কি করে থাকব বলুন? সবে বডিটা বিছানায় ফেলেছি অমনি মনে পড়ল ঝামেলা আছে। কর্তব্যে গাফিলতি পাবেন না, ছুটে গেলাম।
মীমশাই আমার এখানে এসে নেখালিতে গিয়েছিলেন। ওর সঙ্গে শহর থেকে আনা মাত্র তিনচারটে সেপাই ছিল।’
ম্যাডাম, একথা শুনে আমি লজ্জায় মরে গিয়েছি। কাল থানায় ফিরেই খবরটা শুনে ছুটে এলাম, ততক্ষণে মীমশাই চলে গিয়েছেন। রাত্রে এস ডি ওর কাছে গেলাম। তিনি বললেন আপনার সঙ্গে কথা বলতে।
‘এস ডি ও বললেন আমার সঙ্গে কথা বলতে ?
আজ্ঞে হ্যা ম্যাডাম। হঠাৎ দারােগাবাবুর গলা ভেঙে মিহি সুর বেরিয়ে আসতে লাগল, আমার সার্ভিস বুক দেখুন, কোথায় একটা কালাে দাগ দেখতে পাবেন না। স্বাধীন ভারতবের সব এস পি আমাকে ভাল সি সি রােল দিয়েছেন। কিন্তু মন্ত্রী যদি খচে যান তা হলে সব দফা রফা হয়ে যাবে।
আপনি কি বলতে এসেছেন ? ‘ম্যাডাম, আপনি আমায় বাঁচান। পাচটা মেয়ে আমার, বউটার বয়স কুড়ি, লেট ম্যারেজ, এক বর বাকি আছে রিটায়ারমেন্টের। এখন চাকরি গেলে ধনেপ্রাণে মরব। মেয়ে পাঁচটার বিয়ে এ জীবনে হবে না। মেয়ে হয়ে মেয়েদের বাঁচান।
আপনি আপনার কথা বলছিলেন। ‘আমি মানেই আমার মেয়েরা, আমার ভী। ‘আমি কিভাবে আপনাকে বাঁচাতে পারি ?
সাতকাহন পর্ব-(১৬)
শুনলাম নাকি মন্ত্রীমশাই আপনার বাড়িতে ভাত খেয়েছেন, আমার কথায় তিনি নেখালিতে গিয়েছিলেন। ওঃ, যদি কিছু গােলমাল হত? আমি ভাবতেই পারি না। তাই আপনি যদি ওকে বুঝিয়ে বলেন তা হলে আর আমার কোন ক্ষতি হবে না।’ ‘আনুন আপনি ঠিক শােনেননি। মমশাই ডি এম, এস ডি ওকে পি থেকে নামিয়ে দিয়ে অন নায়কের সঙ্গে শহরে গিয়েছিলেন। আপনি বরং জনের সঙ্গে যান তাতে কাজ হবে। দীপাবলীর এখন কথা বলতে বিয়ে হচ্ছে না।
‘অর্জুন। শালা হারামির হাতবায় ! সরি ম্যাডাম, মুখ ফসকে বেরিয়ে এল। দিনরাত চোরডাকাত ঠ্যাঙাই তাে, মুখের উপর কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেছি। ছােট মাইভ। যাহােক অর্জুনের কাছে গেলে বলবে, তােমাকে আমি বাঁচাতে পারি একটা কণ্ডিশনে। যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন যা মাইনে পাবে তার ওয়ান ফিফথ আমাকে পাঠিয়ে দেবে।
‘ওয়ান ফিফথ কেন ? ‘তার নিচে রাজি হবে না। ‘কিছু মনে করবেন না আপনার বাড়তি রােজগার নিশ্চয়ই আছে ? ‘জলে আছি অথচ সাঁতার জানি না বলা মিথ্যে কথা হয়ে যাবে। তা আছে। কিন্তু এলাকাটা তাে দেখছেন! একেবারে মরুভূমি যাকে বলে ! বাড়তি রােজগার হবে কোখেকে ?
‘আপনি সত্যি কথা বলছেন না। ‘সেন্ট পার্সেন্ট সত্যি।
“ঠিক আছে, মন্ত্রী তাে সরে গিয়েছেন, যেতে যেতে এসব ভূলেও যেতে পারেন। আপনি আগে থাকতেই এত চিন্তা কেন করছেন ?
সাতকাহন পর্ব-(১৬)
‘ঘর পােড়া গরু ম্যাডাম, মেঘ দেখলেই ভয় পাই। ‘তা হলে শুনুন, আমি কিছুই করতে পারব না। ‘পারবেন না ? ফ্যাসফেসে শােনাল দারােগার গলা। ‘না। আর কিছু বলার আছে আপনার? দীপাবলী উঠে দাঁড়াল। ‘ম্যাডাম আমি একদম মরে যাব।’ ককিয়ে উঠলেন দারােগা ।
‘আপনি এস ডি ও কিংবা ডি এমের সঙ্গে দেখা করুন। আমার মত সামান্য একজন কর্মচারী কিছুই করতে পারে না। এবার আপনি যেতে পারেন। ‘ম্যাডাম, আমি জানি কিসে আমার উপকার হবে। ঠিক আছে, আপনাকে একটা প্রস্তাব দিচ্ছি। অপনি পুরুষ হলে অবশ্যই আগেই দিতাম। আপনি আমাকে এ যাত্রায় বাঁচিয়ে দিন আপনার ব্যাপারটা আমি দেখব।’ দারােগা উঠে দাঁড়াল।
‘আমার ব্যাপারটা মানে ? চকিতে ঘাড় ঘােরাল দীপাবলী। ‘মানে, ইয়ে, বুঝতেই পারছেন, ওই যে তখন জিজ্ঞাসা করলেন বাড়তি রােজগারের কথা, হয় না, খুব বেশী হয় না, তবু যা হয়—হেঁ হেঁ, বুঝতেই পারছেন ?
‘আপনি আমার অফিস থেকে বেরিয়ে যান, এখনই। ‘ম্যাডাম।’ ‘আপনি এই মুহূর্তে চলে না গেলে আপনার নামে রিপাের্ট করতে বাধ্য । ‘ও, আচ্ছা। আমি মনে রাখব ব্যাপারটা। কটমট চোখে তাকিয়ে দারােগা বেরিয়ে গেলেন। সমস্ত শরীরটা কাঁপছিল দীপাবলীর। এমনভাবে অপমানিত হতে হবে সে ভাবতেই পারেনি। লােকটার স্পধার কথা ভেবে শরীর জ্বলে যাচ্ছিল।
সাতকাহন পর্ব-(১৬)
দারােগার জিপ চলে যাওয়ামাত্র অক্ষয়বাবুরা ছুটে এলেন। অক্ষয়বাবু দীপাবলীর সামনে বাকিরা দরজায়। অক্ষয়বাবু উত্তেজিত হয়ে বললেন, ম্যাডাম, আপনি এখনই শীকে মানে ডি এমকে জানান। লােকটাকে বিশ্বাস করবেন না।
‘কেন ? এদের উত্তেজনা দেখে অবাক হল দীপাবলী।
‘লােকটা কেউটে সাপের চেয়েও ভয়র। একমাত্র অর্ধন নায়েকের কাছেই ঠা থাকে। ও বুঝে গিয়েছে আপনাকে ভেজানাে যাবে না, এবার ঠিক আপনার ক্ষতি করবে।
‘আমার ক্ষতি ? ওঁর তাে আমার নির্দেশ মেনে কাজ করার কথা। ‘ম্যাডাম কথা কি সবসময় পালিত হয়। তা ছাড়া এমন জায়গায় কিছু হয়ে গেলে আমাদের পক্ষে সামলানাে সম্ভব হবে না। ও কিছু করে ওঠার আগেই ব্যবস্থা নিন।
আপনারা মিছিমিছি ব্যস্ত হচ্ছেন। এটা আমার ওপর ছেড়ে দিন। যান, সময় হয়ে গেছে, রােদও চড়া হচ্ছে, এর পরে বাড়িতে যেতে অসুবিধে হবে। ও হ্যাঁ, অক্ষয়বাবু, এস্টিমেটের ফাইলটা হয়ে গিয়েছে ? ‘হ্যাঁ ম্যাডাম, দিয়ে যাচ্ছি। মুখ গম্ভীর করে ওরা সামনে থেকে সরে গেলেও পাশের ঘরে এই নিয়ে যে গুঞ্জন হচ্ছে তা কানে এল । দীপাবলী ভেবে পাচ্ছিল না তার কোন ক্ষতি দারােগা করতে পারে । একজন সরকারি অফিসার আর একজন সরকারি অফিসারকে বিপদে ফেলার সাহস পাবে কি করে ! অক্ষয়বাবু ফাইলটা দিয়ে গেলে সে তাতে চোখ রাখল ।
সাতকাহন পর্ব-(১৬)
মােটামুটি ঠিকই আছে। একটা শব্দ জুড়ল সে। সতীশবাবু থাকলে এটাও করতে হত না। রিপাের্ট এবং আর্জির নিচে সই করে সে ফাইলটা নিয়েই ভেতরে চলে এল। পিওন দাঁড়িয়েছিল তার যাওয়ার অপেক্ষায়। এবার সে বাইবেব দরজা এবং জানলা বন্ধ করবে। দীপাবলী তাকে বলল, “আমি দুপুরের পর এস ডি ও অফিসে যাব। অক্ষয়বাবুকে বলল সন্ধে পর্যন্ত আমার জন্যে অপেক্ষা করতে। বেলা সাড়ে বারােটাতেও শমিত ফিরল না। সে ফিরলে একসঙ্গে খাবে ভেবেছিল দীপাবলী। অবশ্য এখন যা বােদ বাইরে, তাতে কোন পাগলও ছাতি ছাড়া হাঁটতে চাইবে।
দীপাবলীর মনে হল শমিত যদি কোন ছায়ার নিচে থাকে তা হলে তার একবেলা অভুক্ত হয়ে থাকাও ঢের ভাল কিন্তু এই রােদে আসার অ্যাডভেঞ্চাব করা ঠিক নয়।
সে তিরিকে খেতে দিতে বলল । তিরি বেশ অবাক হয়ে বলল, ‘দাদা আসেনি, তুমি এখনই খেয়ে নেবে ?’
‘দাদাবাবু এই রােদে আসবে না। তা ছাড়া আমাকে একটু বাদে বেরুতে হবে। ‘তুমি এই রােদে বেরুবে ?
থমকে গেল দীপাবলী । দাদাবাবু না আসতে পারলে সে নিজে কি করে যাবে। ঠিক কথা। অথচ এটাই তার মাথায় আসেনি। অতএব সে তিরিকে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলল । জানলা দরজা বন্ধ। তিরি কিছুক্ষণ ঘর বারান্দা করল। তারপর বলল, ‘দাদাবাবু জিজ্ঞাসা করল আমি কোন গ্রামের কথা জানি কি না। দাদাবাবু সেখানে গিয়ে আলাপ করবে আমি আমার গ্রামের কথা বললাম।
সাতকাহন পর্ব-(১৬)
দাদাবাবু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল আমাদের গ্রামে সবাই এমন বাংলা বলে কি না। আমি তাে হেসে বাঁচি না। বললাম গ্রামের লােক গ্রামের ভাষায় কথা বলে। আমি তাে ছােট্টবেলা থেকে এদিকে আসি আর তার ওপর বাবুদের কাছে কাজ করছি তাই আমি এমন বাংলা বলতে পারি। তাই শুনে দাদাবাবু বলল আমি যদি ওকে নিয়ে গিয়ে গ্রামের লােকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই তা হলে খুব ভাল হয়। আমি যে গ্রামে যাব না তা তাে বলতে পারি না তাই মিছে করে বললাম তুমি রাগ করবে গ্রামে গেলে ।
দীপাবলী কিছু বলল না। শুধু তার মনে হল এইসব কথা শমিত তার সঙ্গে আলােচনা করতে পারত। সে ইচ্ছে করলে পিওনকে সঙ্গে দিতে পারত। একটু বাদে বারান্দা থেকে ঘুরে এসে তিরি জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা দিদি, দাদাবাবু কি যাত্রা করে ?
‘যাত্রা ? চমকে গেল দীপাবলী। ‘ওই যে মুখে রঙ মেখে রাম রাবণ সাজে।
Read more
