রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(শেষ-পর্ব)

নীরা বলল, দেখ নইমা, দারুচিনি দ্বীপ হচ্ছে আমাদের জন্যে একধরনের তীর্থ তীর্থে যাবার জন্যে সবাই মন ঠিক করে অনেকে রওনাও হয়, কিন্তু তার পরেও সবার তীর্থদর্শন হয় নাতুই এত বড় সুযােগ হেলায় হারাবি

রূপালী দ্বীপহ্যা, হারাবআমি এত পুণ্যবান নই যে তীর্থ দর্শন করবতােরা যাতুই সত্যি যাবি না?” 

ঠিক হল, নইম ঢাকায় ফিরে যাবেতার গায়ে জ্বর এবং বেশ ভাল জ্বরতাকে একা একা ছেড়ে দেয়া যায় নাছেলেদের একজন কাউকে সঙ্গে যেতে হবেকে যাবে সঙ্গে ? রানা বলল, লটারি হবেলটারিতে যার নাম উঠবে, সে যাবেএটা ফাইন্যাল ডিসিশনছাড়া উপায় নেইকাগজের টুকরায় সব ছেলেদের নামলেখা থাকবেনইমা চোখ বন্ধ করে একটা নাম তুলবেযার নাম উঠবে তাকে যেতেই হবে । 

লটারি হলনাম উঠল রানারতার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। 

সঞ্জু বলল, দলপতি চলে গেলে আমাদের হবে কী করে? দলপতিকে তো যেতেই হবেরানা থাকুক, আমি যাব| রানা ক্ষীণ গলায় বলল, তুই যাবি

সঞ্জু বলল, যে সব ব্যবস্থা করল, তা ছাড়া আমার চাকরির একটা ইন্টারভ্যুও আছেতার প্রিপারেশন দরকার। 

রানা বলল, তােরা কি মিষ্টিপান খাবি ? পান নিয়ে আসিরানা পান আনার কথা বলে সরে পড়েছে কারণ তার চোখে পানি এসে গেছেসঞ্জুটা এত ভাল কেন

মানুষকে এত ভাল হতে নেইমানুষকে কিছুটা খারাপ হতে হয়সঞ্জুর ইন্টারভু এইসব বাজে কথাসে এই কাজটা করল তার দিকে তাকিয়ে। 

রূপালী দ্বীপ-শেষ-পর্ব

ঢাকাগামী তুর্ণা নিশীথা ছেড়ে দিচ্ছেদরজা ধরে সঞ্জু দাড়িয়ে আছেসঞ্জুর মুখ হাসি হাসিসে হাত নাড়ছেরানার খুব ইচ্ছা করছে টেনে সঞ্জুকে নামিয়ে সে লাফ দিয়ে উঠে পড়েকিন্তু সে জানে এই কাজটা সে পারবে নাসবার লােভ হয়, করতে পারে নাএই পৃথিবীতে খুব অল্পসংখকে মানুষই আছে যারা জীবনের মােহের কাছে পরাজিত হয় নাসে সেই অল্প জনের একজন নয়তার জন্ম হয়েছে লােভের কাছে, মােহের কাছে বারবার পরাজিত হবার জন্যে। 

ইঞ্জিন বসানাে ছিপছিপে ধরনের নৌকামাথার উপর একচিলতে ছাদছাদের নিচে ইঞ্জিনদেখলে বিশ্বাস হয় না এরা সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়কিন্তু শাঝি যখন বলছে তখন বিশ্বাস করতে হবে| নৌকায় বাংলাদেশি ফ্ল্যাগ উড়ছেসেন্ট মার্টিন যেতে হলে বার্মার আকিয়াব শহরের পাশ দিয়ে যেতে হয়জলযানগুলিতে সে কারণেই পতাকা ওড়াতে হয়যাতে দূর থেকে বােঝা যায় কোন নৌকা বাংলাদেশের, কোণ্ডলি বার্মার। 

নৌকার মাঝি চিটাগংয়ের প্রায় দুর্বোধ্য ভাষায় বােঝাল ইয়া নাফ নদী, ইয়ানর অর্ধেক আঁরার, অর্ধেক বার্মার। 

মােতালেব বলল, অত্যন্ত আপত্তিজনক কথা নদীর আবার অর্ধেক অর্ধেক ভাগাভাগি কী? নদী হচ্ছে প্রেমিকার মতোপ্রেমিকার আবার ভাগাভাগি ! এটা কি মগের মুল্লুক

শাঝি দাঁত বের করে বলল, ইয়ান মগের মুল্লুক বার্মাইয়ারা বেগুন মগআনুশকা বলল, ঢেউ কেমন? আছে, ছােড ছােড গইরকী বলছেন, বাংলা ভাষায় বলুন ছােড ছোড গইর মানে কী? মাঝি আনন্দিত গলায় বলল, অল্প বিস্তর ঢেউ। 

রূপালী দ্বীপ-শেষ-পর্ব

ঢেউ যা উঠছে তাকে অল্প বিস্তর বলাটা ঠিক হচ্ছে নানীরা মুখ কালো করে ঢেউ দেখছে। 

মুনা বলল, কী নীল পানি দেখছেন আপা? নদীর পানি এত নীল হয় ? আশ্চর্য

নীরা জবাব দিল নানাফ নদীর নীল পানি তাকে অভিভূত করতে পারছে নাহঠাৎ তার মনে পড়েছে, সে সঁতার জানে নাসে রানার দিকে তাকাল। 

রানা খুব ব্যস্ত হয়ে নৌকায় জিনিসপত্র তুলছেমালামালের সঙ্গে প্রচুর ডাবও যাচ্ছেরানা কোত্থেকে যেন সস্তা দরে আঠারোটা ডাব কিনেছেসাগরে মিষ্টি পানির সাপ্লাই। 

মােতালেব রানাকে সাহায্য করছেবন্টু দাড়িয়ে আছে এক পাশে। বুদ্বুর মন খুব খারাপট্রেনে ওঠার পর থেকে মুনা তার সঙ্গে একটা কথাও বলেনিএর মানে সে বুঝতে পারছে না। 

মুনার পুরাে ব্যাপারটাই সবসময় তার কাছে এক ধরনের রহস্যমেয়েটা তাকে পছন্দ করে, না করে না? তাকে সে একটা সুয়েটার কিনে দিয়েছেধরে নেয়া যেতে পারে, পছন্দ করে বলেই দিয়েছেকিন্তু কথাবার্তায় কিংবা আচারআচরণে 

তার কোনাে প্রমাণ নেই। 

বন্দুর একবার ধারণা হয়েছিল, তার বড় ভাই উপস্থিত বলেই মুনা তার সঙ্গে কথা বলছে নামেয়েরা আড়াল পছন্দ করেকিন্তু সঞ্জু তাে কাল রাতেই চলে গেছেএর পরেও মুনা কথা বলবে না কেন? বন্দু নিজ থেকে উদ্যোগ নিয়ে আজ ভােরবেলা কথা বলার চেষ্টা করেছেমুনাকে গিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবে বলেছে মুনা, চা খেতে যাবি? একটা দোকানে দেখলাম গুড়ের চা বানাচ্ছে

রূপালী দ্বীপ-শেষ-পর্ব

মুন৷ বলল, গুড়ের চা খাবার জন্যে আমি খুব ব্যস্ত হয়ে আছি আপনাকে কে বলল? চিনির খাই না, তো গুড়ের চা। 

চা না খেলে না খাবি চল, হেঁটে আসিআপনার সঙ্গে হাঁটতে যাব?হ্যাঅসুবিধা আছে

অবশ্যই অসুবিধা আছেবাটকু লােকের সঙ্গে আমি হাটি নালােকজন দেখে ফিক ফিক করে হাসেতারা মনে মনে বলে লম্বা মেয়েটা এই বাটকুটার সঙ্গে 

হাঁটছে কেন

বন্টুর মন এই কথায় অত্যন্ত খারাপ হলএই জাতীয় কথা কি কেউ বলতে পারে? বলতে পারা কি উচিত? মুনার দেয়া স্যুয়েটার সে এখন পরে আছেইচ্ছা করছে সুয়েটারটা খুলে টেকনাফের নদীতে ফেলে দিতেদরকার নেই শালার স্যুয়েটারের

রানা বিরক্ত গলায় বলল, তােরা সব হাবার মতাে তীরে দাড়িয়ে আছিস কেন? আমাদের কি রওনা দেয়া লাগবে না? জোয়ারভাটার ব্যাপার আছেযাকে বলেসমুদ্রযাত্রাএক্ষুনি রওনা দিতে হবেনাে ডিলে। 

নীরা নিচু গলায় বলল, আমি যাচ্ছি নারানা হতভম্ব হয়ে বলল, আমি যাচ্ছি না মানে ? আমি সাতার জানি নাআমরা তাে সাঁতরে যাচ্ছি নানৌকায় করে যাচ্ছিআমার ভয় লাগছেআমি যাব না। 

রানা অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে শান্ত গলায় বলার চেষ্টা করল ঢেউ যা একটু নদীতেই দেখা যাচ্ছে নৌকা সমুদ্রে পড়লেই সব শান্ততাই না মাঝি

রূপালী দ্বীপ-শেষ-পর্ব

মাঝি হাসিমুখে বলল, উল্টা কথা কইওসাগরে ডাঙ্গর ডাঙ্গর গইর ঢেউতুই জান? | নীরা বলল, অসম্ভব, আমি যাব নাআমাকে বটি দিয়ে কুচিকুচি করে কেটে ফেললেও যাব না। 

আনুশকা বলল, শােন নীরা, তীর্থস্থানে সবার যাবার সৌভাগ্য হয় নাঅনেকেই খুব কাছ থেকে ফিরে যায়

নীরা আনুশকাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, স্যরি, এক সময় আমি এরকম কথা বলেছিলামআমি সবার কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চাচ্ছিআমি যাব নাপ্লীজ

নীরার গলায় এমন কিছু ছিল যে সবাই বুঝল, নীরা যাবে নাকেউ কিছু বলল নাদীর্ঘ সময় সবাই চুপচাপরানার চোখে পলক পর্যন্ত পড়ছে না। 

জরী বলল, নীরা, সত্যি যাবে না

না জরীআমি যাব নানৌকায় উঠলেই আমি ভয়ে মরে যাবআমি পানি অসম্ভব ভয় পাইতােদের সঙ্গে ঠিক করেছি কিন্তু আসল কথাটাই কখনো মনে আসেনি। 

মুন বলল, তাহলে কী হবে

আমাকে নিয়ে কাড়কে চিন্তা করতে হবে নাআমি একটা বাস ধরে কক্সবাজার চলে যাবসেখান থেকে ঢাকা। 

আনুশকা বলল, এটা একটা কথা হল? আমি যা করছি খুব অন্যায় করছিআমি সেটা জানিভয়কে জয় করতে হয় নীরা

সব ভয় জয় করা যায় না। 

রানা বলল, এখন তা হলে কী করা? নীরাকে একা একা যেতে দেয়া যায় নাএকজনকাডকে নীরার সঙ্গে যেতে হবেকে যাবে

বল্টু বলল, আমিআমি নিয়ে যাব। 

রূপালী দ্বীপ-শেষ-পর্ব

মুনা অবাক হয়ে বন্দুর দিকে তাকিয়ে আছেকী বলছে এই মানুষটা? সে কি মুনার উপর রাগ করে বলছে? এত রাগ কেন? মুনার সমস্ত অন্তরাত্মা কেঁদে উঠলতার চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছা করল অয়ন ভাই, আপনি যাবেন নাপ্লীজ, প্লীজআমি নিতান্তই দরিদ্র পরিবারের একটা মেয়েআপনিও হতদরিদ্র একজন মানুষকোনােদিন যে আবার আমরা সমুদ্রের কাছে আসতে পারব আমার মনে হয় না। 

কী সুন্দর একটা সুযােগ ! আমার উপর রাগ করে আপনি এই সুযােগটা নষ্ট করবেন 

আমি জানি, আমি নানানভাবে আপনাকে কষ্ট দিইআপনাকে আহত করিকেন করি আমি নিজেও জানি নাপ্রতিবার কষ্ট পেয়ে আপনি যখন মুখ কালো করেন তখন আমার ইচ্ছা করে খুব উঁচু একটা বিল্ডিংউঠে সেখান থেকে লাফিয়ে রাস্তায় পড়ে যেতেঅয়ন ভাই, বলুন তাে আমার স্বভাবটা উল্টো হল কেন? কেন আমি আর দশটা মেয়ের মতো স্বাভাবিক হলাম না ? আপনার ধারণা, আমি খুব বাজে ধরনের একটা মেয়েআপনার এই ধারণা সত্যি নয়খুব ভুল ধারণাআমি যে কত ভাল একটা মেয়ে সে জানে শুধু আমার মাএকদিন আপনিও জানবেন

 সেই দিনটির জন্যে আমি কত যে আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি! অয়ন ভাই, আমাদের আর্থিক অবস্থাটা যে কত খারাপ সেটা তাে আপনি জানেন তার পরেও মাসংসারখরচের টাকা চুরি করে আপনার জন্যে একটা স্যুয়েটার কিনলামআপনার একটাই স্যুয়েটারসেটাও অনেকখানি ছেড়াছড়া ঢাকার জন্যে আপনি সবসময় স্যুয়েটারের উপর একটা শার্ট পরেনএকদিন আমাকে বললেন মানুষ কেন যে শার্টের উপর স্যুয়েটার পরে আমি জানি নাকী বিশী লাগে দেখতে! মনে হয় শার্টের উপর একটা ভারী গেঞ্জি পরে আছে। 

রূপালী দ্বীপ-শেষ-পর্ব

আপনার কথা শুনে আমি সেদিন কী কষ্ট যে পেয়েছিলাম ! সারা রাত কেঁদেছি আর বলেছি, কেন একজন মানুষ আপনার মত দরিদ্র হয় আর কেন আরেকজন হয় শুভ্র ভাইয়ার মতাে ধনী

নানা ধরনের কষ্টের মধ্যে আমি বড় হচ্ছিএকধরনের আশা নিয়ে বড় হচ্ছি গভীর রাতে ঘুম ভেঙে ঠাৎ মনে হয় হয়তো সামনের দিনগুলি অন্যরকম হবে। 

অয়ন ভাই, আমি একটা ঘােরের মধ্যে আপনার সঙ্গে দৌড়াতে দৌড়াতে ট্রেনে উঠে পড়লামসবাই আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকাচ্ছিলআমি কিন্তু একটুও লজ্জা পেলাম নামনে মনে বললাম এই ব্যাপারটা নিয়তি সাজিয়ে রেখেছেনিয়তি চাচ্ছে আমি যাই আপনার সঙ্গে। 

রাতে একসময় আপনারা সবাই ঘুমিয়ে পড়লেন। আমি কিন্তু জেগে রইলাম। জেগে জেগে ঠিক করলাম দারুচিনি দ্বীপে নেমে আমি কী করব। কী করব জানেন? আমি আপনার কাছে গিয়ে বলব, – অয়ন ভাই, আসুন তো আমার সঙ্গে — সমুদ্রে কোমর পর্যন্ত ডুবিয়ে দাড়াই। আপনি অবাক হয়ে আসবেন আমার সঙ্গে। আমি এক সময় বলব, আমার কেমন যেন ভয়-ভয় লাগছে। আপনি আমার হাতটা একটু ধরুন তো! আপনি হাত ধরবেন আর সঙ্গে সঙ্গে আমি বলব — অয়ন ভাই, আমি আপনাকে নিয়ে এত ঠাট্টা-তামাশা করি। আমি জানি আপনি খুব রাগ করেন। কিন্তু আমি যে আপনাকে কতটা ভালবাসি তা কি আপনি জানেন? এই সমুদ্রে যতটা

 

Read more

রূপার পালঙ্ক-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-১)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *