আজ্ঞে হ্যা। কথায় বলে, স্বভাব যায় না মলে! বলে কালাচাদ আমার দিকে ঘুরল। বাবুমশাই! আপনি বাথরুমে গিয়ে হাতমুখ ধােন। ওই দেখুন বাথরুম। আমি আপনার জন্য চায়ের ব্যবস্থা করি।
সে রাতে আর কোনও গণ্ডগােল ঘটেনি। তবে শুয়ে পড়ার পর পুকুরের জলে কিছুক্ষণ অন্তর বারদুয়েক ঝপাং করে কার ঝাপিয়ে পড়ার শব্দ শুনেছি। কেউ তালগাছের ডগা থেকে পুকুরে ঝাপিয়ে পড়ছিল তা ঠিক। গােরাচঁাদ নাকি?
ভােরে কালাচঁাদের ডাকে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। সে কথামতাে বেড-টি এনেছিল। চা খেতে-খেতে ওকে গােরাচঁাদের ব্যাপারটা জিগ্যেস করেছিলুম। কালাচঁাদ হাসতে হাসতে বলেছিল,—ওকে নিয়ে চিন্তার কারণ নেই বাবুমশাই। মােনা-ওঝার নাম করেছি। আর হতচ্ছাড়া আপনার কাছে ঘেঁষবে না। বরং একটুখানি বাইরে ঘুরে জায়গাটা দেখে আসুন। ভালাে লাগবে। আমি বাজারে যাই। খুঁজে পেলে মােনা ওঝাকেও ডেকে আনব। চিন্তা করবেন না।
ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-২১
সত্যি ঘুমঘুমিতলার প্রাকৃতিক পরিবেশ সুন্দর। গিরিবালা ভবনের কাছাকাছি কোনও বাড়ি নেই। ঝােপঝাড়, জঙ্গলে লাল ফুলের শােভা আর পাখির ডাক শুনে আমার মগজের কল্পনাযন্ত্রটি চালু হয়ে গেল। বাড়ি ফিরেই লিখতে বসলুম। কালাচঁাদ তখনও ফেরেনি।
কয়েক লাইন লিখেছি, নিচে কার হাঁকডাক শােনা গেল। কালাচাদ! ও কালাচঁদ–খুড়াে! আমাদের মহামান্য লেখকমশাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে এলুম। যা বাবা! গেল কোথায় কালাচঁাদ! ও কল্লোলবাবু!
বিরক্ত হয়ে কাগজ কলম রেখে বারান্দায় গেলুম। তারাচরণ যশমশাইকে দেখতে পেলুম। তার হাতে একটা সুটকেস।।
একটু পরে তারাচরণ যশ উঠে এসে সুটকেস হাতেই নমস্কার করে সহাস্যে বললেন, আপনি আমার কী যে উপকার করেছেন! পদ্যটা যে শুনছে, সেই বলছে খাসা পদ্য।
বলে তিনি বারান্দার মেঝেতেই বসে পড়লেন। বললুম,—আহা! ওখানে কেন? ঘরে চলুন।
মশাই! ঘরে বসে পদ্য জমবে না। বলে তিনি সুটকেস খুলে একগাদা কাগজ বের করলেন। আপনাকে শােনাব বলে এনেছি। ভুল থাকলে শুধরে দেবেন। আপনি বরং ওই চেয়ারে বসুন। আমি শুরু করি।
সর্বনাশ! এ তাে ভুতুড়ে উৎপাত নয়। মানুষের উৎপাত। এ উৎপাত ভূতের চেয়ে সাংঘাতিক। অতগুলাে পদ্য শুনতে হলে সারাটা দিন কেটে যাবে। সন্দীপ কেন। এসব লােকের কথা আমাকে বলেনি?
ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-২১
যশমশাই কাগজের সাজানাে স্থূপ মেঝেয় রেখে মুচকি হেসে বললেন,বলতে ভুলে গেছি। গতকাল সন্ধ্যায় সে এক কাণ্ড। হঠাৎ হতচ্ছাড়া গােরাচঁাদ গিয়ে আমার পথ আটকে বলল, এবার তার পদ্য শুনতে হবে। বেগতিক দেখে মােনা-ওঝার নাম
করে শাসালুম। তখন কেটে পড়ল। গােরাচঁাদ ওই পুকুরের ধারে বেঁকে থাকা একটা তালগাছের ডগায় চেপেছিল। বুঝলেন? এই তাে গত মাসের কথা। ওর মাথায় ছিট হল। তারপর কী করে তালগাছের ডগা থেকে পুকুরের ঠান্ডা জলে পড়ে অক্কা। অক্কা বােঝেন তাে? পৌষমাসে এখানে প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়ে। পুকুরের ঠান্ডা জলে পড়ে— ব্যস! গােরাচঁাদকে যখন ভােলা হল, তখন সে মড়া। পেটে জলভরা ঢােল মড়া! যাকগে ও কথা। শুরু করি।
এ বিপদের মুহুর্তে চোখ বুজে মনে-মনে যশমশাইয়ের মতাে বললুম,—জয় মা তারা! কিন্তু তাতেও কাজ হল না। যশমশাই সগর্জনে পদ্যআসলে ছড়াপাঠ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। মাথামুণ্ডু বােঝা যাচ্ছিল না। এই উৎপাত থেকে বাঁচবার জন্য শেষে মরিয়া হয়ে উঠেছিলুম। মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল,—গােরাচঁাদ-খুড়াে! বাঁচাও!
অমনি এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল। দক্ষিণ থেকে একটা জোরালাে ঘূর্ণিহাওয়া এসে যশমশাইয়ের কাগজগুলাে উড়িয়ে নিয়ে চলল। যশমশাই আর্তনাদ করলেন, হায়! হায়! এ কী হল, মা গাে!
ততক্ষণে কাগজগুলাে শূন্যে ঘুরপাক খেতে-খেতে পূর্বদিক ঘুরে উত্তরে পুকুরের জলে গিয়ে পড়ছিল। অবশ্য পরে তা দেখেছিলুম। এদিকে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে তারাচরণ যশ বারান্দা থেকে লাফ দিয়ে তার পদ্যের কাগজ ধরতে যাচ্ছিলেন। আমি তাকে টেনে ধরেছিলুম। তা না হলে উনি দোতলা থেকে নিচে পড়ে নির্ঘাত মারা যেতেন!
বাধা পেয়ে তিনি সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলেন। তাঁকে অনুসরণ করলুম। কালাচঁাদ তখনও ফেরেনি। যশবাবুর সঙ্গে খিড়কির দরজা দিয়ে পুকুরের ঘাটে গেলুম। দেখলুম, তার পদ্যলেখা কাগজগুলাে সবই ঘেঁড়া পাতার মতাে জলে ভাসছে। ঘূর্ণি হাওয়াটা তখনও জলকে তােলপাড় করছে। তাই কাগজগুলাে উল্টেপাল্টে ভিজে গিয়ে ডুবে যাচ্ছে।
Read More