সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-২৬

জ্বালাতন! বলে ঠাকুমা উঠে গিয়ে ওদিকের জানালাটা বন্ধ করে দিতেন। তারপর বলতেন,এর একটা বিহিত করা দরকার। কালই মােনা-ওঝাকে ডেকে পাঠাতে হবে। | মােনা ছিল ভূতের ওঝা। ভূতগুলাের সঙ্গে নাকি বেজায় ভাব। তারা তাকে খুব সমীহ করে। একবার হল কী, সিঙ্গিমশাই রাত নটার বাসে শহর থেকে ফিরছেন। হাতে ছিল একভড় রসমালাই। ঠাকরুনতলার বটগাছের কাছে যেই এসেছেন, অমনি গাছ থেকে ঝুপঝুপ করে কয়েকটা ছায়ামূর্তি লাফিয়ে পড়ে তাকে ঘিরে ধরেছে। রসমালাইয়ের ওপর ভূতদের লােভ হতেই পারে। পেঁপেঁ করে তারা চেঁচাচ্ছিল।

ভৌতিক গল্পসমগ্র 

এসব ক্ষেত্রে নিয়ম হল, ‘দেব-দিচ্ছিকরে বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে হয়। কিন্তু সিঙ্গিমশাই নিয়মটা ভুলে গিয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে পালালেন। পালাতে গিয়ে পড়লেন একটা গর্তে। আর একটা ঠ্যাং-ও গেল ভেঙে। রসমালাইয়ের ভাড়টা হাত থেকে ছিটকে পড়েছিল। ভূতেরা আহ্লাদ করে রসমালাই সাবাড় করল। সিঙ্গিমশাই যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে সবই দেখলেন। কিন্তু কী আর করা যাবে? 

 ভঁর কাতরানি রাধােপা শুনতে পেয়েছিল। সে বেরিয়েছিল তার গাধাটাকে খুঁজতে। গাধাটার ছিল বিচ্ছিরি স্বভাব। প্রায় রাত্তিরেই দড়ি ছিড়ে খেলার মাঠে চলে যেত এবং পছন্দসই কোনও ভূতকে পিঠে চাপিয়ে ছুটোছুটি করত। আসলে রামুর গাধার সঙ্গে ভূতদের ছিল বেজায় গলাগলি, বন্ধুত্ব। 

ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-২৬

তাে রামু সিঙ্গিমশাইকে কাঁধে করে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে। তারপর শহরের হাসপাতালে কয়েকমাস কাটিয়ে সিঙ্গিমশাই ফিরে এলেন বটে, কিন্তু একটি ঠ্যাং হাঁটুর ওপর থেকে বাদ। ক্রাচে ভর করে হাঁটতেন এবং নতুন নাম পেয়েছিলেন ‘খোঁড়াসিঙ্গি’। 

খোঁড়াসিঙ্গি ভূতের ওপর খাপ্পা হয়ে মােনা-ওঝাকে তলব করেছিলেন। বলেছিলেন,—শুধু ঠাকরুনতলার নয়, গাঁয়ের সব ভূতকে গঙ্গার ওপারে তাড়িয়ে দিয়ে আয় তাে মােনা। যা চাস, পাবি। 

মােনা-ওঝা বলল,—তাড়িয়ে দেওয়া কি ঠিক হবে সিঙ্গিমশাই? কাউকে ভিটেছাড়া করা যে মহাপাপ। তা ছাড়া, ওদের সঙ্গে আমার কতকালের সম্পর্ক। যা বলি তাই শােনে। এ কাজ আমি পারব না সিঙ্গিমশাই। 

খোঁড়াসিঙ্গি তর্জনগর্জন করে বললেন,—তাহলে তােকেই ভিটেছাড়া করব বলে দিচ্ছি। বেশ বুঝেছি, তুইই যত নষ্টের গােড়া। তােরই আস্কারা পেয়ে হারামজাদাগুলাের এত বাড় বেড়েছে। দাঁড়া! কালই পঞ্চগেরামি করে তাের বিচারের ব্যবস্থা করছি। 

 সে আমলে ‘পঞ্চগেরামিঅর্থাৎ পঞ্চগ্রামী মানে পাঁচ গাঁয়ের মাতব্বর লােকদের ডেকে বিচারসভার আয়ােজন। সেই বিচারসভা বসল চণ্ডীমন্ডপে। মােনাকে ডেকে আনা হল। মােনা-ওঝা কিন্তু একটুও দমে যায়নি। সে মুচকি হেসে বলল, বাবুমশাইরা! ওপরে দেবতা, নিচে মা বসুমতী। ন্যায্য বিচার করে বলুন দিকি দোষটা কার? সিঙ্গিমশাইয়ের ঠ্যাং কি ভূতগুলাে ভেঙেছে, নাকি নিজেই গর্তে আছাড় খেয়ে নিজেই ভেঙেছেন? জিগ্যেস করুন তাে সিঙ্গিমশাইকে। 

ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-২৬

সবাই একমত হলেন যে, ভূতগুলাে সিঙ্গিমশাইয়ের ঠ্যাং-এ আঘাত করেনি, এটা সত্যি। কিন্তু পাশের গায়ের চক্কোত্তিমশাই বললেন, মানছি,—ওরা সিঙ্গি মশাইয়ের ঠ্যাং ভাঙেনি। তবে এ-ও তাে ঠিক যে ভূতগুলাে ওঁকে ভয় না দেখালে উনি দৌড়ে পালাতেন না এবং গর্তেও পড়তেন না। ঠ্যাং-ও ভাঙত না। 

মােনা-ওঝা হাত নেড়ে বলল,ভুল! একেবারে ভুল। ভূতগুলাে ওঁকে কক্ষনও ভয় দেখায়নি। মা চণ্ডীর দিব্যি করে বলুন উনি। সেই সব ভূত 

মাতব্বররা সিঙ্গিমশাইকে জিগ্যেস করলেন কথাটা। সিঙ্গিমশাই গাঁইগুই করে বললেন,-নামানে, ঠিক ভয় দেখায়নি। তবে আমার হাতে রসমালাইয়ের ভাঁড় ছিল। সেটা কেড়ে নিতে এসেছিল। 

মােনা-ওঝা বলল,“আবার ভুল হল বাবুমশাইরা! কেড়ে নিতে এসেছিল, নাকি চেয়েছিল? মা-চণ্ডীর দিব্যি, সত্যি কথাটা বলুন। 

আমাদের গাঁয়ের মা-চণ্ডী জাগ্রত দেবী। তার ভয়ে খোঁড়াসিঙ্গিকে স্বীকার করতে হল, রসমালাইগুলাে কেড়ে নেবে বলে মনে হচ্ছিল বটে, তবে ওরা ‘পেঁপেঁ করে চেঁচাচ্ছিল সেটা মিথ্যা নয়। 

তাহলে? -মােনা-ওঝা একগাল হেসে বলল,-এবার বলুন দোষটা কার ? হাতে রসমালাই দেখলে কেউ চাইতেই পারে। আপনি ইচ্ছে হলে দেবেন, নয়তাে দেবেন না, আপনি বলতেন পারতেন, দেব না। তা না করে আপনি দৌড়ে পালালেন। গর্তে পড়ে ঠ্যাংটি ভাঙলেন। আর দোষটা দিচ্ছেন অন্যকে? 

মামলা ভেস্তে যাচ্ছে দেখে খোঁড়াসিঙ্গি বললেন, কিন্তু আমার নালিশ তাে এই মােনর বিরুদ্ধে। মােনার আস্কারাতেই এ গাঁয়ের ভূতগুলাের বড় বাড় বেড়েছে। 

মােনা-ওঝা বলল, প্রমাণ? 

 

Read More

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-২৭

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *