সঙ্গে এই বিষয়ে আমার কথা হয়েছে।

তিনিও Peter Lamon এর সঙ্গে একমত। তারও ধারণা এটা মিথ। সাধারণ মানুষ মিথ তৈরি করতে ভালোবাসে বলেই মিথ তৈরি হয়। জাদুকর পি সি সরকারকে নিয়েও এরকম একটা মিথ আছে। মিথটা এরকম— হলভর্তি দর্শক। সাতটার সময় শো শুরু হওয়ার কথা। পি সি সরকার আসছেন না। তিনি এক ঘণ্টা পর রাত আটটায় উপস্থিত হলেন।

দর্শকরা চেঁচাচ্ছে, এক ঘণ্টা লেট। এক ঘণ্টা লেট।পি সি সরকার বললেন, লেট হব কেন? আপনারা ঘড়ি দেখুন। সবাই দেখল, তাদের প্রত্যেকের ঘড়িতে সাতটা বাজে।বলা হয়ে থাকে ঘড়ির এই মিথ ছড়ানোর পেছনে পি সি সরকারের নিজের ভূমিকা আছে। এই মিথ ফ্রাংকেনস্টাইন হয়ে তার উপর চড়াও হয়েছিল। গল্পটা বলা যেতে পারে।পি সি সরকার রঙ্গমঞ্চে জাদু দেখাচ্ছেন।

হলভর্তি মানুষ। হঠাৎ দর্শকদের একজন বলল, আমরা ঘড়ির ম্যাজিকটা দেখতে চাই।পি সি সরকার ভান করলেন যেন শুনতে পান নি। তিনি তাঁর জাদু দেখিয়ে যাচ্ছেন। দর্শকদের গুঞ্জন শুরু হলো। এক পর্যায়ে সব দর্শকই বলল, আমরা ঘড়ির জাদু দেখব। অন্য জাদু না।।পি সি সরকারকে জাদু প্রদর্শনী বন্ধ করতে হলো।

মিথ হিসেবে পরিচিত ইন্ডিয়ান রোপ ট্রিকে ফিরে যাই। লাসভেগাসের এক জাদু অনুষ্ঠানে আমি ইন্ডিয়ান রোপ ট্রিক দেখেছি। জাদুকরের নাম মনে নেই। চমৎকার llusion। স্টেজে জাদু দেখানো আর পথেঘাটে জাদু দেখানো সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। ইন্ডিয়ান রোপ ট্রিক পথেঘাটে দেখানো হতো।আমার দাদাজান মৌলানা আজিমুদ্দিন আহমেদ দাবি করেন দড়ির জাদুর এই খেলা তিনি শম্ভুগঞ্জের হাটের দিন অনেকের সঙ্গে দেখেছেন। দাদাজান মাদ্রাসার শিক্ষক, কঠিন মৌলানা। মিথ্যা কথা তিনি বলবেন তা কখনো হবে না। তারপরও আমার ধারণা তিনি মিথ্যা বলেছেন। এই ধারণার পিছনে কারণ ব্যাখা করি।

দাদাজান গল্প করেছেন আমার সঙ্গে। আমার বয়স তখন পাট কিংবা ছয়। শিশুদের আনন্দ দেওয়ার জন্য বানিয়ে গল্প বলা যেতে পারে। তিনি আমার সঙ্গে একদিন মৎস্যকন্যা দেখার গল্পও করলেন। জেলেদের জালে এক মৎস্যকন্যা ধরা পড়ল। তার কোনো হাত নেই। গাত্রবর্ণ নীল। সে শুশুকের মতো ভোঁস ভোস শব্দ করছিল। মৎস্যকন্যা বলে কিছু নেই। কাজেই মৎস্যকন্যার গল্পটি বানানো।

যিনি একটি বানানো গল্প করতে পারেন তিনি আরও বানানো গল্প করতে পারেন।বাকি থাকল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আত্মজীবনী। এই সম্রাট ডুবে থাকতেন মদ, আফিং এবং চরসের নেশায়। নেশাগ্রস্ত একজন মানুষ কী দেখতে কী দেখেছেন কে জানে!প্রাচীন ভারত ছিল জাদুবিদ্যারই দেশ। বেদেরা জাদু দেখাত, সাধুসন্ন্যাসীরা জাদু দেখাতেন। জাদুর দেশ কামরূপ কামাক্ষা নিয়ে গল্পগাঁথা এখনো চালু।

যেসব বিদেশী পর্যটক ভারতবর্ষে এসেছিলেন, মার্কোপোলো (Marco Polo} তাঁদের একজন। তিনি কাশ্মিরের এক জাদুকরের কথা লিখেছেন, যিনি আবহাওয়া পরিবর্তন করতে পারতেন। রৌদ্রোজ্জ্বল দিনকে অন্ধকার করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখতেন, যা মার্কোপোলো নিজে প্রত্যক্ষ করেছেন। (মার্কোপোলো তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে অনেক আজগুবি কথা লিখে গেছেন। তাঁর বক্তব্য বিশ্বাস করা কঠিন। তাঁর আজগুবি কাহিনীর উদাহরণ : আন্দামানে তিনি একদল মানুষ দেখেছেন, যাদের মুখ কুকুরের মতো। আচার-আচরণও কুকুরের মতো। তার প্রকাশ্যে যৌনক্রীড়া করে।

আবহাওয়া পরিবর্তনকারী জাদুকর এই বাংলাদেশে কিন্তু এখনো আছে। শিলাবৃষ্টির হাত থেকে ফসল রক্ষায় তাদের ব্যবহার করা হয়। তারা ফকির নামে পরিচিত। এমন একজনের সঙ্গে আমার দেখাও হয়েছে। তিনি কিছু মন্ত্র বলেছেন, যা আমি ডায়েরিতে লিখে রেখেছি। আমার স্মৃতিশক্তি মোটামুটি ভালো হলেও বৃতিশক্তি একেবারেই নেই। ডায়েরি হারিয়ে ফেলেছি। মন্ত্রের প্রথম দুটি লাইন মনে আছে—আলী কালী লালী ত্রিভুবন খালি। মন্ত্রের আলী কি হযরত আলী (রঃ)? কালী কি হিন্দু দেবী? আমি জানি না। লালী কি খালির সঙ্গে মিল দেওয়ার জন্য?

মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতার ভ্রমণকাহিনীতে ভারতীয় জাদুকরদের অদ্ভুত সব জাদুর কথা আছে। শূন্যে ভেসে থাকা তার একটি। ইবনে বতুতা একবার জাদু দেখে ভয়ে জ্ঞান হারিয়েছিলেন এই তথ্যও উল্লেখ আছে।আমারও একবার ম্যাজিক দেখে জ্ঞান হারাবার মতো অভিজ্ঞতা হয়েছিল। শৈশবের গল্প। থাকি সিলেটের মীরাবাজারে। সুযোগ পেলেই একা একা শহরে হেঁটে বেড়াই।

মূল আকর্ষণ সিনেমা হলের পোস্টার। একদিন দিলশাদ সিনেমা হলের সামনে গিয়ে দেখি ম্যাজিক দেখানো হচ্ছে। অদ্ভুত ম্যাজিক। কাঠের এক তার সঙ্গে গা লাগিয়ে দুহাত যীশুখ্রিষ্টের ক্রুশবিদ্ধ ভঙ্গিতে তুলে এক মায়াকাড়া চেহারার বালিকা দাঁড়িয়ে আছে। কিশোরীটির দশ-বার ফুট দূরত্বে চোখ বাঁধা অবস্থায় ম্যাজিশিয়ান দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর হাতভর্তি চুরি।

তিনি বালিকাটির দিকে প্রচণ্ড গতিতে ছুরি ছুড়ে মারছেন। ছুরি বালিকার গা ঘেঁষে বিধে যাচ্ছে, বালিকাটির গায়ে লাগছেন না। তাকে ঘিরে ছুরির বলয় তৈরি হলো। সে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর ম্যাজিক।সেদিনই আমি প্রথম ম্যাজিকের প্রেমে পড়ি। ছুরি ছুড়ে মারার এই ম্যাজিকের কৌশল খুব সাধারণ। সব ছুরি কাঠের তক্তার পেছনে স্প্রিং দিয়ে লাগানো। ছুরিগুলি পেছন থেকে বাইরে বের হয়ে আসে। দেখে মনে হয় ম্যাজিশিয়ানের হাতের ছুরি কাঠে বিধছে। আসলে তা-না। দর্শকদের দৃষ্টি মেয়েটির দিকে থাকে বলেই ম্যাজিশিয়ান তার হাতের ছুরি কীভাবে সরাচ্ছেন তা কেউ দেখেন না।

বাবার কাছে গণপতি নামের এক বাঙালি জাদুকরের অদ্ভুত ম্যাজিকের কথা শুনেছি। বাবা তার জাদু দেখেছেন কমলা সার্কাসে। বাবার ভাষ্যমতে, গণপতির জাদু যে না দেখেছে তার জীবন বৃথা। পিসি সরকারের অবস্থান গণপতি বাবুর হাঁটুর নিচে।জাদুকর গণপতি সম্পর্কে আমি তেমন কোনো তথ্য জোগাড় করতে পারি নি। তিনি জমিদারপুত্র ছিলেন এই তথ্য পেয়েছি। শখের বসে জাদু শিখেছেন। অসম্ভব খেয়ালি মানুষ ছিলেন। কারও সঙ্গেই তার বনত না।স্যারের অবস্থা কী? একা বসা। মুনশি গেল কই?

গোপাল জর্দার প্রবল গন্ধ নিয়ে আরজু ঢুকল।আমি বললাম, মুনশি এশার নামাজ পড়াতে গিয়েছেন। নামাজ শেষ করে আসবেন। তিনি আমাকে একটা গোলাপ ফুল দিয়ে গেছেন। গোলাপ ফুলে কোনো গন্ধ পাচ্ছি না। তুমি গন্ধ পাও কি না দেখো তো।সর্পরাজ নানান ভঙ্গিমায় গোলাপ শুকতে লাগল। জর্দার কড়া গন্ধ ছাপিয়ে গোলাপের হালকা সৌরভ তার নাকে যাওয়ার কথা না। তবু সে চেষ্টার ত্রুটি করছে না।ইউরোপ-আমেরিকার চাষের গোলাপে কোনো গন্ধ থাকে না। দেখতে অপূর্ব সুন্দর কিন্তু গন্ধহীন।সর্পরাজের হাতের গোলাপটা তা-ই। গন্ধহীন। গ্রামের গোলাপ গাছের গোলাপে গন্ধ থাকতেই হবে। গন্ধ নেই কেন?

 

Read more

ম্যাজিক মুনশি পর্ব:৪ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *