মা কোনাে কথা বললেন না। বাবা বললেন, ‘দেরি হয়ে যাচ্ছে, খােকা তুই নেমে যা।
‘আমিও সঙ্গে যাই বাবা?‘ ‘না–না, তুই থাক। বাসায় ওরা একা। নেমে যা, নেমে যা।
মাসি গলা বাড়িয়ে বললেন, ‘পানের কৌটা ফেলে এসেছি, কেউ আসে তাে সঙ্গে দিয়ে দিও।‘
গাড়ি ছেড়ে দিল। মন্টু গাড়ির পেছনে পেছনে বড়াে রাস্তা পর্যন্ত গিয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে ফিরে এল। রুনু–ঝুনুকে নিয়ে আমি বসে রইলাম বারান্দায়। জন্ম বড়াে বাজে ব্যাপার। মৃতার চেয়েও করুণ।
বুকের উপর চেপে থাকা বিষন্নতা দেখতে দেখতে কেটে গেল। আবহাওয়া তরল হয়ে এল ঘন্টাখানেকের মধ্যে। ছােট খালা এলেন নয়টায় তাঁর মস্ত কালাে রঙের গাড়িতে করে, সঙ্গে মেয়ে কিটকি। রাবেয়া ঢাউস এক কেটলি চায়ের পানি চড়িয়ে দিল। রুনু ঝুনু স্কুলে যেতে হবে না শুনে আনন্দে লাফাতে লাগল।
শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-৬
সারা রাত নিঘুম থাকায় মাথা ব্যথা করছিল। চুপচাপ শুয়ে রইলাম। ইউনিভার্সিটিতে এক দফা যেতে হবে। স্যার কাল খোঁজ করেছিলেন, পান নি। আতিক কি জন্যে যেন তার বাসায় যেতে বলেছে। খুব নাকি জরুরী। চার্লি চ্যাপলিনের ‘দি কিড‘ ছবিটি চলছে গুলিস্তানে। আজ দেখব কাল দেখব করে দেখা হয় নি। দু‘ দিনের ভেতর দেখতে হবে। সামনের হপ্তায় কী একটা বাজে ছবি যেন।
‘কিরে খােকা, শুয়ে?
মৃদু সেন্টের গন্ধ ছড়িয়ে খালা ঢুকলেন। খালার সঙ্গে মায়ের চেহারার খুব মিল। তবে খালা মােটাসােটা, মা ভীষণ রােগা। খালা পাশের চেয়ারে বসলেন, ‘জ্বর নাকি রে?
‘জ্বি না, এই শুয়েছি একটু। ‘দেখি? খালা মাথায় হাত রাখলেন। ‘না, মােটেও জ্বর নেই। ডাক্তারের বউ হাফ–ডাক্তার হয় জান তাে? ‘জানি। জ্বরটর নয়, এমনি শুয়ে আছি।‘
‘খারাপ লাগছে? তা তাে লাগবেই, বুড়াে বয়সে মায়েদের যদি মেটারনিটিতে যেতে হয়।
আমি চুপ করে রইলাম। দরজার আড়াল থেকে কিটকি উকি দিল। খালা ঢাকলেন, ‘আয় ভেতরে।‘
টিকি লজ্জিতভাবে ঢুকল। যখন অন্য কেউ থাকে না তখন আমার সঙ্গে কিটকির ব্যবহার খুব সহজ ও আন্তরিক। বাইরের কেউ থাকলেই কিটকি সংকোচ ও লজ্জায় চোখ তুলে তাকায় না। শৈশবের একটি ছােট্ট ঘটনা থেকেই কিটকির এমন হয়েছে।
শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-৬
সে তখন খুব ছােট, ছ‘–সাত বৎসর বয়স হবে। মায়ের সঙ্গে বেড়াতে এসেছে। বাসায়। রুনু–ঝুনুর সঙ্গে সারা দুপুর হৈচৈ করে খেলল। মা যখন সবাইকে খেতে ডাকলেন, তখন তার হঠাৎ কী খেয়াল হল কি জানি, মাকে গিয়ে বলল, ‘খালা, আমি আপনাকে একটা কথা বলব, কাউকে বলবেন না তাে?‘
“না মা, বলব না।” ‘আল্লার কসম বলুন। ‘আল্লার কসম।
তা হলে মাথা নিচু করুন, আমি কানে কানে বলি।‘
মা মাথা নিচু করলেন এবং কিটকি ফিসফিস করে বলল, বড়াে হয়ে আমি খােকা ভাইকে বিয়ে করব। আপনি কাউকে বলবেন না তাে?
মা কিটকির কথা রাখেন নি। সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে বলে দিয়েছেন। যদিও সুদূর শৈশবের ঘটনা, তবু স্থানে–অস্থানে এই প্রসঙ্গ তুলে বেচারিকে প্রচুর লজ্জা দেওয়া হয়। মা তাে কিটকির সঙ্গে দেখা হলে এক বার হলেও বলবেন, “আমার বউমেয়েকে কেউ দেখি যত্ন করছে না?
কিটকি তার মায়ের পাশে বসল। সে আজ হলুদ রঙের কামিজ পরেছে, লম্বা বেণীতে মস্ত বড়াে বড়াে দু’টি হলুদ ফিতের ফুল। অল্প হাসল কিটকি। আমি
বললাম, কি কিটকি, আজ কলেজ নেই ?
‘আছে, যাব না।‘ ‘কেন?‘ ‘এমনি। কলেজ ভীষণ বােরিং। তা ছাড়া খালার অসুখ।
শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-৬
থাকবি আজ সারা দিন? ‘হা। আজ রাতে আপনাকে ভূতের গল্প বলতে হবে।‘ ‘ভূতের গল্প শুনে কাঁদবি না তাে আবার? ‘ইস, কাঁদব? ছােটবেলায় কবে কেদেছিলাম, এখনাে সেই কথা।‘ ‘ছােটবেলা তাে তুই আরাে কত কি করেছিস।‘ ‘ভালাে হবে না কিন্তু।
বলতে বলতে কিটকি লজ্জায় মাথা নিচু করল। খালা বললেন, ‘আমি হাসপাতালে যাই থােকা। কিটকি, তুই যাবি আমার সঙ্গে?
“না মা, আমি থাকি এখানে।
খালা চলে যেতেই রাবেয়া চায়ের ট্রে হাতে ঢুকল। বেশ মেয়ে রাবেয়া। এর ভেতর সে গােসল সেরে নিয়ে চুল বেঁধেছে। রানা শেষ করেছে, এক দফা চা খাইয়ে আবার চা এনেছে। রাবেয়া হাসতে হাসতে বলল, কি কিটকি? না–না ভিটকি বেগম, এই ঘরে কী করছ? পূর্বরাগ নাকি? সিনেমার মতাে শুরু করলে যে?‘
Read More