হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ৬

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ৬

ভদ্রলোকের বুদ্ধি তো ভালাই । এমন বুুদ্ধিমান একজন মানুষ রিনকির মতো গাধা টাইপের একটি মেয়ের সঙ্গে জীবন কী করে টেনে নেবে কে জানে । হ্যালো! হ্যালোলাইন কি কেটে গেল ?

না, কাটেনি । আপনি কি হিমু ভাই ?

হ্যাঁ ।  রিনকি বলেছে আপনার নাকি অলৌকিক তা আছে ।

কী রকম ক্ষমতা ।

প্রফেটিক ক্ষমতা । আপনি নাকি ভবিষ্যতের কথা বলতে পারেন । আপনি যা বলেন তা-ই নাকি হয় ।

আমি চুপ করে রইলাম । এই জাতীয় প্রসঙ্গে এলে চুপ করে থাকাই নিরাপদ । হ্যাঁ- না কিছু বললেই তর্কের মুখোমুখি হতে হয় । তর্ক করতে আমার ভালো লাগে না । হ্যালো! হ্যালো! লাইনটা ডিসটার্ব করছে । হ্যালো হিমুভাই!

বলুন ।

আপনি কি দয়া করে একটু রিনকিকে…

ওকে তো দেয়া যাবে না । ও আশেপাশে নেই । বাবার সেবা করছে । উনি অসুস্থ । অসুস্থ ? কী বলছেন? সিরিয়াস কিছু ?                    সিরিয়াস বলা যেতে পারে ।

বলেন কী! আমি আসব?

আমি কয়েক মুহুর্ত দ্রুত চিন্তা করে বললাম, আসতে অসুবিধা হবে না তো ? না-না অসুবিধা কী! আমার গাড়ি আছে ।                    আকাশের অবস্থা ভালো না । ঝড়বৃষ্টি হতে পারে । হোক । বিপদের সময় উপস্থিত না থাকলে কী করে হয় ? তা তো বটেই । আপনি এক্ষুনি রওনা না হয়ে ঘন্টাখানেক পরে আসুন । কেন বলুন তো ?

এমনি বললাম ।

ঠিক আছে ।ঠিক আছে । আপনার কথা অগ্রাহ্য করব না । যেসব কথা আমি শুনেছি – মাই গড । আপনি দয়া করে আমার সম্পর্কেও কিছু বলবেন । মাই আর্নেস্ট রিকোয়েস্ট ।

আচ্ছা বলব ।

হিমুভাই, তাহলে রাখি ? আর ইয়ে,আমি যে আসছি এটা রিনকিকে বলবেন না । একটা সারপ্রাইজ হবে ।

আমার টেলিফোন-ব্যাধি আছে । একবার টেলিফোনের কারো সঙ্গে কথা বললে, আবার অন্য কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে। রূপাদের বাসায় করলাম । রূপার বাবা ধরতেই বললাম, আচ্ছা, এটা কি রেলওয়ে বুকিং? রূপার বাবা বললেন, জি-না । আপনার রঙ নাম্বার হয়েছে । তখন আমি বললাম, জাস্ট ওয়ান মিনিট, রূপা কি জেগে আছে ?

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ৬

 

রূপার বাবার হাইপ্রেসার বা এই জাতীয় কিছু বোধহয় আছে । অল্পতেই রেগে গিয়ে এমন হৈচৈ শুরু করেন যে বলার মত না । আমার কথাতেও তাই হল । তিনি চিড়চিড়িয়ে উঠলেন, কে ? কে ? এই ছোকরা, তুমি কে ? তিনি খুব হৈচৈ করতে লাগলেন । আমি রিসিভার রেখে দিলাম । রূপার বাবা নিশ্চয়ই সবাইকে ডেকে এই ঘটনা বলবেন । রূপা সঙ্গে সঙ্গে বুঝবে কে টেলিফোন করেছিল। সে হাসবে না রাগ করবে কে জানে । যেখানে রাগ করা উচিত সেখানে সে রাগ করে না, হাসে । যেখানে হাসা উচিত সেখানে রাগ করে ।

আমি ওয়ান সেভেনে রিং করে জাস্টিস এম.সোবহানের বাসা চাইলাম । সম্ভব হলে মীরা বা মীরুর সঙ্গেও কথা বলা যাবে । কী বলব ঠিককরা হলো না । যা মনে আসে, তাই বলব । আগে থেকে ভেবেচিন্তে কিছু বলা আমার স্বভাবে নেই ।

হ্যালো ।

কে মীরা ?

হ্যাঁ । আপনি কে বলছেন ?

আমার নাম টুটুল ।

কে ?

অনেকক্ষন চুপচাপ কাটল । মনে হচ্ছে মীরা ঘটনার আকস্মিকতায় বিচলিত । আমার মনে হয়, কথা বলবে কি বলবে না বুঝতে পারছে না ।   ভুলে গেছেন ? ঐ যে পুলিশর হাতে তুলে ‍দিলেন । কী করেছিলাম আমি বলুন তো ?

কোথেকে টেলিফোন করছেন ?

হাসপাতাল থেকে । পুলিশ মেরে আমার অবস্থা কাহিল করে দিয়েছে । রক্তবমি করছিলাম ।

সে কী কথা, মারবে কেন !

পুলিশের হাতে আসামি তুলে দেবেন আর পুলিশ আসামিকে কোলে বসিয়ে মণ্ডা খাওয়াবে ? আমি তো আপনাদের কোনোই ক্ষতি করিনি । গাড়িতে ডেকেছেন, উঠেছি । তাছাড়া আপনার টুটুল টুটুল করছিলেন । আমার ডাকনামও টুটুল । আপনি কিন্ত্ত বলেছেন, আপনার নাম টুটুল নয় ।

হ্যাঁ বলেছিলাম । কারণ, বুঝতে পারছিলাম আপনি অন্য টুটুলকে খুঁজছিলেন যার কপালে একটা কাটা দাগ ।

ওপাশে অনেকক্ষণ কোনো কথা শোনা গেল না । অন্ধকারে ঢ়িল ছুড়েছিলাম । মনে হচ্ছে লেগে গেছে । এটা একটা আশ্চর্য ব্যাপার !যা বলি প্রায় সময় তা কেমন যেন  মিলে যায় । টুটুলের কপালের কাটা দাগের কথাটা হঠাৎ মনে এসেছিল । ভাগ্যিস এসেছিল !

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ৬

 

হ্যালো, আপনি কোনো হাসপাতালে আছেন ?

কেন, দেখতে আসবেন ?

বলুন না কোন হাসপাতালে ?

বাসায় চলে যাচ্ছি । ওরা বুকের এক্সরে করেছে । দুটা স্টিচ দিয়েছে । বলেছে ভর্তি হবার দরকার নেই ।

আমি এক্ষুনি বাবাকে বলছি । থানায় টেলিফোন করবেন ।

আমি শব্দ করে হাসলাম ।

হাসছেন কেন ? পুলিশ কি কখনো মারের কথা স্বীকার করে ? কখনো করে না । আচ্ছা রাখি । না না রাখবেন না । প্রিজ । না । প্রিজ ।

আমি টেলিফোন নামিয়ে রাখলাম । ঠিক তখন প্রবল বর্ষণ শুরু হলো । কালবৈশাখী ঝড় । কালবৈশাখী ঝড় । কালবৈশাখী সাধারণত চৈত্র মাসেই হয় । ঝড়ের নাম হওয়া উচিত ছিল কালচৈত্র ঝড় ।  দেখতে দেখতে অসহ্য গরম চলে গিয়ে চারদিক হিম-শীতল হয়ে গেল । নির্ঘাৎ আশেপাশে কোথাও শিলাবৃষ্টি হচ্ছে । ছাদে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজব কি ভিজব না মনস্থির করতে পারছি না । রিনকি বের হয়ে বাবার ঘর থেকে । তাকে কেমন যেন শঙ্কিত মনে হচ্ছে । আমি বললাম, রিনকি , তুই একটু বসার ঘরে যা । কলিংবেল বাজতেই দরজা খুলে দিবি ।

রিনকি বিস্মিত গলায় বলল, কেন ?

তোর জন্যে একটা সারপ্রাইজ আছে ।

রিনকি নিচে নামার সঙ্গে সঙ্গে কলিংবেল বাজল । আমার মনটাই অন্যরকম হয়ে গেল । ঝড়বৃষ্টির মধ্যে দেখা হোক দুজনের ।

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড-৭

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *