সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৪)

কিন্তু দেশে ফিরে কিছুই ভাল লাগলাে নানােংরা ঘর বাড়িদেয়ালগুলি ময়লারাতের বেলা কেমন অন্ধকার অন্ধকার লাগে চারদিকমানুষজনও কেমন যেন বদলে গেছেকেউ যেন ঠিক সহজ হতে পারে নাবড় খালা যিনি সারা জীবন তুই তুই করে কথা বলতেন তিনি পর্যন্ত তুমি বলা শুরু করলেন। 

সবাই গেছে বনেএক মাস পরই রুনকি পড়ে গেল অসুখেযা খায় কিছুই হজম করতে পারে নারাহেলা আমেরিকা ফিরে এসে হাঁপ ছাড়লাে। 

দেখতে দেখতে কতদিন হয়ে গেলবিশ বছর অনেক লম্বা সময়রাহেলার বাবা মা মারা গেলেনআমিন সাহেবের বাবা মাতাে আগেই ছিলেন নাকোনাে পিছু টান রইলাে 

রাহেলার সবচে ছােট বোনটির বিয়ে হয়ে গেলকোথায় আছে সে কিছুই জানা নেইজানবার জন্যে সেরকম উৎসাহও এখন হয় নাসবকিছু যেন হারিয়ে গেছেআজকাল আয়নায় মুখ দেখলে রাহেলার তীক্ষ্ণ ব্যথাবােধ হয় মুখের চামড়া শ্লথ হয়ে এসেছেকানের দুপাশের সাদা চুল সাপের মত কিলবিল করেএখন তার অন্য এক ধরনের আলস্য বােধ হয়সকাল বেলা চেয়ার পেতে বারান্দায় একা একা বসে থাকেন আমিন সাহেব তাকে বিরক্ত করেন নাকেমন একটা দূরত্ব এসে গেছে তাঁদের মধ্যেমাঝে মাঝে রুনকি আসে ঝড়ের মত। 

সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ 

আবার তুমি চেয়ার নিয়ে বসেছ ? শিকড় গজিয়ে শেষে তুমি একটা গাছ হয়ে যাবে। 

আয় তুইও বােসহুঁ, আমার যেন কোনাে কাজ নেই। 

রুনকি দেখতে তার মত হয় নি তবু চমৎকার হয়েছেগায়ের রঙ চাপাকিন্তু কী কালাে শান্তি চোখ! তাকালেই কেমন যেন মন খারাপ হয়আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রুনকি যখন চুল ব্রাশ করে তিনি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকেনরুনকি ঠোট বাঁকায়, এমন করে তাকাও কেন মা

কেমন করে তাকাই ? কেমন যেন পুরুষ পুরুষ চোখে তাকাও। 

তিনি তার নিজেরে মেয়েকে একটুও বুঝতে পারেন নামাঝে মাঝে অনেক কায়দা করে জিজ্ঞেস করেন, তুই কী রকম ছেলে বিয়ে করতে চাস রুনকি

বিয়ের কথা আমি মােটেই ভাবছি নাবছরের পর বছর একটা ছেলের সঙ্গে থাকা বড় 

আলি। 

এসব আবার কী ধরনের কথা ?  সত্যি কথাই বলছি তােমাকেযেসব ছেলে আমার সঙ্গে ডেট করে তুমি কি ভাবছ আমি ওদের কাউকে বিয়ে করার কথা ভাবি ? হলি কাউ তাছাড়া ওরাও বিয়ে করতে চায়। 

ভুলিয়ে ভালিয়ে ঘরে নিয়ে শুতে চায়। 

রাহেলা মুখ কালাে করে বললেন, তুই নিশ্চয়ই ওদের ঘরে যাস না

মা যাই কি না যাই সেসব আমি তােমার সঙ্গে ডিসকাস করতে চাই নাআমার বয়স ১৯ হয়েছেতােমাদের কোনাে রেসপনসিবিলিটি নেই| রাহেলা চান একটি হৃদয়বান এবং বুদ্ধিমান বাঙালি ছেলেকে বিয়ে করবে রুকিজীবনে যে সমস্ত সুখ আনন্দের কথা তিনি সারাজীবন কল্পনা করেছেন তার মেয়ে সেসব ভােগ করবেকিন্তু এই দূর দেশে তেমন ছেলে পাওয়া যাবে কোথায় ?

রাহেলা লং ডিসটেন্সে পরিচিত সবাইকে একটি ছেলের কথা বলেনখোজ যে আসে না তাও নয়প্রথমেই জানতে চায় মেয়ের কি ইমিগ্রেশন আছে ? বিয়ে করলে এখানে থেকে যাবার ব্যাপারে কোনাে সাহায্য হবে কি ? মেয়ের ছবি দেখতে চায় না, মেয়েটিকে দেখতে চায় নাগ্রীন কার্ড দেখতে চায়। 

সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ 

আমিন সাহেব নিজের ঘরে বসে কী যেন লিখছিলেন একতলার সর্ব পশ্চিম কোণার ছােট ঘরটি তার নিজস্ব ঘরঘরটিতে আসবাব বলতে ছােট একটা লেখার টেবিল, একটা ইজি চেয়ার, বুক শেলফবুক শেলফে কয়েকটি রেফারেন্স বই, ন্যাশনাল জিওগ্রাফির কিছু পুরনাে সংখ্যা এবং বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইছামতি ছাড়া অন্য কোনাে বই নেইআমিন সাহেব মাঝে মাঝেই দরজা বন্ধ করে এই ঘরে বসে কী যেন লেখেনরাহেলার কৌতূহল হলেও কখনাে কিছু জিজ্ঞেস করেন নি আমিন সাহেবের কোনাে বিষয়ে কৌতূহল প্রকাশ করতে আজ আর তার ভাল লাগে না। 

রাহেলা দরজায় দুবার টোকা দিয়ে মৃদু গলায় বললেন, আসব ? জবাব পাবার আগেই তিনি পর্দা সরিয়ে আমিন সাহেবের ঘরে ঢুকলেনআমিন সাহেব তার লেখাটি আড়াল করবার চেষ্টা করলেনরাহেলা ভান করলেন যেন তিনি এসব কিছুই লক্ষ করছেন না। 

আমি আজ সন্ধ্যায় কয়েকজনকে খেতে বলেছিআমিন সাহেব কোনাে উত্তর দিলেন না। 

তুমি টচি থেকে শুটকি মাছ এনে দেবেশুটকি মাছ পাওয়া যায় ? মাঝে মাঝে যায়। 

আমি নিয়ে আসব

রাহেলার মনে হলাে আমিন সাহেব অস্বস্তিবােধ করছেন যেন তিনি চান না রাহেলা এখানে থাকেকিন্তু এরকম মনে করার কারণ কী ? রাহেলা নিজের অজান্তেই বলে ফেললেন, কী লিখছো

তেমন কিছু না। 

রাহেলা খানিকক্ষণ সরু চোখে তাকিয়ে থেকে দোতলায় চলে গেলেনদোতলার একেবারে শেষ কামরাটি রুনকিরসে দরজা বন্ধ করে গান শুনছে। 

রুনকি দরজা খুলাে তাে মারুনকি দরজা খুলে দিলতার চোখ ভেজামনে হলাে সে অনেকক্ষণ ধরে কাঁদছেকী হয়েছে রুনকি

 

Read more

সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৫)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *