থাকলে কী ? আশ্চর্য! তুই তাে দেখি মানসিক রােগী হয়ে যাচ্ছিস। রােগা চিমশা তেলাপােকা টাইপের একটা মানুষ। তাকে ভয় পাওয়ার কী আছে?
খালু সাহেব ডাইনিং রুমের চেয়ারে খবরের কাগজ হাতে নিয়ে বসে আছেন। আমাকে ঢুকতে দেখে মুখের উপর থেকে কাগজ সরিয়ে একবার শুধু দেখলেন, আবার কাগজ দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললেন। যে দৃষ্টিতে দেখলেন সেই দৃষ্টির নাম সর্পদৃষ্টি। ছােবল দেবার আগে এই দৃষ্টিতে তারা শিকারকে দেখে নেয়। আমি বললাম, খালু সাহেব ভালাে আছেন ?
তিনি জবাব দিলেন না। মাজেদা খালা বললেন, এ কী! তুমি ওর কথার জবাব দিচ্ছ না কেন? বেচারা এমনিতেই তােমাকে ভয় পায়। এখন যদি কথারও জবাব না দাও, তাহলে তাে ভয় আরাে পাবে।
খালু সাহেব শুকনাে মুখে বললেন, আমি কাগজ পড়ছিলাম। কী বলেছে শুনতে পাই নি।
মাজেদা খালা বললেন, হিমু জানতে চাচ্ছে তুমি ভালাে আছ কিনা।
আমি ভালাে আছি।
সে আসে ধীরে খন্ড-৩
খালা বিরক্ত গলায় বললেন, এই তাে আবার মিথ্যা কথা বললে। তুমি ভালাে আছ কে বলল ? তােমার পেটের অসুখ। ডিসেনট্রি। দু‘দিন ধরে অফিসেও যাচ্ছ না। ফট করে বলে ফেললে ভালাে আছি। তুমি জাননা কেউ মিথ্যা কথা বললে আমি একেবারেই সহ্য করতে পারি না। আমার ব্লাডপ্রেসার বেড়ে যায়, পালপিটিশন হয়। হিমুকে সত্যি কথাটা বলাে। বলল যে তােমার শরীরটা বিশেষ ভালাে যাচ্ছে না।
খালু সাহেব পত্রিকা ভাজ করে রাখতে রাখতে বললেন আমার শরীরটা বিশেষ ভালাে যাচ্ছে না। ডিসেনট্রির মতাে হয়েছে। দিনে দশ–বারােবার টয়লেটে যেতে হচ্ছে। গত দু’দিন অফিসে যাই নি। আজও অফিস কামাই হবে।
খালুর সত্যভাষণে মাজেদা খালার মুখে হাসি দেখা গেল। খালা বললেন, ঠিক আছে, এখন তুমি খবরের কাগজ নিয়ে তােমার ঘরে যাও। হিমুর সঙ্গে আমার কিছু অত্যন্ত জরুরি কথা আছে ।
খালু সাহেব কোনাে কথা বললেন না, কাগজ হাতে উঠে চলে গেলেন। তাকে দেখাচ্ছে যুদ্ধে পরাজিত এবং বন্দি জেনারেলের মতাে। যে জেনারেল শুধু যে পরাজিত এবং বন্দি তা না, তিনি আবার বন্দি অবস্থায় পেটের অসুখও বাধিয়ে ফেলেছেন। অস্ত্র-গােলাবারুদের চিন্তা তার মাথায় নেই, এখন শুধু মাথায় পানি ভর্তি বদনার ছবি।
সে আসে ধীরে খন্ড-৩
খালার জরুরি কথা হলাে তার এক বান্ধবী (মিসেস আসমা হক, পিএইচডি) দীর্ঘদিন অস্ট্রেলীয়া প্রবাসী। তাদের কোনাে ছেলেমেয়ে নেই। ডাক্তাররা জবাব দিয়ে দিয়েছেন— আর হবে না। তারা বাংলাদেশ থেকে একটা বাচ্চা দত্তক নিতে চান।
মাজেদা খালা বললেন, কী রে হিমু, জোগাড় করে দিতে পারবি না?
আমি বললাম, অবশ্যই পারব। এটা কোনাে ব্যাপারই না। এক্সপাের্ট কোয়ালিটি বেবি জোগাড় করে দেব।
এক্সপাের্ট কোয়ালিটি মানে?
কালাকোলা, বেঁকা বেবি না, পারফেক্ট গ্লাক্সো বেবি। দেখলেই গালে চুমু খেতে ইচ্ছা করবে। থুতনিতে আদর করতে ইচ্ছা করবে। স্পেসিফিকেশন কী। বলাে। কাগজে লিখে নিই।
স্পেসিফিকেশন আসমা লিখেই পাঠিয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে উনিশ-বিশ হতে পারে। আবার কয়েকটা জায়গায় ওরা খুবই রিজিড। যেমন ধর, বাচ্চার মুখ হতে হবে গােল। লম্বা হলেও চলবে না, ওভাল হলেও চলবে না। গােল হতে হবে কেন?
খালা বললেন, আসমা এবং আসমার স্বামী দু’জনের মুখই গােল। এখন ওদের যদি একটা লম্বা মুখের বাচ্চা থাকে তাহলে কীভাবে হবে! লম্বা মুখের বাচ্চা দেখেই লােকজন সন্দেহ করবে হয়তাে এদের বাচ্চা না । মূল ব্যাপার হলাে- বাচ্চাটাকে দেখেই যেন মনে হয় ওদেরই সন্তান।
আর কী কী বিষয়ে তারা রিজিড ?
বাচ্চার বয়স হতে হবে দুই থেকে আড়াই-এর মধ্যে। দুইয়ের নিচে হলে চলবে না, আবার আড়াইয়ের উপরে হলেও চলবে না।
আমি বললাম, মাত্র জন্ম হয়েছে এরকম বাচ্চা নেয়াই তাে ভালাে। এ । ধরনের বাচ্চা বাবা-মা’কে চিনে না। আশেপাশে যাদের দেখবে তাদেরই বাবা মা ভাববে।
খালা বললেন, ন্যাদা-প্যাদা বাচ্চা ওরা নেবে না। বাচ্চার হাগামুতা তারা পরিষ্কার করতে পারবে না। আসমার আবার শুচিবায়ুর মতাে আছে।
আমি বললাম, দু’বছরের বাচ্চারও তাে শুচু’ করাতে হবে। সেটা কে করাবে? যে মহিলার শুচিবায়ু আছে সে নিশ্চয়ই অন্যের বাচ্চাকে শুচু করাবে।
খালা বললেন, এটা তাে চিন্তা করি নি।
তুমি বরং উনাকে জিজ্ঞেস করে জেনে নাও। আমার তাে মনে হচ্ছে উনার দরকার টয়লেট ট্রেইন্ড বেবি। |আমি এক্ষুণি টেলিফোন করে জেনে নিচ্ছি। তুই বরং এই ফাকে আসমার পাঠানাে স্পেসিফিকেশনটা মন দিয়ে পড়।