কিন্তু দেশে ফিরে কিছুই ভাল লাগলাে না। নােংরা ঘর বাড়ি। দেয়ালগুলি ময়লা। রাতের বেলা কেমন অন্ধকার অন্ধকার লাগে চারদিক। মানুষজনও কেমন যেন বদলে গেছে। কেউ যেন ঠিক সহজ হতে পারে না। বড় খালা যিনি সারা জীবন তুই তুই করে কথা বলতেন তিনি পর্যন্ত তুমি বলা শুরু করলেন।
এক মাস পরই রুনকি পড়ে গেল অসুখে। যা খায় কিছুই হজম করতে পারে না। রাহেলা আমেরিকা ফিরে এসে হাঁপ ছাড়লাে।
দেখতে দেখতে কতদিন হয়ে গেল। বিশ বছর অনেক লম্বা সময়। রাহেলার বাবা মা মারা গেলেন। আমিন সাহেবের বাবা মা‘তাে আগেই ছিলেন না। কোনাে পিছু টান রইলাে
রাহেলার সবচে ছােট বোনটির বিয়ে হয়ে গেল। কোথায় আছে সে কিছুই জানা নেই। জানবার জন্যে সেরকম উৎসাহও এখন হয় না। সবকিছু যেন হারিয়ে গেছে। আজকাল আয়নায় মুখ দেখলে রাহেলার তীক্ষ্ণ ব্যথাবােধ হয় । মুখের চামড়া শ্লথ হয়ে এসেছে। কানের দু‘পাশের সাদা চুল সাপের মত কিলবিল করে। এখন তার অন্য এক ধরনের আলস্য বােধ হয়। সকাল বেলা চেয়ার পেতে বারান্দায় একা একা বসে থাকেন । আমিন সাহেব তাকে বিরক্ত করেন না। কেমন একটা দূরত্ব এসে গেছে তাঁদের মধ্যে। মাঝে মাঝে রুনকি আসে ঝড়ের মত।
সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ
আবার তুমি চেয়ার নিয়ে বসেছ ? শিকড় গজিয়ে শেষে তুমি একটা গাছ হয়ে যাবে।
আয় তুইও বােস। হুঁ, আমার যেন কোনাে কাজ নেই।।
রুনকি দেখতে তার মত হয় নি তবু চমৎকার হয়েছে। গায়ের রঙ চাপা। কিন্তু কী কালাে শান্তি চোখ! তাকালেই কেমন যেন মন খারাপ হয়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রুনকি যখন চুল ব্রাশ করে তিনি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকেন। রুনকি ঠোট বাঁকায়, এমন করে তাকাও কেন মা?
কেমন করে তাকাই ? কেমন যেন পুরুষ পুরুষ চোখে তাকাও।
তিনি তার নিজেরে মেয়েকে একটুও বুঝতে পারেন না। মাঝে মাঝে অনেক কায়দা করে জিজ্ঞেস করেন, তুই কী রকম ছেলে বিয়ে করতে চাস রুনকি ?
বিয়ের কথা আমি মােটেই ভাবছি না। বছরের পর বছর একটা ছেলের সঙ্গে থাকা বড়
আলি।
এসব আবার কী ধরনের কথা ? সত্যি কথাই বলছি তােমাকে। যেসব ছেলে আমার সঙ্গে ডেট করে তুমি কি ভাবছ আমি ওদের কাউকে বিয়ে করার কথা ভাবি ? হলি কাউ তাছাড়া ওরাও বিয়ে করতে চায়।
ভুলিয়ে ভালিয়ে ঘরে নিয়ে শুতে চায়।
রাহেলা মুখ কালাে করে বললেন, তুই নিশ্চয়ই ওদের ঘরে যাস না ?
মা যাই কি না যাই সেসব আমি তােমার সঙ্গে ডিসকাস করতে চাই না। আমার বয়স ১৯ হয়েছে। তােমাদের কোনাে রেসপনসিবিলিটি নেই। | রাহেলা চান একটি হৃদয়বান এবং বুদ্ধিমান বাঙালি ছেলেকে বিয়ে করবে রুকি। জীবনে যে সমস্ত সুখ ও আনন্দের কথা তিনি সারাজীবন কল্পনা করেছেন তার মেয়ে সেসব ভােগ করবে। কিন্তু এই দূর দেশে তেমন ছেলে পাওয়া যাবে কোথায় ?
রাহেলা লং ডিসটেন্সে পরিচিত সবাইকে একটি ছেলের কথা বলেন। খোজ যে আসে না তাও নয়। প্রথমেই জানতে চায় মেয়ের কি ইমিগ্রেশন আছে ? বিয়ে করলে এখানে থেকে যাবার ব্যাপারে কোনাে সাহায্য হবে কি ? মেয়ের ছবি দেখতে চায় না, মেয়েটিকে দেখতে চায় না। গ্রীন কার্ড দেখতে চায়।
সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ
আমিন সাহেব নিজের ঘরে বসে কী যেন লিখছিলেন । একতলার সর্ব পশ্চিম কোণার ছােট ঘরটি তার নিজস্ব ঘর। ঘরটিতে আসবাব বলতে ছােট একটা লেখার টেবিল, একটা ইজি চেয়ার, বুক শেলফ। বুক শেলফে কয়েকটি রেফারেন্স বই, ন্যাশনাল জিওগ্রাফির কিছু পুরনাে সংখ্যা এবং বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইছামতি ছাড়া অন্য কোনাে বই নেই। আমিন সাহেব মাঝে মাঝেই দরজা বন্ধ করে এই ঘরে বসে কী যেন লেখেন। রাহেলার কৌতূহল হলেও কখনাে কিছু জিজ্ঞেস করেন নি । আমিন সাহেবের কোনাে বিষয়ে কৌতূহল প্রকাশ করতে আজ আর তার ভাল লাগে না।
রাহেলা দরজায় দুবার টোকা দিয়ে মৃদু গলায় বললেন, আসব ? জবাব পাবার আগেই তিনি পর্দা সরিয়ে আমিন সাহেবের ঘরে ঢুকলেন। আমিন সাহেব তার লেখাটি আড়াল করবার চেষ্টা করলেন। রাহেলা ভান করলেন যেন তিনি এসব কিছুই লক্ষ করছেন না।
আমি আজ সন্ধ্যায় কয়েকজনকে খেতে বলেছি। আমিন সাহেব কোনাে উত্তর দিলেন না।
তুমি টচি থেকে শুটকি মাছ এনে দেবে। শুটকি মাছ পাওয়া যায় ? মাঝে মাঝে যায়।
আমি নিয়ে আসব ?
রাহেলার মনে হলাে আমিন সাহেব অস্বস্তিবােধ করছেন যেন তিনি চান না রাহেলা এখানে থাকে। কিন্তু এরকম মনে করার কারণ কী ? রাহেলা নিজের অজান্তেই বলে ফেললেন, কী লিখছো ?
তেমন কিছু না।
রাহেলা খানিকক্ষণ সরু চোখে তাকিয়ে থেকে দোতলায় চলে গেলেন। দোতলার একেবারে শেষ কামরাটি রুনকির। সে দরজা বন্ধ করে গান শুনছে।
রুনকি দরজা খুলাে তাে মা। রুনকি দরজা খুলে দিল। তার চোখ ভেজা। মনে হলাে সে অনেকক্ষণ ধরে কাঁদছে। কী হয়েছে রুনকি?
Read more