হুমায়ূন আহমেদের লেখা সে আসে ধীরে শেষ খন্ড

পৃথিবীর সবচে’ সুখী মানুষের মতাে আমি ঘুমালাম। ঘুম ভাঙার পরেও বিছানায় উঠে বসলাম না। ছােটবেলার মতাে চোখ বন্ধ করে মটকা মেরে পড়ে রইলাম। আমার বিছানার পাশে বসে থাকা লােকটা এখনাে আছে। তাকে এখনাে চিনতে পারছি না। তবে চিনে ফেলব। সমস্যা হচ্ছে তাকে চিনতে ইচ্ছা হচ্ছে না।

সে-আসে-ধীরে 

হিমু সাহেব। জি। মনে হচ্ছে আপনার ঘুম ভেঙেছে। আমি ফ্লাস্ক ভর্তি চা নিয়ে এসেছি। মুখ ধুয়ে চা খাওয়ার অভ্যাস কি আপনার আছে ? 

আছে। 

এক কাপ চা কি দেব? দিতে পারেন। আমাকে কি আপনি চিনতে পেরেছেন? 

 আপনাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমি নিজেই আমাকে চিনতে পারছি না। আয়নার দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠে ভেবেছি— এ কে ? গত রাতে আমি গোঁফ ফেলে দিয়েছি। এতেই চেহারাটা অনেকখানি পাল্টে গেছে। তার উপর গায়ে দিয়েছি কটকটে হলুদ পাঞ্জাবি। কড়া হলুদ রঙ যে আইডেনটিটি ক্রাইসিস তৈরি করতে পারে তা জানতাম না। 

ভদ্রলােক শরীর দুলিয়ে ঘর কাঁপিয়ে হাসলেন। হাসি থামার পরেও আমার খাট দুলতে লাগল। 

সে আসে ধীরে শেষ খন্ড

আমি চোখ মেলে ভদ্রলােককে দেখলাম। বিছানায় উঠে বসলাম। ভদ্রলােক আমার দিকে গরম চা ভর্তি মগ ধরিয়ে দিলেন। আমি বললাম, আপনি কে? 

ভদ্রলােক বললেন, আমি আপনার আসমা ম্যাডামের হাজবেন্ড। নাম ফজলুল আলম। 

আপনি এখানে কেন ? | আমি ঠিক করেছি আজ সারাদিন আমি আপনার সঙ্গে থাকব। এই উপলক্ষে একটা হলুদ পাঞ্জাবি বানিয়েছি। আমি এসেছিও খালি পায়ে। 

 আমি কিছু বললাম না। চায়ে চুমুক দিলাম। ভদ্রলােক বললেন, চাটা কি ভালাে হয়েছে ? 

হ্যা। 

আমি কি আজ সারাদিন আপনার সঙ্গে থাকতে পারি ? থাকতে চাচ্ছেন কেন? আপনি সারাদিনে কী কী করেন সেটা দেখার ইচ্ছা। আমি সারাদিনে কিছুই করি না।। 

আমি এই কিছুই করি না-টাই দেখব। ভালাে কথা, আমি ইমরুল ছেলেটির মায়ের চিকিৎসার সব ব্যবস্থা করেছি। এই মহিলাকে তার স্বামী এবং সন্তানসহ দেশের বাইরে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করেছি। 

আমি কিছু না বলে আমার চায়ের মগ বাড়িয়ে দিলাম। চা খেতে খুবই ভালাে হয়েছে। এই চা দু’তিন মগ খাওয়া যায়। 

ভদ্রলােকের ধৈর্য ভালাে। আমি তাঁকে নিয়ে সারাদিন হটলাম। উদ্দেশাহীন হাঁটা। তিনি একবারও বললেন না, আমরা কোথায় যাচ্ছি। 

মতিঝিল এলাকায় একুশতলা বিল্ডিং-এর ফাউন্ডেশন হচ্ছে। আমি ভদ্রলােককে নিয়ে ঘণ্টাখানেক মাটি খােড়া দেখলাম। সেখান থেকে গেলাম নাটকপাড়া বেইলী রােডে। সেখানে একটা ফুচকার দোকানে রুপবতী সব মেয়েরা নানান ধরনের আহাদ করতে করতে ফুচকা খায়। দেখতে ভালাে লাগে। 

সে আসে ধীরে শেষ খন্ড

ফুচকা খাওয়া দেখে গেলাম রমনা থানায়। এই থানার বারান্দায় কেরােসিনের চুলা পেতে ইদ্রিস নামের এক ছেলে চা বানায়। তার চা হলাে অসাধারণ টু দা পাওয়ার টেন। আসমা ম্যাডামের হাজবেন্ডকে এই চা খাইয়ে দেয়া দরকার। থানার বারান্দায় বসে চা খাচ্ছি, ওসি সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তিনি বিরক্ত মুখে বললেন, হিমু না ? 

আমি বললাম, জি। 

আপনাকে আমি বলেছি থানার ত্রিসীমানায় যদি আপনাকে দেখি তাহলে খবর আছে। আমি আপনাকে হাজতে ঢুকিয়ে দেব। 

চা খেতে এসেছি স্যার। ইদ্রিসের চা। চা খেয়েই চলে যাব। প্রমিস । | থানার ভেতর চা খাওয়া যাবে না। এটা কোনাে রেস্টুরেন্ট না। কাপ হাতে নিয়ে রাস্তায় চলে যান। এক্ষুণি। এক্ষুণি।। 

আমরা কাপ হাতে রাস্তায় চলে গেলাম। চা শেষ করে গেলাম সােহরাওয়ার্দী উদ্যানে। এই সময় সেখানে নানান ধরনের মানুষের সমাগম হয়। ওদের দেখতে ভালাে লাগে। পার্কের একটি অংশে আসে হিজড়ারা। তারা আসে পুরুষের বেশে। এখানে এসে নিজেদের নারী করার চেষ্টা করে। ঠোটে কড়া করে লিপস্টিক দেয়। নারিকেলের মালার কাঁচুলি পরে। মুখে লজ্জা লজ্জা ভাব এনে একজন আরেকজনের চোখে কাজল দিয়ে দেয়। এদের সবার সঙ্গেই আমার খুব খাতির। আমাদের দু’জনকে দেখে তারা খুশি হলাে। 

একজন আনন্দিত গলায় বলল, কেমন আছেন গাে হিমু ভাইজান ? ভালাে আছি। সাথে কে ? 

জানি না আমার সাথে কে ? আমি নিজেকেই চিনি না। অন্যকে চিনব কীভাবে? 

আমার কথায় তাদের মধ্যে হাসির ধুম পড়ে গেল। তারা খুবই মজা পেল।

 

Read More

হুমায়ন আহমেদ এর যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *