রাজেনবাবুকে রােজ বিকেলে ম্যাল–এ আসতে দেখি। মাথার চুল সব পাকা, গায়ের রং ফরসা, মুখের ভাব হাসিখুশি। পুরনাে নেপালি আর তিব্বতি জিনিস-টিনিসের যে দোকানটা আছে, সেটায় কিছুক্ষণ কাটিয়ে বাইরে এসে বেঞ্চিতে আধঘণ্টার মতাে বসে সন্ধে হব–হব হলে জলাপাহাড়ে বাড়ি ফিরে যান। আমি আবার একদিন ওঁর পেছন পেছন গিয়ে ওঁর বাড়িটাও দেখে এসেছি।

গেটের কাছাকাছি যখন পৌছেছি, হঠাৎ আমার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, “কে হে তুমি, পেছু নিয়েছ ? আমি বললাম, আমার নাম তপেশরঞ্জন বােস।‘ তবে এই নাও লজেস বলে পকেট থেকে সত্যিই একটা লেমন–ড্রপ বার করে আমায় দিলেন, আর দিয়ে বললেন, একদিন সকাল সকাল এসাে আমার বাড়িতে অনেক মুখােশ আছে ; দেখাব।’ সেই রাজেনবাবুর যে এমন বিপদ ঘটতে পারে, তা কেউ বিশ্বাস করবে ?
ফেলুদাকে কথাটা বলতেই সে খ্যাক করে উঠল। ‘পাকামাে করিসনে। কার কীভাবে বিপদ ঘটবে না-ঘটবে সেটা কি মানুষকে দেখলে বােঝা যায় ?
আমি দস্তুরমতাে রেগে গেলাম। ‘বা রে, রাজেনবাবু যে ভাল লােক, সেটা বুঝি দেখলে বােঝা যায় না ? তুমি তাে তাকে দেখােইনি। দার্জিলিং-এ এসে অবধি তাে তুমি বাড়ি থেকে বেরােওইনি। রাজেনবাবু নেপালি বস্তিতে গিয়ে গরিবদের কত সেবা করেছেন জান ?
“আচ্ছা বেশ বেশ, এখন বিপদটা কী তাই শুনি। আর তুই কচি খােকা, সে বিপদের কথা তুই জানলি কী করে?
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১)
কচি খােকা অবিশ্যি আমি মােটেই না, কারণ আমার বয়স সাড়ে তেরাে বছর। ফেলুদার বয়স আমার ঠিক ডবল।
সত্যি বলতে কী ব্যাপারটা আমার জানার কথা নয়। ম্যাল–এ বেঞ্চিতে বসেছিলাম—আজ রবিবার, ব্যান্ড বাজাবে, তাই শুনব বলে। আমার পাশে বসেছিলেন তিনকড়িবাবু, যিনি রাজেনবাবুর ঘর ভাড়া নিয়ে দার্জিলিং–এ গরমের ছুটি কাটাতে এসেছেন।
তিনকড়িবাবু ‘আনন্দবাজার পড়ছিলেন, আর আমি কোনওরকমে উকিঝুকি মেরে ফুটবলের খবরটা দেখার চেষ্টা করছিলাম। এমন সময় হাঁপাতে হাঁপাতে ফ্যাকাশে মুখ করে রাজেনবাবু এসে ধপ করে তিনকড়িবাবুর পাশে বসে গায়ের চাদরটা দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে লাগলেন।
তিনকড়িবাবু কাগজ বন্ধ করে বললেন, “কী হল, চড়াই উঠে এলেন নাকি? রাজেনবাবু গলা নামিয়ে বললেন, ‘আরে না মশাই। এক ইক্রেডিল ব্যাপার!
ইনক্রেডিবুল কথাটা আমার জানা ছিল। ফেলুদা ওটা প্রায়ই ব্যবহার করে। ওর মানে ‘অবিশ্বাস্য।
তিনকড়িবাবু বললেন, কী ব্যাপার ? ‘এই দেখুন না ।
রাজেনবাবু পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা নীল কাগজ বার করে তিনকড়িবাবুর হাতে দিলেন। বুঝতে পারলাম সেটা একটা চিঠি ।
আমি অবিশ্যি চিঠিটা পড়িনি, বা পড়ার চেষ্টাও করিনি ; বরঞ্চ আমি উলটো দিকে মুখ ঘুরিয়ে গুনগুন করে গান গেয়ে এমন ভাব দেখাচ্ছিলাম যেন বুড়ােদের ব্যাপারে আমার কোনও ইন্টারেস্টই নেই। কিন্তু চিঠিটা না পড়লেও, তিনকড়িবাবুর কথা আমি শুনতে পেয়েছিলাম।
‘সত্যিই ইনক্রেডিবল। আপনার ওপর কার এমন আক্রোশ থাকতে পারে যে আপনাকে এ ভাবে শাসিয়ে চিঠি লিখবে ?
রাজেনবাবু বললেন, তাই তাে ভাবছি। সত্যি বলতে কী, কোনও দিন কারও অনিষ্ট করেছি বলে তাে মনে পড়ে না। | তিনকড়িবাবু এবার রাজেনবাবুর দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললেন, ‘হাটের মাঝখানে এ সব ডিসকাস না করাই ভাল। বাড়ি চলুন।
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১)
দুই বুড়াে উঠে পড়লেন।
ফেলুদা ঘটনাটা শুনে কিছুক্ষণ ভুরু কুঁচকে গুম্ হয়ে বসে রইল। তার পর বলল, “তুই তা হলে বলছিস যে একবার তলিয়ে দেখা চলতে পারে ?
বা রে—তুমিই তাে রহস্যজনক ঘটনা খুঁজছিলে। বললে, অনেক ডিটেকটিভ বই পড়ে তােমারও ডিটেকটিভ বুদ্ধিটা খুব ধারালাে হয়ে উঠেছে।
‘তা তাে বটেই। এই ধর—আমি তাে আজ ম্যালে যাইনি, তবু বলে দিতে পারি তুই কোন দিকের বেঞ্চে বসেছিলি।‘
‘কোন দিক ? ‘রাধা রেস্টুরান্টের ডান পাশের বেঞ্চগুলাের একটাতে ? ‘আরেব্বাস! কী করে বুঝলে ? ‘আজ বিকেলে রােদ ছিল । তাের বাঁ গালটা রােদে ঝলসেছে, ডান ধারেরটা ঝলসায়নি। একমাত্র ওই বেঞ্চিগুলাের একটাতে বসলেই পশ্চিমের রােদটা বাঁ গালে পড়ে।‘
‘ইক্রেডিল।’ ‘যাক গে । এখন কথা হচ্ছে—রাজেন মজুমদারের বাড়িতে একবার যাওয়া দরকার ।
Read More