কথা বলতে বলতে।
‘একটি অসুস্থ মানুষের সঙ্গে এমন কী কথা বললেন যাতে সে এক্সাইটেড হতে পারে ? ‘সরি ডাক্তার, ব্যাপারটা খুব সামান্য ভেবেছিলাম আমি। ‘আপনার কি, আই মিন আপনি ওঁর আত্মীয় ? ‘না। আমরা বন্ধু। কলকাতায় একটা সম্পর্ক ছিল। এখানে হঠাৎ এসেছিলেন। ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’ ‘আমি যাচ্ছি। আমার ঠিকানা এখানে দেওয়া আছে। যদি কিছু দরকার হয়। ‘নিশ্চয়ই। তবে তেমন কিছু না হলে খবব যাবে না । আর হ্যাঁ, আগামীকাল এলে যদি ওই বিষয় আপনাদের আলােচনা ওঠে তাহলে না এলেই ভাল।
দীপাবলী মাথা নেড়ে বেরিয়ে এল। এখন বিকেল । ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলার পর মন সামান্য হালকা হয়েছে। কিন্তু এখনই বাসস্ট্যান্ডে না পৌঁছালে ফেরার বাস পাওয়া যাবে । শেষ বাসের ছাড়ার সময় হয়ে গিয়েছে। এই শহরে একা রাত্রে থাকার জায়গা পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়বে।
হাসপাতালের গেটের বাইরে আসতেই সে থমকে দাঁড়াল। জিপের গায়ে হেলান দিয়ে অর্জুন দাঁড়িয়ে হাসছে, ‘চলুন ম্যাডাম, রথ হাজির।
‘আমি বাসে যাব।
তাহলে চলুন বাসস্ট্যাণ্ডে পৌঁছে দিই। ‘আমি রিক্সা নেব। ‘তাহলে বাস মিস করবেন। দীপাবলী কোন জবাব না দিয়ে একটা রিক্সাকে ডাকল। তাকে রিক্সায় উঠতে দেখে অর্জুন বলল, আমি আধ ঘণ্টা এখানে আছি । যদি বাস না পান তাহলে ফিরে আসতে পারেন। কোন সঙ্কোচ করবেন না। দীপাবলী রিক্সাওয়ালাকে দ্রুত চালাতে বলল।
সাতকাহন পর্ব-(২৩)
প্রায় ঝড়ের মত উড়ে এসে দীপাবলী আবিষ্কার করল অর্জুনের কথাই ঠিক। শেষ বাস মিনিট পাঁচেক আগে বেরিয়ে গিয়েছে। কাল সকালে সেটি ফিরে এলে আবার দিনের প্রথম বাস হয়ে রওনা হবে। প্রচণ্ড ফাঁপরে পড়ল সে। নানান ভাবনা মথায় আসছিল। তিরি না হয় সামলে নেবে একটা রাত। কিন্তু অনুমতি ছাড়া ব্লকের বাইরে রাত্রিবাস ঠিক নয়।
সে অবশ্য ডি এমকে সমস্যার কথা বলতে পারে। ভদ্রলােক ইচ্ছে করলে তাকে একটা গাড়ি দিতে পারেন নয়তাে সার্কিট হাউসে রাতের থাকার ব্যবস্থা হতে পারে। কিন্তু আজ যে ব্যবহার পেয়েছে সে তাতে এই কৃপাটুকু নিতে মন চাইল না। খুব ছােট হয়ে যাবে নিজের কাছে।
সরকারি কাজে এলে অশ্য এরকম মনে হত না। অথচ অর্জুন নায়েকের কাছে সাহায্য চাইতে খারাপ লাগছে। বরং একটা ট্যাক্সির চেষ্টা করলে কেমন হয় ? অনেক টাকা খরচ হবে, তবু । দীপাবলী সেই চেষ্টাই করল । স্ট্যান্ডে একটি ট্যাক্সি দাঁড়িয়েছিল। তার ড্রাইভার জুল জুল করে তাকে দেখল, ‘অদুর একা যাবেন ?
‘যেতে যেতে রাত হয়ে যাবে। ‘আমি একজন সরকারি অফিসার। ‘অ। তাহলে অন্য ট্যাক্সি দেখুন। ‘মানে ? “অতটা পথ নির্জনে অন্ধকারে আপনার মত একটা মেয়েছেলেকে একা পেলে কি করতে কি করে ফেলব, মানে মাথা তাে ঠাণ্ডা থাকবে না, তারপর বিপদে পড়ে যাব। সরকারি অফিসার বলছেন যখন তখন তাে ফাঁসিয়ে দেবেন ? অত্যন্ত নির্লিপ্তভাবে কথাগুলাে বলল লােকটা, বলে ফিরে গেল।
সাতকাহন পর্ব-(২৩)
বজ্রপাত হলেও এর চেয়ে ভাল হত। দীপাবলী নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল । লােকটা তার মুখের ওপর এমন কথা বলে যেতে পারল ! পায়ে পায়ে সে চলে এল রিক্সর কাছে। বলল, “হাসপাতালে চল।
চলন্ত রিক্সায় বসে তার অন্য চিন্তা হল । এই ট্যাক্সি ড্রাইভার লােকটি মানুষ হিসেবে যত খারাপ হােক ওর মধ্যে সততা আছে। অন্তত সত্যি কথা বলতে দ্বিধা করেনি। নিজের পাশব ছবিটাকে খুব ভাল করে দেখা এবং সে যে নিজেকে বিশ্বাস করে না তা অকপটে জানিয়েছে। এমনটা কজন মানুষ করে ?
জিপের সামনে রিক্সা থেকে নামতেই অর্জুন জিপে বসেই ডাকল, ‘চলে আসুন, আর দেরি করা যাবে না।
খুব খারাপ লাগছিল। পেছনের সিটে বসার কোন যুক্তি নেই, দীপাবলী জিপে উঠে মুখ ঘুরিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড স্পীড তুলে অর্জুন, ‘সাতটার আগে পৌঁছাতে পারি কিনা দেখি।
দীপাবলী রঙ আঁকড়ে ধরল। শহরের মধ্যে দিয়ে এঁকে বেঁকে জিপ চালাচ্ছে অর্জুন। চালাতে চালাতে বলল, ‘শমিত বাবু দিন তিনেকের আগে ছাড়া পাবেন বলে মনে হয় না। ডাক্তারকে বলে এলাম যা খরচাপত্তার হাসপাতালের অ্যাকাউন্টে করতে, পরে দাম চুকিয়ে দেওয়া যাবে।
সাতকাহন পর্ব-(২৩)
দীপাবলী নিঃশ্বাস বন্ধ করল এক মুহূর্ত, কিছু বলল না। ‘আপনি চলে আসার পর ওর কন্ডিশন খারাপ হয়েছিল । ডাক্তার বললেন, টেনশনে। এসব আবার আমি বুঝিটুঝি না। টেনশন আবার কি ! যা হবার তা হবে, যা হবে না তা হবে । এ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কি লাভ।
দীপাবলী কোন কথা বলল না। তার মনে হল অর্জুন জেনেশুনে তাকে পরীক্ষা করতে চাইছে। তার যাওয়ার সঙ্গে শমিতের টেনশন জড়িয়ে আছে। এটা সে জানে এবং তাই জানাচ্ছে। এই লােকটাই ডি এমের ঘরে পাথরের ম3 চুপ করে বসেছিল। তার সঙ্গে যে একই জিপে শহরে এসেছে তা তখন বােঝার উপায় ছিল না। মানুষ কত অদ্ভুত চরিত্রের
শহর ছাড়িয়ে জিপ তখন ফাঁকা মাঠের ভেতর দিয়ে ছুটছে। আকাশ লালে লাল। সূর্য ডুবছে। ওদিকে তাকাবার অবকাশ নেই দীপাবলীর। সে কোনমতে জিপের রড আঁকড়ে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করছিল। কিন্তু একসময় সে না বলে পারল না, “প্লিজ একটু আস্তে চালান।
সাতকাহন পর্ব-(২৩)
‘আস্তে চালালে আপনার সঙ্গে আমার সম্পর্ক খারাপ হবে। গলা তুলে বলল অর্জুন, “নিশ্চয়ই আমার সম্পর্কে অনেক গল্প শুনেছেন, নিজের চোখে আর নাই বা দেখলেন! | ধক করে উঠল হৃৎপিণ্ড। এই ফাঁকা রাস্তায় অর্জুন যদি তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে তাহলে সে কি কিছু করতে পারবে ?
অশিক্ষিত ট্যাক্সির ড্রাইভার যা বলতে পারল অর্জুন ততা তাই করতে পারে। অন্তত তিরির কাছে অর্জুনের যে গল্প শুনেছে তা তাই সমর্থন করে। এই সময় আকাশে ওঠার জন্যে পৃথিবীর বুক ফুড়ে অন্ধকার মাথা তুলল। জিপের হেডলাইট জ্বেলেছে অর্জুন। অন্ধকার চিরে আরও রহস্য বাড়িয়ে তুলেছে সে দুটো। রাস্তা ভাল নয়। দ্রুত গতির জন্যে আরও লাফাচ্ছিল জিপ। দীপাবলী আর পারল না, প্লিজ একটু
স্পীড কমান।
স্পীড কমল। এখন তবু বসা যায়। দীপাবলীর মনে হচ্ছিল, এ যেন অনন্ত পথ। কিছুতেই ফুরােচ্ছে না। অন্ধকার পৃথিবীর চেহারা সর্বত্র একই রকম হয়ে যায়। কোন চিহ্ন চোখে না পড়ায় বােঝাই যায় না কতদূর বাকি আছে পথ শেষ হতে। অর্জুন কোন কথা বলছে না। আড় চোখে সে দেখল ঘন ঘন ঘড়ি দেখছে অর্জুন। হঠাৎ একসময় জিপ থামিয়ে ফেলল লােকটা, ‘নাঃ আর পারলাম না। সরি ম্যাডাম !
সাতকাহন পর্ব-(২৩)
‘মানে ? আঁতকে উঠল দীপাবলী । জিপ থামাবার কোন কারণ খুঁজে পেল না সে। অর্জুন তখন হাত বাড়িয়ে পেছন থেকে একটা ব্যাগ সামনে টেনে নিয়ে বলল, ‘সাতটা বাজলেই আমার শরীর বিদ্রোহ করে। তখন তাকে ঠাণ্ডা করতে পেটে কিছুটা জল ঢালতে হয়। রঙিন জল । ভেবেছিলাম সাতটার আগেই আপনাকে পৌঁছে দিতে পারব কিন্তু আপনি বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেরি করিয়ে দিলেন। অতএব এখন কোন উপায় নেই, আপনি যা ভাববেন ভাবুন, কি করা যাবে !
এই জিপের ভেতর কোন আলাে নেই। যেহেতু হেডলাইট জ্বেলে রেখেছে অর্জুন তারই চুয়ানাে আলােয়া অন্ধকারে ফিনফিনে হয়ে গিয়েছিল। শক্ত মুখে বসে দীপাবলী দেখল অর্জুন একটা বােতল বের করে সবাসরি গলায় ঢালল। ভক করে নাকে এল গন্ধ। তীব্র গা গােলানাে ! মুখ ঘুরিয়ে নিতে নিতে কানে এল অর্জুনের সমস্ত শরীর মন্থন করে একটি শব্দ ছিটকে এল, “আঃ!’
সে কি করবে এখন। এই নির্জনে রাস্তায় ঘন অন্ধকারে জিপ থেকে নামে কোথায় যাবে ? একটা লম্পট মানুষ তার পাশে বসে মদ্যপান করছে। সম্ভবত সন্ধে সাতটা বেজে গেলেই ওর মদের প্রয়ােজন। কিন্তু তাই কি : অর্জুনের সঙ্গে বাত্রেও সে কথা বলেছে এর আগে। কখনই তাকে মাতাল বলে মনে হয়নি অথবা মদের গন্ধ পায়নি।
সাতকাহন পর্ব-(২৩)
অবশ্য মদ খাওয়ার পরেও নিজেকে স্বাভাবিক রাখার প্রক্রিয়া যদি ওর জানা থাকে তাে আলাদা কথা। কিন্তু সে স্বাভাবিক ছিল এটাই সত্যি । এখন একটা পরিবেশ তৈরী করার জন্যে ফাঁকা মাঠে হেডলাইট জ্বালিয়ে অর্জুন মদের বােতল খুলে বসেছে। লােকটা সবসময় সঙ্গে মদ রাখে ? তিরির কথাই ঠিক।
শব্দ হল। দীপাবলী দেখল বােতল হাতে অর্জুন নেমে যাচ্ছে জিপ থেকে। কোথায় যাচ্ছে ? কি মতলব ? এই সময় সে পা সরাতেই কিছু একটা ঠেকল। মুখ নামিয়ে হ্যাভেলটাকে দেখতে পেল। লােহার। হঠাৎ একধরনের নিরাপত্তাবােধ ফিরে এল তার। অর্জুন যদি আক্রমণ করে তাহলে প্রতিরােধ করবে সে। ওই লােহার হ্যান্ডেলটাকে তুলে নিতে একটুও দেরি করবে না সে।
বােতল হাতে অর্জুন ততক্ষণে হেডলাইটের আলােয় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে অজস্র পােকা উঠে এসেছে মাঠ থেকে আলাের বৃত্তে তারা পাক খাচ্ছে। হয়তাে জীবনে এতক্ষণ স্থির হয়ে থাকা আলাে তারা এর আগে কখনও দ্যাখেনি। অর্জুন হাত নেড়ে তাদের সরাবার চেষ্টা করে বােতলের মদ গলায় উপুড় করল। ঠোঁট কামড়ালে দীপাবলী। এখনই মাতাল হয়ে যাবে লােকটা। মাতাল অবস্থায় যদি তাকে আক্রমণ নাও করে তাহলে গাড়ি চালাবে কি করে। যেকোন মুহুর্তেই আকসিডেন্ট ঘটিয়ে ফেলতে পারে।
সাতকাহন পর্ব-(২৩)
হঠাৎ একটা কাণ্ড করে ফেলল দীপাবলী। করার আগে বিন্দুমাত্র ভাবেনি। জিপ থেকে নেমে সটান সে চলে গেল অলাের বৃত্তে, অর্জুনের সামনে গিয়ে গলা তুলে বলল, “অনেক হয়েছে, এবার থামুন।
অর্জুন হাসল, ‘ভয় পাচ্ছেন, না, আমি মাতাল হব না।’ ‘আমাদের ফিরে যেতে হবে।’ ‘ফিৰব । দশ মিনিট দেরি হবে। ‘আপনি কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন।’ ‘আমি আগেই ক্ষমা চেয়ে নিয়েছি ম্যাডাম। চা খেতেও তাে জিপ থামাতে পারতাম। পারতাম না ?
‘একজন ভদ্রমহিলাকে আপনি সম্মান জানাচ্ছেন না ! ‘দূর মশাই। সম্মান টুম্মান সব নিজেব তৈরী কবা। ও নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। আমি অসুস্থ হচ্ছিলাম। মদ খেয়ে সুস্থ হলাম। বােতলটা খালি কবে ছুঁড়ে ফেলে দিল সে অন্ধকার মাঠে । তারপর তরতাজা হাসল, চলুন ম্যাডাম ।।
বাকি পথটুকু চুপচাপ কেটে গেল। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে জিপ থামাল অর্জুন, ‘আমি এখান থেকেই ফিরব।’
দীপাবলী কোন কথা না বলে নামতে যাচ্ছিল অর্জুন সেই হাসিটা হাসল, আপনাকে এখানেই নামিয়ে দিচ্ছি কেন জানতে চাইলেন না ?’
‘আপনার নিশ্চয়ই অসুবিধে আছে।’
‘আমার নয়, আপনার। আমার সঙ্গে এক জিপে অন্ধকারে ফিরছেন দেখলে আপনার নামে গল্প তৈরী হবে । সম্মান বলে কি একটার কথা বলছিলেন না তখন সেটাই বাঁচবে।’
সাতকাহন পর্ব-(২৩)
মাটিতে নেমে দীপাবলী বলল, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। ‘মাতলামি করিনি তাে ? ‘এখনও পর্যন্ত না।
‘তাহলে তাে চুকে গেল। চলি ম্যাডাম। আমরা তাে নষ্ট হয়ে গেছি, আপনার মত ঠিক থাকা কিছু মানুষের সঙ্গ পেলে তাই খারাপ লাগে না।
‘আপনারা মানে ?
এই আমি, এস ডি ও, ডি এম মন্ত্রী যারা পরস্পরের কাঁধে ভর দিয়ে চলি। কথা শেষ করেই জিপ ঘুরিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেল অর্জুন ।।
কিছুক্ষণ সেই ছুটন্ত আলাের স্থূপ দেখল দীপাবলী । তারপর পা বাড়াল। বাড়ির সামনে পেীছে সে অবাক হল। অফিসঘরে আলাে জ্বলছে। এখন ওখানে কারও থাকার কথা নয়। | সে অফিসের দরজায় শব্দ করল। তিনবারের বার দরজা খুলল। চমকে উঠল দীপাবলী। সতীশবাবু দাঁড়িয়ে আছে, কুণ্ঠিত ভঙ্গী। আরও বৃদ্ধ দেখাচ্ছে।
সে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি ? সতীশবাবু বললেন, ‘কদিনের কাজ জমে ছিল ‘কাজ জমে ছিল ? তাই বলে আপনি এখন কাজ করবেন ?
সতীশবাবু চুপ করে রইলেন। দীপাবলী কুল পাচ্ছিল না। যাঁর স্ত্রী মারা গিয়েছে গতকাল, দাহ করে যিনি ফিরেছেন আজ দুপুরের পর তিনি এত রাত্রে সরকারি কাজ করতে ছুটে আসবেন ভাবা যায় ? সে নিচু গলায় বলল, “সতীশবাবু আমি খুব ক্ষুধার্ত, একা খেতে ইচ্ছে করছে না, আমার সঙ্গে কিছু খাবেন ?
সাতকাহন পর্ব-(২৩)
পৃথিবী থেকে প্রিয়তম মানুষ অকস্মাৎ সরে গেলে যে অন্ধকার নেমে আসে তার স্থায়িত্ব কতটুকু ? কারাে কারাে হয়তাে শ্মশান থেকে বেরিয়ে আসার পরেই তা দূর হতে আরম্ভ কবে, কেউ সারাজীবন মনের আনাচে কানাচে তাকে আঁকড়ে থাকেন তবু যে কোন চলে যাওয়া মানেই জলেব বুকে গর্ত খোঁড়া, যা পর মুহূর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়া জলের ঢেউ-য়ে বুজে যায, বেঁচে থাকার নিযমে সেইটেই শেষ সত্যি হয়ে দাঁড়ায়।
এই ঘরবাড়ি, জমি বাগান, আত্মীয়তা অথবা ভালবাসা যা একটি মানুষ বুক ভরে ভালবাসে জীবন ধরে তার আয়ু কতদিন এমন ভাবনা সচরাচর আসে না। যারা পড়ে রইল তাদেব হাহুতাশের সময় খুব কম, কারণ মানুষ ভুলে যেতে বড় ভালবাসে। | সতীশবাবু দীপাবলীকে খুব ধাক্কা দিলেন । ভুলে যাওয়া এক কথা আর ভুলবার চেষ্টা করা আব এক।
স্ত্রীর মৃতদেহের পাশে যে মানুষ পাথরের মত বসে থাকতে পারেন সেই মানুষ দাহ করে ফিরে এসে অফিসের কাজ করবেন কেন ? ভুলে যাওয়ার এই চেষ্টা যেন আন্ডারলাইন করা। স্ত্রীর মুখাগ্নি করেছিলেন ভদ্রলােক। পরদিন আচার অনুযায়ী পােশাক পবে অফিসে এলেন ঠিক সমযে। যেন কিছুই ঘটে যায়নি এমন ভঙ্গীতে কাজ শুরু করলেন ।
সাতকাহন পর্ব-(২৩)
ভুলে যাওয়ার এই অতিবিক্ত চেষ্টাই বলে দিচ্ছে তিনি ভুলতে পারবেন না । ধুয়ে ফেলার জন্যে জল দরকার হয়। অন্য বাবুদের মুখে দীপাবলী শুনছে সতীশবাবু একবারও কাঁদেননি । জমে যাওয়া সেই কান্নার ওপর প্রাত্যহিকের ভিত গড়ছেন ভদ্রলােক, যে কোন মুহুর্তে গলন বিপর্যয় ডেকে আনতে পাবে।
দুপুরের ছুটির আগে দীপাবলী সতীশবাবুকে ডেকে বলল, ‘সতীশবাবু, আমার মনে হয় কিছু দিন আপনার ছুটি নেওয়া উচিত।
চমকে উঠলেন ভদ্রলােক, কেন ?
উত্তরটা দেওয়া গেল না। কথা ঘােরালাে দীপাবলী, এই সময় তাে কিছু নিয়মকানুনের মধ্যে আপনাকে থাকতে হচ্ছে। সেসব কবে চাকবিতে আসলে পরিশ্রম হবে । | ‘না। একা বসে থাকলে দম বন্ধ হয়ে আসে। এখানে এলে তবু ফাইল পত্তর, পাঁচজন মানুষ দেখে নিঃশ্বাস নিতে পাবি । তবে আপনি যদি আদেশ করেন তাহলে ছুটি নিতে আমি বাধ্য।’ মাথা নিচু করে বললেন বৃদ্ধ।
মাথা নাড়ল দীপাবলী, ঠিক আছে, যাতে আপনার স্বস্তি হয় তাই করুন। ‘ধন্যবাদ, অনেক ধন্যবাদ। বৃদ্ধ মাথা নেড়ে দরজার দিকে এগিয়েই আবার ফিরে দাঁড়ালেন, ‘নেখালির জন্যে যে প্রপােজাল পাঠিয়েছেন সেটা খুব ভাল হয়েছে।
সাতকাহন পর্ব-(২৩)
‘লাভ হল না সতীশবাবু। ডি এম বলেছেন একটা পয়সাও পাওয়া যাবে না।’ ‘সে কি ! মন্ত্রী মহাশয় নিজের মুখে বলে গিয়েছেন সাহায্য দেবেন। ‘আমার চেয়ে আপনার এই ব্যাপার ভাল বােঝার কথা সতীশবাবু। আপনি তাে অনেকদিন ধরে কাজ করছেন ডিপার্টমেন্টে।
সতীশবাবু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। দীপাবলী জিজ্ঞাসা করল, “কিছু বলবেন বলে মনে হচ্ছে। ‘হ্যাঁ । আমি তাে ব্রিটিশ আমল থেকে কাজ করছি। তা তারা সহজে প্রতিশ্রুতি দিত না। তবে দিলে অবশ্যই রাখত। ওটাই ওদের চরিত্র ছিল। কিন্তু এর জন্যে আমাদের খুব অসুবিধেয় পড়তে হতে পারে।’
“অসুবিধে কেন ?
“মেমসাহেব, যারা কখনও কিছু পায়নি, পাওয়ার আশা কেউ দ্যাখ্যায়নি তারা চিরকাল মাথা নিচু করে থাকে। কিন্তু আমরা ওদের মনে বিশ্বাস ঢুকিয়ে দিয়েছি পাবে বলে, স্বয়ং মন্ত্রীমশাইকে ওরা চোখে দেখল এখন না পেলে হইচই করতে পারে।
