দীর্ঘস্থায়ী হোক এই মূহুর্ত । রিনকি দরজা খুলছে । না জানি তার কেমন লাগছে ।
আমি বাদলের ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়লাম । নদীটাকে আনা যায় কিনা দেখা যাক । যদি আনতে পারি ওদের দুজনকে কিছুক্ষণের জন্যে এই নদী ব্যবহার করতে দেব । হিমুৃভাই !
তুই কি এখনো জেগে আছিস ?
হু । রাতে আমার ঘুম হয় না ।
বলিস কী!
ঘুমের অষুধ খাই । তাতেও লাভ হয় না । দশ মিলিগ্রাম করে ফ্রিজিয়াম ।
আজ খেয়েছিস ?
না । আজ সারারাত তোমার সঙ্গে গল্প করব ।
গল্প করতে ইচ্ছা করছে না । আয়, তোকে ঘুম পাড়িয়ে দি ।
ঘুমুতে ইচ্ছা করছে না ।
আজ ঘুমিয়ে থাক । কাল গল্প করব ।
ঘুম আসবে না ।
ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড-৭
বললাম, ঘুম এনে দিচ্ছি । না-কি তুই আমার কথা বিশ্বাস করিস না ?
কী যে বল ! কেন বিশ্বাস করব না ? তুমি যা বল তাই হয় ।
বেশ, তাহলে চোখ বন্ধ কর । করলাম ।
মনে কর তুই হেঁটে হেঁটে যাচ্ছিস । চৈত্র মাসের কড়া রোদ । হাঁটছিস শহরের রাস্তায় ।
হ্যাঁ ।
এখন তুই শহর থেকে বেরিয়ে এসেছিস । গ্রাম, বিকেল । সূর্য নরম । রোদে কোনো তেজ নেই । ফুরফুর বাতাস তোর শরীর ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে ।
হু ।
হঠাৎ তোর সামনে একটা নদী পড়ল । নদীতে হাঁটুজল । কী ঠাণ্ডা পানি ! কী পরিষ্কার ! আঁজলা ভরে তুই পানি খাচ্ছিস । ঘুমে তোর চোখ জড়িয়ে আসছে । ইচ্ছা করছে নদীর মধ্যেই শুয়ে পড়তে ।
হু ।
নদীর ধারে বিশাল একটা পাকুড় গাছ । তুই সেই পাকুড় গাছের নিচে এসে দাঁড়িয়েছিস । এখন শুয়ে পড়লি । খুব নরম হালকা দূর্বাঘাসের উপরে শুয়েছিস । আর জেগে থাকতে পারছিস না । রাজ্যের ঘুম তোর চোখে । বাদল এবার আর হু বলল না । কিছুক্ষণের মধ্যে তার ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা গেল । এই ঘুম সহজে ভাঙবে না ।
কেউ যদি এটাকে কোনো অস্বাভাবিক বা অলৌকিক কিছু ভেবে বসেন তাহলে ভুল করবেন । পুরো ব্যাপারটার পেছনে কাজ করছে আমার প্রতি বাদলের অন্ধভক্তি । যে ভক্তি কোনো নিয়ম মানে না । যার শিকড় অনেকদূর পর্যন্ত ছড়ানো ।
বাদল না হয়ে অন্য কেউ যদি হতো তাহলে আমার এই পদ্ধতি কাজ করত না । এই ছেলেটা আমাকে বড়ই পছন্দ করে । সে আমাকে মহাপুরুষের পর্যায় ফেলে রেখেছে । আমি মহাপুরুষ না ।
ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড-৭
আমি ত্রূমাগত মিথ্যা কথা বলি । অসহায় মানুষদের দুঃখকষ্ট আমাকে মোটেই অভিভূত করে না । একবার আমি একজন ঠেলাঅলার গালে চড়ও দিয়েছিলাম । ঠেলাআলা হঠাৎ ধাক্কা দিয়ে আমাকে রাস্তার ড্রেনে ফেলে দিয়েছিল । নোংরা পানিতে আমার সমস্ত শরীর মাখামাখি । সেই অবস্থাতেই উঠে এসে আমি তার গালে চড় বসালাম । বুড়ো ঠেলাআলা বলল, ধাক্কা দিয়া না ফেললে আপনে গাড়ির তলে পড়তেন । আসলেই তাই । যেখানে আমি দাঁড়িয়েছিলাম ঠিক সেখান দিয়ে একটা পাজেরো জিপ টার্ন নিল । নতুন আসা এই জিপগুলির আচার-আচরণ ট্রাকের মতো । আমি গম্ভীর গলায় বললাম, মরলে মরতাম । তাই বলে তুমি আমাকে নর্দমায় ফেলবে ? ঠেলাআলা করুণ গলায় বলল, মাফ কইরা দেন । আর ফেলুম না । আমি আগের চেয়ে রাগী গলায় বললাম, মাফের কোনো প্রশ্নই আসে না । তুমি কাপড় ধোয়ার লন্ডির পয়সা দেবে ।
গরিব মানুষ ।
গরিব মানুষ, ধনী মানুষ বুঝি না । বের কর কী আছে ?
অবাক বিস্ময়ে বুড়ো আমার দিকে তাকিয়ে রইল ।
আমি বললাম, কোনো কথা শুনতে চাই না বের কর কী আছে । মাঝে মাঝে মানুষ তীব্র আঘাত করতে ভালো লাগে । কঠিন মানসিক যন্তণায় কাউকে দগ্ধ করার আনন্দের কাছে সব আনন্দই ফিকে । এই লোকটি আমার জীবন রক্ষা করেছে । সে কল্পনাও করেনি কারোর জীবন রক্ষা করে সে এমন বিপদে পড়বে । যদি জানত এই অবস্থা হবে তাহলেও কি সে আমার জীবন রক্ষা করার চেষ্টা করত ?
Read more