বলাে শুনি।
পারুল বলল, আমি আর চম্পা এই দুজনে শলাপরামর্শ করে কিসমতকে ছাদে খালি গায়ে দুই ঘণ্টা শুইয়ে রেখেছি, এতেই কাজ হয়েছে। পাপ বিদায়।
খিলখিল করে অনেকক্ষণ হাসল। তার হাসি থামার পর মিসির আলি শান্ত গলায় বললেন, তুমি পারুল না, তুমি চম্পা!
পারুল সেজে দ্বিতীয়বার আমার কাছে এসেছ। গলা চেপে কথা বলছ। মাঝে মাঝে চেপে কথা বলার ব্যাপারটা ভুলে যাচ্ছ বলে মূল স্বর চলে আসছে।
চম্পা! তুমি আমাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছ। কেন করছ জানি না। জানতে চাচ্ছি না। তুমি এখন বিদায় হও। তােমার আর কোনাে গল্প শুনতে আমি রাজি না। আমার ধারণা, তােমরা দুই বোেনই অসুস্থ। স্কিজোফ্রেনিয়ার রােগী। তােমাদের কোনাে কথাই বিশ্বাসযােগ্য না।
চাচাজি, পারুল আপা কখনাে কোথাও যায় না। কারও সঙ্গে কথাও বলে না। এই জন্যে বাধ্য হয়ে পারুল সেজে এসেছি। আপনি দয়া করে আমাদের একটু সাহায্য করুন।
মিসির আলি বললেন, আমার সাহায্যের তােমার প্রয়ােজন নেই। আমাকে যা বলেছ পুলিশকে তা-ই বলবে। পুলিশ তদন্ত করে বের করবে ঘটনা কী?
চাচাজি! আমি এখন আপনাকে একটা জরুরি কথা বলব। মিসির আলি বললেন, আমি তােমার কোনাে কথাই শুনব না । তাহলে কিন্তু ছােট্ট একটা সমস্যা হবে । বলাে কী সমস্যা?
আপনি ভাড়াটে হিসেবে এখানে আর থাকতে পারবেন না। এখন সবকিছু চালাচ্ছে আমার বড়বোেন পারুল।
যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১১
মিসির আলি বললেন, সমস্যা নেই, আমি বাড়ি ছেড়ে দিব ।
আজকেই ছাড়তে হবে।
মিসির আলি হেসে ফেলে বললেন, পুরাে মাসের ভাড়া আমার দেওয়া, তারপরেও আজ রাতেই বাড়ি ছেড়ে দেব ।
মিসির আলির মনে হলাে তিনি অতি বৃদ্ধ মানুষের মতাে আচরণ করছেন। অতি বৃদ্ধরা অকারণে অভিমান করে। তিনিও তা-ই করছেন। চম্পা মেয়েটির ওপর অভিমান ঘটিত রাগ করেছেন। চট করে কারও ওপর রেগে যাওয়া তার স্বভাবেই ছিল না। এ রকম কেন হচ্ছে ?
আজকের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে দিতে হলে নতুন বাসা খুঁজে বের করতে হবে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা শহরে বাড়ি খুঁজে পাওয়া মুশকিল।
মিসির আলি অনেক খুঁজে পেতে মালিবাগের এক হােটেলে এসে উঠলেন। হােটেলের নাম মুন হাউস। হােটেলের মালিক কবীর সাহেবকে মিসির আলির কাছে যথেষ্টই ভদ্রলােক বলে মনে হলাে। তিনি মিসির আলির বিছানা, বালিশ, সিঙ্গেল খাট, চেয়ার-টেবিল গুদামঘরে রাখার ব্যবস্থা করলেন। মিসির আলির বারাে ইঞ্চি কালার টিভি তার ঘরেই লাগানাের ব্যবস্থা করলেন।
মুন হাউসে খাবারের ব্যবস্থা নেই। হােটেলের বয় টিফিন ক্যারিয়ারে করে বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসে। কবীর সাহেব মিসির আলিকে এই ঝামেলা থেকেও মুক্তি দিলেন। হােটেলের কর্মচারীদের জন্যে যে খাবার তৈরি হয়, তার সঙ্গে মিসির আলি এবং জসুও যুক্ত হয়ে গেল ।
হােটেলে মিসির আলির রুম নম্বর ২১১ বি। ২১১-র দুটা ঘর আছে। একটা ২১১ এ, আরেকটা ২১১ বি। এ-বি দিয়ে রুম নম্বর দেওয়ার ব্যাপারটি তিনি বুঝতে পারলেন না। নিশ্চয়ই কোনাে কারণ আছে। আমাদের এই জগৎ কার্যকারণের জগৎ। কার্যকারণ ছাড়া এখানে কিছুই হয় না। প্রথমে Cause, তারপর effect।
যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১১
মিসির আলির ঘরটা বেশ বড়। ঘরে দুটা জানালা। একটা পশ্চিমে আরেকটা পুবে। পশ্চিমের জানালা খুললে প্রকাণ্ড এক কাঁঠালগাছ দেখা যায়। কাঁঠালগাছে কাক বাসা বেঁধেছে। জানালা দিয়ে তাকালে কাকের বাসায় চারটা ডিম দেখা যায়। কোকিলরা সন্তান বড় করার ঝামেলা এড়ানাের জন্যে কাকের বাসায় ডিম পাড়ে। এখানে কি কোনাে কোকিলের ডিম আছে ? মিসির আলি ঠিক করলেন, ডিম থেকে ছানা বের না হওয়া পর্যন্ত তিনি এই হােটেলেই থাকবেন। নতুন বাসা খুঁজে বেড়াবেন না।
রাত নটার দিকে হােটেলের মালিক নিজেই টিফিন ক্যারিয়ারে করে খাবার নিয়ে এলেন ।
গরম ভাত মুগের ডাল পটল ভাজি কৈ মাছের ঝােল। কবীর সাহেব বললেন, আয়ােজন খারাপ, কিন্তু খেয়ে আনন্দ পাবেন । বাবুর্চির রান্না খুবই ভালাে। সে যদি কাঠাল পাতার ঝােল রাঁধে, সেই ঝােল খেয়েও বলবেন, অসাধারণ! এই বাবুর্চি আবার ভালাে পা দাবাতে পারে। আপনার যে বয়স তাতে পা দাবালে শরীর ভালাে থাকবে। তাকে বলে দেব সে প্রতি রাতে এসে কিছুক্ষণ আপনার পা দাবাবে।
মিসির আলি বললেন, আমার পা দাবাতে হবে না । শারীরিক এই আরাম আমি নেব না। আপনি আমার প্রতি যে বাড়তি মমতা দেখাচ্ছেন, তার কারণটা কী বলবেন?
কবীর সাহেব বললেন, বাড়তি মমতা দেখাচ্ছি না। | হােটেলের সব বাের্ডারের জন্যে আপনি নিশ্চয়ই খাবারের ব্যবস্থা করেন না, বা নিজে তার জন্যে টিফিন ক্যারিয়ারে করে খাবার আনেন না।
কবীর সাহেব বললেন, আপনার চেহারা, কথা বলার ভঙ্গি, হাঁটা সবই আমার বাবার মতাে। আমি আপনাকে দেখে চমকে উঠেছিলাম।
আপনার বাবা কবে মারা গেছেন ? আমার বয়স যখন পাঁচ। তখন।
মিসির আলি বললেন, পাঁচ বছর বয়সের কথা পরে মনে থাকে না। আপনার বাবার বিষয়ের খুব কম স্মৃতিই আপনার আছে। এই কারণেই অনেকের সঙ্গে আপনি আপনার বাবার চেহারার মিল পাবেন। আমার আগেও নিশ্চয়ই অনেকের। সঙ্গে আপনি আপনার বাবার চেহারার মিল পেয়েছেন। তাই না?
যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১১
জি।
মিসির আলি রাতের খাবার খেয়ে সত্যি সত্যি আনন্দ পেলেন। পটল ভাজিকে তিনি এত দিন অখাদ্যের পর্যায়ে রেখেছিলেন। আজ মনে হলাে এই ভাজি খাদ্যতালিকায় রােজ থাকতে পারে।
খাওয়া শেষ হওয়ার পর কবীর সাহেব বললেন, পান খাওয়ার অভ্যাস কি আছে ?
মিসির আলি বললেন, নাই। তবে আজ একটা পান খাব । তৃপ্তি করে খাবার খেলে কেন জানি না জর্দা দিয়ে পান খেতে ইচ্ছা করে।
পান ছাড়া আর কিছু কি লাগবে ? একটা বাইনােকুলার কি জোগাড় করে দিতে পারবেন? বাইনােকুলার দিয়ে কী করবেন ?
কাঠালগাছে একটা কাক বাসা বেঁধেছে । ডিম পেড়েছে। ডিমে তা দিচ্ছে। ডিম থেকে বাচ্চা বের হওয়ার দৃশ্যটা দেখব।
কবীর সাহেব বললেন, পান এনে দিচ্ছি। সকালবেলা বাইনােকুলার এনে দেব। চলবে না ?
অবশ্যই চলবে। থ্যাংক য়ু।
Read More