‘আপনার যদি অসুবিধে না হয় তাহলে বলুন!
আবার কিছুক্ষণ চুপচাপ। শিস শুরু করল অর্জুন। জিপের গর্জনের সঙ্গে শিসের শব্দে মিশে যাচ্ছিল মাঝে মাঝে। শিস থামিয়ে আচমকা অৰ্জুন বলল, ‘নেখালির লােকগুলাের যা সহ্য হয় তা বাইরের মানুষ পারবে কেন?’
চোয়াল শক্ত হল দীপাবলীর । অথাৎ অর্জুনের কিছুই জানতে বাকি নেই ? লােকটাকে এই অঞ্চলের মুকুটহীন রাজা বলা হয়ে থাকে। ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহার এবং ব্যবহার করে মেজাজে আছে। অবশ্য এই ক্ষমতা নিশ্চয়ই সে অর্জন করেছে।
তা সত্ত্বেও কোথায় কি ঘটছে তার খবর চটপট পায় কি করে লােকটা। খবর দেবাব লােকগুলােকে কি অর্জুন কিনে রেখেছে ? দীপাবলী জবাব দিল না। অর্জুন আর কথা বাড়াল না। জিভে শিস বাজাতে বাজাতে জিপ চালাতে লাগল দ্রুতগতিতে। যেন যা বােঝাবাব বুঝিয়ে দিয়ে খুশী হল।
সদর হাসপাতালে শমিতকে ভর্তি করে দেওয়া হলে ডাক্তার বললেন লু লেগে শরীর অসুস্থ হয়েছে। সেই সঙ্গে শরীরের ওপর দীর্ঘদিনের অত্যাচার ছিল। হাসপতালের খাতায় নামধাম লেখানাের সময় অর্জুনপাশে ছিল। ঠিকানার জায়গায় এসে একটুও দ্বিধা না কবে দীপাবলী নিজের ঠিকানা দিল । যে ভর্তি করছে তার সঙ্গে রুগীর সম্পর্কে জায়গায় লিখল আত্মীয়। অর্জুন একটু চুপচাপ দেখল। শহরে আসার পরও অর্জুন তার মুখের আবরণ খােলেনি। যদিও এখানে গরম কম নয় কিন্তু কাউকেই এই বেশে দেখা যাচ্ছে না। অর্জুনের এই নিয়ে কোন ভাবনাই নেই ।
বিকেলের আগে কোন খবর পাওয়া যাবে না শমিতের ব্যাপারে, এই অবস্থায় ওরা হাসপাতালের বাইরে বেরিয়ে এল । অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, ‘ম্যাডাম, এবার তাে আমার চলে যাওয়া উচিত কিন্তু তবু একটা কথা জিজ্ঞাসা করছি !
সাতকাহন পর্ব-(২২)
দীপাবলী তাকাল। খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল সে। ‘বিকেলে ভদ্রলােকের সঙ্গে দেখা করে ফিরবেন কি করে ? ‘ফিরে যাব । অদ্ভুত গলায় জবাব দিল দীপাবলী। অর্জুন বুঝল অবহেলা প্রকট না হলে , এমন গলায় কথা বলা যায় না।
‘আপনি এখন কোথায় যাবেন ? ‘দেখি ! ‘আচ্ছা, চলি, নমস্কার। অর্জুন হঠাৎ যেন ঝাঁকুনি দিয়ে শরীরটাকে চালু করল। সে যখন বেশ কয়েক পা এগিয়ে যাচ্ছে তখন দীপাবলী তাকে ডাকল, ‘শুনুন, একটু দাঁড়িয়ে যাবেন ?
পেছন ফিরল অর্জুন। ওর মুখ যেহেতু দেখার উপায় নেই তাই অভিব্যক্তি বােঝা গেল
ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দীপাবলী কাছে গেল, ‘আপনি অনেক উপকার করেছেন। কি বলে ধন্যবাদ দেব জানি না।
‘ধন্যবাদের দরকার নেই এখন। ঠিক সময়ে ওটা আদায় করে নেব। ‘মানে ? ‘অর্জুন নায়েক সম্পর্কে কিছু তাে জেনেছেন। বিনা স্বার্থে আমি কোন কাজ করি না। এই যে এসব করলাম তার পেছনে কিছু কারণ আছে। | কি কারণ?
‘আপনার হাতে কিছু সরকারি ক্ষমতা আছে। সামান্য হলেও আছে। সেটুকু কাজে না। লাগালে আমার অসুবিধে হতে পারে। অবাক হবেন না, আমার চরিত্র এটাই।
‘আপনি এভাবে বলবেন জানলে আপনার উপকার নিতাম না।’ ‘না নিলে আপনার আত্মীয়কে বাঁচানাে মুশকিল হতাে ম্যাডাম।’ ‘সেটা আমার সমস্যা ছিল।’ “নিশ্চয়ই। তবে মানুষের জীবনের চেয়ে দামী আর কি হতে পারে! ‘সেটাও আমি বুঝতাম। ‘যাক, এখন তাে ভেবে লাভ নেই। আপনি আমার কাছ থেকে উপকার নিয়েছেন এটাই সত্যি। আমি উপকাব চাইলে কি আর না বলতে পারবেন ?
‘কি চান আপনি ? দীপাবলীর মুখে রক্ত জমল।
‘খেতে।’ হেসে উঠল অর্জুন। ‘মানে ?
সাতকাহন পর্ব-(২২)
“সকালে এক কাপ চা আব দুটো বিস্কুট খেয়েছিলাম। এখন দুপুর শেষ হতে চলেছে। (পেটে কিছু নেই। খাওয়াবেন ?
‘আমি আপনাকে বুঝতে পারছি না !
‘আমিও নিজেকে বুঝতে পারি না বেশীর ভাগ সময়। সেই চেষ্টাও আর করি না। কিন্তু খিদে বা শরীরে ব্যথা পেলে বেশ টের পাই। আপনিও তাে সকাল থেকে কিছু খাননি। না খেয়ে থাকলে ওই ভদ্রলােকের অসুখ যদি সেরে যায় তাহলে অবশ্য অন্য কথা।’ অর্জুন সেই হাসিটা হাসল। | ঠোঁট কামড়ালাে দীপাবলী। লােকটাকে খাইয়ে দিলে যদি দায়মুক্ত হওয়া যায় তালে সেটা এখনই করা উচিত। সে বলল, “আমি এখানকার কিছু জানি না, কোথায় ভাল খাবার পাওয়া যায় বলুন।
অর্জুন বলল, ‘আসুন। জিপে ওঠার সময় একটু ইতস্তত করছিল দীপাবলী । অর্জুন বলল, “ম্যাডাম, আপনি যদি কিছু মনে না করেন তাহলে পেছনে বসুন।
‘কেন ? চমকে উঠল দীপাবলী। তার মনের কথা লােকটা টের পেল ?
‘আমার পাশে আপনাকে জিপে দেখলে চেনা পাবলিক গল্প তৈরী করবে। পচা আলুর পাশে থাকলে ভাল আলুও নষ্ট হয়ে যায়।
দীপাবলী ড্রাইভারের পাশে সিটে উঠে বসল। বসে বলল, “আমি যতক্ষণ অন্যায় না করছি ততক্ষণ বদনামের ভয় করি না।
অর্জুন কথা না বলে ইঞ্জিন চালু করল । শহরের ঠিক মাঝখানে একটা সিনেমা হলের পাশে জিপ দাঁড় করিয়ে বলল, “আপনি একটু বন আমি আগে দেখে আসছি। সে নেমে গেল।
রাস্তাঘাট এখনও শূন্য। সম্ভবত ছায়া না ঘনালে কেউ ঘর থেকে বের হয় না। দীপাবলীর হঠাৎ মনে হল ডি এম এই শহরে আছেন। নেখালির ব্যাপার নিয়ে যে পরিকল্পনা সে গতকাল এস ডি ওর অফিসে রেখে এসেছিল তা কি তিনি আজ ডি এমের অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছেন ? মন্তব্যসহ পাঠানােটাই নিয়ম। একবার খোজ নিলে ভাল হয়। ডি এম জানলে ওগুলাে রাইটার্স বিল্ডিং-এ তাড়াতাড়ি পৌঁছাবে।
সাতকাহন পর্ব-(২২)
অর্জুন বেরিয়ে এল হােটেল থেকে। জিপের পাশে এসে বললে, ম্যাডাম, কপাল মন্দ
বলে মনে হচ্ছে। এদের লাঞ্চ শেষ। মিষ্টিটিষ্টি খেয়ে ম্যানেজ করা যেতে পারে।
‘আপনি খাবেন। ‘না ম্যাডাম, স্বভাব ব্রত-উদযাপন নেই। ‘ব্রত উদযাপন ? ‘ওই বিধবা মহিলারা যা করে থাকেন। * তাহলে তাে আপনাকে খাওয়াতে পারছি না আমি। যা করছেন তার জন্যে আবার ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি নামছি। দীপাবলী জিপ থেকে নেমেই দেখতে পেল একটা রিক্সাওয়ালা রিক্সা নিয়ে সিনেমাহলের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে । অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনাকে আমিই হাসপাতালে পৌঁছে দিতে পারতাম ! | ‘আমি হাসাপাতলে নয়, ডি এমের অফিসে যাচ্ছি। দীপাবলী এগিয়ে গেল।
- ডি এমের অফিসে পৌছাতেই বড়বাবু তাকে সসম্রমে বসতে বলে জানালেন, স্যার মিটিং করছেন। খবর দিচ্ছি। কিন্তু আপনার কি হযেছে ?
‘আমার ? কেন ? ‘খুব রুক্ষ লাগছে।মনে হচ্ছে ঝামেলার মধ্যে আছেন । ‘তা আছি । কিসের মিটিং ? ‘শান্তি শৃঙ্খলা নিয়ে। কমুনাল দাঙ্গা বাধার চান্স আছে। আমাকে হুকুম দিয়েছেন কেউ যেন বিরক্ত না করে। আপনার নেখালির কাগজপত্র আমরা পেয়েছি।
‘বাঃ। কুইক কাজ কবছে সবাই।
‘কিন্তু কোন লাভ হবে ন!’ বড়বাবু কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। অর্জুন নায়েক ঢুকছে পান চিবােতে চিবােতে। দীপাবলীকেই চেনেই না এমন ভঙ্গীতে বড়বাবুকে জিজ্ঞাসা করলাে সে, সাহেব কোথায় ? ভেতরে ? বড়বাবু মাথা নড়তেই সে হেলতে দুলতে ডি এমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে গেল সাবলীল ভঙ্গিতে।
দীপাবলী তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। একজন সরকারি অফিসার যেখানে তার বসের সঙ্গে দেখা করতে বসে থাকে সেখানে একজন সাধারণ ব্যবসায়ীকে এই প্রশ্রয় দেওয়া হয় কি করে ? সে বড়বাবুব দিকে রাগত চোখে তাকাল। তিনি মাথা নেড়ে বসতে বললেন, ‘এই লােকটির জন্যে আপনার নেখালির পরিকল্পনা কার্যকর হবে না। বুঝলেন ?
সাতকাহন পর্ব-(২২)
দীপাবলী বসে পড়ল, “আপনি কি বলছেন ?’ বড়বাবু চারপাশে তাকিয়ে গলা নামালেন, ‘আমি বলেছি একথা সাহেবকে বলবেন না। আপনাদের এলাকায় উনি যা চাইবেন তাই হবে, যা চাইবেন না। মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলেন ভদ্রলােক। দীপাবলী বিশ্বাস করতে পারছিল না।
“কি থেকে মনে হচ্ছে ওর জন্যে সব বানচাল হয়ে যাবে ? “আর আমাকে দিয়ে বলাবেন না। সাহেব জানলে চাকরি চলে যাবে। কিন্তু আমাকে একটা কিছুর আভাস দিন।
‘গতকাল ভদ্রলােক এসে সাহেবের সঙ্গে কথা বলে যাওয়ার পর তিনি আমাকে বলেছেন নেখালির ফাইলটা কিছুদিন আটকে রাখতে। গরীব মানুষগুলাের উপকার করতে চেয়েছিলেন কিন্তু কি আর হবে। এদিকে পাবলিসিটি যা হবার হয়ে গিয়েছে। ‘পাবলিসিটি ? হাঁ হয়ে গেল দীপাবলী।
মন্ত্রী আপনার অনুরােধ সব কাজ ফেলে বহুদূর পথ পাড়ি দিয়ে নেখালি গ্রামে গিয়ে নিজের চোখে গরীব মানুষদের কষ্ট দেখে এসেছেন এ খবর তাে সব কাগজেই ছাপা হয়েছে।
খবরের কাগজ জানল কি করে ? ‘তা আমি জানব কি করে বলুন ?’
‘যাক, যত দিন যাচ্ছে তত অভিজ্ঞতা বাড়ছে আমার। আপনি একটু ডি এমকে খবরটা দিন। বিরক্ত গলায় বলল দীপাবলী ।। | বড়বাবু উঠে ডি এমের ঘরে ঢুকে গেলেন। গরমে নয়, রাগে শরীর জ্বলছিল দীপাবলীর। মন্ত্রীমশাই নিজে তাকে যে কথা নিয়ে গিয়েছেন তা উল্টে যায় কি করে ? বড়বাবু বেরিয়ে এলেন, “আর দু মিনিট অপেক্ষা কবতে বললেন উনি।
‘এখনও কি মিটিং চলছে ? ‘্যা।। ‘অর্জুন নায়েকের সামনেই ? ‘হ্যা, উনি ডি এমকে কথা দিয়েছেন ওঁর এলাকায় কোন গােলমাল হবে না।’ ‘ওঁর এলাকা মানে ?’ ‘আপনার অফিসিয়াল জুরিসডিকসনই ওঁর এলাকা।
সাতকাহন পর্ব-(২২)
দীপাবীর ইচ্ছে করছিল এখনই এই অফিস থেকে বেরিয়ে যেতে। তারপরই মনে হল সেটা করে কোন লাভ হবে না । রাইটার্স বিল্ডিংসের সঙ্গে যাবতীয় যােগাযােগ তাকে এই অফিসের মাধ্যমেই কবতে হবে। ডি এম হলেন একটি জেলার ঈশ্বর। তাঁর সঙ্গে বিরােধ করে জেলায় বসে কাজ করা অসম্ভব। অতএব লােকটিকে বােঝাতে হবে।
| এই সময় পিওন এসে দীপাবলীকে জানাল ডি এম তার সঙ্গে দেখা করতে চান ? ওঠার সময় বড়বাবু আবার নিচু গলায় বললেন! এসব কথা সাহেবকে বলবেন না, অ্যা ? | দীপাবলী কোন কথা না বলে এগিয়ে গিয়ে ডি এমের ঘরে ঢুকল, ‘আসতে পারি ? টেবিলের উল্টো দিকে বসা অর্জুন নায়েককে কিছু বলতে বলতে পাইপ ধরাচ্ছিলেন ডি এম, চোখ ফিরিয়ে মাথা নাড়লেন। ধরানাে হয়ে গেলে বললেন, ‘বসুন।
পর পর চারটি চেয়ার । অর্জুনের সঙ্গে দুই চেয়ারের ব্যবধান রেখে দীপাবলী বসল। অর্জুন এমন ভঙ্গিতে ডি এমের মাথার পেছনে টাঙানাে মহাত্মা গান্ধীর ছবির দিকে তাকিয়ে আছে যেন কস্মিন কালেও তার সঙ্গে পরিচয় ছিল না।
ডি এম ধোঁয়া ছেড়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কি ব্যাপার ? আপনি এখানে ?
একটু স্বস্তি পেল দীপাবলী । তাহলে কি অর্জুন শমিতের অসুস্থতার কথা ডি এমকে বলেনি। বললে অনেক কথাই বলতে হতাে। সে বলল, আমি একটা প্রপােজাল পাঠিয়েছিলাম গ্লু প্রপার চ্যানেল, যদি ওটা তাড়াতাড়ি রাইটার্সে পৌঁছায় তাহলে ভাল হয়।
‘কোন প্রপােজালের কথা বলছেন বলুন তাে ? ডি এমের চোখ ছােট হল। এগুলাে ন্যাকামি চটে গেল দীপাবলী। সে রােজ গাদাগাদা প্রপােজাল পাঠায় না। না জানার কোন কারণ নেই ভদ্রলােকের। তবু গলার স্বর ভদ্ৰস্তরে রেখে সে জবাব দিল, ‘নেখালি এবং আশেপাশের গ্রামগুলাের জন্যে মিনিস্টার যেসব স্টেপ নিতে বলেছিলেন সেগুলাের কথা বলেছি। | ‘ও, তাই বলুন। ঠিক আছে, আপনি তাে পাঠিয়েছেন, আমি দেখছি। কিন্তু এই কারণে এমন গরমে আপনার আসার দরকার ছিল না।’
সাতকাহন পর্ব-(২২)
দীপাবলী কি বলবে বুঝতে পাবছিল না। এই ভদ্রলােক সেদিন মন্ত্রীব সামনে তার সঙ্গে একদম অন্যবকম ব্যবহার করেছিলেন। ইনি যদি এখন বলেন দেখছি, তাহলে তার আব কিছু কাব থাকে না। এবার ডি এম অর্জুনের দিকে তাকালেন, আপনি তাে সেদিন বললেন নেখালিতে কুযযা খুঁড়িয়ে দিচ্ছেন। ওদেব তত প্রব্লেম জলেব। সেটা মিটে গেলে
তাে অনেক সমস্যা সহজ হয়ে যাবে।
অৰ্জুন বসেছিল প্রায় শৰীব এলিযে। সেই অবস্থায় বলল, “আজ বিকেলের মধ্যে কুযযা খোঁড়া হয়ে যাবে। কথা দিয়ে না বাখাব অভ্যেস তাে আমার নেই । তাবপব মিনিস্টাব কথা আদায় কবে গিযেছেন।
‘তাহলে তাে চুকে গেল। ডি এম দীপাবলীব দিকে তাকালেন । ‘কি কবে ? শুধু একটা দুটো কুযযা খুঁডলেই সমস্যার সমাধান হয় না। আপনি বােধহয় আমাব পাঠানাে কাগজপত্রে চোখ বাখাব সময় পাননি।
দেখুন মিসেস ব্যানার্জি, সবকাব চালাই আমবা, মিনিস্টাববা নয়। তাঁরা এসে হুটহাট কত কি বলে যেতে পাবেন, কাগজে ছাপা হলে পবেব নির্বাচনে কাজে লাগে। কিন্তু আমবা সেটা করতে পাবি না। মন্ত্রী চলে যাওযাব পব জেলার সব ব্লক থেকে একসঙ্গে যেসব প্রপােজাল এসেছে তা আগামী দশ বছরেও মিটিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। সবাই জল, বিদ্যুৎ, রাস্তা চাইছে। আপনি লাকি কাবণ অর্জুনবাবুব মত একজন ধনী সমাজসেবী আপনার ব্লকে থাকেন। উনি নিজে এগিয়ে এসে যা কবছেন অন্য ব্লকে তাব ওযান পার্সেন্টও হচ্ছে না। আপনি কি মনে কবেন অভাবগুলাে আপনাব ব্লকেই আছে অন্য কোথাও নেই ?
‘আমি সেকথা বলিনি।’ ‘বেশ। কিন্তু এত প্রপােজাল বাইটর্সে পাঠালে মিনিস্টাব আমাকে পাগল ভাববেন । ‘কিন্তু মিনিস্টাব নিজে আমাকে পাঠাতে বলেছিলেন। ‘মিসেস ব্যানার্জী, জেলায় এসে বলা এক আব বাইটাসে বসে বলা সম্পূর্ণ আলাদা। যাক, এ নিয়ে আব বেশী কথা না বলাই ভাল।
সাতকাহন পর্ব-(২২)
‘আমাবটা পাঠাতে আপনি আপত্তি করছেন কেন ?
‘কাবণ কালই আমি সাকুলাব পেযেছি নেক্সট বাজেটেব আগে কোন খাতে নতুন কোন খরচ করা চলবে না। ডি এম আবাব পাইপ ধবালেন, আপনার সঙ্গে এসব কথা আমি নিশ্চয়ই বলতাম না কিন্তু সেদিন মিনিস্টাবের সামনে আপনি যে সাহস দেখিয়েছেন তাবই
অনাবে বললাম।
‘আমি যদি মিনিস্টাবেব সঙ্গে দেখা কবি, অনুমতি দেবেন ? ‘বাইটার্সে গিযে ?’ চমকে উঠলেন ডি এম । মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল দীপাবলী ।। ‘আপনি ক্ষেপেছেন ? না, এই অনুমতি আপনাকে দিতে পাবি না। ‘তাহলে আমি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি তা বাখা যাবে না ? ‘প্রতিশ্রুতি ? কাকে ? যাদের অবিলম্বে সাহায্য দবকাব।
ডি এম হাসলেন, “মিসেস ব্যানার্জী, আপনাব ব্যস কম, সবে চাকবিতে ঢুকেছেন। আপনাব এমনটা মনে হতেই পাবে। কিন্তু দেখুন, আমাদের সবাইকে সীমাবদ্ধ ক্ষমতায় কাজ করতে হয়। যা চাই কখনাে কি পাই ? ঠিক আছে, এবার আপনি আসতে পারেন।
সাতকাহন পর্ব-(২২)
দীপাবলী উঠে দাঁড়াল। এক মুহুর্ত। তাকে ওইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ও
বললেন, ‘ঠিক আছে, আপনার কথা আমার মনে থাকবে। সুযােগ পেলেই যাতে একটা কিছু ব্যবস্থা করা যায় সেই চেষ্টা করব।
দীপাবলী আর দাঁড়াল না। ঘরের বাইরের আসামাত্র বড়বাবু তাকে থামালেন, স্যারকে কিছু বলেননি তাে ?
না। আপনি আমার প্রপােজালটা ফেরত দিন তাে। মাথা নাড়লেন ভদ্রলােক, তা কি করে হয়। এখন তাে ওগুলাে সরকারি কাগজ সাহেবের অনুমতি না পেলে আমি ফেরত দিতে পারি না।
দীপাবলী আর দাঁড়াল না। তার শরীর জ্বলছিল। মধ্যাহ্নের সূর্যতাপ এতটা জলনি ছড়ায়নি। শুধু সে বুঝতে পারছিল না তার কি করা উচিত ।
হাসপাতালে পৌছে একটা ভাল খবর পাওয়া গেল। শমিতের চেতনা ফিরেছে। এ যাত্রায় আর বিপদ নেই। সিড়ির মুখে দাঁড়িয়ে নার্স খবরটি দিয়ে বলল, “আচ্ছা দিদি, আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করব ?
ঘাড় বেঁকিয়ে দীপাবলী বলল, “কি ব্যাপারে ? ‘আপনি একা মেয়ে, সরকারি অফিসারি করতে অসুবিধে হয় না ? ‘অসুবিধে! কেন ?
সাতকাহন পর্ব-(২২)
না, মানে, আমি তাে সামান্য নার্সের চাকরি করি, তবু কত রকম ঝামেলায় পড়তে হয়। আমার বাড়িতে স্বামী ছেলে মেয়ে আছে তবু পুরুষগুলাে নাছােড়বান্দা। আপনি কেমন করে এত সাহস পান?
‘আমার সম্পর্কে আপনি জানলেন কি করে ?
‘কাগজে পড়েছি। ওই মন্ত্রীর সঙ্গে ঘটনাটা। তারপর শহরে সবাই এ নিয়ে আলােচনা করেছে। আজ যখন আপনি পেশেন্টকে ভর্তি করতে এলেন তখন তাে জানাজানি হয়ে গেল। পেশেন্টই বলল আপনি একা থাকেন। বড় চোখে মহিলাটিকে দেখল দীপাবলী। আদৌ সুন্দরী নন। বয়স মধ্য তিরিশে। এ চাকরি করতে এসে সেই চিরন্তন সমস্যায় পড়েছেন। সে বলল, এসব সমস্যা তাে একদিনে চলে যাবে না ভাই। তবে আপনি যদি পাত্তা না দেন তাহলে ওদের ধৈর্য একসময় ভেঙে যাবেই।
নাসটি আর কথা না বলে সরে দাঁড়াল। বােঝা গেল দীপাবলীর এই যুক্তি তার পছন্দ হচ্ছে না। দীপাবলী আর বাঁড়াল না।
শমিত চোখ বন্ধ করে শুয়েছিল। মুখের চেহারা সামান্য বদলালেও অসুস্থতা পুরােদমে রয়েছে । টুলটা টেনে নিয়ে পাশে বসতেই চোখ মেলে তাকাল। তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করল।
দীপাবলী জিজ্ঞাসা করল, কেমন লাগছে।
ফাইন। গলার স্বর খুব দুর্বল। ‘এরকম কেন করলেন ? ‘ইচ্ছে হল, তাই। ‘এটা তাে আত্মহত্যা করার চেষ্টা। ‘রােজ রােজ একই নিয়মে চলতে ভাল লাগছিল না।
দীপাবলী কিছু বলল না। খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। শমিত বলল, এখানে আমাকে আনতে খুব কষ্ট করতে হয়েছে ?
সাতকাহন পর্ব-(২২)
হয়েছে। কিন্তু এখান থেকে সুস্থ হয়ে আপনি কোথায় যাবেন ? ‘মানে বুঝলাম না। শমিতের চোখে বিস্ময়। দীপাবলী মাথা নাড়ল, ‘আমার ওখানে আপনার নিশ্চয়ই অসুবিধে হচ্ছে। আর আপনি যে জীবন চাইছেন তা মেনে নিতে আমি সক্ষম নই।’
শমিত বলল, আমি কিরকম জীবনযাপন করলে তুমি খুশি হও ? ‘আমার খুশীর জন্যে আপনাকে কিছু করতে হবে না।’
কিন্তু শব্দটা উচ্চারণ করেই থেমে গেল শমিত। তার চোখ বন্ধ হল । ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট হল মুখে। ফিসফিস করে বলল, ‘পরে কথা বলব।
দীপাবলী চুপচাপ বসে রইল। তার মনে পড়ল এই মানুষটি কোন একদিন মাযাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল যাদবপুরে যখন সে প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে একা পড়েছিল। না, শমিতের প্রতি সে কৃতজ্ঞ নানান কারণে। কিন্তু ভালবাসা কি কখনও কৃতজ্ঞতা থেকে জন্মায়। কৃতজ্ঞতা মানুষকে নম্র করে, হয়তাে সেই নম্রতা সইতে শেখায়। সয়ে গেলে একসময় ভালবাসা তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু তার জীবনে তৈরী হবার মুখে যে আঘাত এসেছিল তাতে কোন কিছু স্থির হয়ে দাঁড়ায়নি। হ্যাঁ, এখনও সে কৃতজ্ঞ। কিন্তু একজীবনে এই কৃতজ্ঞতার দাম আর কত দিয়ে যেতে হবে ?
সাতকাহন পর্ব-(২২)
অবশ্য একথাও ঠিক, আজ শমিতের শরীরের যা অবস্থা তাতে তার উচিত হয়নি এইসব কথা তােলা। প্রচণ্ড অসুস্থ মানুষ যত চেষ্টা করুক না কেন বেশিক্ষণ মস্তিষ্ক সাবলীল রাখতে পারে না। সে ঘড়ি দেখল । শমিত চোখ বন্ধ করে স্থির । একজন নতুন নার্স এল এই সময়। মেয়েটি দীপাবলীর দিকে একবার তাকিয়ে শমিতের পাল্স দেখল। তার কপালে রেখা ফুটল। তারপর দ্রুত চলে গেল অন্য ঘরে। | তবে কি শমিতের শরীর আবার খারাপ হল ? হঠাৎ নিজেকে খুব অপরাধী বলে মনে হতে লাগল দীপাবলীর। এখন যদি ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে জানতে চান তার সঙ্গে শমিতের কি কথা হয়েছিল তাহলে সত্যি কথা বলতে পারবে সে ? আচমকা যেন নিজেকে ভিলেন বলে মনে হচ্ছে। দীপাবলী উঠে দাঁড়াল। তারপর নিচু গলায় বলল, ‘আমি যাচ্ছি, আবার আসব।’
চোখ বন্ধ করেই শমিত মাথা নাড়ল। ভঙ্গীটার অর্থ স্পষ্ট হল না। দীপাবলী ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতেই বরান্দায় নার্সটিকে দেখতে পেল, ব্যস্ত পায়ে ফিরছে। সে বলল, “আচ্ছা, ওর কন্ডিশন কি ভাল নয় ?
‘আমি বলতে পারব না। ডাক্তারবাবুর সঙ্গে দেখা করুন। নার্সটি চলে গেল।
এক মুহূর্ত ভাবল দীপাবলী । যতই অন্যায় সে করে থাকুক শমিতের ব্যাপারটা সঠিক না জেনে ফিরে গেলে স্বস্তি পাবে না। সে খুঁজে খুঁজে ডাক্তারদের ঘরে পৌছাল । জিজ্ঞাসা করে নির্দিষ্ট ডাক্তারের সামনে দাঁড়িয়ে একই প্রশ্ন করল সে।
সাতকাহন পর্ব-(২২)
ডাক্তার বললেন, ‘একটু আগে তাে খুব ভাল প্রগ্রেস করছিলেন। নার্স বলে গেল পালাবি গােলমাল করছে। যাচ্ছি আমি একটু বাদে।
এর জন্যে খুব খারাপ কিছু হতে পারে কি ? কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করল দীপাবলী। মনে হয় না। আসলে আমার মনে হয় উনি একটু এক্সাইটেড হয়ে গিয়েছিলেন। ‘কেন ?
Read more
