সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-২)

 হত না যদি না ও প্রকাশকের তাগিদের চোটে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ত। ওকে দোষ দিই কী করে বলুন ? আমার মামলা থেকে ও যা খাড়া করে তাকে কিশাের উপন্যাসই বলা হয়ে থাকে। এইসব উপন্যাস যদি শুধু কিশােররাই পড়ত তাহলে কিন্তু কোনাে সমস্যা ছিল না ; আসলে যেটা ঘটে সেটা হল, কিশােরদের সঙ্গে তাদের মা, বাবা, মাসি, পিসি, খুড়াে, জ্যাঠা সকলেই এসব উপন্যাস পড়ে। একসঙ্গে এত স্তরে চাহিদা মেটানাে কি চাট্টিখানি কথা ?

নয়ন রহস্য 

‘আপনি তপেশকে একটু গাইড করুন না । ‘সেটা করব । আগে করতাম, ইদানীং করি না। আবার করব। তবে তার আগে প্রকাশকের সঙ্গে একটা মােকাবিলা করা দরকার। তাদের 

বােঝাতে হবে যে, লাগসই মামলা পেলেই তারা উপন্যাস পাবে, নচেৎ নয়। তাতে যদি একটা বছর ফেলুদা বাদও যায়, সেটাও তাদের মেনে নিতে হবে। তারা ঘাের ব্যবসাদার ; আমার মান-ইজ্জত নিয়ে তারা চিন্তিত নয়—সে চিন্তা আমাদেরই করতে হবে। | ‘পাঠকদের সঙ্গেও ত একটা মােকাবিলার প্রয়ােজন। তাই নয় কি? এই যে সব যারা রাগী রাগী চিঠি দিল ? 

‘এরা বােকা নয়, লালমােহনবাবু। এদের চাহিদা অত্যন্ত সঙ্গত। সেটা মেটাতে পারলেই এরা আবার আমাকে তুলে ধরবে। 

নয়ন রহস্য (পর্ব-২)

‘শুধু আপনাকে ? আমাকে নয় ? ‘একশােবার! আপনি-আমি ত পরস্পরের পরিপূরক। সােনায় সােহাগা। অ্যারালডাইট দিয়ে আমার সঙ্গে সেঁটে রয়েছেন আপনি সেই সােনার কেল্লার সময় থেকেই । আমাকে ছাড়া আপনার অস্তিত্বই নেই—অ্যান্ড ভাইসি ভারসা। 

লালমােহনবাবু আমার দিকে ফিরে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘বি ভেরি কেয়ারফুল, তপেশ ? 

এটা বলার কোনাে দরকার ছিল না, কারণ ফেলুদা স্পষ্টই বুঝিয়ে দিয়েছে যে, এবার থেকে কেয়ারফুল হবার অর্ধেক দায়িত্ব ওর। | কথার ফাঁকে ফেলুদা একটা চারমিনার ধরিয়েছিল। এবার সেটা আধ শােভা অবস্থায় আশ ট্রেতে ফেলে দিয়ে আমার দিকে এগিয়ে এসে পিঠে একটা চাপড় মেরে বলল, সােজা নিয়ম, বুঝলি তােপশে। এবার থেকে আমার গ্রীন সিগন্যাল না পাওয়া পর্যন্ত তুই হাত পা গুটিয়ে বসে থাকবি। ঠিক হ্যায় ? 

আমি হেসে মাথা নাড়িয়ে বুঝিয়ে দিলাম ঠিক হ্যায় । 

 এই যে এতক্ষণ পাঁয়তারা করলাম, তা থেকে বােঝাই যাবে যে, ফেলুদা আমায় গ্রীন সিগন্যাল দিয়েছে। শুধু ফেলুদা কেন, নয়নের মামলা নিয়ে লিখছি শুনে জটায়ু একটা কান-ফাটানাে হাততালি দিয়ে বললেন, ‘গ্রেট ! 

গ্রেট ! ইয়ে, আমার ভূমিকাটা ইনট্যাক্ট থাকবে ত ? সব কিছু মনে আছে। ত?’ আমি বললাম, কোনাে চিন্তা নেই ; সব নােট করা আছে।’ 

নয়ন রহস্য (পর্ব-২)

আসল মামলায় পৌঁছতে অবিশ্যি আরাে কিছুটা সময় লাগবে । কোথায় শুরু করব জিজ্ঞেস করাতে ফেলুদা বলল, ‘তরফদারের শাে। দ্যাট ইজ দ্য স্টাটিং পয়েন্ট। আমি ওর কথামতােই স্টার্ট করছি । | তরফদার হলেন ম্যাজিশিয়ান । পুরাে নাম সুনীল তরফদার। শশায়ের নাম ‘চমকদার তরফদার’ । আজকাল ব্যাঙের ছাতার মতাে ম্যাজিশিয়ান গজাচ্ছে এই পশ্চিম বাংলায়।

এর মধ্যে কিছু আছে যারা সত্যিই ম্যাজিক নিয়ে সাধনা করে। প্রতিদ্বন্দ্বিতার চাপে অনেককেই শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে আসতে হয়। যারা টিকে থাকে তাদের মােটামুটি একটা স্ট্যান্ডার্ড আছে। ইয়াং বয়সে ফেলুদার ম্যাজিকের নেশা ছিল, সেটা আমিই একটা গল্পে জানিয়ে ফেলেছিলাম। ফলে এসব উঠতি ম্যাজিশিয়ানদের অনেকেই ওর কাছে আসে শােয়ে নেমন্তন্ন করার জন্য। আমরা কয়েকবার গিয়েছি, আর গিয়ে হতাশ হইনি । 

সুনীল তরফদারও এই উঠতিদের মধ্যে একজন। বছর খানেক হল শশা করছেন। এখনাে তেমন নাম করেননি, যদিও দু-একটা কাগজে বেশ প্রশংসা বেরিয়েছে। গত ডিসেম্বরের গােড়ার দিকে একদিন সকালে ইনি আমাদের বাড়িতে এসে ফেলুদাকে টিপ করে এক প্রণাম করলেন। কেউ ওর পায়ে হাত দিলে ফেলুদা ভীষণ বিব্রত হয়ে পড়ে ; তরফদারের প্রণামে ও হাঁ হাঁ করে উঠল।

ভদ্রলােকের বয়স ত্রিশ-বত্রিশের বেশি নয়, লম্বা একহারা চেহারা, ঠোঁটের উপরে একটা সরু সাবধানে ছাঁটা গোঁফ। প্রণাম সেরে নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, স্যার, আমি আপনার একজন গ্রেট ফ্যান। আমি জানি এককালে আপনার নিজেরই ম্যাজিকের শখ ছিল। আমার শশা হচ্ছে 

মহাজাতি সদনে। আপনাদের জন্য তিনটে ফাস্ট রােয়ের টিকিট দিয়ে যাচ্ছি। আগামী রবিবার সাড়ে ছটায় যদি আপনারা আসেন তাহলে আমি সত্যিই খুশি হব।’ | ফেলুদা তৎক্ষণাৎ হ্যাঁ না কিছুই বলছে না দেখে ভদ্রলােক ঝুঁকে পড়ে ফেলুদার কাঁধে হাত রেখে বললেন, আমি আপনাদের রােববার ডাকছি এই কারণে যে, সেদিন আমার প্রােগ্রামে একটা নতুন আইটেম অ্যাড করছি। আমি জোর দিয়ে বলতে পারি এ জিনিস আর কেউ কখনাে স্টেজে দেখায়নি।

নয়ন রহস্য (পর্ব-২)

 ফেলুদা যাব বলে কথা দিয়েছিল। রবিবার বিকেলে সাড়ে পাঁচটায় লালমােহনবাবু তাঁর সবুজ অ্যাম্বাসাডর নিয়ে আমাদের বাড়িতে চলে এলেন। চা-ডালমুট খেয়ে আমরা ছটায় রওনা হয়ে শােয়ের ঠিক পাঁচ মিনিট আগে মহাজাতি সদনে পৌঁছে গেলাম।

কাগজে বেশ চোখে পড়ার মতাে একটা বিজ্ঞাপন দুদিন আগেই বেরিয়েছিল, ভিড় দেখে মনে হল সেটায় কাজ দিয়েছে। আমরা মাঝের প্যাসেজ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে সামনের সারির মাঝামাঝি পাশাপাশি তিনটে চেয়ারে বসলাম। 

‘কাগজে বিজ্ঞাপনটা দেখেছিলেন ? ফেলুদার দিকে ঝুঁকে পড়ে প্রশ্নটা করলেন লালমােহনবাবু। 

‘দেখেছি’, বলল ফেলুদা। ‘তাতে যে বলছে অভূতপূর্ব নতুন আকর্ষণ জ্যোতিষ্ক—এই জ্যোতিষ্কটি কী বস্তু, মশাই ?  ‘একটু ধৈর্য ধরুন–যথাসময়ে জানতে পারবেন। 

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-৩)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *