ফুপা অনেকক্ষণ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রেইলেন। হতভম্ভ ভাব খানিকটা কাটার পর বিড় বিড় করে বললেন, আসলেই তোমার ক্ষমতা আছে। ইয়েস, ইউ হ্যাভ পাওয়ার। বাদল ভুল বলেনি। আমি ইমপ্রেসড্। থরোলি ইমপ্রেসড্।ফুপা ঘোর-লাগা চোখে তাকিয়ে আছেন। আমি তাঁর ঘোর অনেকখানি কাটিয়ে দিতে পারি। বাদল বাইরে চলে যাচ্ছে এটা বলার জন্যে কোন ক্ষমতার প্রয়োজন হয় না। আমি অনুমান থেকে বলেছি। যেহেতু ফুপা আমার উপর থেকে এমবারগো তুলে নিচ্ছেন সেহেতু আমি ধরে নিয়েছি বাদলকে নিয়ে তাঁর আর ভয় নেই। আমেরিকা যাত্রার ব্যাপারটাও সহজ অনুমান—বাদলের বড়বোন রিনিকি আছে আমেরিকায়।সেই ব্যবস্থা করেছে।
‘হিমু।’ ‘জ্বি ফুপা।’ ‘আমি সত্যি অবাক হয়েছি। সুপারন্যাচারাল পাওয়ার তাহলে মানুষের আছে!’ ‘তা আছে।’ ‘ভবিষ্যৎ তুমি কি কিছু বলতে পার?’ ‘সবাই খানিকটা পারে।’ ‘না না, সবাই পারে না। এটা সবার পারার ব্যাপার না। আচ্ছা আমার ভবিষ্যৎ কি বল তো?’ ‘আপনার ভবিষ্যৎ খুব ভয়াবহ।’ ফুপা হকচকিয়ে গেলেন। চট করে তাঁর চোখ বড় বড় হয়ে গেল। তিনি জড়ানো গলায় বললেন, কেন?’
‘আপনার জীবন হবে নিঃসঙ্গ। প্রচুর মদ্যপান করবেন। দু’বছরের মাথায় বড় ধরনের স্ট্রোক হবে। যদি বেঁচে যান তাহলেও সমস্যা। ফুপুর সঙ্গে খিটিমিটি লেগেই থাকবে। শেষটায় এমন দাঁড়াবে যে দু’জন থাকবেন দু’বাড়িতে।’ ‘এসব তুমি কি বলছ?’ ‘যা ঘটবে তাই বলছি ফুপা।’ ‘তোমার আধ্যাত্মিক ক্ষমতা থেকে বলছ না অনুমান করছ?’
‘আধাত্মিক ক্ষমতা থেকে বলছি, তবে লজিকও একে সাপোর্ট করবে। মেয়ে কাছে নেই, ছেলেও চলে যাচ্ছে। নিঃসঙ্গ হওয়াটা তো স্বাভাবিক। সামনের বছর রিটায়ার করছেন। কাজেই মেজাজ থাকবে খারাপ। এম্নিতেই আপনি সিগারেট বেশি খান। তার পরিমাণ আরো বাড়বে। নিঃসঙ্গতার দূর করার জন্যে মদ্যপানের মাত্রা দেবেন বাড়িয়ে। স্ট্রোক হবে। যতই দিন যাচ্ছে, ফুপুর সঙ্গে ততই আপনার দুরুত্ব বাড়ছে। যেহেতু বাড়ি ছাড়াও ঢাকায় আপনার একটি এ্যাপর্টমেন্ট আছে, কাজেই অনুমান করছি শেষের ভয়ংকর দিনগুলিতে দু’জন থাকবেন দু’জায়গায়।’
কফি চলে এসেছে। ফুপা শুকনো মুখে কফির পেয়ালার চুমুক দিচ্ছেন। ফুপার মুখের ভাব দেখে আমার মায়াই লাগল। আমি কফি শেষ করে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললাম, এতটা মন খারাপ করার কিছু নেই ফুপা। আগেভাগে সমস্যা জানা থাকলে সমস্যা এড়ানো যায়।ফুপা গম্ভীর গলায় বললেন, তুমি যা বলছ তাই হবে। আমি সমস্যা এড়াতে পারব না। আমার সেই ক্ষমতাই নেই। তুমি তো খবর রাখ না, মদ্যপান তিনগুণ বেরেছে। এখন রোজই খাই। ফুপুর সঙ্গে বাক্যালাপ সাতদিনের ভেতর দু’দিনই থাকে বন্ধ। তুমি এসো, আজ সন্ধ্যায় কথা বলব।
ফুপার বাড়িতে যাবার আগে আগে পুরানো ঢাকায় গেলাম। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তিতলী যে বাড়িতে থাকে সেটা বের করলাম। ভঙ্গুর দশার এক দোতলা বাড়ি। আধঘণ্টার মত কড়া নাড়ার পর বুড়ো মত এক লোক বের হয়ে এলেন। আমি তিতলীর সঙ্গে দেখা করতে চাই শুনে তিনি খুবই সন্দেহজনক চোখে আমাকে দেখতে লাগলেন। ‘তিতলী এ বাড়িতে থাকে আপনাকে কে বলল?’ ‘তার বাবা বলেছেন।’ ‘তিনি বলবেন কিভাবে? তিনি তো জেলে।’ ‘ব্যাখ্যা করতে হলে অনেক সময় লাগবে। আপনি তিতলীকে দয়া করে বলুন হিমু এসেছে।’ ‘আপনি কোথেকে এসেছেন?’ ‘এতসব জানার কোন দরকার নেই। আমার নাম বললেই হবে।’ ‘কি নাম বললেন?’ ‘হিমু। হিমালয়।’ ‘দাঁড়ান এইখানে।’
আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলাম।ভদ্রলোক ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। নেমে এলেন প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। বিরস মুখে বললেন, তিতলী বলেছে দেখা হবে না। ‘আপনি কি আমার নাম বলেছিলেন?’ ‘বলেছিলাম।’ ‘গুবলেট পাকননি তো। একটা বলতে গিয়ে আরেকটা বলেননি তো?’ ‘বলেছি হিমু দেখা করতে চায়। হিমালয়।’ ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’
ভদ্রলোক ভেতরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। কেন জানি মনে হচ্ছে ভদ্রলোক আবার দরজা খুলে বলবেন—অপ্রস্তুত গলায় বলবেন, আপনাকে বসতে বলেছে। ইনট্যুশন কাজ করল না। আধঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পরেও দরজা খুলল না।
ফুপার পুরো বাড়ি অন্ধকার। পোর্চেও আলো নেই। ব্যাপার কি কিছুই বুঝতে পারছি না। গেট খুলে অনিশ্চিত ভঙ্গিতে ভেতরে ঢুকলাম। মনে হচ্ছে বাড়ি খা খা করছে। কেউ নেই। বারান্দায় পা দিতেই ফুপা বললেন, এসো হিমু, তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছি। ‘বাড়ি অন্ধকার কেন?’
‘বুঝতে পারছি না। সব বাড়িতে ইলেকট্রিসিটি আছে, শুধু এখানেই নেই। কোন মানে হয় বল তো? ইলেট্রিসিয়ানকে খবর দিয়েছিলাম—সে বলল কাট-আউট চুরি হয়ে গেছে। কাট-আউট কোন বাড়িতে চুরি হয়? চোর কাট-আউট দিয়ে কি করবে বল দেখি?’ ‘কাট-আউট লাগিয়ে দিলেই হয়।’ ‘এখানে যেসব পাওয়া যায় সেগুলি ফিট করে না। ব্যাংকক থেকে এনেছিলাম। ড্রাইভারকে পাঠিয়েছি খুঁজে দেখতে কোথাও পায় কিনা।’ ‘বাড়িতে কেউ নেই?’
‘তোমার ফুপু নেই। সমান্য একটু আর্গুমেন্ট হয়েছে। স্যুটকেস গুছিয়ে সন্ধ্যাবেলা চলে গেল।’ ‘গেছেন কোথায়/’ ‘বলে গেছে হোটেলে গিয়ে উঠবে। যন্ত্রণা আর সহ্য হচ্ছে না। ইট ইজ হাই টাইম দ্যাট সামথিং হ্যাজ টু বি ডান। মনে হয় না এই মহিলার সঙ্গে বাস করতে পারব।’ ‘বাদল বাড়িতে নেই?’ ‘আছে। ঘরে বসে কি সব যেন করছে। গোদের উপর বিষ ফোঁড়া।’ ‘আমি ওর সঙ্গে একটু গল্প করে আসি ফুপা। অনেক দিন কথা হয় না।’ ‘যাও। ও, আরেকটা কথা, তোমাকে ডিনারের নিমন্ত্রণ করেছিলাম, সরি, এব্যাউট দ্যাট কিছু রান্নাই হয় নি। কাজের মেয়ে দু’জন আছে, ওরা রাঁধতে পারত। তোমার ফুপু তাদের নিষেধ করে দিয়েছে। দু’জনকেই ছুটি দেয়া হয়েছে।’
‘এটা কোন সমস্যা না ফুপা। পাউরুটি আছে তো, ঐ খেয়ে নেব।’ ‘পাউরুটি খেতে হবে না। ড্রাইভারকে বলেছি যা পায় নিয়ে আসতে। বাদলের সঙ্গে কথাবার্তা যা বলার বলে তুমি ছাদে চলে এসো।’ বাদলের ঘরে ঘিয়ের প্রদীপ জ্বলছে। প্রদীপের সামনে সে পদ্মাসন হয়ে বসে আছে। তার পরণে গেরুয়া চাদর। ‘হচ্ছে কি এসব?’
‘মনটা স্থিতি করার চেষ্টা করছি। তুমি বলেছিলে না—মন বিক্ষিপ্ত হলে প্রদীপের দিকে তাকিয়ে মন স্থিতি করা যায়।’ ‘বলেছিলাম নাকি।’ ‘কি আশ্চার্য! না বললে আমি জানব কোথেকে?’ ‘মন কি খানিকটা স্থিতি হয়েছে?’ ‘বুঝতে পারছি না হিমুদা। এসো ঘরে এসো।’ ‘তোর সাধনায় বিঘ্ন হবে না তো?’ ‘কি যে তুমি বল।’ ঘরে ঢুকতে ঢুকতে আমি বললাম, কাট-আউট তুই-ই চুরি করেছিস?
বাদল বিস্মিত হয়ে বলল, কি করে বুঝলে? ও আচ্ছা, তুমি তো বুঝবেই। ঘর পুরোপুরি অন্ধকার না করলে প্রদীপের আলো স্পষ্ট বোঝা যায় না। এইজন্যেই কাট-আউট খুলে ড্রয়ারে রেখেছি। ভাল করিনি হিমুদা? বাদল উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে আছে। আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, ঠিকই আছে। শুনলাম তুই আমেরিকা যাচ্ছিস? বাদল হাসল। ‘কি পড়বি সেখানে?’ ‘আমেরিকা গেলে তবে তো পড়বে?’ ‘যাচ্ছিস না?’ ‘তুমি পাগল হলে হিমুদা? আমি আমেরিকা যাব কেন?’ ‘তাহলে যাওয়া হচ্ছে না?’
‘অফকোর্স না এম্নিতে অবশ্যি কাউকে কিছু বলছি না। সবাই ভাবছে আমি যাচ্ছি। কাজেই আমাকে কেউ ঘাটাচ্ছে না। যা ইচ্ছা করতে পারছি। হিমুদা, আমি এইখানেই থাকব।’ ‘ফুপা-ফুপু মনে কষ্ট পাবেন।’ ‘আমি চলে গেলে আরো কষ্ট পাবেন।’ ‘তা ঠিক। তবে নিজের জীবন নিয়ে ওতো ভাবতে হবে। বড় হয়ে কি করবি?’ ‘তুমি যা করছ আমি তাই করব। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরব। হিমুদা, এখন তুমি আমাকে মন স্থিতি করার কৌশলটা ভালমত শিখিয়ে দাও। প্রদীপটা শুধু কাঁপছে। দরজা জানালা বন্ধ করে দেব। পদ্মসনটা কি ঠিকমত হয়েছে?’
‘সবই ঠিক আছে। দরজা খোলা রাখাই ভাল। এতে শরীর ঠাণ্ডা থাকবে। ফ্যান বন্ধ করে দে।’ ‘চাদরটা খুলে খালি গা হব?’ ‘রেশমী কাপড় গায়ে থাকলে ভাল? তোর মটকা পাঞ্জাবি আছে না? ঐ একটা পরে নে।’ ‘ভাগ্যিস তুমি এসেছিলে হিমু দা। তুমি না এলে কি যে হত।’ ‘তুই সাধনা চালিয়ে যা।আমি ফুপার সঙ্গে দেখা করে আসি।’ ‘না না, তুমি এখানে বস।’ ‘এখানে বসলে হবে কি করে? তুইতো এখন সাধনা করবি।’ ‘ও আচ্ছা, তাও তো কথা। আচ্ছা তুমি যাও।’
যা ভেবেছিলাম, তাই। বড় ফুপা পানের যাবতীয় আয়োজন নিয়ে ছাদে বসেছেন। আইসবক্সে বরফ। ঝাল মরিচ মাখানো চিনা বাদাম। তিনি বসে আছেন শীতল পাটিতে। ঠিক বসে নেই—আধশোয়া হয়ে আছেন।
‘বস হিমু। তোমার ফুপু চলে যাওয়ার একদিকে ভাল হয়েছে। ক্যাট ক্যাট করে কথা শুনাবে না। মুখ গম্ভীর করে থাকবে না। পুরো বোতল শেষ করলেও কারো কিছু বলার নেই। ‘পুরো বোতল শেষ করবেন?’ ‘না। শরীরে সহ্য হয় না। পাঁচ পেগের বেশি এখন আর পারি না। এর কম হলে ঘুমের অসুবিধা হয়। বেশি হলে বমি বমি ভাব গয়।’ ‘আপনি কি নিয়মিতই পাঁচ করে চালাচ্ছেন?’
‘কাল একটু বেশি হয়ে গেল। দশ ক্রস করে ফেললাম। তারপর বমি টমি করে কেলেংকারী অবস্থা। তবে কাল ঘুম খুব ভাল হয়েছিল। এক ঘুমে রাত কাবার। এখন বল হিমু তুমি কেমন আছ?’
‘ভাল।’ ফুপা গ্লাসে লম্বা চুমুক দিতে দিতে বললেন,নেশাটা ঠিকমত ধরুক, তারপর হায়ার ফিলসফি নিয়ে আলাপ করব। মনের তরল অবস্থায় হায়ার ফিলসফি নিয়ে আলাপ করতে ভাল লাগে। আচ্ছা, তুমি কি মাওলানা জালালুদ্দিন রুমীর কবিতা পড়েছ?
‘না।’ ‘আমিও পড়ি নি। শুনেছি—উনি মদ্যপান নিয়ে অনেক ভাল ভাল কথা লিখেছেন। ভাল কাজ করলেও লোকে ভাল কথা বলে না। মদ্যপান তো কোন ভাল কাজ না। এই নিয়েও একটা লোক ভাল বলবে ভাবাই যায় না। পড়ে দেখা দরকার। কি বল হিমু?’ আপনি দেখি অতি দ্রুত চালিয়ে যাচ্ছেন ফুপা।’ ‘প্রথম তিনটা অতিদ্রুত খেতে হয়। তারপর স্লো। স্টিডি হয়ে যেতে হয়। এটাই নিয়ম।’ ‘আজকে আপনি পাঁচের ভেতর থাকবেন, না সীমা অতিক্রম করবেন?’
‘তোমার ফুপু নেই। সুযোগ যখন পাওয়া গেছে হা হা হা –সীমা অতিক্রম করার আনন্দ আছে হিমু। আনন্দ আছে বলেই সবাই সীমা অতিক্রম করতে চায়। অবশ্যি আমাদের হলি বুকে সীমা অতিক্রম করতে নিষেধ করা হয়েছে। হা হা হা।’ ‘আপনি শুধু শুধু হাসছেন ফুপা।’
‘শুধু শুধু হাসছি না-কি? যা ভাবছ তা না। এখনো নেশা হয়নি। আনন্দে হাসছি। তোমার ফুপু বাড়িতে নেই এই জন্যেই আনন্দ বোধ হচ্ছে। আই হেই দিস উইম্যান। সারা জীবন হেট করেছি, মুখে কখনো বলিনি। ভদ্রতা করে বলিনি। আজ তোমাকে বললাম।’ আমি তাকিয়ে আছি। মনে হচ্ছে অন্ধকারেও ফুপার চোখে চকচক করছে। বিড়ালের চোখের মত জ্বলছে।
‘হিমু।’ ‘জ্বি।’ ‘মাঝে মাঝে ঐ মহিলাকে আমার খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করে। আমাকে খুশি করার জন্য সে আবার কখনো কখনো আহ্লাদী ধরনের কথা বলে। আমি মনে মনে বলি, “চুপ হারামজাদী”। কিন্তু বাইরে এমন ভাব দেখাই যেন বড় আনন্দিত।’ ‘ফুপু কি আপনাকে পছন্দ করেন?’
‘কে জানে করে কি-না। হু কেয়ারস? বুঝলে হিমু, আমার জীবনটা আমি নষ্ট করে ফেলেছি।তেইশ বছর এমন একজন মহিলার সঙ্গে কাটালাম যাকে আমি সহ্যই করতে পারি না।’ ‘ফুপা আর খাবেন না। আপনি ঠিকমত কথা বলতে পারছেন না। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে।’
Read more
