আমার মেয়েটা যে কত ভাল তা একমাত্র আমি জানি আর জানেন আল্লাহপাক । আপনার কাছে আমি হাতজোড় করছি।’বায়েজিদ সাহেব সত্যি সত্যি হাত জোড় করলেন । আমি বিব্রত গলায় বললাম – ‘ভাই, আপনি আমার হলুদ পাঞ্জাবি, লম্বা দাড়িগোঁফ দেখে বিভ্রান্ত হ-য়েছেন । আপনার দোষ নেই, অনেকেই হয় । বিশ্বাস করুন, আমি মহাপুরুষ না । অতি সাধারণ মানুষ প্রচুর মিথ্যা কথা বলি, অনেক ধরণের ভড়ং করি । মানুষকে হকচকিয়ে দেয়ার একটা সচেতন চেষ্টা আমার মধ্যে থাকে । কাজকর্ম করার কোন ক্ষমতা নেই বলেই আমি ভবঘুরে । বুঝতে পারছেন’?
বায়েজিদ সাহেব আগের মতো কোমল গলায় বললেন, ‘আপনি এক্তু দোয়া করবেন আমার মেয়ের জন্যে । অনেকদিন বলার চেষ্টা করেছি । সাহস পাইনি । আজ আল্লাহপাক সুযোগ করে দিয়েছেন’।
আমি হাসতে হাসতে বললাম, ‘ঠিক আছে, প্রার্থনা করলাম । অসম্ভব রুপবান এবং ধনবান ছেলের সঙ্গে আপনার কন্যার বিয়ে হবে । তারা দু’জনে মিলে ঘুরবে দেশ থেকে দেশান্তরে’।
বায়েজিদ সাহেব ক্ষীণ গলায় বললেন, আপনার অসীম শুকরিয়া ।
আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে মহাপুরুষদের মতেই গম্ভীর ভঙ্গিতে নিচে নেমে গেলাম । ভাল যন্ত্রনা হয়েছে । আমারেক অলৌকিক ক্ষমতাধর মনে করে এমন লোকের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে । একটা আশ্রম টাশ্রম খুলে বসার সময় বোধহয় হয়ে এসেছে ।- কমন বাথরুমে নিচে । এত ভোরে কেউ উঠেনি । বাথরুমে খালি পাওয়া যাবে । কল ছেড়ে কিছুক্ষণ মাথা পেতে বসে থাকব । তারপর পর পর তিন কাপ চা খেতে হবে । রাতে ঘুম না হওয়ায় মাথা জাম হয়ে আছে ।
চা খেয়ে রফিকের বাসায় একবার যেতে হবে । সে গত এক সপ্তাহে ধরে দুদিন পর পর আমার কাছে আসছে । কখনো দেখা হচ্ছে না । সে এমন সময় আসে যখন আমি থাকি না । তার ব্যাপারটি কি, কে জানে ? বাথরুমের বেসিন অনেকদিন ধরেই ভাঙ্গা । আজ দেখি নতুন বেসিন । বেসিনের উপর নতুন আয়না । মেসের মালিক বসিরুদিন সাহেব খরচের চুড়ান্ত করেছেন বলে মনে হচ্ছে ।
দরজার ওপাশে খন্ড-৩
বেসিনের কাছে না গিয়েও বলতে পারছি কোন রিজেকটেড বেসিন বসিরুদিন সাহেব কুড়িয়ে এনে ফিট করে দিয়েছেন । আয়নাটাও হবে ঢাকা শহরের সবচে সস্তা আয়না । মুখ দেখা যাওয়ার কোন কারণ নেই । আয়না দেখলেই আমার কাছে দাঁড়াতে ইচ্ছা করে । খুবই ক্ষুদ্র ইচ্ছা । এবং নির্দোষ ইচ্ছা । তবু অতি ক্ষুদ্র ইচ্ছাকে প্রশ্রয় দিতে নেই । একবার প্রশ্রয় দেয়া শুরু করলে সব ইচ্ছাকেই প্রশ্রয় দিতে মন চাইবে । ‘‘যে মানব সন্তান ক্ষুদ্র কামনা জয় করতে পারে সে বৃহৎ কামনাও জয় করতে পারে।’’ এই মহৎ বাণী আমার বাবার ।
চামড়ায় বাঁধানো তিনশ একুশ পৃষ্টার একটা খাতায় তিনি এইসব বাণী মুক্তার মত গোটা গোটা হরফে লিখে রেখে গেছেন । পুরো খাতাটাই হয়তো ভরে ফেলার ইচ্ছা ছিল । সময় পাননি । , মাত্র চার দিনের নোটিসে তাঁকে পৃথিবী ছাড়তে হল । জ্বর হল । জ্বরের চতুর্থ দিনে বিস্ময় এবং দুঃখ নিয়ে তাঁকে বিদায় নিতে হল । আমাকে হতাশ গলায় বললেন, আসলে কথা তোকে কিছুই বলা হল না । অল্প কিছু লিখেছি- এতে কিছুই হবে না । তিনি আঠারো পৃষ্টা পর্যন্ত লিখেছেন । কিছু কিছু বাণী লেখার পরও কেটে ফেলা হয়েছে, তাঁর পছন্দ হয়নি । বাণীর মধ্যেও ভেজাল আছে । এ রকম একটা ভেজাল বাণী হল :
‘‘হে মানব সন্তান, সুখের স্বরুপ নির্ধারণের চেষ্টা কর । যে সুখের স্বরুপ জেনেছ ।
সে দুঃখ জেনেছে । দুঃখের বাস সুখের মাঝখানে ।’’
এই বাণ লাল কালি দিয়ে কেটে তার নিচে বাবা লিখেছেন – ভার অস্পষ্ট ও ধোঁয়াটে ।
কলের নিচে মাথা পেতে মনে হল জগৎ সংসারে সবটাই কি অস্পষ্ট ও ধোঁয়াটে নয়?
Read More
হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস দরজার ওপাশে খন্ড-৪
