রম্য কথা -পর্ব-(৪)-আনিসুল হক

রম্য কথা

কবি ও ক্যামেরা 

নির্মলেন্দু গুণ আবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছেন। অভিনয় করতে হয়েছে তাকে। অবশ্য এইবারও কবি নির্মলেন্দু গুণ হিসেবেই । বাংলাভিশনে মে দিবসে তার তিনটা কবিতার দৃশ্যায়ন প্রচার করা হয়। নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ ছিল অনুষ্ঠানটির নাম। নেকাব্বরের মৃত্যুদৃশ্যটি চিত্রায়িত হয় কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে।

নিজের সৃষ্ট চরিত্রের মৃত্যুদৃশ্যটিতে কবি নিজেই আবির্ভূত হন। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে দেখেন নেকাব্বরের পড়ে থাকা দেহটিকে। এ ছাড়া, ‘চাষাভুষার জন্য তুমি লিখতে আমায় কহ যে, চাষাভুষার কাব্য লেখা যায় কি এত সহজে’-এই পঙক্তিগুলাে যখন আবৃত্তি হয়, তখন ক্যামেরার সামনে কবি উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। 

আপাতত মনে হতে পারে, এ এমন কী কঠিন কাজ? লাইট জ্বলবে। ক্যামেরা চলবে। পরিচালক বলবেন, অ্যাকশন । মােট কথা, কবিকে এক ধরনের অভিনয়ই করতে হয়েছে। 

নির্মলেন্দু গুণ অভিনয় করতে রাজি হলেন? 

বাংলালিংকের বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করতে রাজি করাতে কিন্তু বেশ কাঠখড় পােড়াতে হয়েছিল। 

রবীন্দ্রনাথ মঞ্চনাটক করতেন, বালিকা রানু হতাে নায়িকা, তিনি নায়ক, নজরুল ইসলাম তাে সিনেমাও করেছেন। আর আমাদের সময়ের কবিরা ইদানীং টেলিভিশন নাটকের দিকে বেশ ঝুঁকেছেন দেখা যাচ্ছে। 

রম্য কথা -পর্ব-(৪)

বাংলা ভাষার একজন প্রধান সাহিত্যিক ও কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ এরই মধ্যে অভিনয় করেছেন শরাফ আহমেদ জীবন পরিচালিত চমৎকার টিভি-নাটক শেখ আবদুর রহমানের আত্নীয় জীবনীতে, কেন্দ্রীয় চরিত্রে। তিনি এরপর উৎসাহিত হয়েছেন নিজেই টিভি-নাটক পরিচালনা করতে।

আর তরুণ কবিদের মধ্যে উৎকৃষ্টগণ-কামরুজ্জামান কামু, টোকন ঠাকুর ও মারজুক রাসেল অভিনয় তাে করেছেনই, নাটকের পরিচালক হিসেবেও প্রথম দুজন নাম লিখিয়েছেন। কবি রিফাত চৌধুরী আর সরকার মাসুদকে তরুণ বলা যাবে কি না জানি না, ওঁরাও অভিনয় করছেন টিভি-নাটকে। 

প্রথমে বাংলালিংকের ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়ে বানানাে বিজ্ঞাপনে নির্মলেন্দু গুণের অংশ নেওয়ার গল্পটা বলে নিই। 

রাত ১২টার দিকে মােস্তফা সরয়ার ফারুকীর ফোন এল আমার মােবাইলে । “একটা কবিতা পাইছি, শােনেন। কল্পনা করুন ভাষাহীন একটা পৃথিবী, সব বই যেখানে শােকে সাদা, পিতার কাছে টাকা চেয়ে যেখানে চিঠি লেখে না পুত্র…” ইত্যাদি । পুরােটা পড়ে শুনিয়ে সরয়ারের প্রশ্ন, কেমন হইছে?’ আমি বলি, ভালাে । সরয়ার বলে, ‘ঘুমের মধ্যে পাইছি আইডিয়াটা । মােবাইল ফোনের বিজ্ঞাপন করব।

রম্য কথা -পর্ব-(৪)

‘ হাসতে হাসতে বলল, “আপনি হবেন এই অ্যাডের পারফেক্ট মডেল, কারণ আপনার দৃষ্টি ব্লাঙ্ক । আপনি যখন কথা বলেন, অন্য কথা ভাবেন ।। 

আমি জানি, সরয়ারের কথা সত্য। আমি যার সামনে বসে আছি, আসলে তার সামনে বসে থাকি না। দূরে কোথায় দূরে, আমার মন বেড়ায় ঘুরে। কিন্তু বললাম, মিয়া ফাজলামাে পাইছ, এই অ্যাডের শেষে ভাষাসৈনিকদের শ্রদ্ধা জানানাের কাজটা কেবল একজন লেখক হিসেবে করে দিতে পারি । তাও করব কি না, ভেবে দেখতে হবে। এর আগে অমুক অভিনেত্রীর অ্যাডের অফার নিয়া যেই ক্যামেরা বাসার সামনে আসছে, পালায়া গেছি। অত সােজা না। 

সরয়ার লাফিয়ে উঠল । এইটা তাে আপনি ভালাে বলছেন । ভাষাসৈনিকদের শুভেচ্ছা তত দিতে পারে কলমসৈনিকেরা। দাড়ান দাঁড়ান। 

আমি সরয়ারের এই স্বভাবের সঙ্গে খুবই পরিচিত। আমরা বহু নাটকের আইডিয়া এইভাবে কথা বলতে বলতে বের করেছি । এইটাই সরয়ারের কাজের ধরন। 

বিজ্ঞাপনদাতা ও বিজ্ঞাপনী সংস্থার সঙ্গে কথা বলে পরের দিন রাত ১১টায় সরয়ার জানাল, একজন কবি হিসেবে তারা চায় নির্মলেন্দু গুণকে, লেখক হিসেবে আমাকে। গুণদাকে টাকা দিতে হবে ভালাে অঙ্কের, এটা আমি সরয়ারকে বলে-কয়ে নিলাম।

সরয়ার বলল, এই নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। কারণ কবি-সাহিত্যিক শিল্পীদের সম্মান জানানাে ও সম্মানী দেওয়া, দুটোকেই সে কর্তব্য বলে মনে করে। 

এইবার আমার পালা নির্মলেন্দু গুণকে রাজি করানাে। সরয়ারের হয়ে এই জাতীয় কাজ অতীতে অনেক করেছি। সরয়ার প্রত্যেকবার আমাকে ফোন করে আর বলে, “এইটা আপনাকে আমার শেষ রিকোয়েস্ট । এরপর আর কোনাে রিকোয়েস্ট আমি করব না।’ ওর শেষ আর শেষ হয় না। 

রম্য কথা -পর্ব-(৪)

আমি ফোন করলাম নির্মলেন্দু গুণকে, ‘দাদা, আপনি কই? 

‘শাহবাগে, পরীবাগের রাস্তায়। ‘আমি আসতেছি । আপনি থাকেন। 

বললাম বটে আসতেছি, কিন্তু যাই কী করে। রাত সাড়ে ১১টা। জরুরি অবস্থাছন্ন ঢাকার রাস্তা সন্ধ্যার পরই ফাকা হয়ে যায়। ড্রাইভার বিদায় নিয়েছে আগেই। আমি নিজেই কম্পিত হস্তে গাড়ি চালাতে চালাতে পরীবাগের রাস্তায় চলে এসে দেখি, সপারিষদ কবি দাঁড়িয়ে সােডিয়াম আলােয় ভিজছেন। তাঁকে বললাম, বাসায় যাবেন তাে, গাড়িতে ওঠেন। 

তিনি আমার পাশের আসনে বসলেন। 

আমি ভাবতে লাগলাম, কী বললে গুণদাকে রাজি করানাে সহজ হবে। সম্প্রতি সরয়ার ওই মােবাইল কোম্পানির একটা বিজ্ঞাপন বানিয়েছে, অসাধারণ, মুক্তিযােদ্ধা আজম খান আর আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে। একাত্তরে তার বন্দুক বেজেছিল গিটারের মতো আর গিটার বেজেছিল বন্দুকের মতাে…গুরু তােমায় সালাম। ধনধান্যপুষ্পভরা গানটা যখন বাজে, আবেগে চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ে। 

বললাম, গুণদা, আপনি আজম খান আর আইয়ুব বাচ্চুর স্বাধীনতার অ্যাডটা দেখছেন? 

দেখছি। কেমন লাগছে? ভালাে না। ভড়কে গিয়ে বললাম, কেন?’ 

‘বাচ্চু বলে, গুরু তােমায় সালাম, আর আজম খান মাথা নাড়ে। এইভাবে সালাম নেয় কেউ ক্যামেরার সামনে? তবে লাইনটা ভাললা, বন্দুক বেজেছিল গিটারের মতাে…।’ 

মুশকিল হলাে তাে! এই লাইনে তাে রাজি করানাে যাবে না। তখন বললাম, আচ্ছা, একটা বিজ্ঞাপনে ধরেন কবি হিসেবে আপনাকে একটু অ্যাপিয়ার করতে হবে। 

না না, আমি এইসব করব না। শােনাে, আমি কবি হিসেবে বেশি জনপ্রিয় হয়ে গেছি । আর জনপ্রিয় হওয়া উচিত হবে না। অসুবিধা আছে। 

আমি বললাম, ‘দাদা, সুবিধা আছে। এই বিজ্ঞাপন ফেব্রুয়ারির পরে আর দেখাবে না। লােকে ভুলে যাবে। 

রম্য কথা -পর্ব-(৪)

‘না, তাইলেও আমি করতে চাই না।’ 

আমি বললাম, “দাদা, আপনি টাকা পাবেন। ‘আমার টাকার দরকার নাই।আমি বিস্মিত। প্রথম আলােতে যখনই আমার লেখা দরকার হয়, আমি প্রথমে দাদাকে বলি, “দাদা, টাকা রেডি, পাঠায়া দিচ্ছি, একটা লেখা দিয়েন।’ উনি লেখা দেন । এখন এই ওষুধেও কাজ হচ্ছে না! আমি ভাবলাম টাকার অঙ্ক শুনলে দাদা নরম হবেন। বললাম, “দাদা, আপনি লাখ টাকা পাবেন। 

তিনি আমাকে অধিকতর বিস্মিত করে দিয়ে বললেন, এত টাকা দিয়া আমি কী করব? আমার তাে টাকার দরকার নাই।’ 

আজিমপুরে দাদার বাসার কাছে এসে গেছি। গুণদা এখনাে রাজি হননি। শেষ চেষ্টায় আমি বললাম, ‘দাদা, আপনাকে আর আমাকে কাজটা কী করতে হবে আগে শােনেন। শহীদ মিনারে গিয়া ফুল দিতে হবে । আর কিছু না। 

এইবার গুণদা নরম হলেন। বললেন, ‘শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া? এইটা করা যায়। আচ্ছা আমি ভাবি। 

আমি পরের দিন আবার গেলাম নির্মলেন্দু গুণের বাসায়। দাদার স্বভাব দেখি পাল্টায় নাই। সেই যে কবিতা, অমীমাংসিত রমণী বইয়ে ভাড়াবাড়ির গল্প’ নামের কবিতায় নিজের বাসার বর্ণনা দিয়েছিলেন, “মৃত্যু আর জীবনের মাঝের দেয়াল ছুঁয়ে ছুঁয়ে একটু এগুলেই আজিমপুরের পুরােনাে কবর, কিনু গােয়ালার গলি, গ্রীন লেন।

‘না আসছে আলাে না আসছে হাওয়া। শুধু টিনের চাল থেকে চুয়ে পড়া বৃষ্টির জল অবিরল ধারায় নেমেছে, কোনােদিন ফাকি দেয়নি।” আজও সেই রকম বাসাতেই তিনি থাকেন। একটা টানা টিনে ছাওয়া ইটের বাড়ি। তারই দুটো রুমে তাঁর বসত। ডােরবেল নাই। বাইরের টিনের গেটে ধাক্কা দিতেই সামনের বাড়িওয়ালা বেরিয়ে এসে বলল, “দাদা, আর কত দিন ধাক্কাধাক্কি করবেন, আমাদের অসুবিধা হয়, একটা কলিংবেল লাগায়া নেন। 

রম্য কথা -পর্ব-(৪)

 ঘরের ভেতরটা দিনের বেলাতেও অন্ধকার ঘরে কোনাে আসবাব নাই বললেই চলে। আমরা ছাত্রাবস্থায় মেসে বা হােস্টেলে যে রকম কাপড়-চোপড় ঝুলিয়ে রাখতাম এখানে-ওখানে, তেমনি কিছু পাঞ্জাবি ঝুলছে। স্টিলের আলমারির ওপরে তার বইগুলাে। একটা কম্পিউটার অবশ্য ঘরে আছে। সেই ঘর, ঘরের বাইরের পরিবেশ দেখে আমার চোখে জল চলে এল। এই লােক বলে কিনা টাকা দিয়া আমি কী করব! আমার টাকার দরকার নাই!’ 

একটা লােক এমনি এমনি বড় হয় না। কবির ভেতরে একজন ঋষি বাস করে। তাই তিনি ব কবি । কিছু পেতে হলে কিছু ছাড়তে হয়। কবি নির্মলেন্দু গুণ কবিতার জন্য নিজের জীবনের লােভ-লালসা ও স্বাচ্ছন্দ্যকে বিসর্জন দিয়েছেন। তিনি নিজেই লিখেছিলেন, আমার সামান্য জীবনে দু দুটো অসামান্য জিনিসের সঙ্গে আমি রসিকতা করেছি: এর একটি হচ্ছে নারী, একটি হচ্ছে টাকা।

মাঝে মাঝে আমি ভাবি, আমারও উচিত হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমি যদি এ কাজটা না করি, তাে করবে কে? গুরুত্বপূর্ণ নয়, এমন বিষয় নিয়ে রসিকতা করা কি গুরুত্বপূর্ণ কবিকে মানায়?’ (চরিত্রদোষ) 

আমরা শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার কাজটা এক সকালবেলা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করলাম। এক সন্ধ্যায় যেতে হলাে সংলাপের ডাবিং করতে, স্টুডিওতে। নিজের চেহারা দেখে গুণদা খুবই চিন্তিত, ‘আহা, চুলটা ঠিকমতাে আঁচড়ানাে হয়নি। সরয়ার হাসতে হাসতে খুন, বলে, “প্রত্যেকটা মডেল এসেই প্রথমে এই ডায়ালগটা বলে । গুণদা বড় মডেল…’। 

বিজ্ঞাপন প্রচারিত হতে লাগল। বইমেলাতেই বিজ্ঞাপনী সংস্থার লােক এসে চেকসমেত খাম দিয়ে গেল । গুণদার হাতে সেটা অর্পণ করা হলাে। 

পরের দিন সকাল সাড়ে নটার দিকে গুণদার ফোন, এই শােনাে, ইনকাম ট্যাক্স অফিসটা কোথায়? আমি সেগুনবাগিচায়। আমি বললাম, আপনি ঠিক জায়গাতেই গেছেন। ওইখানেই। উনি বললেন, “ইনকাম ট্যাক্সটা দিয়ে দিব, বুঝছ? তাহলে আমাদের বড়লােকেরা যে ইনকাম ট্যাক্স দিতে চায় না, তাদের জন্যে একটা দৃষ্টান্ত হবে…। 

রম্য কথা -পর্ব-(৪)

শ্রদ্ধায় আবার আমার মাথা নত হয়ে এল। 

এই যে নির্মলেন্দু গুণ, তিনি বাংলাভিশনের জন্যে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বেশ খানিকটা অভিনয় করলেন? ব্যাপার কী? 

গুণদা বললেন, কাওনাইন সৌরভ ছেলেটা কবিতা বােঝে । ও গত বছর আমার হুলিয়াটার ওপরে একটা ভিডিও ফিল করেছিল, সেটা ভালাে হয়েছিল। এই জন্যে এইবার করলাম । 

 ‘আপনি তাে আগেও নাটক করেছেন। ষাটের দশকে, যখন মামুনুর রশীদের সঙ্গে থাকতেন? | ‘পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের হােস্টেলে মামুনুর রশীদের সঙ্গে থাকতাম । তখন ওখানেই একটা নাটক লিখেছিলাম, এ যুগের আকবর নামে। মঞ্চনাটক ।

মামুনুর রশীদেরই আইডিয়া । উনিই পরিচালক। পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট বলে রেডিও ও টিভির টেকনােলজিটা ওই নাটকে ব্যবহার করা হয়েছিল । মােনেম খানের স্টাইলে সম্রাট আকবর রেডিও-টিভিতে ভাষণ দিয়েছিল আর সেটা ওই ক্যাম্পাসে প্রচারিত হয়েছিল। 

আর আপনি যে অভিনয় করেছিলেন টিভি-নাটকে সেইটা বলেন 

“টিভির জন্যে আমি একটা নাটক লিখেছিলাম-আপন দলের মানুষ নামে । মােমিনুল হক ছিলেন পরিচালক। ওই নাটকটা প্রচারিত হয়েছিল ‘৭১ সালের 

জানুয়ারিতে। নাটকে ঢাকার রাজপথের মিছিল দেখানাে হয়। ওই নাটকে আমি নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম।’ 

 ‘তখন আপনার দাড়ি ছিল? 

‘অল্প অল্প। ‘তাে আপনার অভিনয়ের প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলেন কেমন? 

‘৫০০ টাকা পেয়েছিলাম। আড়াই শ লেখার জন্যে, আড়াই শ অভিনয়ের জন্যে। এ ছাড়া আলমগীর কবীর এক্সপ্রেস নামের পত্রিকায় সমালােচনা লিখেছিলেন, হি অ্যাকটেড ওয়েল হােয়েন হি কেপ্ট হিজ মাউথ শাট। বুঝাে, সংলাপ ছাড়া 

অভিব্যক্তি ভালাে দেওয়া কিন্তু বড় অভিনেতার কাজ, তাই না? হা হা হা। 

‘আর সংলাপ বলার সময়?’

রম্য কথা -পর্ব-(৪)

তখনাে আমার উচ্চারণে ময়মনসিংহের টান ছিল তাে।’ ‘আর আপনার নাটক করার কথা শুনে কবি-সাহিত্যিকেরা কী বললেন? 

‘সমকাল সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফর বললেন, আর কোনাে দিন যেন তােমাকে অভিনয়ের আশে-পাশে না দেখি…’ 

আপনার নায়িকা কে ছিলেন? ‘ডলি আনােয়ার। 

‘নায়িকা তাে ভালােই পাইছিলেন। সূর্য দীঘল বাড়িতে অভিনয়ের জন্য তাঁকে চিরদিন মনে রাখা হবে। 

 ডলি আনােয়ার আর নাই । আলমগীর কবীর নাই । সিকান্দার আবু জাফর নাই । নির্মলেন্দু গুণ রয়ে গেছেন। 

নেকাব্বরের লাশ শুয়ে আছে কমলাপুরে । নেকাব্বর শুয়ে আছে জীবনের শেষ ইস্টিশনে। তার পচা বাসী শব ঘিরে আছে সাংবাদিক দল। কেউ বলে অনাহারে, কেউ বলে অপুষ্টিতে, কেউ বলে বার্ধক্যজনিত ব্যাধি, নেকাব্বর কিছুই বলে না। এই কবিতার দৃশ্যায়নে তিনি হাজিরা দেন ক্যামেরার সামনে। কিংবা নেপথ্যে বাজছে তাঁরই কবিতা: 

চাষাভুষার জন্য তুমি লিখতে আমায় কহ যে চাষাভুষার কাব্য লেখা যায় কি এত সহজে? সবাই যারে পথের ধারে গেছে দুপায়ে দলে, তুমি কি চাও নাম কুড়াতে তাদের কথা বলে? তাদের সেই ঘাম জড়ানাে নাম কুড়াতে হলে পুড়তে হবে মাঠের রােদে, ভিজতে হবে জলে। 

আর ক্যামেরার সামনে রবীন্দ্রনাথের মতাে শুক্র ও গুশােভিত নির্মলেন্দু গুণ উদাসভঙ্গিতে আকাশের দিকে তাকান, তখন কি তাঁর মনে বাজে তার নিজের লেখা কবিতা-আকাশ যেমন বিমানের চেয়ে বড়, তেমনি আমার বেদনা বক্ষ থেকে। 

১৫ মে ২০০৭

 

Read more

রম্য কথা -পর্ব-(৫)-আনিসুল হক

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *