সে বড়াে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। এখানে দাঁড়িয়ে তার ক্লান্তি আরাে বেড়ে গেল। বিরক্ত হয়ে বলল, “কী ব্যাপার হাসান আলি, টুনু মিয়ার দল কোথায়? | হাসান আলি সে কথার জবাব দিল না, গামছা দুলিয়ে হাওয়া করতেই লাগল। মজিদ গলা উচিয়ে বলল, ‘কথা বলছ না যে, কী ব্যাপার?
‘নৌকা আসছে। বিশ্রাম করেন মজিদ ভাই।’
হুমায়ূন ও জাফর এসে বসল হাসান আলির পাশে। বৃষ্টি নামতে–নামতে আবার থেমে গেছে। বসে থাকতে মন্দ লাগছে না তাদের। রামদিয়ার ঘাটে টুনুমিয়ার দলকে
দেখতে পেয়ে তারা সে–রকম অবাক হল না! জাফর হঠাৎ সুর করে বলল, ওগাে ভাবীজান, মর্দ লােকের কাম।” | তারা সবাই মিনিট দশেক বসে রইল। চারিদিকে ঘন অন্ধকারে মাঝে মাঝে সিগারেটের ফুলকি আগুন জ্বলছে–নিভছে। ঝিঝি পােকার একটা বিরক্তিকর আওয়াজ ছাড়া অন্য আওয়াজ নেই। হাসান আলি হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘নৌকা দেখা যায়। উঠেন, সবেই উঠেন।
দেশী ডিঙ্গি নৌকা ঠেলে উজানে নিয়ে আসছে। হাসান আলি উচু গলায় সাড়া দিল, ‘হই হই হই–হা।’
নৌকা থেকে এক ক্লিন চেচিয়ে উঠল, হাসান ভাই নাকি গাে? ও হাসান ভাই।’
‘ঠিকমতাে পৌছছেন দেহি।’
শ্যামল ছায়া (পর্ব-১৮)
হাসান আলি আচমকা প্রগলভ হয়ে উঠল। নৌকা পাড়ে ভিড়তেই নৌকার দড়ি ধরে শিশুর মতো চেচিয়ে উঠল, টুনু মিয়া, ও টুনু মিয়া।
নৌকার ভেতর থেকে একসঙ্গে উচু স্বরগ্রামে হেসে উঠল সবাই। টুনু মিয়া লাফিয়ে নামল নৌকা থেকে, বেঁটেখাট মানুষ। পেটা শরীর, মাথার চুল ছােট ছােট করে কাটা। সে হাসিমুখে এগিয়ে গেল হুমায়ূনের দিকে।
‘আমারে চিনছেন কমাণ্ডার সাব? আমি টুনু। বাজিতপুরের টুনু মিয়া। বাজিতপুর থানায় আপনার সাথে ফাইট দিছি।
হুমায়ুন বলল, ‘তােমরা দেরি করে ফেলেছ, আড়াইটা বাজে।
আগে কল আমার টিনছেন কিনা। ‘চিনেছি, চিনেছি। চিনব না কেন?
‘বাজিতপুর ফাইটে আমার বাম উড়াতে গুলী লাগল। আপনে আমারে পিঠে লইয়া দৌড় দিলেন। মনে নাই আপনার?
শ্যামল ছায়া (পর্ব-১৮)
খুব মনে আছে।
‘বাঁচনের আশী আছিল না। আপনে বাঁচাইছেন। ঠিক কইরা কন, আমারে চিনছেন? সেই সময় আমার লম্বা চুল আছিল।’
হুমায়ূন অবশ্যি সত্যি চিনতে পারে নি, তবু আজকের এই মধ্যরাতে স্বাস্থ্যবান হাসি–খুশি এই তরুণটিকে অচেনা মনে হল না। দলের অন্যান্য সবাই নেমে এসেছে। হাসান আলি তাদেরকে কী যেন বলছে, আর তারা ক্ষণে ক্ষণে হেসে উঠছে। কে বলবে এই সব ছেলেদের জীবন–মৃত্যুর সীমারেখা কিছুক্ষণের মধ্যেই সম্পূর্ণ মুছে যাবে।
জাফর বলল, ‘আর লাফান কোথায় ? ‘আছে, জায়গা মতােই আছে।’
তাহলে আর দেরি কেন? নৌকা ছাড়া যাক। হমায়ুন ভাই কী বলেন? ‘হ্যা হ্য, উঠে পড় সবাই।
নৌকায় উঠে বসতেই বড়ো বড়াে ফোঁটায় বৃষ্টি নামল। নৌকা যদিও ভাটির দিকে যাচ্ছে, তবু বাতাসের ঝাপটায় এগােচ্ছে ধীর গতিতে, মাঝে মাঝে তীরে গজিয়ে–ওঠা বেতঝাপে আটকে যাচ্ছে। যত বারই নৌকা আটকে যাচ্ছে, তত বারই মাঝি দু’টি গাল পাড়ছে, ‘ও হালার পুত, ও হারামীর বাচ্চা।’ গ্রামের ভেতর দিয়ে নৌকা যাবার সময় মেঘ ধরে গেল। তীরে বৃষ্টি অগ্রাহ্য করে অনেক কৌতূহলী লােক বসে আছে। দু’–এক জন সাহস করে নিচু গলায় বলছে, “জয় বাংলা”।
শ্যামল ছায়া (পর্ব-১৮)
মুক্তিবাহিনী চলাচল হচ্ছে এ খবর কী করে পেল কে জানে! হুমায়ূন একটু বিরক্ত হল। মুখে কিছুই বলল না। অবশ্য ভয় পাবার তেমন কিছু নেইও। মিলিটারিরা কিছুতেই এই রাত্রিতে থানার নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে বাইরে বেরুবে না। মজিদ বলল, ‘হুমায়ুন ভাই, পজিশন নেব কোথায়? সব খানাখন্দ তাে পানিতে ভর্তি। সাপ খােপও আছে কিনা কে জানে। | নৌকার অনেকেই এই কথায় হেসে উঠল। মজিদ রেগে গিয়ে বলল, ‘হাস কেন? ও মিয়ারা, হাস কেন? মজিদ রেগে যাওয়াতেই হাসিটা হঠাৎ করেই থেমে গেল। নৌকা নীরব হল মুহূর্তেই। তখনি শােনা গেল, বাইরে ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি হচ্ছে। মাঝি দু জন ভিজে চুপসে গেছে। জাফর বলল, ‘মাঝিরা তাে দেখি গােসল সেরে ফেলেছে।
‘হ গাে ভাই, তিন দফা গােসল হইল।
জাফর সুর করে বলল, “বাইচ বাইতে মর্দ লােকের কাম।
মজিদ ক্রমাগতই বিরক্ত হচ্ছিল। ভয় করছিল তার। ভয় কাটানর জন্যেই জিজ্ঞেস করল, ‘মটার কোথায় ফিট করেছ তােমরা? থানা কত দূর?
Read More