রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-১৮)

আনুশকা মােটেই চমকাল নাসে এত স্বাভাবিকভাবে তার ব্যাগ ঠিক করছে যে রানা মুগ্ধ হয়ে গেলএকেই বােধহয় বলে ইস্পাতের নার্ভএই নার্ভ কতক্ষণ ঠিক থাকে তা দেখার ব্যাপার

রূপালী দ্বীপবেশি টেনশানে ইস্পাতের নার্ভেরও ছিড়ে যাবার কথাআনুশকার নার্ভ কখন ছিড়বে ? রানা সেই দৃশ্য দেখার জন্যে অপেক্ষা করতে পারছে নাতার বাথরুমে না গেলেই নয়সে বাথরুমের সন্ধানে রওনা হল। 

পুলিশ অফিসার বললেন, আপনারা কি আমাদের সঙ্গে থানায় যাবেন ? আনুশকা বলল, হ্যা, যাৰ

তা হলে চলুন। 

এখন তাে যেতে পারব না। হাতমুখ পােব, চা খাব, তারপর যাবআপনারা এতক্ষণ অপেক্ষা করবেন?‘ 

অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছিআর অপেক্ষা করা ঠিক হবে না। 

শুভ্র এতক্ষণ চুপ করে শুনছিলসে অবাক হয়ে বলল, কথাবার্তা কী হচ্ছে আমি কিছু বুঝতে পারছি না। 

পুলিশ অফিসার বললেন, থানায় চলুনথানায় যাওয়ামাত্রই সব জলের মতাে পরিষ্কার বুঝে যাবেনপুলিশের অনেক কথাই বাইরে অর্থহীন মনে হয়থানা হাজতে ঢােকার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি শব্দের অর্থ পরিষ্কার হয়ে যায়। 

থানায় যেতে হবে কেন?সেটাও থানায় গেলেই জানতে পারবেন। 

এতক্ষণে গাড়ি থেকে সবাই নেমে এসেছেপুলিশের কথাবার্তা যথেষ্ট উদ্বেগের সঙ্গে শুনে যাচ্ছেজরীর চোখেমুখে হতভম্ব ভাবরান তা হলে ভুল বলেনিসমস্যা কিছু একটা হয়েছেজরী বলল, ব্যাপার কী রে আনুশকা? উনি আমাদের থানায় যেতে বলছেন কেন

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১৮

আনুশকা সহজ গলায় বলল, ওনার ধারণা, আমরা মনিরুজ্জামান নামের এক ভদ্রলােকের স্ত্রীকে ভাগিয়ে নিয়ে এসেছিএই জন্যেই আমাদের থানায় যেতে বলছেন। 

জরী আগের চেয়েও অবাক গলায় বলল, মনিরুজ্জামানের স্ত্রীটি কে? | মনে হচ্ছে তুইযে বদমাশটার সঙ্গে তাের বিয়ে হবার কথা ছিল ওর নামই তাে মনিরুজ্জামান, তাই না

জরীর মুখে কোনাে কথা ফুটল নাসে বড়ই অবাক হয়েছেআনুশকা বলল, তােরা সবাই হাতমুখ ধুয়ে তৈরি হয়ে নেআমরা থানায় যাচ্ছিচা ওখানেই খাব। 

নীরা ভীত গলায় বলল, এসব কী হচ্ছে? শুধু শুধু থানায় যাব কেন? পুলিশ অফিসার অমায়িক ভঙ্গিতে হাসলেন। 

আনুশকা বলল, আমরা আমাদের মালপত্র কী করব? এখানে রেখে যাব, না সঙ্গে নিয়ে যাব

সেটা আপনাদের ব্যাপারআপনারা ঠিক করবেনদেরি করবেন না, চলুন। 

আনুশকা উঠে দাড়াতে দাঁড়াতে বলল, রানা কোথায় গেল? হচ্ছে আমাদের টীম লীডারমালপত্রের ব্যাপারে ওর ডিসিশান লাগবে। 

রানা টয়লেট খুঁজে বেড়াচ্ছেবিপদের সময় কিছুই পাওয়া যায় নাপর্যন্ত দুজনকে জিজ্ঞেস করল, টয়লেট কোথায়? দুজনই এমনভাবে তাকাল যেন এই 

শব্দটা জীবনে প্রথম শুনছেটয়লেট শব্দের মানে কী জানে নাস্টেশনের কাউকে ধরা দরকারএরাও সব উধাওনইমাকে দেখা যাচ্ছেবেশ হাসিহাসি মুখে আসছেহাতে পত্রিকানাইমা বলল, এই রানা, যাচ্ছ কোথায়

টয়লেট খুঁজছিটয়লেটটা কোথায় জান? আমি কী করে জানব

না জানলে বলাে, জানি নারেগে যাচ্ছ কেন? | মেয়েদের টয়লেট সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করাই অভদ্রতাএই জন্যে রেগে যাচ্ছিতােমার কি ইমারজেন্সি?” 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১৮

হ্যা, ইমারজেন্সিবড় টয়লেট, না ছােট টয়লেট ?কী যন্ত্রণা! ছােটতা হলে কোনাে একটা ট্রেনের কামরায় ঢুকে পড়লেই হয়ছুটে বেড়াচ্ছ 

বিপদের সময় সব এলােমেলাে হয়ে যায়, এটা খুবই সত্যিসাধারণ ব্যাপারটা তার মাথায় আসেনি কেন? রানা লাফ দিয়ে সামনের একটা ট্রেনের কামরায় উঠে 

নইমা অপেক্ষা করছেরানা নামলে তাকে একটা মজার জিনিস দেখাবে। রানা রাজি থাকলে তাকে নিয়ে আরেক কাপ চা খাবেওরা নিশ্চয়ই তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছেকিছুক্ষণ টেনশানে ভূগুকহু কেয়ারস? | রানা নামতেই নইমা বলল, চাটগার লােকরা ঘুমুচ্ছিকে কী বলে জান? তারা বলে, ঘুম পাড়িঘুম কি ডিম নাকি যে ডিম পাড়ার মত ঘুম পড়বে? হিহিহি। 

রানা ধমকের সুরে বলল, হাসি বন্ধ করােহাসি বন্ধ করব মানে?কেলেংকেরিয়াস ব্যাপার হয়ে গেছেপুলিশ আমাদের অ্যারেস্ট করেছেতুমি এত ফালতু কথা বল কেন? মােটেও ফালতু কথা বলছি নাঅবস্থা সিরিয়াসউই আর আন্ডার অ্যারেস্টআমরা কী করেছি? ডাকাতি করেছি

তােমরা ডাকাতির চেয়েও বড় জিনিস করেছঅন্যের বউ ভাগিয়ে নিয়ে চলে এসেছ। 

রানা, তােমার ব্রেইনের নাটবল্ট সব খুলে পড়ে গেছেতুমি ঢাকায় গিয়েই ধােলাইখালে চলে যাবেনাট বন্টু লাগিয়ে নেবে। তােমার যা সাইজ, রেডিমেড পাওয়া যাবে নালেদ মেশিনে বানাতে হবে। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১৮

রানা আগুনচোখে তাকালসে ভেবে পাচ্ছে না পুরুষ এবং মেয়ের মস্তিষ্কেরঘিলুর পরিমাণ সমান হওয়া সত্ত্বেও মেয়েরা পৃথিবীর কিছুই বােঝে না কেন

যে বাস ওদের টেকনাফ নিয়ে যাবে বলে এসেছে সেই বাসে করেই ওরা থানায় যাচ্ছেপুলিশের দুজন লোক বাসে আছেএকজন বসেছে ড্রাইভারের পাশে, অন্যজন আনুশকাদের সঙ্গেনইমা সেই পুলিশ অফিসারের দিকে তাকিয়ে করুণগলায় বলল, আচ্ছ, চিটাগাংএর লোকরা ঘুমাচ্ছি না বলে ঘুম পাড়িবলে কেন? ঘুম কি ডিম যা পাড়তে হয় ? সবাই হাে হো করে হাসছেপুলিশ অফিসারটি হাসছে না। 

সে তাকিয়ে আছে শুভ্রের দিকেশুভ্র বলল, আপনি কি আমাকে কিছু বলবেন

হ্যা, বলবআপনার নাম শুভ্র ?” 

আপনার বিরুদ্ধে আলাদা স্পেসিফিক অভিযােগ আছেগুণ্ডামির অভিযােগআপনি রশীদউদ্দিন ভূঁইয়া নামে বুফে কারের কেয়ারটেকারকে মারধাের করেছেনচাকু দিয়ে ভয় দেখিয়েছেন এবং এক পর্যায়ে তাকে চলন্ত ট্রেন থেকে ঠেলে নিচে ফেলে দেবার চেষ্টা করেছেন

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১৮

শুভ্র শুধু একবার বলল আমি

বলেই সে চুপ করে গেলঅন্য সবাই চুপশুধু নইমা এখনাে হেসে যাচ্ছেচিটাগাংএর লােকেরা ঘুমিয়ে পড়াকে কেন ঘুম পাড়িবলে এটা কিছুতেই তার মাথায় ঢুকছে না। 

অয়ন বাসের বড় ধরে দাঁড়িয়ে আছেমুনার পাশে খালি জায়গা আছে সে যেখানে দাড়িয়ে সেখান থেকে মুনার পাশের জায়গাটাই সবচেকাছেকাজেই অয়ন যদি সেখানে গিয়ে বসে কেউ অন্য কিছু মনে করবে নাসে ঠিক ভরসাও পাচ্ছে নামুনা যদি ফট করে কিছু বলে বসে। 

রানা বলল, তুই হাঁদার মত দাড়িয়ে আছিস কেন? বসাে না। 

অয়ন মুনার পাশে বসতে গেলমুনা বলল আপনার গা থেকে বিশ্রী গন্ধ আসছেঅন্য কোথাও গিয়ে বসুন। 

অয়ন আগের জায়গায় ফিরে গেল। 

ওসি সাহেব তাদের থানার লকআপে ঢুকিয়ে দিলেনছেলে এবং মেয়েরা আলাদা হয়ে গেলএই ওসি সাহেবকে স্টেশনে দেখা যায়নিতিনি স্টেশনে যাননিভদ্রলােকের বয়স বেশি নাভদ্র চেহারাপুলিশের ভদ্র চেহারা হলে অস্বস্তি লাগেমনে হয় কিছু একটা ঝামেলা আছেতা ছাড়া ভদ্রলােক পাঞ্জাবি পরে আছেনপুলিশের লােক থানার ভেতরে পাঞ্জাবী পরবেন কেন? জেনানা ওয়ার্ডে এক অল্পবয়স্ক পাগলীকে রাখা হয়েছে

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১৮

সে বমি করে পুরোটা ভাসিয়ে ফেলেছেসে শুধু বমি করেই ক্ষান্ত হয়নি মনের আনন্দে নিজের বমিতে গড়াগড়ি করছেভয়ংকর গন্ধকোনো স্বাভাবিক মানুষ এর মধ্যে থাকতে পারে নাপ্রথমে নইমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলফিসফিস করে বলল, এখানে এক ঘণ্টা থাকলে আমি মরে যাবআমি সত্যি মরে যাবকেন আমি তােদের সঙ্গে এলাম ! কেন এলাম? কেন এলাম? নইমার হিস্টিরিয়ার মতো হয়ে গোল। 

আনুশকা বলল, ন্যাকামি করবি নাএখন ন্যাকামির সময় নাআমি ন্যাকামি করছি ? আমি করছি ন্যাকামি ? আমি ন্যাকামি করছি ?চুপ করএক কথা বারবার বলবি না।’ 

(চলবে)

Read more

রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-১৯)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *