ক্রসফায়ারের চেয়ে বাঘ ভালো। হিমু ভাই! সুন্দরবন যাবেন? সপ্তাহখানিক থাকলেন। ফরেস্টের বাংলোয় থাকার ভালো ব্যবস্থা আছে। ফরেস্টের লোকজন দেখভাল করে। তাদের আদর যত্নও ভালো। ফ্রেশ হরিণের মাংস সাপ্লাই করে। ব্ল্যাব বাঁ পুলিশ যখন আসে তখন বনবিভাগ এডভান্স খবর দেয়। আমরা ডিপ ফরেস্টে চলে যাই।
তুমি কি আগেও ছিলে সুন্দরবনে? কয়েকবার ছিলাম। র্যাবের যন্ত্রণায় মাঝে মধ্যে যেতে হয়। হিমু ভাই! আপনাকে পেয়েছি। এখন আর ছাড়ব না। সেবা করব। আপনাকে সেবা করা বিরাট ভাগ্যের ব্যাপার।আমি বললাম, হরিণের মাংস ছাড়া সুন্দরবনে আর কী পাওয়া যায়?
ফ্রেন্স চিংড়ি খাবেন। চাষের চিংড়ি না। ভাঙ্গন মাছ আস্ত ভেজে দিবে। মাখনের মতো মোলায়েম। সামুদ্রিক রিটা কখনো খেয়েছেন? সামুদ্রিক রিটা খাবেন, সারা জীবন মনে থাকবে। হিন্দু এক বাবুর্চি আছে। নাম হরি ভট্টাচার্য। তার হাতে হরিণের মাংস অপূর্ব। মাংসটা মধু দিয়ে মাখায়ে দুদিন বাসি করে তারপর রান্না। আহা কী জিনিস! হিমু ভাই। এখন বলেন, লঞ্চে আপনার কোনো সেবা লাগবে? সিদ্ধান্ত নিয়েছি কিছুক্ষণের মধ্যে লঞ্চের দখল নিব। একা?
আমারে চিনেন না হিমু ভাই? আমার কি দোকা লাগে? টাকা নিয়ে তিন আনসার পালায়েছিল। এদের ধরে টাকা উদ্ধার করেছি। তিনটাকে বাথরুমে তালাবন্ধ করে রেখে দিয়েছি। ওসি সাহেবকে পঞ্চাশ হাজার দিয়েছি। উনি আর শব্দ করবেন না। ঝিম ধরে থাকবেন। রুস্তম নামে একটা ফালাফালি করতেছে, তাকে একটা থাবড়া দিয়ে কনট্রোল নিজের হাতে নিব। তার আগে বলেন, আপনার কোনো সার্ভিস লাগবে? না।আমাকে শুধু একটা খবর দেন, লঞ্চটা কি ড়ুববে? লঞ্চ ড়ুবে যাবে, আপনে এডভান্স খবর পাবেন না-এটা কখনো হবে না।লঞ্চ ড়ুববে।
আতর ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, সামান্য সমস্যা হয়ে গেল। যাই হোক অসুবিধা নাই। আপনি আছেন কোথায়? কেবিনে। কেবিন নাম্বার চার।পাঁচ নাম্বার কেবিনে ফুর্তি করার জন্য এক হারামজাদা মেয়ে নিয়ে আছে। খবর পেয়েছেন? হুঁ।জাতি কোনদিকে যাচ্ছে খেয়াল করেছেন? হুঁ।লঞ্চ ড়ুবে গেলে সেটা সম্ভব হবে না।আমি বললাম, এরা দুজন দরজা বন্ধ করে বসে আছে। আপাতত এদের বের করার ব্যবস্থা করো।আতর বলল, চলেন যাই। বের করি। হালকা পাতলা দরজা। এক লাখি দিলেই ভেঙে হবে চাইর টুকরা।
আতর আমার সঙ্গে কেবিনের দিকে রওনা হলো। এখন আতর প্রসঙ্গে বলি। বায়তুল মোকাররমের সামনে আতর মিয়ার একটা আতর এবং তসবির দোকান আছে। দোকানোর নাম– দি নিউ মদিনা আতার হাউস দি নিউ মদিনা অতির হাউসে কাটনে করে ছোটখাটো অন্ত্রের লেনদেন হয়। আতর মিয়ার সব অ্যাসিসটেন্টের নাম পুলিশের সন্ত্রাসী তালিকায় আছে। আতরের নাম নেই। আতর মিয়ার কথা হচ্ছে-কোনো ইনসান আমার হাতে খুন হয় নাই। মানুষ হলেই ইনসান হয় না। মানুষের মতো দেখতে অনেক হায়ওয়ান ঘুরে বেড়ায়। এরা অফ হয়ে গেলে জগতের উপকার হয়।
আতর মিয়ার সঙ্গে আমার পরিচয়ের কাহিনীতে কোনো নাটকীয়তা নাই। সময় পেলে সেই গল্প করব। আজ সময় নেই। ঝড় শুরু হয়ে গেছে।আচ্ছ, ঠিক আছে। ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেই গল্পটা করি। সেদিনও এরকম ঝড়বৃষ্টি। মানুষের যেমন ডিপ্রেশন হয় সাগর-মহাসাগরেরও ডিপ্রেশন হয়। বঙ্গোপসাগরে ডিপ্রেশন। সাত নম্বর বিপদ সংকেত। ঢাকায় বৃষ্টি, দমকা বাতাস। কিছুক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজালাম। বৃষ্টির পানি বরফের চেয়েও ঠান্ডা।
শরীর হিম হয়ে গেছে। এক কাঁপা গরম চা খেতে পারলে ভালো হতো। চায়ের দোকানের সন্ধানে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি—দি নিউ মদিনা আতর হাউস থেকে একজন হাতের ইশারায় আমাকে ডাকল। কাছে গেলাম। সেই লোক সন্দিগ্ধ চোখে আমাকে দেখতে লাগল। একসময় বলল, আপনার পাঞ্জাবি হলুদ? আমি বললাম, হ্যাঁ বৃষ্টিতে ভিজে কমলা হয়ে গেছে।বুঝতে পারছি। দূর থেকেই নিউ মদিনী হাউস দেখা যায়। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলেন কেন?
গরম চা খুঁজছি।হুঁ। হয়েছে। গরম চা। পেমেন্ট নিয়ে যান। ঘরে ঢুকেন।আমি ঘরে ঢুকলাম। লোক গলা খাকারি দিয়ে বলল, আমার নাম আতর মিয়া। আপনার সঙ্গে আগে মুখোমুখি দেখা হয় নাই। আজ দেখা হলো। আপনাদের সঙ্গে ব্যবসা করে আরাম পেয়েছি। এই প্যাকেটে দুই লাখ পঁচিশ আছে। আমি গুনে দিয়েছি তারপরেও শুনে নিন।
আমি টাকা গুনতে পারি না। আপনি গুনেছেন এই যথেষ্ট। বেশি গুনালে টাকা কমে যায়।আতর মিয়া বলল, টাকার প্যাকেটটা পলিথিন দিয়ে মুড়ে দেই। পকেটে রেখে দিন, বৃষ্টিতে ভিজিবে না।আমি বললাম, আমার পাঞ্জাবির পকেট নাই।পকেট নাই কেন? পকেট থাকলেই পকেটে টাকা-পয়সা রাখতে হয়। দিগদারি। আমি দিগদারি পছন্দ করি না।করেন দিগদারির কাম আর দিগদারি পছন্দ করেন না? আমি বললাম, গরম এক কাপ চা খাওয়ান আমি চলে যাব। টাকা থাকুক আপনার কাছে।টাকা নিবেন না? না।কবে নিবেন?
টাকা আমার না, আমি নিব না। যার টাকা সেও নিবে না। সে ধরা খেয়েছে। এটা আমার অনুমান।টাকা আপনার না? সাংকেতিক কথা গরম চা কীভাবে বলেছেন? এমনি বলেছি। মনে এসেছে বলেছি।গায়ে হলুদ পাঞ্জাবি গরম চা বলেন কী? পিয়েন্টে পয়েন্টে মিলে গেছে।
আতর মিয়া বিম ধরে গেল। আতর মিয়া একটি কথাও বলল না। চা আনল। চা শেষ করে উঠে দাঁড়ালাম। তখন তার মোবাইলে একটা টেলিফোন এল। সেইশারায় আমাকে দাঁড়াতে বলল। আমি দাঁড়ালাম। টেলিফোন শেষ করে আতর বলল, আপনার কথা সত্য। উনি ধরা খেয়েছেন।আমি বললাম, পুরুষের জন্মই হয়েছে ধরা খাওয়ার জন্য। কেউ স্ত্রীর হাতে ধরা খায়, কেউ পুত্র-কন্যার হাতে ধরা খায়। কেউ ধরা খায় প্রেমিকার কাছে। আবার কেউ কেউ র্যাবের কাছে ধরা খায়।আতর মিয়া বলল, আপনি কই থাকেন? আপনার ঠিকানা কী? কেন?
যোগাযোগ রাখতাম।কোনো প্রয়োজন নাই। হঠাৎ হঠাৎ আপনার সঙ্গে দেখা হবে সেটাই তো ভালো।আতরের সঙ্গে পরে আরও দুইবার দেখা হয়েছে। শেষবার দেখা হয় মধ্যরাতে।মধ্যরাত খুবই বিস্ময়কর সময়। তখন পেত্নী মারে ঢ়িল। মধ্য দুপুর থাকে ভূতের হাতে, মধ্য রাত পেত্নীর হাতে।
পেত্নী টিল মারতে থাকুক আমি ঘটনাটা বলি। কাওরান বাজারের সামনে দিয়ে আসছি। মাছের আড়াতে এক বেচারি বলল, হিমু ভাই না? যান কই? আমি বললাম, কোথাও যাই না। হাঁটতে বের হয়েছি।একটা ইলিশ মাছ নিয়া যান। আজ ভালো ইলিশ আসছে। দেড় কেজি, দুই কেজি।
ইলিশ মাছ দিয়ে আমি করব কী? ভাইজা খাবেন আর কী করবেন। টাটকা ইলিশ। এমন টাটকা ইচ্ছা করলে কঁচাও খাইতে পারেন। কঁচা ইলিশ কোনোদিন খাইছেন? না।আমার অনুরোধ রাখেন, একটা পিস হইলেও কাঁচা খায়া দেখেন। লবণের ছিটা দিবেন, কাগজি লেবু চিপ্যা লেবুর রস দিবেন। কচকচায়া খাবেন। এই হিমু। ভাইরে সবচেয়ে বড় মাছটা গাঁইথা দে।
আমি বিশাল এক ইলিশ হাতে নিয়ে হাঁটছি। আমার পেছনে পেছনে দুটা কুকুর আসছে। রাজধানীর কুকুর বলশালী হয়। এরা যথেষ্ট বলশালী। হাঁটার মধ্যে জংলিভাব আছে। আমি দাঁড়িয়ে পড়লে ওরাও খানিকটা দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে পড়ে। আমি বললাম, তোরা কি কাঁচা ইলিশ খাবি? দুজনই ঘড়ঘড় শব্দ করল। কুরের ভাষা বুঝত না পারার কারণে কী বলল বুঝতে পারলাম না।আরও খানিকটা এগুতেই মাইক্রোবাসের লেখা পেলাম। মাইক্রোবাসের ইঞ্জিনের কোনো সমস্যা হয়েছে। ড্রাইভার বনেট খুলে ইঞ্জিন ঠিক করার চেষ্টা করছে।
ড্রাইভারের পাশে চিন্তিত মুখে শুটিকা টাইপের এক লোক টর্চ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। টর্চ একটু পরপর নিভে যােচ্ছ। আমি তাদের পাশে দাঁড়ালাম। কুকুরের ঘড়ঘড় শব্দ শুনে দুজনই ফিরে তৃ কাল।মাইক্রোবাসের ভেতর অত্যন্ত বলশালী একজ বসা। সে ঘাড় সোজা করে বলল, এই লোক কী চায়? আমি বললাম, আমি কিছু চাই না। আপনার গাড়ি থেকে কড়া আতরের গন্ধ আসছে। আমার কুকুর দুটা আ ক্লার গন্ধে অস্থির হয়ে গেছে।
কুকুর দুটা একসঙ্গে কলজে, শুকিয়ে যাওয়ার মতো আওয়াজ করল। টর্চ হাতে ড্রাইভারের পাশের লোক হঠাৎ দৌড় দিল। তার দেখাদেখি ড্রাইভার। কেউ দৌড়ালে জংলি কুকুর তার পেছনে পেছনে যাবে। এটাই স্বাভাবিক। দুটা কুকুরই ছুটে গেল। একজন শুটকা লোক কে কামড়ে ধরলে, আরেকজন ড্রাইভারকে। তাদের চিৎকার শুনলাম, বাঁচান আমাদের বাঁচিন।আমি ডাকলাম, তোরা ফিরে আয়। শুটিকা লোক ফুটপাতে পড়ে রইল। কুকুর দুটা ফিরে এল।মাইক্রোবাসে বসা লোক ভীত গলায় বলল, আপনি কী চান?
আমি বললাম, আপনি গাড়ি; বস্তাভর্তি করে কাউকে নিয়ে যাচ্ছেন। যাকে নিয়ে যাচ্ছেন তার গা থেকে আতরের গান্ধ বের হচ্ছে। আমার ধারণা তার নাম আতর মিয়া। আপনার পরিকল্পনা কী? বস্তা বাংলাদেশ চায়না ফ্রেন্ডশিপ বীজ থেকে পানিতে ফেলা? বস্তায় ইট কি ভরা আছে? আপনি তো ভগাই বিরাট ঝামেলায় আছেন। গাড়ি নষ্ট। লোকবলও কমে গেল। সঙ্গে মোবাইল ফোন আছে না? টেলিফোন করে লোক আনবার ব্যবস্থা করুন। অন্য গাড়ি আনুন। এই ধরনের জটিল কাজে সবসময় ব্যাকআপ ব্যবস্থা থাকতে হয়।
গাড়ির ভেতর থেকে ভোঁ ভোঁ শব্দ পাওয়া গেল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে টহল পুলিশ আসতে দেখা গেল। আমি মাইক্রোবাসে বসা লোকটার দিকে তাকিয়ে বললাম, ভাইসাহেব, পুলিশ আসতেছে। আমার মনে হয় আপনার উচিত দৌড় দিয়ে পালানো। আতর মিয়াকে ধরার অনেক সুযোগ পাবেন।
মাইক্রোবাসের দরজা খুলল। ঐ লোক বের হলো। কেড়ে দৌড় দিল। পেছনে পেছনে কুকুর দুটা ছুটে গেল। সেও ধরাশায়ী হলো।মানুষের বিপদ দেখে পুলিশ এগিয়ে আসবে এটাই স্বাভাবিক। এই ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ঘটনা ঘটল না। পুলিশ দুজনও উল্টোদিকে দৌড় দিল।
বস্তার ভেতর থেকে আতর মিয়াকে অর্ধমৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হলো। আতর মিয়া হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, হিমু ভাই। আপনি মানুষ না অন্য কিছু! এখন থেকে আমি আপনার কেনা গোলাম।কুকুর দুটিাকে ইলিশ মাছ উপহার দিয়ে আমি কেনা গোলাম নিয়ে হাঁটা দিলাম। মধ্যযুগে মুনিবরা কেনা গোলাম নিয়ে হাঁটত। যুগের অভ্যাস বদলায় না। এই যুগেও আমি কেনা গোলাম নিয়ে হাঁটছি।
তৃষ্ণার কাছে ফিরে এসেছি। সে ভোল পাল্টেছে। শাড়ির বদলে জিন্সের প্যান্ট, গাঢ় হলুদ রঙের ফুলহাতা জামা। গলায় হলুদ পাথরের মালা। আগেরবার চোখের পাতা নীল ছিল। এখন হলুদ। এর মধ্যে চোখে রঙ করাও শেষ।মেয়েরা ভয়ঙ্কর দুর্যোগেও সাজ ঠিক রাখতে ভোলে না।আতর মিয়া আমার সঙ্গে নেই। সে নাকি পাঁচ মিনিট পরে আসবে। রুস্তমকে টাইট দিতে পাঁচ মিনিট লাগবে। পুরো টাইট দিবে না। স্কুর দুই প্যাঁচের টাইট। ঘাঁচ ঘাচং।
আমাকে দেখে তৃষ্ণা কেবিন থেকে বের হয়ে এসে কোমল গলায় বলল, এতক্ষণ কোথায় ছিলেন? জীবনানন্দ দাশ। আমাদের নানানভাবে প্রভাবিত করেছেন। এতদিন কোথায় ছিলেন?-বাক্যটি নানানভাবে ব্যবহৃত হয়। প্ৰতিবারই শুনতে ভালো লাগে।আমি বললাম, ভয় লাগছে?
তৃষ্ণা বলল, ভয়ে আধমরা হয়ে গিয়েছিলাম। আপনাকে দেখে ভয় কমেছে। সত্যি কমেছে। আপনি আর যেতে পারবেন না। এখানে থাকতে হবে।পাশের কেবিনের মেয়ের কান্না থেমেছে? হ্যাঁ, তবে মাঝে মাঝে ফোঁপানোর শব্দ হচ্ছে। এবং যথারীতি মোরগ ডাকছে।আমি বললাম, মহা বিপদের সময় পশুপাখি ডাকাডাকি করে শুনেছি, মোরগ মনে হয়। সেই কারণেই ডাকছে।কেবিনের ভেতর মোরগ আসবে কেন? তাও কথা।
বাঁ-পাশের কেবিনের দরজা খুলে এক ভদ্রলোক বের হলেন। তাঁর গায়ে আলজেরিয়া ফুটবল দলের জার্সির মতো ক্লিপিং সুন্টুট। মুখে ফ্রেঞ্চকাটি দাড়ি। ভদ্রলোক ভয়ে চিমশা মেরে গেছেন। তাঁর ফ্রেঞ্চকাট দাড়িগোঁফ ঝুলে গেছে। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কী হচ্ছে বলতে পারেন? আমি বললাম, ঝড় হচ্ছে।ঝড় হচ্ছে সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি। আমাদের করণীয় কী?
মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা ছাড়া তেমন কিছু করণীয় নেই। গণ তওবার আয়োজন হচ্ছে। তওবায় সামিল হতে পারেন। তওবা পড়ানোর জন্যে যোগ্য মাওলানার সন্ধানে কিছুক্ষণের মধ্যে বের হব। ইচ্ছা করলে আপনিও আমার সঙ্গে আসতে?ilo। In Search of Godo-র মতো In Search of মাওলানা।
You are talking nonsense!
অতি সত্য কথা বলেছেন।লঞ্চ কর্তৃপক্ষ আমাদের জন্য কী করছে? লঞ্চের মালিকপক্ষের সঙ্গে আমি কথা বলতে চাই।মালিকপক্ষের এখন আর কেউ নাই। আমরা সবাই মালিক আমাদের এই লঞ্চের রাজত্বে। মালিকের খোঁজখবর না করে একটা কাজ করতে পারেন। কড়া ঘুমের ওষুধ খেয়ে একটা দোয়া পড়ে ঘুমিয়ে পড়ুন। যা ঘটবে ঘুমের মধ্যে ঘটবে। দোয়াটা হচ্ছে—আল্লাহুমা বি ইছমিকা আমতু ওয়া আহইয়া। এর অর্থ হে আল্লাহু! তোমার নামেই আমি মৃত্যুর কোলে অর্থাৎ নিদ্রায় যাইতেছি এবং জীবিত হইব। তবে এই দফায় জীবিত হওয়ায় সম্ভাবনা ক্ষীণ।
ফাজলামি করছেন? আমি কে আপনি জানেন? আমি ডক্টর জিলুর খান। হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট অব বায়োকেমিস্ট্রি। স্টেট ইউনিভার্সিটি অব লালমাটিয়া।ঢাকা শহরে এখন স্টেট ইউনিভার্সিটির ছড়াছড়ি। ধানমণ্ডির কোনো কোনো গলিতে তিনটা-চারটা করে ইউনিভার্সিটি। মাঝারি সাইজের বাড়ি ভাড়া করে। ইউনিভার্সিটি বানানো হয়। বাড়ির গ্যারাজ হয়। ভাইস চ্যান্সেলর সাহেবের অফিস। সেই অফিসে এসি থাকে। বেশির ভাগ সময় এসি থেকে গরম বাতাস বের হয়। ফ্যান চললে ভাইস চ্যান্সেলর সাহেবের আরাম হতো, কিন্তু এসি-তে যে ইজ্জত ফ্যানে তা নেই।
আমি বললাম, স্যার ভালো আছেন? ভেতরে এসে বসুন। লঞ্চ দুলছে, যেকোনো সময় আপনি পড়ে যাবেন। যেভাবে দাঁড়িয়ে আছেন সেটা দেখেও ভয় লাগছে। রেলিং ধরে দাঁড়ান।তুমি কি লঞ্চের কেউ?
জি স্যার। আমি যাত্রীদের চা, পান-সিগারেট এইগুলা কেবিনে কেবিনে দেই। আমাকে কেবিন বয় বলতে পারেন। রাতের খানা কি খাবেন? এনে দিব? মেন্যু হলো—
ডাল-খাসি
ইলিশ মাছ ইলিশ
মাছের ডিম ডিম
সবজি
মসুর ডাল।
ডক্টর জিলুর খান বস্তিওয়ালা ভাইদের ভাষায় চলে গেলেন। খ্যাক খ্যাক করে বললেন, হারামজাদা কেবিন বয়। তুই ফাইজলামি শুরু করেছিস কী জন্যে? যা মালিকপক্ষের কাউকে ডেকে আন।
স্যার! এইটা আমার ডিউটিতে পড়ে না। তারপরেও যেতাম। লঞ্চে মালিক পক্ষের একজন আছেন। তিনি অসামাজিক কর্মে ব্যস্ত আছেন। তাঁকে ডাকার সাহস আমার নাই, কারণ তার সঙ্গে একটা লাইসেন্স করা পিস্তল আছে। সারেঙ আছেন। উনার ব্রেইন কাজ করছে না। উনি শুধু বলছেন, যার গৈ, চানপুর যার গৈ। যার গৈ কথাটার অর্থ হচ্ছে—চলে যায়। চানপুর যার গৈ অৰ্থাৎ চাঁদপুর চলে যায়। লঞ্চ যখন ড়ুবে যাবে তখন তিনি বলবেন, লঞ্চ যার গৈ। শ্রাবণ যার গৈ মানে হচ্ছে শ্রাবণের দিন চলে যায়।
ডক্টর জিল্লুর খান বললেন, হারামজাদা। থাপড়ায়ে আমি তোর দাঁত ফেলে দেব।তৃষ্ণা এতক্ষণ চুপ করে ছিল। মনে হয় আমার কথাবার্তায় মজা পাচ্ছিল। সে বলল, আপনি অকারণে গালাগালি করছেন কেন? ডক্টর জিলুর খান বললেন, গালাগালি করা অবশ্যই ঠিক হচ্ছে না। এই কুত্তার বাচ্চাকে আমি লাখি দিয়ে পানিতে ফেলব। সেটাই হবে সঠিক কাজ।প্রফেসর সাহেব বাক্য শেষ করার আগেই আতর মিয়া কেবিনের সামনে এসে দাঁড়াল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, দরজা কোনটা ভাঙব?
আমি বললাম, পাশেরটা।আতরের প্রচণ্ড লাথিতে দরজা ভেঙে গেল। কেবিনে চামচিকার মতো এক প্রৌঢ়, তার পাশে সম্পূর্ণ নগ্ন এক তরুণী। তরুণী আচমকা দরজা খোলায় হকচকিয়ে গেছে। গা ঢাকার কাপড় খুঁজছে। এইসব ক্ষেত্রে যা হয়—কাপড় পাওয়া যাচ্ছে না। মার্ফিস ল কাজ করছে। মার্ফি সাহেবের সূত্র বলে, যখন যেটা প্রয়োজন তখন তুমি তা পাবে না। যখন প্রয়োজন নেই, তখন সেই জিনিসই চোখের সামনে পড়ে থাকবে। কেবিনের ভেতর কোনো মোরগ বা মুরগি দেখা গেল না।
অধ্যাপক সাহেব নগ্ন তরুণী দেখে যথেষ্ট আনন্দ পাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। চোখের পাতা ফেলা সাময়িক বন্ধ রেখেছেন।আমি আমার গায়ের চাদর বের করে প্রৌঢ়ের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বললাম, চাদরটা দিয়ে ঢেকে দিন।আতর মিয়া বলল, ঐ শিয়ালের বাচ্চা বাইর হ। ফুর্তি অনেক হইছে। ফুর্তি শেষ। বাইর হে কইলাম। এক্ষণ বাইর না হইলে ঘেটি চিপ দিয়া বাইর করব।
গাল ভাঙা চামচিকা মানব বের হয়ে এল। আতর মিয়া ভাঙা দরজা বন্ধ করতে করতে বলল, সিস্টার, শইল ভালোমতো ঢাকেন। কেয়ামত শুরু হইছে। আর আপনে নেংটিা বসা। এইটা কোনো কথা! প্রফেসর সাহেব, আতর মিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি হঠাৎ এসে কী শুরু করছেন! Who are you? আতর বলল, ঝিম ধইরা খাড়ায়া থাক। কথা বললে থাপ্পড় খাবি।তুমি চেনো আমি কে?
চিনার প্রয়োজন নাই। কিয়ামতের দিন কেউ কাউরে চিনবে না। আইজ কিয়ামত। আপনি আমারে চিনেন না, আমিও আপনারে চিনি না।ফ্রেঞ্চকাট বললেন, কেয়ামত হোক বাঁ না-হোক আমাদের ভদ্রতা শালীনতা বজায় রাখতে হবে।আতর বলল, এই দেখ আমার ভদ্রতা।
প্রচণ্ড থাপ্নড়ের শব্দ হলো। ডক্টর জিল্লুর খান হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন। সেখান থেকে হামাগুড়ি দিয়ে নিজের কেবিনে ঢুকে গেলেন। দৃশ্যটিতে নিশ্চয়ই কিছু হাস্যরস ছিল, তৃষ্ণা হেসে ফেলল। মানুষ ভয়ঙ্কর সময়েও হাসতে পারে।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনজন রাশিয়ান সৈনিক নাজিদের হাতে ধরা পড়ল। তাদের ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। যে কমান্ডার গুলি করার নির্দেশ দিবেন, তিনি হঠাৎ বরফে পা পিছলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন। রাশিয়ান সৈন্য দুজন হো হো করে হাসতে লাগল। তাদের মৃত্যু হলো হাসতে হাসতে।
আতর মিয়া আমার দিকে তাকিয়ে বলল, হিমু ভাই! আপনি এই চামচিকারে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। আমি একটা চক্কর দিয়া আসি। আইজি রাইতটা যাবে চক্করের উপরে। দুইটা আতরের শিশি পকেটে নিয়া বাইর হইছি, সাথে যন্ত্রপাতি নাই। একটা যন্ত্রের সন্ধান পাইছি। লিঞ্চ মালিকের পোলার লাইসেন্স করা যন্ত্র। ঐটা উদ্ধার করা বিশেষ প্রয়োজন।আতর মিয়া নিমিষে উধাও হয়ে গেল। আমি চামচিকা মানবকে বললাম, ভাই আছেন কেমন?
চামচিকা মানবের মোবাইল বেজে উঠেছে। রিং টোন হিসাবে আছে মোরগের ডাক। এতক্ষণে মোরগ রহস্যের সমাধান হলো। চামচিকা মানব মোবাইলে বিড়বিড় করে কিছু কথা বলে মোবাইল পকেটে রেখে দিল। তাকে মোটেই বিব্রত মনে হলো না। থলথলে ভূড়ির নাদুসনুদুস প্রৌঢ়। গায়ের পাঞ্জাবিটা সিস্কের। সে যে পান চিবুচ্ছে তা আগে লক্ষ করি নি। মুখ থেকে জর্দার কড়া গন্ধ আসছে। সে আয়োজন করে রেলিং-এর বাইরে পানের পিক ফেলল।আমি বললাম, আপনার নাম কী? রশীদ খান।আমি বললাম, রশীদ ভাই ভালো আছেন?
রশীদ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে থমথমে গলায় বলল, দরজা যে ভেঙেছে সে কে? তার নাম আতর। বায়তুল মোকাররমে তাঁর একটা আতরের দোকান আছে। দোকানোর নাম দি নিউ মদিনা আতার হাউস।রশীদ বলল, আমি যদি ঐ শুয়োরের বাচ্চার জান কবজ না করি আমার নাম রশীদ খান না। আমার নাম শুয়োর খান।আমি বললাম, জানি কবজ করে আজরাইল। আপনি কি আজরাইল?
আমি আজরাইল না। আমি গাৰ্মেন্টের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবে বাংলাদেশে আজরাইল ভাড়া পাওয়া যায়।ভাড়াটে আজরাইল দিয়ে কাজ হবে না। ঢাকা শহরের ভাড়াটে আজরাইল কষ্ট্রোল করে আতর মিয়া। আপনার সঙ্গে তো মোরগ টেলিফোন আছে। মোরগ। ফোনে আপনার ভাড়াটে যে-কোনো আজরাইলের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। তাদের জিজ্ঞেস করুন, আতর মিয়াকে চেনে কি না।আমি কী করব না করব সেটা আমার ব্যাপার। আপনি বলার কে?