আকাশের দিকে তাকালে মন খারাপ হয়ে যায়।
অবিকল দেশের মত মেঘ করেছে। চারদিক অন্ধকার করে একটু পরেই যেন কালবৈশাখীর তাণ্ডব শুরু হবে। আনিস কফি খেতে যাচ্ছিল। আকাশ দেখে তার খানিকটা মন খারাপ হয়ে গেল। বডড নস্টালজিক মেঘ।
অ্যান্ডারসন ব্যস্ত ভঙ্গিতে পার্কিং লটের দিকে এগুচ্ছিল। আনিসকে দেখে থমকে দাঁড়াল, সরু গলায় বললাে, এখনাে বাড়ি যাও নি ? প্রচণ্ড থান্ডার স্টর্ম হবে। ওয়েদার সার্ভিস স্পেশাল বুলেটিন দিচ্ছে।
কফি খেয়েই রওনা হব। লিফট চাও? লিফট দিতে পারি ।
লিফট চাই না। এ অঞ্চলে ঝড় বৃষ্টি বড় একটা হয় না। সে জন্যেই সম্ভবত লােকজনদের ভয় একটু বেশি। দেখতে দেখতে ক্যাম্পাস ফাকা হতে শুরু করেছে। কফি হাউসে মােটেই ভিড় নেই। উইক এন্ডে এ রকম থাকে না কখনাে। মেয়েরা সেজে–গুজে বসে থাকে। ছেলেরা আসে ডেটের কথা পাকাপাকি করতে।
আনিস কফির পেয়ালা নিয়ে বাঁ দিকে এগিয়ে গেল । কফি হাউসের শেষ মাথায় চার পাঁচটি ছােট ছােট ঘর আছে। তিন নম্বর ঘরটি আনিসের খুব প্রিয়। দারুণ ভিড়ের সময়ও সেটি ফাকা থাকে। আজ পুরাে কফি হাউস ফাকা কিন্তু সেখানে একজন বুড়ি বসে আছে।
আমি কি এখানে বসতে পারি ? বুড়ি সম্ভবত ঘুমুচ্ছিল। আনিসের কথায় নড়েচড়ে বসলাে। নিশ্চয়। নিশ্চয়ই।
সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ
বসার পরই আনিসের মনে হল কাজটি ভাল হয় নি। আমেরিকান বুড়িগুলাে কথা না বলে থাকতে পারে না। ভ্যাজর ভ্যাজর করে দশ মিনিটের মধ্যে মাথা ধরিয়ে দেয়।
তুমি ইন্ডিয়ান নিশ্চয়ই ? না আমি ইন্ডিয়ান নই । তুমি কি মালয়েশিয়ান ?
আমি বাংলাদেশী। সেটি কোথায় ? ইন্ডিয়া ও বার্মার মাঝামাঝি একটা ছােট দেশ। কত ছােট? বেশ ছােট। নর্থ ডেকোটার অর্ধেক হবে।
বুড়ি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাে আনিসকে। দম ফুরিয়ে গেছে নিশ্চয়ই। বিশ্রাম নিয়ে আবার শুরু করবে।
তুমি কি শুনেছাে সিভিয়ার থান্ডার স্টর্ম হবে। স্পেশাল বুলেটিন দিচ্ছে দুপুর থেকে। হ্যা শুনেছি। খুবই খারাপ ওয়েদার। তুমি কি এই ইউনিভার্সিটির ছাত্র ?
আমি এখানকার একজন টিচার। কোন সাবজেক্ট ? কেমিস্ট্রি। পলিমার কেমিস্ট্রি।
আনিস বড়ই বিরক্তি বােধ করতে লাগলাে। বুড়িগুলির কৌতূহল সীমাহীন। এরা মানুষদের বড় বিরক্ত করতে পারে। বুড়িটি তার ব্যাগ থেকে সিগারেট বের করলাে। লাইটার জ্বালাতে জ্বালাতে বললাে, তুমি কি এমিলি জোহানের নাম শুনেছ ?
না। কে সে? এখানকার একজন বড় কবি। গত বৎসর রাইটার্স গিল্ড এওয়ার্ড পেয়েছে।
না আমি তার নাম শুনিনি। লিটারেচরে আমার তেমন উৎসাহ নেই। বুড়ি সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে তার হাত বাড়িয়ে দিল।
আমি এমিলি জোহান। তােমার সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুব খুশি হলাম ।
আনিস হকচকিয়ে গেল। বুড়ি থেমে থেমে বললাে, সমস্ত কফি হাউস ফাকা আর তুমি বেছে বেছে আমার এখানে বসতে এসেছু দেখে ভাবলাম হয়তাে আমাকে চেন। গল্প করতে চাও। বুড়িদের সঙ্গে ইচ্ছে করে কে আর বসতে চায় বলাে ?
সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ
আনিস ঠিক কী বলবে ভেবে পেল না। কিছু একটা বলা উচিত। তুমি কিন্তু তােমার নাম বল নি এখনাে।
আমার নাম আনিস সাবেত । তােমার মত বড় কবির সঙ্গে দেখা হয়ে খুব ভালাে লাগলাে।
বুড়ি গলার স্বর নামিয়ে ফেললাে। প্রায় ফিসফিস করে বললাে, মােটেই বড় কবি নই। রাইটার্স গিল্ড এওয়ার্ড হচ্ছে একটা সস্তা ধরনের পুরস্কার। এখন পর্যন্ত কোনাে বড় কবি রাইটার্স গিল্ড এওয়ার্ড পায় নি। আমি যখন পেলাম তখন এত মন খারাপ হলাে যে বলার নয়। বুঝতে পারলাম যে আমি একজন সস্তা ধরনের কবি, থার্ডরেটেড ।
বুড়ি উঠে দাড়াল। শান্ত স্বরে বললাে, তােমার সঙ্গে কি আমার আবার দেখা হবে ? আনিসের উত্তর দেবার আগেই সে থেমে থেমে বললাে,
“ওয়ান ফ্লিউ টু দ্য ইস্ট ওয়ান ফ্লিউ টু দা ওয়েস্ট
অ্যান্ড ওয়ান ফ্লিউ ওভার দ্য কাক্কুস নেস্ট।” আনিস অনেকক্ষণ বসে রইল একা একা। এখান থেকে বাইরের আকাশ দেখা যাচ্ছে তবে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে তা চোখে পড়ে। কত তফাৎ ঝমঝম শব্দ নেই, গাছের পাতার শন শনানি নেই, ব্যাঙ ডাকছে না। বােঝার কোনােই উপায় নেই যে বাইরে আকাশ অন্ধকার করে ঝড়াে হাওয়া বইছে।
অ্যাটেনশন প্লিজ। অ্যাটেনশন প্লিজ। কফি হাউজ দশ মিনিটের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাবে। অ্যাটেনশন প্লিজ।
কফি হাউজ থেকে বেরিয়ে মনে হলাে বড়ড় বােকামি হয়েছে। অনেক আগেই বাড়ি ফেরা উচিত ছিল। ভাল ঝড় হচ্ছে। লােকজন কোথাও নেই। পার্কিং লট ধূধূ করছে। আনিস মেমােরিয়াল লাউঞ্জে চলে গেল। মেমােরিয়াল লাউঞ্জে পত্রিকা পড়ার ব্যবস্থা আছে। একটি
সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ
প্রকাণ্ড ভিক্টোরিয়ান পিয়ানাে আছে। হট চকলেট এবং পেপসির দুটি ভেন্ডিং মেশিন আছে। অবস্থা তেমন খারাপ হলে সেখানকার সােফায় আরাম করে রাত কাটানাে যাবে । | লাউঞ্জের শেষ প্রান্তে একটি ছেলে এবং খুবই অল্প বয়সী একটি মেয়ে জড়াজড়ি করে বসেছিল। ছেলেটি এক হাত দিয়ে মেয়েটির জামার হুক খােলবার চেষ্টা করছে। মেয়েটি বাধা দেয়ার একটি ভঙ্গি করছে এবং খিলখিল করে হাসছে। আনিস না দেখার ভান করে ভেন্ডিং মেশিনের দিকে এগুলাে। এই সময় চারদিক অন্ধকার হয়ে গেলাে। এখানে এরকম হয় না কখনাে। হাজারাে দুর্যোগেও এদের ইলেট্রিসিটি ঠিকই থাকে। মনে হচ্ছে মেয়েটি উঠে আসছে সােফা থেকে।
তােমার কাছে কি সিগারেট আছে ? আছে। আমি কি তােমার একটি সিগারেট
Read more