অনেক গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট এই হােটেলে থেকেই পড়াশােনা করে। তুমিও ইচ্ছা করলে তা করতে পারে। হােটেলের সব সুযােগ-সুবিধা এখানে আছে। বার আছে, বল রুম আছে, সাওয়ানা আছে। একটাই অসুবিধা, হােটেলটা ইউনিভার্সিটি থেকে দশ কিলােমিটার দূরে। তােমাকে বাসে যাতায়াত করতে হবে। এটা কোনাে সমস্যা হবে না, হােটেল থেকে দু’ঘণ্টা পর পর ইউনিভার্সিটির বাস যায়। আমি কি বলছি বুঝতে পারছাে তো?
ও পারছি।ঃ তুমি এসেছাে একটা অঙ টাইমে, স্প্রীং কোয়ার্টার শুরু হতে এখনাে এগারে দিনের মতাে বাকি। সামারের ছুটি চলছে। এই ক’দিন বিশ্রাম নাও। নতুন দেশের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করতেও কিছু সময় লাগে। তাই না?
ও ইয়েস। |. টয়লা ক্লেইন হেসে বললেন—ইয়েস এবং নাে–এই দুটি শব্দ ছাড়াও তােমাকেআরো কিছু শব্দ শিখতে হবে। দুটি শব্দ সম্বল করে কথাবার্তা চালানাে বেশ কঠিন।
তিনি আমাকে হােটেলের রিসিপশনে নিয়ে অতিদ্রুত কি সব বলতে লাগলেন ডেস্কে বসে থাকা পাথরের মতাে মুখের মেয়েটিকে। সেইসব কথার এক বর্ণও আমি বুঝলাম না। বােঝার চেষ্টাও করলাম না। আমি তখন একটা দীর্ঘ বাক্য ইংরেজিতে তৈরি করার কাজে ব্যস্ত। বাক্যটা বাংলায় এ রকম—মিসেস টয়ল ক্লেইন, আপনি যে এই ভােররাতে আমাকে এয়ারপাের্ট থেকে আনার জন্য নিজে গিয়েছেন এবং নিজে হােটেলে পৌছে দিয়েছেন তাঁর জন্যে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
হোটেল গ্রেভার ইন খন্ড-৩
আমি আপনার প্রতি খুবই কৃতজ্ঞ বোধ করছি। | বাক্যটা মনে মনে যখন প্রায় গুছিয়ে এনেছি তখন টয়লা ক্লেইন আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, বাই। বলেই ছুটে বেরিয়ে গেলেন । আমার আর ধন্যবাদ দেয়া হলাে না। এই মহিলার আচার-ব্যবহারে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছিলাে উনি একজন অত্যন্ত কর্মঠ, দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন হাসিখুশি ধরনের মহিলা।
পরে জানলাম ইনি একজন খুবই ইনএফিসিয়েন্ট মহিলা। তাঁর অকর্মণ্যতা ও অযােগ্যতার জন্যে পরের বছরই তাঁর চাকরি চলে যায়।
হােটেল গ্রেভার ইমে আমার জীবন শুরু হলো। | তিনতলা একটা হােটেল। পুরােনো ধরনের বিড়িং। এর সবই পুরােনাে, কার্পেট পুরােনা, ঘরের বাতাসে পর্যন্ত একশ’ বছর আগের গন্ধ। আমেরিকানরা ট্রাডিশনের খুব ভক্ত এটা বলা ঠিক হবে না। তবে ডাকোটা কাস্ট্রির অনেক জায়গাতেই দেখেছি ওয়াইল্ড ওয়েস্ট ধরে রাখার একটা চেষ্টা। পুরোনাে হােটেলগুলােকে পুরােনাে করেই রাখা হয়েছে। দেয়ালে বাইসনের বড় বড় শিং। যত্ন করে ঝুলানাে আগের আমলের পাইপ গান, বারদের থলে। মেঝেতে বিছানাে ভারি কার্পেটের রঙ বিবর্ণ। আমেরিকানরা হয়তাে বা এসব দেখে নষ্টালজিক হয়। আমি হলাম বিরক্ত। কোথায় এরা আমাকে এনে তুললাে ?
আমার ঘরটা দোতলায়। বিরাট ঘর। দুটো খটি পাশাপাশি বিছানাে। ঘরের আসবাবপত্র কোনােটাই আমার মন কাড়লাে না। তবে দেয়ালজোড়া পুরােনাে কালের আয়নাটা অপূর্ব। যেন বাংলাদেশের দিঘির কালাে জলকে জমিয়ে আয়না বানিয়ে দেয়ালে সাজিয়ে রেখেছে। এ রকম চমৎকার আয়না এ যুগে তৈরি হয় কিনা আমি জানি না।
হোটেল গ্রেভার ইন খন্ড-৩
আমার পাশের ঘরে থাকেন নব্বই বা এক শ’ বছরের একজন বুড়ি। এই হােটেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাড়াও বাইরের গেস্টরা ভাড়া দিয়ে থাকতে পারেন। লক্ষ্য করলাম গেস্টদের প্রায় সবাই বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা শ্রেণীর। পরে জেনেছি, এদের অনেকেই জীবনের শেষের দিকে বছরের পর বছর হােটেলে কাটিয়ে দেন। বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের জন্যে নির্মিত ওল্ডহােমগুলাে তাদের পছন্দ নয়। ওল্ড হােমগুলােতে তাঁরা হসপিটাল হসপিটাল গন্ধ পান। লােকজনও ওল্ড হাউসগুলােকে দেখে করুণার চোখে, এর চেয়ে হােটেলই ভালো।
পাশের ঘরের বৃদ্ধার নাম মনে পড়ছে না—সুসিন বা সুজি জাতীয় কিছু হবে। দেখতে অবিকল পথের পাঁচালির সত্যজিতের ছবির ইন্দিরা ঠাকরুণের মতো। মাথার চুল সেই রকম ছােটছােট করে কাটা, বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর। শুধু পরনে শতছিন্ন শাড়ির বদলে স্কার্ট, ঠোটে লিপস্টিক। এই বৃদ্ধা, হােটেলে ঢােকার এক ঘন্টার মধ্যে আমার দরজায় নক করলেন। দরজা খোলামাত্র বললেন, সুপ্রভাত। তােমার কাছে কি ভারতীয় মুদ্রা আছে?
না।
ও স্ট্যাম্প আছে? ও না, তা-ও নেই।
Read More
